সবুজকলি সেন- পর্দাপুরাণে পাঁচটি অধ্যায়। এক–একটি অধ্যায় পর্দার আড়ালে নারীদের অন্তঃপুরের জীবন থেকে তাদের বিনোদন–বহির্জগতে আসা, প্রবাসগমন এবং আলোকে উত্তরণের ইতিহাস। অধ্যায়গুলির নামকরণেও সেটি পরিস্ফুট— ‘‌পিঞ্জরে সোনারপাখি’‌, ‘‌বিনোদন ও পর্দা’‌, ‘‌বাহনে পর্দাতন্ত্র’‌, ‘‌প্রবাসে পর্দা’‌ এবং ‘‌আঁধারে আলো’‌। পৌরাণিক যুগ, বৌদ্ধযুগ থেকে একবিংশ শতক পর্যন্ত নারীদের ইতিহাস এই গ্রন্থের বিষয়। বৌদ্ধযুগ থেকেই বা বলা যায় পৌরাণিক যুগ থেকেই আমাদের দেশে পর্দাপ্রথার প্রচলন আছে, ইতিহাস আলোচনা করে লেখিকা সেটি প্রমাণ করেছেন।
লেখিকা ললিতাবিস্তার সূত্র থেকে উল্লেখ করে দেখিয়েছেন, সিদ্ধার্থপত্নী শাক্যসুন্দরী গোপা বিবাহের পর শাক্যরাজপুরীতে পা রাখলেন এবং প্রচলিত রীতিকে অস্বীকার করে অবগুণ্ঠনে মুখ না ঢেকেই বয়োজ্যেষ্ঠদের সামনে এগিয়ে গেলেন। যথারীতি সমালোচনার লক্ষ্য হলেন তিনি।
‘‌পিঞ্জরে সোনারপাখি’‌ সেই সব মেয়ের গল্প, যাঁরা শিকার হয়েছিলেন নিষ্ঠুর পর্দাপ্রথার। সন্তানসম্ভবাকে চিকিৎসা করানো হত না কেবলমাত্র ডাক্তার পুরুষ বলে। এমনকী ওষুধ সেবা পথ্য কোনও কিছুরই ব্যবস্থা হত না, এমন এক ময়নার গল্প বলেছেন লেখিকা। “‌অবশেষে ময়নার শেষ দিন ঘনিয়ে এলো খবর গেল শ্বশুরবাড়িতে, জামাই এসে একবার শেষ দেখা দেখে যাক। জামাই এলেন, তবে স্ত্রীর ঘরে ঢুকলেন না। ‘‌কী করে ঢুকবেন লোকনিন্দা আছে না?‌’‌ বাইরে থেকেই ময়নাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘‌কি খেতে ইচ্ছে হয়’‌?‌ উত্তর আসে ‘‌একটুখানি দুধ’।‌ শেষ আশা অপূর্ণ থাকে না। মৃত্যুর আগে আধসের দুধ খাওয়ানো হয় তাঁকে। সেই দিনই রাত বারোটায় ময়নার মৃত্যু হয়।”‌‌
কিছু কৌতুককর ঘটনার উল্লেখ করেছেন লেখিকা। হাঁসরা গ্রামের জমিদার বাড়ির মেয়ে প্রতিভা বসু তাঁর বাড়ির কথা শুনিয়েছেন। জমিদার বাড়িতে ভাই আর বোনের একই দিনে বিয়ে। জমিদার বাড়ির মেয়ে আর কুলীন কনে। কুলীন কনের বিয়ে হবে জমিদার বাড়ির ছেলের সঙ্গে। দুই কনেরই কলাবৌয়ের মতো একবুক ঘোমটা। অন্তঃপুরের গিন্নিরা যাঁরা স্ত্রীআচার, বরণ করবেন তাঁরাও পর্দার আড়ালে। এই পর্দা এক অঘটন ঘটাল। জমিদার মেয়েটিকে বসানো হল তাঁর ভাইয়ের পাশে আর কুলীন কন্যাটিকে মেয়েটির বরের পাশে। নিজের বাড়ি বলে বোধহয় জমিদারকন্যা দেখে নিয়েছিল তার বরের মুখ, তার নিজের দাদা। চেঁচিয়ে উঠেছিল— সোনাদা, আমি টুনি। রক্ষে হয়েছিল।
ইউরোপীয় প্রভাবে শিক্ষিত বাঙালিরা অন্তঃপুরে বিনোদন ব্যবস্থার দিকে দৃষ্টিপাত করেন। এর আগে বিনোদন ছিল বিকেলে চুল বাঁধার পালা, দুপুরে স্নানের পালা, মালিনী বা বৈষ্ণবীর কাছে অথবা শাড়ি নিয়ে আসা মহিলার কাছে, এ–বাড়ি ও–বাড়ির গল্প শোনা। বাইরের কলকাতা তখন এগিয়ে চলেছে, গঙ্গার ওপরে পুল হয়েছে মেয়েরা কিন্তু তা দেখতে পায়নি। তবু এর মধ্যে দেখি হেমন্তবালা— যিনি মা–বাবার প্রশ্রয়ে ক্রিকেট খেলা শিখেছেন, বাড়িতে কিছুটা গান–বাজনাও শিখেছিলেন এবং পেয়েছিলেন পড়ার অভ্যাস। কিন্তু হায়, শ্বশুরবাড়িতে এসে সবই তাঁকে ছাড়তে হল, ছাড়েননি পড়ার অভ্যাস। কিন্তু সেখানেও ছিল বিধিনিষেধ। স্ত্রীশিক্ষামূলক বই পড়ার অনুমতি ছিল শুধু, ছিল না পুরাণাদি অশ্লীল বই পড়ার অনুমতি। আরেক পর্দানশিন বইপাগল বধূ মনোদার কথা জানিয়েছেন লেখিকা। ভাগনে যোগেশ তাঁর ঘরে রেখে যেত পড়ার জন্য বই। মনে মনেই প্রাপ্তি স্বীকার করেন, কথা তো বলা যায় না পনেরো–ষোলো বছরের ছেলের সঙ্গে। এক জেনানা মিসট্রেস সরযূবালা সেনের নাম পাই। সাইকেলে চড়ে পাড়ায় পাড়ায় স্কুলে যান। কিন্তু কোথাও পেলাম না সিস্টার নিবেদিতার কথা— যিনি বিদেশিনি হয়েও পর্দা ভেদ করে হিন্দুর অন্তঃপুরে প্রবেশ করতে সর্মথ হয়েছিলেন। ধীরে ধীরে সখীসমিতি, শিল্পমেলা, এগজিবিশন দেখা, ছবি আঁকা, সাহিত্যচর্চা— সব কিছুতে এগিয়ে এলেন ঠাকুর বাড়ির মেয়েরা। নারী মুক্তির আন্দোলনে এক পুরোধা পুরুষ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। নারীদের বিনোদনের পর্দানশিন পরিবারের কথা জানিয়েছেন লেখিকা। পালকি একমাত্র বাহন শহরে— গ্রামেও। এমনই পর্দার নিষেধ যে পালকি থেকে অসাবধানে ছোট শিশু পড়ে গেল জঙ্গলে— মা বলতেও পারলেন না বেহারাকে— পরপুরুষ যে। অবশেষে, মায়ের কান্নায় হুঁশ ফেরে সকলের। এই শিশুটি ছিলেন বীরবল প্রমথ চৌধুরীর দিদি ও কবি প্রিয়ম্বদা দেবীর মা।
পরিবর্তনও দেখা দিল— মেয়েরা ধীরে ধীরে ঘোড়ার রাশ নিজের হাতে রেখে খোলা ফিটনে চড়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। গহরজান ছিলেন এঁদের মধ্যে একজন। অবন ঠাকুরের স্ত্রী সুভাষিণীর আবার শখ ছিল বিকেলে ঘোড়ার গাড়িতে বেড়ানোর এবং সাহেবি দোকানগুলি ঘুরে ঘুরে দেখা।
ধীরে ধীরে এল ট্রাম। পর্দা কিন্তু থেকেই গেল, শুধু রকম–ফের হল মাত্র। এসেছে বঙ্গরমণীদের পশ্চিমের যাওয়ার, হাওয়া বদলে যাওয়ার গল্প। এখানে পর্দা একটু কম, এখানে একটু স্বাধীনতার স্বাদ। পশ্চিমি পরিবারগুলির পর্দা তখনও শিথিল হয়নি। তখনও তাঁরা অসূর্যম্পশ্যা, তবুও এরই মধ্যে মজফ্‌ফরপুরে দুই সখী অনুরূপা দেবী ও রবীন্দ্রকন্যা মাধুরীলতার বিদ্যালয় খোলার প্রচেষ্টা বেশ প্রাসঙ্গিক।‌
এই অন্ধকারের মধ্যেই ফুটে ওঠে আলোর রেখা। আবার সেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি। স্বামী সাহেব–সুবোর সঙ্গে কী করেন দেখতে রাতের অন্ধকারে গোপনে বিশ্বস্ত দাসীকে সঙ্গে নিয়ে পা রাখলেন অন্তঃপুরের বাইরে। সেই বাড়িরই সত্যেন্দ্রনাথ স্বপ্ন দেখালেন, ভেঙে দিচ্ছেন অন্তঃপুরের ঝরোখা। দিগম্বরীর নাতবউ জ্ঞানদানন্দিনী নারী স্বাধীনতার পথিকৃৎ হলেন। ধীরে ধীরে পর্দানশিন বধূদের ক্যামেরায় ছবি তোলা শুরু হল, মহিলা ফটোগ্রাফার এলেন। সরোজিনী ঘোষ জীবিকা করলেন ফটোগ্রাফিকে। এগিয়ে এলেন অন্যরাও— অন্তঃপুরের মুক্তির ইতিহাস লেখা হল এঁদের দিয়েই। ১৮৮৯ সালের বোম্বাইয়ে কংগ্রেসের অধিবেশনে বাংলা থেকে গিয়েছিলেন স্বর্ণকুমারী দেবী ও কাদম্বরী গাঙ্গুলী। ১৮৪৯–এ হল বেথুন স্কুল। এরপরে ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয় এই দশকের শেষ পর্বে স্থাপিত হল। এই সময়ে উচ্চশিক্ষিতা প্রগতিশীল মনের বেগম রোকেয়ার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল ছাড়াও মুসলিম মেয়েদের জন্য হল আঞ্জুমান গার্লস স্কুল।
১৯২১ সালে ১৩ আগস্ট মহিলাদের ভোটাধিকারের পক্ষে গঠিত হল বঙ্গীয় নারী সমাজ। অবশেষে এল দেশ ভাগ। আর থাকল না হিন্দু মেয়েদের পর্দা। পর্দানশিন মেয়েদের ভিড়ে তখন স্টেশন প্ল্যাটফর্ম ফুটপাথ উপছে পড়ছে। উদ্বাস্তু জীবনে নিরাপত্তাহীন জীবনের নরম মন কঠোর হতে সময় নিল না। পুরুষদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শুরু হল বেঁচে থাকার লড়াই। কলকাতাবাসী অবাক হয়ে দেখল উদ্বাস্তু মেয়েদের নবজাগরণ। বাসে ট্রেনে ট্রামে তাঁরা ভিড় করে যাচ্ছেন নানা কাজে। লেখাপড়া শেখার জন্যও তাঁরা মরিয়া। আজকের বাঙালি নারীর কল্পনার বাইরে সেই সংগ্রামের ইতিহাস।
জয়িতা দাসের পর্দাপুরাণ সেই কাল থেকে শুরু করে আজকের কালের ইতিবৃত্ত। নারীমুক্তির ইতিহাসে এই গ্রন্থটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান। ■
পর্দাপুরাণ:‌ বাঙালি নারীর আড়াল ও অন্তরাল • জয়িতা দাস 
কারিগর • ৫৩০ টাকা‌‌‌‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top