দু–একদিন নিশ্চিন্ত হয়ে কোথাও নেশা করে পড়ে থাকার উপায় ছিল না। চটকা ভাঙলেই চোখের সামনে ভেসে উঠবে— একটা মানুষ উপোস করে ঘরের মেঝেয় লম্বা হয়ে পড়ে আছে।.‌.‌.‌ সদর দরজায় কড়া নাড়লেই দরজা খুলে যাবে— সামনে থাকবে বোকা–বোকা ভীতু চোখে একটা উপোসী শুকনো মুখ।.‌.‌.‌ রাগারাগি বকাঝকা অনেক করেচি।.‌.‌.‌ কোনও ফল হয়নি। কৈফিয়তও চায় না— রাগও করে না— শুধু ভাবনাভয়ে ভরা ভীতু চোখে তাকিয়ে থাকে।’‌
অতি নিকট থেকে জানতেন, অপরিমেয় স্নেহ পেয়েছিলেন, তিনি তঁার বিবাহব্যবস্থা করেছিলেন— সেই রাধারাণী দেবীকে শরৎচন্দ্র এসব বলেছিলেন। যঁার সম্পর্কে এ কথা বলেছিলেন, তিনি হিরণ্ময়ী দেবী। ‘‌শরৎচন্দ্র:‌ মানুষ ও শিল্প’‌ বইতে বিশেষ করে মানুষ শরৎচন্দ্রকে চেনাতে চেয়েছিলেন রাধারাণী। মরমি মানুষটির জীবনে ঘাত–প্রতিঘাত কম ছিল না, ছিল টানাপোড়েন, বিবিধ সঙ্কট— সেদিকেই আলো ফেলেছেন স্নেহধন্যা রাধারাণী।
রাধারাণী দেবীকে বালিগঞ্জের বাড়িতে বসে শরৎচন্দ্র সেদিন নিজের বিপন্নতার কথা শুনিয়েছিলেন। জীবনসঙ্গিনী হিরণ্ময়ী দেবীর ভক্তিপরায়ণতার এই বাড়াবাড়ি নিয়ে শরৎচন্দ্র প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেছেন। কখনও বা হাসি–মশকরাও। সেদিকে হিরণ্ময়ী দেবী ফিরেও তাকাতেন না। নিত্যদিনের কর্মসূচি থেকে কেউ তঁাকে কখনও টলাতে পারেননি। স্বামী নরেন্দ্র দেবকে সঙ্গে নিয়ে রাধারাণী দেবী এক রোববার সকালের দিকে শরৎচন্দ্রের বাড়িতে গিয়ে এক নিদারুণ দৃশ্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন। খবরের কাগজ হাতে নিয়ে শরৎচন্দ্র তখন আড্ডায় মশগুল। হঠাৎই ছন্দপতন। সবারই চোখ চলে যায় দরজার দিকে। রাধারাণী লিখেছেন, ‘‌দরজার সামনে বউদি এসে দঁাড়ালেন। চওড়া লালপাড় তসরের শাড়ি, সিঁথিতে চওড়া সিঁদুর, সাদা শঁাখা, আর একগোছা ঝকঝকে সোনার চুড়ি।’‌ হিরণ্ময়ী দেবীর হাতে ছিল পাথরের বাটি। কখনও কঁাসার বাটিও থাকত। শূন্য বাটি নয়, জল–ভরা বাটি হাতে নিয়ে লজ্জা–লজ্জা মুখে কেন হিরণ্ময়ী দেবীর আগমন— শরৎচন্দ্র খোলসা করেছিলেন খানিক রসিয়ে। রাধারাণী দেবী, শরৎচন্দ্রের কাছে যিনি স্নেহের ‘‌রাধু’‌, তঁাকে নিয়ে কৌতুক করতেও ছাড়েননি। কৌতুক মেশানো গলায় হিরণ্ময়ী দেবীর উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘‌পা–দোক নেবে বুঝি তুমি?‌ এরা রয়েছে বলে লজ্জা হচ্চে?‌ লজ্জার কী আছে?‌ তুমি কত ভক্তিমতী আদর্শ হিন্দুনারী— একটু দেখেশুনে শিখে নিক না রাধু। এরা তো সব একেলে বিবি–মেয়ে।’‌
‘‌রাধু’‌কে জড়িয়ে শরৎচন্দ্র যা বলেছিলেন, তা নিশ্চয়ই তঁার মনের কথা নয়। শরৎচন্দ্রের পা–ধোয়া জল খেতেন প্রতিদিন, হিরণ্ময়ী দেবীর এই ভক্তির বাড়াবাড়িতে স্তম্ভিত হতেই হয়। যঁার লেখার অনেকখানি জুড়েই নারীমনের যন্ত্রণা, দুঃখের বারোমাস্যা, সেই শরৎচন্দ্র এসব বরদাস্ত করতেন কী করে, কে জানে। তঁার ভাবনার জগতের সঙ্গে মেলানো যায় না, ঘোরতর বৈপরীত্য রয়ে যায়। ভাবতেও কেমন যেন লাগে, হিরণ্ময়ী দেবী এভাবে প্রতিদিন জলের বাটি শরৎচন্দ্রের পায়ের কাছে ধরতেন। শরৎচন্দ্র বাটির জলে বুড়ো আঙুল ছুঁইয়ে দিতেন। রাধারাণী দেবী লক্ষ্য করেছিলেন, ‘‌বউদি শরৎদাকে প্রণাম করে বাটি হাতে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।’‌
যতই মধ্যযুগীয় মনে হোক না কেন, এও বোধহয় গভীর প্রেমের এক ভিন্নতর প্রকাশ। যদিও শরৎচন্দ্র তঁাকে প্রথা মেনে বিয়ে করেননি। শরৎচন্দ্রকে যঁারা নিকট থেকে জানতেন, তঁারা কেউ কেউ এ বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন। মধ্যযুগীয় ‘‌পাদোদক’‌–পান, সেই সঙ্গে আধুনিকতার পরিচয়বহ ‘‌লিভটুগেদার’‌— সবই শরৎচন্দ্রের জীবনে মানানসই হয়ে উঠেছিল। বাড়তি সমস্যা তৈরি করেনি।
হিরণ্ময়ী দেবী শরৎচন্দ্রের জীবনে এসেছিলেন এক ঝোড়ো–এলোমেলো সময়ে। সাহিত্যচর্চা থেকে স্বেচ্ছায় নির্বাসিত, আত্মীয়স্বজন–পরিবৃত্ত চেনা পরিমণ্ডলের বাইরে তখন তিনি রয়েছেন দূর–প্রবাসে রেঙ্গুনে। সে–সময়, আকস্মিকই হিরণ্ময়ী দেবীর আগমন। এসেছিলেন নিঃশব্দ চরণে, পিতার হাত ধরে। পিতা তঁাকে শরৎচন্দ্রের হাতে সমর্পণ করে কন্যাদায় থেকে মুক্ত হয়ে নিশ্চিন্ত হতে চেয়েছিলেন। হিরণ্ময়ী দেবীর পিতা কৃষ্ণদাস চক্রবর্তীর (‌মতান্তরে অধিকারী)‌ সঙ্গে শরৎচন্দ্রের পূর্বপরিচয় ছিল। সেই পরিচয়ের সূত্রেই গড়ে উঠেছিল নির্ভরতা। তাই হিরণ্ময়ী দেবীকে সঙ্গে নিয়ে এভাবে হাজির হয়েছিলেন শরৎচন্দ্রের বাসগৃহে। শরৎচন্দ্রের জীবনীকার গোপালচন্দ্র রায় তথ্যের প্রয়োজনেই বারবার হিরণ্ময়ী দেবীর কাছে সামতাবেড়ের বাড়িতে ছুটে গিয়েছিলেন, হিরণ্ময়ী দেবীর সঙ্গে শুধু নয়, শরৎচন্দ্রের আত্মীয়পরিজনের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন। সেই শোনা কথার ভিতিতে গোপালচন্দ্র লিখেছেন কী করে শরৎচন্দ্রের সঙ্গে হিরণ্ময়ী দেবীর যোগাযোগ ঘটেছিল। তঁার লেখায় আছে, ‘‌একদিন সকালে কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে শরৎচন্দ্রকে অনুরোধ করে বলেন— আমার মেয়েটির এখন বিয়ের বয়স হয়েছে। একে সঙ্গে নিয়ে একা বিদেশ বিভুঁইয়ে কোথায় থাকি। আপনি যদি অনুগ্রহ–পূর্বক আমার এই কন্যাটিকে গ্রহণ করেন তো গরিব ব্রাহ্মণের বড় উপকার হয়।’‌
এ প্রস্তাবে তৎক্ষণাৎ সাড়া দিতে পারেননি শরৎচন্দ্র। আকস্মিক এমন এক প্রস্তাব শুনে, সামনে দঁাড়ানো চোদ্দো বছরের হিরণ্ময়ীকে দেখে বিষম সঙ্কটেই পড়েছিলেন। বছর দুয়েক আগে প্রয়াত শান্তির স্মৃতি তখনও মনের মণিকোঠায় সযত্নে লালিত, সেই স্মৃতিতে তিনি আচ্ছন্ন। বেদনায় বিষণ্ণতায় লেখাটেখা ছেড়েছুড়ে কোনও রকমে চলেছে তঁার দিনযাপন। এর মাঝে যদি এমন প্রস্তাব আসে, এক ভাগ্যবিড়ম্বিত পিতা, চোখেমুখে আর্তি নিয়ে সম্মুখে দঁাড়ান, তাহলে দ্বিধায় দ্বন্দ্বে জেরবার হওয়াই তো স্বাভাবিক। শরৎচন্দ্রের ক্ষেত্রেও তেমনই হয়েছিল।
আজকের মায়ানমার, সেকালের রেঙ্গুনে এসে প্রথমদিকে শরৎচন্দ্র বেশ আনন্দেই ছিলেন শান্তি–সান্নিধ্যে। ‘‌ব্রহ্মদেশে শরৎচন্দ্র’‌ নামে একটি বই লিখেছিলেন শরৎচন্দ্রের রেঙ্গুনের বন্ধু গিরীন্দ্রনাথ সরকার। সে–বইতে আছে, ‘‌শরৎচন্দ্র স্বজাতীয় কোনও ব্রাহ্মণ কন্যাকে সমাজের অবিচার হইতে রক্ষা করিবার জন্য স্ব–ইচ্ছায় বিবাহ করিয়া সুখী হইয়াছিলেন।.‌.‌.‌ স্বপ্নবিলাসী শরৎচন্দ্রের প্রাণে ছিল অপূর্ব প্রেমের ভাণ্ডার, তিনি তঁাহার সমস্ত খুলিয়া দান করিয়াছিলেন স্ত্রী শান্তি দেবীকে.‌.‌.‌।’‌ গিরীন্দ্রনাথ বন্ধুজন, এসব দেখে কৌতুক করেই শরৎচন্দ্রকে বলতেন, ‘‌মহাস্ত্রৈণ’‌। শান্তির সঙ্গে শরৎচন্দ্রের হঠাৎই বিবাহ, এমন এক ঘটনার প্রেক্ষাপটে সে–বিবাহ, যা গল্পকথা বলেই ভ্রম হতে পারে। রেঙ্গুনে শরৎচন্দ্র যে বাড়িতে থাকতেন, সে–বাড়ির একতলায় কলকবজার এক মিস্ত্রি থাকত। স্ত্রী মরেছে, কারখানায় কাজ করে মেয়েকে নিয়ে কোনও রকমে দিন কাটানো সেই মিস্ত্রি রোজ রাতে নেশাড়ু বন্ধুদের নিয়ে মদ–গঁাজার আসর বসাত বাড়িতে। মেয়েটি বড়ই বিপন্ন হয়েছিল সংসারে। লাঞ্ছনা–গঞ্জনার সে–জীবন মুখ বুজেই সহ্য করছিল। হঠাৎই জানতে পারে, এক বৃদ্ধ–মাতালের হাতে বাবা সঁপে দিতে চাইছে তাকে। সে–পরিকল্পনা তলে তলে অনেক দূর এগিয়েওছে।
অশ্রুজলে অসহায় মেয়েটি দোতলার যুবকের কাছে সেদিন আশ্রয় খুঁজেছিল। শরৎচন্দ্র অশ্রুসিক্ত কিশোরী–কন্যাকে শুধু আশ্রয় দেননি, দিয়েছিলেন স্ত্রীর স্বীকৃতি। শরৎচন্দ্র ও শান্তির আনন্দ–সংসার স্থায়ী হয়নি। ভেঙেচুরে সব তছনছ হয়ে গিয়েছিল। শান্তির কোল–আলো করে যে পুত্রসন্তানের জন্ম হয়েছিল, এক বছরের বেশি বঁাচেনি সে। বঁাচেনি শান্তিও। প্লেগে দু’‌দিনে দুটি প্রাণ শরৎচন্দ্রকে বিধ্বস্ত করে ঝরে পড়ে।
হিরণ্ময়ী দেবী যখন পিতৃদেবের হাত ধরে দরজায় দঁাড়ালেন, তখনও শরৎচন্দ্র শান্তিময়, নানা রঙের দিনগুলিরই স্মৃতি হাতড়াচ্ছেন। তঁার গান গাওয়া, ছবি অঁাকা— সব বন্ধ হয়েছিল আগেই। সাহিত্যেও আর মনোনিবেশ করতে পারতেন না। প্রাণোচ্ছল চেনা শরৎচন্দ্র একেবারেই অচেনা হয়ে উঠেছিলেন।
প্রথমে রাজি না হলেও অচিরেই রাজি হতে হয়। হিরণ্ময়ী দেবীকে মন্ত্রোচ্চারণ করে বিবাহ না করলেও অন্তর থেকেই তঁাকে গ্রহণ করেছিলেন শরৎচন্দ্র। হিরণ্ময়ী দেবীকে নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আবিষ্কার করেছিলেন।
শরৎচন্দ্রের জীবনীকার গোপালচন্দ্র রায় শ্যামচঁাদপুর গ্রামে গিয়ে পরবর্তিকালে হিরণ্ময়ী দেবীর পিতা কৃষ্ণদাসের বংশপরিচয় ও সন্তানসন্ততিদের নামধাম উদ্ধার করেছিলেন। জানা যায়, কৃষ্ণদাসের চার কন্যা, কনিষ্ঠার নাম মোক্ষদা। মোক্ষদাই হিরণ্ময়ী। এ নাম কি শরৎচন্দ্রের দেওয়া, যদি তা–ই হয়, তাতে অবাক হওয়ার কী আছে!‌ সুখ্যাত হিন্দি–লেখক বিষ্ণু প্রভাকর ‘‌আওয়ারা মসীহা’‌ নামে শরৎচন্দ্রের একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। নানা ভারতীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে এই জীবনীগ্রন্থটি। বাংলা ভাষায় অনূদিত সংস্করণটির নাম ‘‌ছন্নছাড়া মহাপ্রাণ’‌। এ বই থেকে জানা যায়, সে–সময় শরৎচন্দ্র অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সেবায় পরিচর্যায় হিরণ্ময়ীই সুস্থ করে তুলেছিলেন তঁাকে। বিষ্ণু প্রভাকরের লেখা জীবনচরিতে আছে, ‘‌মায়ের মৃত্যুর পর শান্তি তঁার জীবনে একমাত্র নারী যে তঁাকে সত্যিকারের স্নেহ–ভালোবাসা দিয়েছিল। বহুদিন পর দুটো মমতামাখানো কথা, তঁার মনে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ল।’‌
এদিকে কন্যাটিকে শরৎচন্দ্রের কাছে রেখে তঁার পিতা কৃষ্ণদাস ততদিনে রেঙ্গুন থেকে ফিরে গিয়েছেন। হিরণ্ময়ী শরৎচন্দ্রের কাছেই রয়ে গিয়েছিলেন। দিনে দিনে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে মোক্ষদা শরৎচন্দ্রের কাছে নতুন করে ধরা দিয়েছেন। শরৎচন্দ্র বুঝেছেন, খঁাটি সোনা, ‘‌মোক্ষদা’‌ আসলে হিরণ্ময়ী। ‘‌ছন্নছাড়া মহাপ্রাণ’‌ বইতে বিষ্ণু প্রভাকর লিখেছেন, ‘‌যতক্ষণ না গান–বাজনা, আলোর ঝলমলানি ও বিধি–বিধানের সঙ্গে বিয়ে হয়, সমাজ তা মানতে চায় না। না মানুক, সর্বহারাদের শরৎ তা মেনেছিল।.‌.‌.‌ আইনত স্ত্রী না হয়েও স্ত্রীর সব দায়িত্ব হিরণ্ময়ী সেদিন গ্রহণ করেছিল। মনের এই মিলনই যথার্থ বিবাহ। .‌.‌.‌ হিরণ্ময়ী যদি মন্ত্রশুদ্ধ স্ত্রী না–ও হয়, তাতে কী হয়েছে?‌ সমাজ যদি তাকে স্ত্রীর ন্যায্য মর্যাদা না দিয়ে থাকে, তাতে তার কি ক্ষতি হয়েছিল?‌ শরতের প্রতি তার মনে ভক্তি শ্রদ্ধা ও ভালবাসার শেষ ছিল না। শরৎও যে হিরণ্ময়ীকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসত।’‌
এই ভালবাসায় কোনও খাদ ছিল না, সজীব ছিল জীবনভর। তঁাদের আদৌ আনুষ্ঠানিক বিবাহ হয়েছিল কি না, তা নিয়ে একদা মতভেদ–মতান্তর কম হয়নি। শরৎচন্দ্রের স্নেহধন্য উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, নরেন্দ্র দেব ও রাধারাণী দেবীর সুরে সুর মিলিয়ে হিরণ্ময়ী দেবীকে শরৎচন্দ্রের ‘‌জীবন–সঙ্গিনী’‌ বলতে চাননি। ‘‌শরৎচন্দ্র প্রসঙ্গ’‌ নামের বইটিতে নিজের মতো করে যুক্তির পর যুক্তি সাজিয়ে ওই অভিমতের বিরোধিতা করেছেন তিনি। আদৌ হিরণ্ময়ী দেবীকে শরৎচন্দ্র বিবাহ করেছিলেন কি না, তা নিয়ে ঘোরতর অস্পষ্টতা রয়েছে। গোপালচন্দ্র রায়ও তঁার ‘‌শরৎচন্দ্র’‌ নামের বইটির ভূমিকায় লিখেছিলেন, ‘‌সত্যই শরৎচন্দ্রের বিবাহটা একটা ধোঁয়াটে ব্যাপার। কেউ কেউ বলেন তিনি বিয়ে করেছিলেন;‌ আবার অনেকে বলেন, তিনি বিয়ে করেননি, কেবল জীবনসঙ্গিনী জুটিয়েছিলেন।’‌ গোপালচন্দ্র নিজে অবশ্য বিবাহ হয়েছিল বলেই মনে করেছেন।
মতভেদ–মতান্তরের কূটকচালি যতই চলুক, রাধারাণী দেবীও লক্ষ্য করেছিলেন, ‘‌শরৎচন্দ্র তঁাকে স্ত্রীর পূর্ণ মর্যাদায় সংসারে প্রতিষ্ঠিত রেখেছিলেন।’‌ হিরণ্ময়ী দেবীর দুঃস্থ পিতার প্রতি শরৎচন্দ্র কতখানি সহানুভূতিশীল ছিলেন, তা বোঝা যায় একটি ঘটনায়। শরৎচন্দ্রের বই ছাপতেন কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের ‘‌গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড সন্স’‌। প্রকাশকের কাছ থেকে রয়্যালটি বাবদ যে টাকা প্রাপ্য হত, সে–টাকা থেকে মাসে মাসে পঁাচ টাকা মানি অর্ডার যেত মেদিনীপুরে, হিরণ্ময়ী দেবীর পিতার ঠিকানায়। শরৎচন্দ্রের নির্দেশে প্রকাশক এই টাকা পাঠাতেন।
হিরণ্ময়ী দেবী ছিলেন রন্ধনপটিয়সী, ভাল রান্না করতেন। শরৎচন্দ্রকে এটা–সেটা রেঁধে খাওয়াতেন। লীলারাণী গঙ্গোপাধ্যায় নামে এক লেখিকা শরৎচন্দ্রকে মাঝে মাঝেই চিঠি লিখতেন। শরৎচন্দ্রও সে–সব চিঠির উত্তর দিতেন। ‘‌পরম কল্যাণীয়াসু’‌ সম্বোধনে লেখা শরৎচন্দ্রের চিঠিতে সম্পর্কের মাধুর্যতা গোপন থাকেনি। হাওড়ার কাছে শিবপুর থেকে লেখা এক চিঠিতে হিরণ্ময়ী দেবী খাওয়ার ব্যাপারে কতখানি পীড়াপীড়ি করতেন, সে–সব জানিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র। হিরণ্ময়ী দেবী শরৎচন্দ্রকে চোখে চোখে রাখতেন, তঁাকে নিয়ে কতখানি চিন্তা–দুশ্চিন্তা ছিল, তা বোঝা যায় এই তৎপরতায়। যত্নের বাড়াবাড়ি, অভিমান করে ‘‌বিবাগী’‌ হয়ে যাওয়ার কথা বলা— সবই হিরণ্ময়ীর প্রেমের ভিন্নতর প্রকাশ। শরৎচন্দ্র উল্লিখিত চিঠিতে লীলারাণীকে লিখেছিলেন, ‘‌বাড়ীর লোকে বোঝে না, তারা ভাবে আমি কেবল না খেয়ে খেয়েই রোগা। সুতরাং খেলেই বেশ ওদেরই মত হাতী হয়ে উঠব।.‌.‌.‌ আজ বিশ বছর আমরা কেবল খাওয়া নিয়েই লাঠালাঠি করে আসছি। ঐ খেলে না, খেলে না— রোগা হয়ে গেল— ঘরসংসার রান্নাবান্না কিসের জন্য— যেখানে দুচোখ যায় বিবাগী হয়ে যাব.‌.‌.‌।’‌
হিরণ্ময়ী দেবী রান্নাবান্নায় যেমন মনোযোগী ছিলেন, তেমনই মনোযোগী ছিলেন পূজার্চনায়। ধর্মেকর্মে নিবেদিতপ্রাণ। ব্রত–উদযাপন, ব্রাহ্মণভোজন— এসব বাড়িতে লেগেই থাকত। শরৎচন্দ্র এসবে কখনও বাধা দেননি। সব সময়ই সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে পাশে থেকেছেন। হিরণ্ময়ী দেবীর ব্রত উদযাপনকল্পে একবার প্রচণ্ড গরমে গোটা চৈত্রমাসই শরৎচন্দ্রকে কাটাতে হয়েছিল কাশীতে। একলাইনও লিখতে পারেননি, তবু বিরক্ত না হয়ে হিরণ্ময়ী দেবীর মনস্কামনাকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র। প্রকাশক হরিদাস চট্টোপাধ্যায়কে দুশো টাকা পাঠানোর আর্জি জানিয়ে কাশী থেকে লিখেছিলেন, ‘‌এখানে ভারি গরম পড়িয়াছে, আর এক মুহূর্ত মন টেকে না এমন হইয়াছে। .‌.‌.‌ একটা ব্রত উদযাপন আছে এঁর। শ দুই টাকা পাঠিয়ে দেবেন। একছত্র লেখা বার হয় না, একি বিশ্রী দেশ। গত ৪/‌৫ দিন নিয়ে বসি, আর ঘণ্টা দুই চুপ করে থেকে উঠে পড়ি।’‌
হিরণ্ময়ী দেবীর মনস্কামনাকে স্বীকৃতি দিতে নিজের মনোযন্ত্রণা এভাবেই শরৎচন্দ্র হেলায় সহ্য করেছিলেন। হিরণ্ময়ী অসুস্থ হলে তিনি কতখানি উদ্বিগ্ন–বিচলিত হতেন, তা আত্মজনের স্মৃতিচর্চায় ছড়িয়ে আছে।
জীবনের শেষ ক’‌বছর শরৎচন্দ্রের সুখে কাটেনি। অসুখ যেন আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ধরেছিল। লিভার–কিডনির সমস্যা তো ছিলই, বাত–বেদনা, এমন–কি উদরাময় রোগেও আক্রান্ত হয়েছিলেন। বন্ধুদের অনুরোধে, ডাক্তারের পরামর্শে সে–সময় টানা কিছুদিন দেওঘরে গিয়ে ছিলেন। দেওঘরে গিয়ে উঠেছিলেন প্রকাশক–বন্ধু হরিদাস চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে। স্বাস্থ্যোদ্ধারে গিয়েও সারাক্ষণ ভেবেছেন বাড়ির কথা, হিরণ্ময়ী দেবীর কথা। দেওঘর থেকে হিরণ্ময়ীকে লিখেছিলেন, ‘‌ভাবনা তোমার জন্যেই, পাছে অসাবধানে অসুখ–বিসুখ করে। কারণ, তোমার অসুখ করেছে যেদিন কানে শুনতে পাবো, সেই দিনই দেওঘর ছেড়ে কলকাতায় চলে যাবো।’‌
ওই চিঠিতেই লিখেছিলেন, ‘‌সকলেই বলচেন ১মাস ২মাস থাকতে পারলে শরীর সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যাবে।’‌ না, ভাল হননি শরৎচন্দ্র। দেওঘর থেকে ফিরে এসেই ভর্তি হতে হয়েছিল পার্ক নার্সিংহোমে। ধরা পড়েছে ক্যান্সার, যকৃতের ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে পাকস্থলীতে। শরৎচন্দ্র অসুস্থ, নার্সিংহোমে— শুনে উদ্বিগ্ন রবীন্দ্রনাথ কুশল কামনা করে চিঠি লিখেছেন, ‘‌তোমার আরোগ্য লাভের প্রত্যাশায় বাংলাদেশ উৎকণ্ঠিত হয়ে থাকবে।’‌
সব উদ্বিগ্নতার অবসান হল অতি দ্রুত। ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের পরামর্শে ডাঃ ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় অপারেশন করেছিলেন। ডাঃ রায় বলেছিলেন, ‘‌অপারেশন না হলে শরৎচন্দ্র পরশু মারা যাবেন।’‌ অপারেশনের পর শরৎচন্দ্র বেঁচেছিলেন চারদিন।
শরৎচন্দ্রের মৃত্যু হিরণ্ময়ী দেবীকে শোকস্তব্ধ, বাকরুদ্ধ করে তোলে। ছবির পর ছবি, মনের কোণে কত না ছবি ভেসে ওঠে। সব ছবি সমান নয়, কোনওটি ধূসর–ফিকে, আবার কোনওটি ঝলমলে উজ্জ্বল। মনে পড়ে রেঙ্গুনবাসের স্মৃতি। তঁার আঁধার–কালো মুখে আলো ফুটিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র। তঁাদের সেই আনন্দ–সংসারে ‘‌ভেলু’‌ নামে একটি কুকুরও ছিল। রেঙ্গুন থেকে ফেরার সময় শরৎচন্দ্র ভেলুকেও সঙ্গে এনেছিলেন। রেঙ্গুনের চাকরি ছেড়ে স্থায়ীভাবে কলকাতায় ফেরার পর সংসার পেতেছিলেন হাওড়ার বাজে শিবপুরে, পরে দেউলটি স্টেশনের অদূরে রূপনারায়ণ–সংলগ্ন সামতাবেড়ে গ্রামে। শরৎচন্দ্র প্রয়াত হওয়ার পর স্মৃতি দিয়ে ঘেরা মূলত সামতাবেড়েতেই থাকতেন হিরণ্ময়ী দেবী। স্মৃতি অঁাকড়ে আরও বছর তেইশ বেঁচেছিলেন তিনি। শরৎচন্দ্র মারা গিয়েছিলেন ১৯৩৮–এর ১৭ জানুয়ারি। স্বামীর প্রয়াণদিবসে হিরণ্ময়ী দেবী নিরম্বু উপবাস করে থাকতেন সারাদিন। ব্যবস্থা করতেন বালকভোজনের।
শরৎচন্দ্রের জীবন ভরিয়ে দিয়েছিলেন হিরণ্ময়ী দেবী। শরৎচন্দ্রের এলোমেলো জীবনে শৃঙ্খলা এনেছিলেন তিনি। শরৎ–জীবনে হিরণ্ময়ী দেবীর ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়। শরৎ–জীবনীকার যথার্থই লিখেছেন, ‘‌শরৎচন্দ্র তঁার প্রথম যৌবনে অল্পদিন স্থায়ী সাহিত্য–সাধনার পর দীর্ঘদিন যখন সাহিত্যক্ষেত্র থেকে দূরে ছিলেন এবং আত্মীয়স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দূর প্রবাসে যখন ছন্দহীন জীবনযাপন করেছিলেন, ঠিক সেই সময়ে তঁার জীবনে হিরণ্ময়ী দেবী এসে যদি না দেখা দিতেন, তা হলে সেদিনের সেই শরৎচন্দ্র আজকের শরৎচন্দ্র হতে পারতেন কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।’‌
নার্সিংহোমে শয্যাশায়ী শরৎচন্দ্র শুনতে পেয়েছিলেন মৃত্যুর পদধ্বনি। বুঝতে পেরেছিলেন তঁার মৃত্যু আসন্ন। রাধারাণী দেবীর লেখায় আছে, এক সময় ‘‌ভারতবর্ষ’‌ পত্রিকার সম্পাদক জলধর সেন ও প্রকাশক হরিদাস চট্টোপাধ্যায় শরৎচন্দ্র–হিরণ্ময়ীর ম্যারেজ–রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করতে তৎপর হয়েছিলেন। জলধর সেনকে সামনে রেখে জড়ো হয়েছিলেন আরও কয়েকজন ঘনিষ্ঠ হিতার্থী। শরৎচন্দ্র অবশ্য কিছুতেই রাজি হননি। বলেছিলেন, ‘‌বড়বউকে কেউ যদি কোন ঘা দিতে আসে— সেটা বুমেরাং হয়ে তাকেই উল্টে আঘাতে ফেলবে। তোমাদের কোনো ভয় নেই। রেজিস্ট্রি ফেজিস্ট্রি করতে চাই না। সারা জীবনে যা করলুম না— মরবার আগে সে ভণ্ডামি করতে পারবো না।’‌ অবশ্য আদৌ এমন ঘটেছিল কি না, তা নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। যেমন, উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তঁার লেখা থেকে জানা যায়, উইল করার ঢের আগে জীবনবিমার নমিনিতে হিরণ্ময়ী দেবীর নাম ‘‌স্ত্রী’‌ হিসেবেই যুক্ত করেছিলেন শরৎচন্দ্র। ‘‌শরৎচন্দ্র–প্রসঙ্গ’‌ বইতে তিনি জানিয়েছেন, ‘‌তঁার মৃত্যুর পর হিরণ্ময়ী দেবী শরৎচন্দ্রের একটি জীবন–বীমাপত্র— Life Insurance Policy আমাকে দেখান। তাতে প্রকাশ পায়, মৃত্যুর বহু পূর্বে শরৎচন্দ্র হিরণ্ময়ী দেবীকে ‘‌স্ত্রী’‌ বর্ণনা করে তঁার nominee‌ মনোনয়ন করেন এবং বীমা অফিসে যথাবিধি জানিয়েও রাখেন। এই মনোনয়নের বলে হিরণ্ময়ী দেবী তঁার প্রাপ্য টাকাও পান।’‌ উমাপ্রসাদের মতো আরও কেউ কেউ হিরণ্ময়ীকে শরৎচন্দ্রের বিয়ে করা ‘‌স্ত্রী’‌ ভাবতেই চেয়েছেন, ‘‌জীবনসঙ্গিনী’‌ নয়। রাধারাণী দেবীর লেখা নিয়ে এক সময় জোর তর্ক–বিতর্কও হয়েছিল। শরৎচন্দ্র অবশ্য মৃত্যুশয্যায় হিরণ্ময়ীকে ‘‌মাই ওয়াইফ’‌ বলেছিলেন।
অপারেশন ছাড়া অন্য কোনও পথ খোলা নেই— এই চরম সত্যটি জানার পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন শরৎচন্দ্র। যাবতীয় সম্পত্তি দ্রুত উইল করে রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। সেইমতো ব্যবস্থাও হয়। উইলে লেখা হয়েছিল, ‘‌I give devise and bequeath all my estate and effects to my wife Sm. Hironmoyee Debi of No. 24, Aswini Dutt Road to be held and enjoyed by her for the term of her natural life subject nevertheless to the right of my brother to live in the premises No. 24 Aswini Dutt Road with his family as he is at present doing and after my death and my wife's death my brother Prokash's son or sons who shall survive her shall be the absolute owner.‌’‌
হিরণ্ময়ী দেবী ছিলেন ঘোরতর সংসারী। দক্ষ হাতে ঘরগৃহস্থালি সামলাতেন। ছিলেন অন্তঃপুরচারিণী। সে–ভাবে কোথাও বেরুতেন না। শরৎচন্দ্রের সঙ্গে সভাসমিতিতে কখনই যাননি। ক্যামেরার সামনেও দঁাড়াননি। নিজেকে মেলে ধরে নয়, গুটিয়ে রেখেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। নিজের সন্তান ছিল না, শরৎচন্দ্রের ভাইপো–ভাইঝি অমলকুমার ও মুকুলমালাকে সন্তানস্নেহে আগলে রেখেছিলেন।
শরৎচন্দ্রের সঙ্গে হিরণ্ময়ীর আদৌ বিবাহ হয়েছিল কি না, তা নিয়ে তর্ক–বিতর্কের কোনও মানে হয় না। আটপৌরে হিরণ্ময়ীকে নিয়ে শরৎচন্দ্র ভাল ছিলেন, এটাই বোধহয় বড় কথা। শরৎ–জীবনীকার গোপালচন্দ্র জানিয়েছেন, ‘‌হিরণ্ময়ী দেবী খুব স্বামী–সোহাগিনী ছিলেন।’‌ ১৯১২ থেকে ১৯৩৮ ছাব্বিশ বছরের সম্পর্ক, সেবায় শুশ্রূষায় শরৎ–জীবন ভরিয়ে তুলেছিলেন তিনি। হাল–ভাঙা দিশা হারানো নাবিকের মতো অবস্থা তখন, শরৎচন্দ্রের সেই বিশৃঙ্খল–বোহেমিয়ান জীবনে দু’‌দণ্ড নয়, স্থায়ী শান্তি–প্রশান্তি দিয়েছিলেন হিরণ্ময়ী দেবী।‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top