কাকলি চক্রবর্তী- বইটির নাম ‘‌অতঃপর অন্তঃপুরে’‌। লেখক সামরান হুদা। বইটি হাতে পেয়ে প্রথমেই মনে হয়েছিল নামটি ঘর গেরস্তালিও হতে পারত। তারপরেই মনে হয় যে না, অন্তঃপুর কথাটার মধ্যে যে–রহস্য আছে ঘর গেরস্তালিতে তা নেই। আসলে মানুষ তো জীবনটা কাটায়ই অন্তঃপুরের দিকে তাকিয়ে। সেটা হৃদয়ের অন্তঃপুরই হোক বা সংসারের।
এরপর প্রবেশিকায় প্রবেশ। সেখানে বৃষ্টিস্নাত সকাল বিকাল পাঠকমাত্রকেই নিয়ে যাবে তার আপন শৈশব–‌বাল্যের রূপকথা আর স্বপ্নের স্মৃতিতে। শহরে বেড়ে ওঠা শিশুদের ওই বর্ষা বা বন্যার অভিজ্ঞতা না থাকলেও বৃষ্টির ওই হালকা চাদর মনে একটা মায়া তৈরি করবেই। বই শুরু হয়েছে রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থর (‌১৮৩৩–‌১৯১৬)‌ ছড়ার আমন্ত্রণের মধ্য দিয়ে। ‘‌চাউল ভিজাইয়া কন্যার মায়ে ডাকছে আরিপরি/‌আরিপরি বৌ ঝিয়ারি সকলও নাইওরী,/‌তোমরা যাইও আমার বাড়ি।’‌ এইভাবেই সকলে মিলে চালের গুঁড়োর আলপনা দিয়ে শুভক্ষণের সূচনা করা হয়েছে কবিতায়।
‘‌অন্তঃপুর প্রবেশিকা’‌, ‘‌আইলো নকশা পিঠাতে চড়িয়া’‌, ‘‌নৈব নৈব চিতই’‌, ‘‌পিয়ুরসালা রানছোনি?‌’‌ ‘‌হারানো হাঁস ম্লান মুরগি’‌, ‘‌উত্তম বসনে বেশ করয়ে বনিতা’‌, ‘‌সংসারে এক তালব্য শ’‌, ‘‌বাটা ঝিলমিল বাটা ঝিলমিল বন্ধু খাওরে বাটার প্রাণ’‌, বইটি এই আটটি পর্বে সম্পূর্ণ। লেখক বলেছেন, এই বই যেমন খাল–‌ডোবা পথে নিরুদ্দেশ মাছেদের, তেমনই মাছের চিন্তায় উদ্‌ভ্রান্ত হয়ে পড়া বিরল মানুষদেরও বটে। অর্থাৎ পর্ব থেকে পর্বান্তরে রয়েছে সুখাদ্য সুবচন। প্রতিটি পর্ব শুরু হয়েছে কবিতা দিয়ে। সেটি কখনও ময়মনসিংহ গীতিকা কখনও রাজশাহি বা নবাবগঞ্জের খ্যামটা কখনও–বা ঢাকার ধুয়া গান। খাবারের বর্ণনা বয়ে চলেছে গল্পের বুনোটে। যেমন— ‘‌আমার দাদির একটা বিশেষ হালুয়া ছিল, সেটা দাদি নিজেই বানাত। এমনিতে দাদিকে রান্নাঘরে যেতে দেখিনি কখনও কিন্তু শবে বরাতের ওই হালুয়া দাদি নিজে বানাত। বিশাল এক হাঁড়ির মধ্যে একটু মোটা করে চালা চালের গুঁড়োকে ঘিয়ের মধ্যে নেড়ে নেড়ে চিনি আর গুড় মিশিয়ে সেই হালুয়া বানাত দাদি, সঙ্গে গোটা গোটা গরমমশলা আর কিশমিশ।’‌ অথবা ‘‌ঈদের দিনে আম্মা আর চাচি কাঠের আগুনে রেঁধে চলেছে খাসির রেজালা, মুরগির রোস্ট, শামি কাবাব আর পোলাও।’‌
‘‌জাড়ের দিনে পুয়া খাও/‌ঘুরা চিতাই দুটা দ্যাও/‌প্যাট কামড়াইলে খাইয়া লিও/‌চাইল ভাজা ঝাঁই।’‌ অথবা ‘‌হাঁস মারলাম কইতর মারলাম বাচ্যা মারলাম টিয়া।/‌ভাল কইরা রাইন্দো বেনুন কাল্যাজিরা দিয়া।’‌
পূর্ব বাংলার রান্নার ছড়া পড়তে পড়তে হঠাৎ ছোটবেলায় আমার পিসিমার মুখে শোনা একটা ছড়া মনে পড়ল।
‘‌প্রিয়ে তুমি বালাম চাল, তুমি অরহড় ডাল, তুমি আমার মাছের অম্বল জানবে চিরকাল।’‌‌ ছড়াটিতে তার পরেই আসছে অসাধারণ লাইন ক’‌টি: ‘‌তুমি আমার মাথার মণি, আয় তোরে মাথায় করি। সুন্দরী কার কথায় করেছ এত মনভারী।’‌ প্রিয়ার মানভাঞ্জনেও মোক্ষম অস্ত্র খাদ্য। সুকুমার রায়ও তাঁর ‘‌ভালো রে ভালো!’‌‌ কবিতায় বলেছেন— ‌‘‌পোলাও ভালো কোর্মা ভালো,/‌
মাছ–‌পটলের দোলমা ভালো,‌/‌...‌কিন্তু সবার চাইতে ভালো—
পাউরুটি আর ঝোলাগুড়।’‌ অতএব বাসনার সেরা বাসা যে রসনায়, এ–বিষয়ে আর সন্দেহ নেই।
খাদ্যাভ্যাস বা রন্ধনপ্রণালী বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে আমরা দেখি যে, নীহাররঞ্জন রায় তাঁর ‘‌বাঙালির ইতিহাস’‌ আদিপর্বে লিখছেন যে শুধু বাঙালি নয়, যে–কোনও জাতির ইতিহাস জানতে গেলেই তার খাদ্যাভ্যাসকেও জানতে হয়।
সাহিত্যিক বাংলাভাষার আগেও ‘‌সদুক্তিকর্ণামৃত’‌ ও ‘‌প্রাকৃত পেঙ্গল’‌–‌এর বহু শ্লোকে তৎকালীন মধ্যবিত্ত বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের পরিচয় পাওয়া যায়। সুকুমার সেন তাঁর ‘‌বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস’‌–‌এ এরকম উদ্ধৃতি দিয়েছেন—
‘‌সের এক্ক জই পাঅই ঘিত্তা/ ‌মণ্ডা বীস পকাইল নিত্তা/‌ 
টঙ্ক এক্ক জই সিন্ধব পাআ/‌ জো হউ রঙ্ক সো হউ রাআ।’‌ (‌এক সের ঘি যদি মেলে তো বিশটা মন্ডা–‌পাকানো যায়। আর এক ছটাক সৈন্ধব লবণ পেলে তো নিঃস্বও রাজা)‌
আরেকটি:‌ ‘‌ওগ্গর ভত্তা/‌ রম্ভয় পত্তা/‌ গায়িক ঘিত্তা/‌ দুগ্ধ সজুত্তা/‌
মোইলি মচ্ছা/ ‌নালিচ গচ্ছা/ ‌দিজ্জই কন্তা/ ‌খাই পুণবন্তা।’‌ (‌গরম ভাত, কলাপাতার ওপর, তাতে গাওয়া ঘি, পরিমাণ মতো দই, ময়না মাছ, নালতে শাক পড়লে তা অমৃত। তারপর যদি তা স্ত্রী বেড়ে দেয়, তো সে পুরুষ পুণ্যবান।)‌
তবে সে–সময় মানুষের চাহিদা ছিল অতি অল্প। এখনকার নেমন্তন্ন বাড়ির রান্নার স্বাদ পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরও কয়েক শতক। মোগলাই মশলাপাতির আগমন বা আরও পরে স্পেন–‌দেশীয় জলপাই তেলের আবির্ভাবে মিশ্র এই রন্ধন–সংস্কার জন্ম দিয়েছে উন্নততর রন্ধন শিল্পের।
বাঙালির খাদ্যস্মৃতি অনিবার্যভাবে মৎস্য–‌কে কেন্দ্র করে। এ বিষয়ে পুব বাংলার অভিজ্ঞতা ‌লিপিবদ্ধ হয়েছে দুই খণ্ডে ‘‌রসনাস্মৃতির বাসনাদেশ’‌ বইয়ে, সামরান হুদা যার অন্যতম সম্পাদক। তবে সে বই দুটি বিভিন্ন লেখকের রচনা সঙ্কলন। সেগুলিকে যদি বলি ‘‌কেটারিং’‌ ব্যবস্থার মাধ্যমে অতিথি অর্থাৎ পাঠককে আপ্যায়ন, তা হলে এই বইয়ে তিনি নিজেই বাড়িতে ‘‌ভিয়েন’‌ বসিয়ে দিয়েছেন। ‘‌অতঃপর অন্তঃপুরে‌’‌ বইটি অতি সুন্দর চিত্রিত। সেজন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য শফিকুল কবীর চন্‌দন–‌এর। প্রচ্ছদের সূচিশিল্প অপূর্ব হয়তো–বা অ–‌ভূতপূর্ব। ■

অতঃপর অন্তঃপুরে • সামরান হুদা • ৯ঋকাল বুকস • ৪৫০ টাকা‌‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top