সঞ্জয় ঘোষ: ‘‌ল্যুভর না ল্যুভ?‌ কোন উচ্চারণটা ঠিক?‌’‌ এক ফরাসিনী আমার প্রশ্নের উত্তরে মৃদু হাসলেন, ‘‌আমাদের পক্ষেও বলা কঠিন।’‌ তাই আমরা বরং প্রচলিত উচ্চারণ ‘‌ল্যুভর’‌ দিয়ে এই কাহিনী শুরু করি.‌.‌.।‌
ল্যুভর মিউজিয়ামে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে কেমন জানি শিহরন জাগে। যেন কোনও পবিত্র দেবালয়ে প্রবেশ করছি। শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায়। এই দেবালয়ে কোনও ধর্ম নেই, দেবতা নেই, শুধু মানুষের সৃষ্টির চূড়ান্ত ঐশ্বরিক মুহূর্তের স্পর্শ দেওয়ালে–‌দেওয়ালে, পাথরে–‌পাথরে লিপিবদ্ধ করা আছে। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা দর্শকেরা ‘‌বিপন্ন বিস্ময়’‌ শব্দবন্ধকে যেন আবার নতুন করে আবিষ্কার করি। এই সেই পবিত্র স্থান, যেখানে মাতিস, পিকাসো, মিরো তাঁদের যৌবনবেলায় প্যারিসের শিল্পভূমিতে পৌঁছে ওল্ড মাস্টারদের ছবির কপি করে দিনের পর দিন হাত মকশো করেছিলেন। এই সেই তীর্থক্ষেত্র যেখানে আমাদের দেশের অগ্রজ শিল্পী পরিতোষ সেন, নীরদ মজুমদার, যোগেন চৌধুরীরা বারবার পৌঁছে যান চিত্রশিল্পী হিসেবে নিজের ভিশনটা আরও প্রশস্ত করে নেবেন বলে। ল্যুভর মিউজিয়ামের করিডর পেরোতে পেরোতে এইসব পুরনো মিথ মনে পড়ে যায়। নিজেকে কোনও অলৌকিক গ্রহে ঘটতে থাকা ঘটনাপঞ্জির সাক্ষী বলে মনে হয়।
গণেশ পাইনকে অনেক যুগ আগে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তখনও তিনি বিদেশের মাটি ছোঁননি একবারের জন্যেও, ‘‌প্যারিসে যাননি কেন কোনওদিন?‌ ল্যুভরে?‌ শিল্পের ওই দেবালয়ে কোনওদিন যেতে ইচ্ছে করে না আপনার?‌’‌ তিনি গম্ভীর হয়ে যান, ‘‌যাইনি কেন জানো?‌ আমার এক শিল্পীবন্ধু প্যারিসের ল্যুভর দেখে আসার পরে  ভয়ানক ডিপ্রেশনে ডুবে গিয়েছিল। ছবি আঁকতে পারেনি প্রায় এক বছর। তার মনে হয়েছিল ওইসব শিল্পকার্য, যা ল্যুভরে রাখা আছে, তা কোনও মানুষের পক্ষে সৃষ্টি করা সম্ভব হবে না আর কোনওদিন, আমি নিশ্চিত, ওখানে গেলে আমার ফিরে এসে কোনওদিন ছবি আঁকা হবে না আর। তাই যাইনি, যাবও না কোনওদিন।’‌ 
যদিও গণেশ পাইন তাঁর শিল্পী জীবনের পড়ন্তবেলায় প্যারিসে গিয়েছিলেন বলে শুনেছি। তাঁর সেই অভিজ্ঞতার কথা শোনা হয়নি কোনওদিন।
ভারতীয়রা বিশেষত বাঙালিরা ল্যুভর যান প্যারিসে ট্রাভেল এজেন্টের নির্দিষ্ট ট্যুরে, যেখানে ল্যুভরের জন্যে বরাদ্দ থাকে ঘড়ি ধরে মাত্র দেড় ঘণ্টা!‌ তার মধ্যেও শতকরা নিরানব্বই ভাগ দর্শক শুধু লিওনার্দোর আঁকা ‘‌মোনালিসা’‌র সামনে ভিড়ে ধাক্কাধাক্কি করেন, ফটো কিংবা সেলফি তুলে জীবন সার্থক করেন। ভাগ্যিস উনিশ শো এগারো সালে মোনালিসা ছবিটা ল্যুভর থেকে চুরি এবং পুনরুদ্ধার হয়েছিল, না হলে এই ছবিটার জন্যে এত ক্রেজ তৈরি হত কিনা সন্দেহ। আর ল্যুভর মিউজিয়ামও হয়তো প্যারিসের প্যাকেজ ট্যুর থেকে বাদ পড়ে যেত!‌
ল্যুভরের যে ঘরে ‘‌মোনালিসা’‌ ছবিটি বিশেষভাবে সুরক্ষিত করা আছে, দর্শকদের ছবির কাছে একেবারেই পৌঁছতে দেওয়া হচ্ছে না, বিশেষত ছবির নিবিড় দর্শকদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছবি তৈরির ভাষা পড়ে নিতে দেওয়া হচ্ছে না, সেই ঘরে ঢোকার আগেই বিশাল হলঘরের দেওয়ালে লিওনার্দোর আঁকা বেশ কিছু উজ্জ্বল মণিমাণিক্য ঝোলানো আছে, যাদের এক ফুটের মধ্যে দর্শক অবলীলায় চোখ নিয়ে যেতে পারে। শিল্প হিসেবে তাঁরা বোধহয় ‘‌মোনালিসা’‌র চেয়েও শ্রেয়, অথচ মোনালিসা–‌য় মশগুল দর্শকবৃন্দ একবার ভুলেও সেসব ছবির সামনে দাঁড়াচ্ছেন না। স্বয়ং লিওনার্দো বেঁচে থাকলেও হয়তো এই দৃশ্য দেখলে চরম আঘাত পেতেন।
যেমন, লিওনার্দোর আঁকা ওই ছবিটা, ‘‌ভার্জিন অফ দ্য রক্স’‌, ছবির ইতিহাসে লিওনার্দোই প্রথম চিত্রশিল্পে বিজ্ঞান–‌নির্ভর ব্যাকরণ তৈরি করতে থাকেন, হয়তো বিজ্ঞানী লিওনার্দো ছবিতে তার অভাব বোধ করছিলেন। অথচ লিওনার্দোর ছবি কখনওই শুকনো ‘‌গ্রামার’‌–‌এ পর্যবসিত হয় না, ইমোশন ও সায়েন্সের সার্থক মেলবন্ধন হয়ে ওঠে। ইতালির মিলানে বসে প্রথম আঁকা এই ছবিটি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে ল্যুভরের দেওয়ালে একা ঝুলে থাকে। শুধু দর্শক মেলে না। পিরামিডের মতো ত্রিভুজাকার একটি কাঠামোর ওপর আঁকা এই ছবিটা, কোথাও কিন্তু চরিত্র চলাচল ব্যাহত করে না এই সুদৃঢ় বাঁধুনি। এক অসাধারণ অর্কেস্ট্রার মতো প্রতিটি চরিত্রের প্রকাশভঙ্গি বাঁধা থাকে এক সুরে। একজনের হাতের ওপর রাখা থাকে আরেকজনের হাত, কিংবা চাহনির লুকোচুরি খেলা চলে প্রগাঢ় চিত্রভাষায়, বিক্ষিপ্ত আলোয় দ্রবীভূত হয়ে যায় প্রতিমাদের প্রান্তর, অথচ কোথাও গঠন দুর্বল হয়ে পড়ে না। পাথুরে জমির পরিবেশে ছবির চরিত্রদের স্থাপন করে এ ছবির মধ্যে লিওনার্দো সমসাময়িক ছবির তুলনায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনলেন। এক অস্ফুট আলোর মায়ায় যিশু, ভার্জিন মেরি ও সেন্ট জনকে এঁকে ধর্মীয় ছবির মধ্যেও এক নতুন মাত্রা যোগ করলেন। এক অভাবনীয় মানবিক স্পর্শের ছোঁয়া রেখে দিলেন।
কিছু দূরে দেওয়ালে ঝুলছে লিওনার্দোর আঁকা আরেকটা ছবি, যা তাঁর আঁকা অন্য ছবির চেয়ে অনেকটাই আলাদা। সেজন্য অনেকে ভাবেন যে এটা বোধহয় লিওনার্দোর আঁকা নয়। ল্যুভর কর্তৃপক্ষ কিন্তু এই ছবির পাশে রচয়িতা হিসেবে লিওনার্দোর নামই স্পষ্ট করে লিখে রেখেছেন। ছবির নাম ‘‌লা বেল ফেরোনিয়ের’‌। এ ছবি ‘‌মোনালিসা’‌র অন্তত দশ বছর আগে আঁকা। লিওনার্দোর মতো সংবেদনশীল শিল্পী দশ বছরে তাঁর কাজের ধারার স্বভাবতই অনেক পরিবর্তন করে থাকবেন। অবনীন্দ্রনাথ যে জাতীয়তাবাদের যুগে ‘‌ভারতমাতা’‌ ছবি আঁকেন তার অনেক পরে ‘‌কৃষ্ণ’‌ ‌সিরিজ নির্মাণ করেন দুটোর মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া ভার। লিওনার্দোর এই ছবির নারী অনেক নিস্পন্দ, অনেক প্রাণহীন, তাঁর পরবর্তী ছবির চরিত্রদের মতো তার ঠোঁটে রহস্যময় মৃদু হাসির আভাস নেই।

ভঙ্গিতেও ‘‌মোনালিসা’‌র থেকে এ ছবির অনেক ফারাক। ‘‌মোনালিসা’‌ সরাসরি দর্শকদের দিকে তাকিয়ে থেকে তাঁদের বিদ্ধ করেন। ‘‌লা বেলে ফেরোনিয়ের’‌–‌এর নারী একদিক থেকে মুখ সরিয়ে অন্য কারওর দিকে দৃষ্টিপাত করার ঠিক মুহূর্তে দর্শকের দিকে ক্ষণিকের জন্য তাকান। কোনও সমালোচক ভাবেন যে চরিত্রের এই কাঠিন্য লিওনার্দোর শিল্পধর্ম হতে পারে না, আবার কেউ কেউ ভাবেন যে মহিলার ওই কাঁধের ওপর ফেলা গিঁট–‌পাকানো ফিতে বা গলার চারপাশে পুরু রশি লিওনার্দোরই সিগনেচার স্টাইল। দুটো ছবিকে রঞ্জনরশ্মির নিচে ফেলে দেখা গেছে যে ‘লা বেলে ফেরোনিয়ের’‌ ছবির গভীর স্তরে শিল্পী নিখুঁতভাবে মাংসপেশি এঁকে গেছেন, অথচ ‘‌মোনালিসা’‌র তলদেশে শুধু অস্পষ্ট কুয়াশা মাখা পাতলা রঙের আস্তরণ।
অবশেষে লিওনার্দোর আঁকা সেই রহস্যময় ছবি ‘‌সেন্ট জন দ্য ব্যাপটিস্ট’‌ যা তাঁর আঁকা শেষ চিত্র বলে ভাবা হয়। ধর্মীয় বিষয় নিয়ে তৈরি হওয়া এ ছবি ধর্ম থেকে অনেক দূরে। লিওনার্দোর অন্য অনেক ছবির চরিত্রের মতো মানুষের মহত্ত্বের শীর্ষবিন্দুর দিকে আঙুল তুলে আছে এ ছবির প্রতিমা, যেদিকে মানুষের কল্পিত স্বর্গ যেন অবস্থান করে আছে। ছবির কম্পোজিশনে এ ছবি যুগান্তকারী, রেনেসাঁ যুগের ছবির মধ্যে এই প্রথম শিল্পীর নিজস্বতা বা ম্যানারিজম প্রকাশ পাচ্ছে, পোর্ট্রেট নির্মাণের বাঁধাধরা রীতিনীতি চুরমার করে। সেন্ট জন এখানে নারী–‌পুরুষের মধ্যবর্তী একটি লিঙ্গ, মুখে মৃদু ম্লান হাসি। এই ছবির আলো–‌আঁধারির খেলা, যা আগে কোনও পোর্ট্রেট ছবিতে দেখা যায়নি, হয়তো উদ্বুদ্ধ করে থাকবে পরবর্তী যুগের শিল্পী রেমব্রান্টকে। এবং রেমব্রান্ট এই ধারাকে বহন করে সৃষ্টি করে যাবেন লাইট–‌অ্যান্ড–‌শেডের চূড়ান্ত সব শিল্পমুহূর্ত।
লিওনার্দোর হাত ছেড়ে আমি কখন যেন রেমব্রান্টের জগতে পৌঁছে যাই। ল্যুভরে রেমব্রান্টের কাজ খুব বেশি নেই। বেশ কয়েক বছর আগে আমস্টারডামের ন্যাশনাল মিউজিয়ামে থরে থরে সাজানো রেমব্রান্টের ছবির নিঃশব্দ বিস্ফোরণের যে সম্মুখীন হয়েছিলাম সে তো ভোলা যাবে না জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। সেই গাঢ় অন্ধকার মাখা ‘‌নাইট ওয়াচম্যান’‌, যে ছবির জন্য রেমব্রান্টের শিল্পখ্যাতি টলমল হয়ে গিয়েছিল অথচ পরবর্তী যুগে তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছবি বলে বিবেচিত হয়েছিল। সেই জীবনের আগুনে সেঁকা গাঢ় রহস্যাবৃত রেমব্রান্টের সেল্ফ পোর্ট্রেট, যা আসলে রেমব্রান্টের লেখা আত্মজীবনীই। ওইসব ছবির কাছাকাছি নিদর্শন ল্যুভরে নেই। কিন্তু ল্যুভরের দেওয়ালে ওই যে ছবিটা ঝুলছে ‘‌বাথশেবা অ্যাট হার বাথ’‌, সে তো রেমব্রান্টের অন্য সব ছবির চেয়ে আলাদা। বাইবেলের সেই ডেভিড আর বাথশেবাকে নিয়ে গল্প রেমব্রান্টের হাতে পড়ে কী এক অলৌকিক জাদুজগতে পরিণত হয়েছে তা ছবিটা সামনাসামনি না দেখলে বোঝা যাবে না। স্বৈরাচারী ডেভিড একদিন তাঁর প্রাসাদের ছাদ থেকে উঁকি মেরে দেখলেন তাঁর সৈনিক ওনার স্ত্রী বাথশেবার সঙ্গে নগ্ন হয়ে স্নান করছেন। কামোদ্দীপ্ত ডেভিড বাথশেবার কাছে অচিরেই পত্র পাঠিয়ে তাঁকে আহ্বান জানালেন নিজের প্রাসাদে আসতে। এবং তাঁর সঙ্গে যৌনমিলনে লিপ্ত হলেন। ডেভিড পরে যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর কমান্ডান্টকে নির্দেশ পাঠালেন যে ওনাকে অবিলম্বে যুদ্ধের সম্মুখভাগে নিয়োজিত করতে, যাতে সে খুব তাড়াতাড়ি যুদ্ধে প্রাণ হারায়। বাশথেবার সঙ্গে মিলনে ডেভিড একটি সন্তান লাভ করেন, যে খুব শিগগিরি মারা যায় ঈশ্বরের অভিশাপে। রেমব্রান্টের আগে রেনেসাঁর প্রথম দিকের শিল্পীরা এই বিষয়কে অবলম্বন করে অসংখ্য ছবি এঁকেছেন, যেখানে বাথশেবাকে বেশিরভাগ সময়ে পোশাকে আচ্ছাদিত অবস্থায় দেখানো হয়। রেমব্রান্ট আর কখনও নগ্ন ছবি আঁকেননি, এই প্রথম আঁকলেন বাথশেবাকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে। আর সেই নগ্নতার পূর্ণ উদ্‌যাপন করলেন ‌তার ঠিক পাশে সূক্ষ্ম ভাঁজওলা পোশাকের স্তূপ রেখে দিয়ে। রেমব্রান্ট এ ছবিতে তাঁর মাস্টার স্ট্রোকের চিহ্ন রেখে দিলেন এই নগ্নতার মধ্যে বিষাদ আর দ্বিধাগ্রস্ততা মিশিয়ে দিয়ে। হাতে রাজার প্রেমপত্র পেয়ে বাথশেবা ‘‌গভীর দুখে দুখি’‌, চিন্তায় অবসন্ন, প্রেমের দোলাচলে নিঃশেষিত কিংবা ভয়ে বিমূঢ়। সেই মুহূর্তে তাঁর মনের যে ডাইকোটমি তা রেমব্রান্ট ছাড়া পৃথিবীর আর কোনও চিত্রকরের তুলিতে এত বাঙ্ময় হতে পারত?‌ এ ছবির এক্স–‌রে দেখিয়েছে যে, প্রথমে বাথশেবার মুখ আকাশের ঈশ্বরের দিকে উন্নীত ছিল। পরে রেমব্রান্ট তাঁর মহৎ শিল্পবোধে সে মুখ নামিয়ে আনেন মাটির দিকে, করুণ মানবিক ছোঁয়ার এই ছবি শিল্পের আরও গভীর তল স্পর্শ করে।
আরও কিছুটা দূরে দেয়ালে রাখা আছে রাফায়েলের আঁকা ‘‌দ্য ভার্জিন অ্যান্ড চাইল্ড উইথ সেন্ট জন দ্য ব্যাপটিস্ট’‌। সৌন্দর্যের তুঙ্গ মুহূর্ত স্পর্শ করে আছে এ ছবি, যা রাফায়েলের ছবির বৈশিষ্ট্য। অসাধারণ ভারসাম্যে ও ছন্দে রচিত হয়েছে এ ছবি, কোথাও এতটুকু বিচ্যুতি নেই। মিথ আছে, রাফায়েলের ছবির কৃত্রিম ফল বিভ্রমে পাখিরা ঠুকরে খেতে যেত। ফটোগ্রাফি আবিষ্কারের আগে ছবিতে রিয়েলিজমকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ধরার চেষ্টায় মগ্ন থাকতেন চিত্রশিল্পীরা, রাফায়েলের ছবি তার শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন। তার মধ্যেও রাফায়েলের ছবিতে তাঁর প্রগাঢ় শিল্পবোধের সাক্ষর ধরা থাকে তাঁর অসাধারণ কল্পনাদীপ্ত কম্পোজিশনের মধ্যে, যেখানে তাঁর ছবির চরিত্রদের মধ্যে থাকে গভীর অনুভূতির দেওয়া–নেওয়া। ছবির ওপরের ওই আর্চ ছবিতে এনে দেয় এক ছন্দময় অথচ সুদৃঢ় কাঠামো।
বেশ কিছুটা গেলে দেলাক্রোয়া, তাঁর আঁকা সেই মর্মান্তিক ছবি ‘‌দ্য ডেথ অফ সারডানাপালুস’‌। গ্রিক ঐতিহাসিক ডিওডোরাসের লেখা থেকে অনুপ্রেরণায় কবি বায়রন লিখেছিলেন সারডানাপালুসের ট্র‌্যাজেডির ওপর এক করুণ গাথা, দোলাক্রোয়া বায়রনের সেই কাব্যের চিত্রভাষা নির্মাণ করলেন এই ছবিতে।

সারডানাপালুস, নিনেভে শহরের শেষ রাজা, একদিন জানতে পারেন যে, একদল বিদ্রোহীর হাতে তাঁর দেশ আক্রান্ত হতে চলেছে। লজ্জাজনক পরাজয়ের হাত থেকে বাঁচতে তিনি নিজের হাতে নিজের দেশ ধ্বংস করতে শুরু করলেন। তিনি তাঁর প্রিয় ঘোড়াকে হত্যা করলেন, তাঁর পরিচারককে, তাঁর আত্মীয়স্বজনকে। খুব নির্লিপ্তভাবে নিজেকেও আগুনে পুড়িয়ে আত্মহত্যা করলেন। এই নিদারুণ ঘটনাকে দোলাক্রোয়া এঁকে রেখেছেন তাঁর নিজস্ব চিত্রভাষায়, নিবিড় মর্মস্পর্শী তুলির জাদুতে। তাঁর অন্যান্য ছবির মতোই এ ছবি চরম নাটকীয়, অথচ গভীর এক বেদনায় ভরা।
ল্যুভরে যে ঘরে ‘‌মোনালিসা’‌ টাঙানো আছে তার একপাশে একটি অসাধারণ ছবিতে আটকে গেল চোখ, সে ছবির শিল্পীর নাম সচরাচর শোনা যায় না। ল্যামবার্ট সাসত্রিসের আঁকা এক মায়ের বিস্ময়কর তৈলচিত্র। সাদা বিছানার ওপরে অর্ধশায়িত এই নারী তার হাতের কোমল স্পর্শে ছুঁয়ে আছে দুটি নরম পায়রার দেহ। তার শিশুপুত্র একটি তীর দিয়ে খেলাচ্ছলে বিদ্ধ করতে চাইছে সেই পায়রার শরীর। শিশুর কাঁধে পরিদের মতো ডানা। পনেরোশো পঞ্চাশ সালে আঁকা এই ছবিতে সুররিয়ালিজমের অস্ফুট প্রতিধ্বনি শোনা যায় যেন। বাইবেলীয় মিথের ওপর আঁকা এই ছবি, না পুরোটাই শিল্পীর নিজস্ব কল্পনা?‌ যদি শেষেরটাই সত্যি হয় তা হলে এ ছবি প্রমাণ করে দেয় যে, বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন তকমা দিয়ে ছবিকে বা কবিতাকে বাঁধবার চেষ্টা অর্থহীন। মহত্তর শিল্পীরা এই সব গণ্ডির অনেক ঊর্ধ্বে। রেমব্রান্টের ছবির আলো–‌অন্ধকারে মডার্নিজমের অনেক চিহ্ন, অবনীন্দ্রনাথের ‘‌কাটুম–‌কুটুম’‌–‌এ পোস্ট মডার্নিজমের অনেক লক্ষণ ছড়িয়ে আছে।
ল্যুভরের তিনতলার সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে চাতালে এক অসামান্য ভাস্কর্য আমাকে দাঁড়াতে বাধ্য করল। ‘‌ভিকট্রি অফ সামোথরেস’‌— এই প্রাচীন গ্রিক ভাস্কর্যে এক ডানাওলা নারী, যার মুখ নেই, দাঁড়িয়ে আছে, জাহাজের ডেকের মতো এক পাটাতনের ওপরে। পাথরে নির্মিত এই কবিতার সূক্ষ্মতা তার পোশাকের নিখুঁত ভাঁজে ভাঁজে, তার ছন্দোময় লীলায়িত ভঙ্গিতে। এই ভাস্কর্যের সঙ্গে রামকিঙ্করের কলাভবনে তৈরি করা ‘‌ধান ঝাড়াই’‌ ভাস্কর্যের এক আশ্চর্য অন্তর্লীন মিল লক্ষ্য করার মতো। দুটো ভাস্কর্যই স্কন্ধকাটা, দুই ভাস্কর্যের ওই উন্মুক্ত আকাশে বিহঙ্গের বিচরণের মতো নির্ভার ভঙ্গিমা, গ্রিক ভাস্কর্যে দু ডানা মেলে, রামকিঙ্করে ‘‌ধান ঝাড়াই’‌–‌য়ে দুবাহু মেলে। 
‌ল্যুভর মিউজিয়াম আসলে প্রথমে একটি দুর্গ ছিল, যার প্রথম নির্মাণ এগারো শো নব্বই সালে, এর বেসমেন্টে গেলে এখনও তার মূল দেওয়ালগুলোর দেখা মিলবে। এরপর ষোড়শ শতাব্দীতে একে পরিবর্তিত করা হল রেনেসাঁ শৈলীর একটি প্রাসাদে, যেখানে রাজাদের সংগৃহীত সব শিল্পকার্যগুলি রাখা হল। এইসব শিল্পকার্যের মধ্যে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি বা রাফায়েলের চিত্রকলাও ছিল যা ইতালি থেকে চুরি করে আনা হয়েছিল। এরপরে সেই প্রাসাদকে আরও বাড়ানো হল, নতুন করে সাজানো হল এবং তা রাজা চোদ্দো লুইয়ের বাসস্থান হয়ে উঠল। তিনি ভারমেলিস প্রাসাদে চলে যাওয়ার পরে এই প্রাসাদ পরিত্যক্ত হয়, মদের ভাটিখানা হয়ে ওঠে, বারাঙ্গনাদের আবাসে পরিণত হয়। এরপর আবার রাজা চোদ্দো লুই আর মেরি আন্তনিও মিলে আবার এই প্রাসাদকে শিল্পগৃহ বানান, কিন্তু সে সব শিল্প শুধু রাজ পরিবারের লোকেরাই দেখতে পেতেন। সতেরো শো ছিয়ানব্বইকে এঁদের শিরশ্ছেদের পরে ফ্রেঞ্চ বিপ্লবের সময় এই মিউজিয়ামের দরজা সাধারণ মানুষের জন্যে হাট করে খুলে দেওয়া হয়। সারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যেমন গ্রিক, রোমান, ইজিপ্টসিয়ান এবং প্রাচীন যুগের ভাস্কর্য ও শিল্পকার্য সংগৃহীত করে এখানে রাখা হয়। সারা পৃথিবীর বৃহত্তম এই শিল্প মিউজিয়ামে একই ছাদের তলায় যে এত শিল্পসম্ভার একসঙ্গে রাখা আছে তার আর দ্বিতীয় কোনও উদাহরণ নেই।
একজন যদি প্রকৃতিদত্তভাবে অ্যাথলিট হয় এবং তার ফটোগ্রাফিক স্মৃতিশক্তি অসম্ভব প্রখর হয় এবং প্রতিটি শিল্পকার্য তিন মিনিটের মধ্যে দেখা শেষ করেন, তা হলেও একদিনে তিনি এই মিউজিয়াম পুরো দেখে উঠতে পারবেন না। তাই এই মিউজিয়াম দেখবার নিয়ম হল যে, প্রথমে চাই হোমওয়ার্ক। জানতে হবে এখানে কী কী আছে। যে ধরনের শিল্পকার্যে আগ্রহী তার একটা তালিকা করে নিতে হবে। তারপর ম্যাপ দেখে সেইসব কাজ দেখতে যাওয়া। আসা–যাওয়ার পথে অনেক ভাল কাজ হয়তো চোখে পড়বে। পরে সেগুলোর কাছে ফিরে আসা যেতে পারে। এই মিউজিয়াম মঙ্গলবার ছাড়া রোজ খোলা থাকে, সকাল ৯টা থেকে সন্ধে ৬‌টা পর্যন্ত। কিছু পাবলিক ছুটির দিন অবশ্য বন্ধ থাকে। এর টিকিট অনলাইনে আগেই কেটে নেওয়া ভাল, ভিড় আর লাইন এড়ানোর জন্যে। প্রতি মাসের প্রথম রবিবার এই মিউজিয়ামে ঢুকতে কোনও টিকিট লাগে না। 
ল্যুভর মিউজিয়ামের মূল ফটকে ঢোকা বা বেরোনোর পথে আছে দুটি অদ্ভুত আকৃতির গ্লাস পিরামিড, একটি সোজা, একটি উল্টোনো। সেই গ্লাস পিরামিডের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এক অদ্ভুত জাদু শিল্পজগতের ছবি ভেসে উঠল আমার চোখের সামনে। মনে হল ল্যুভরের দেওয়ালে, করিডরে রাখা রয়েছে গান্ধার শিল্পের এক ঝাঁক ভাস্কর্য, মহেঞ্জোদাড়োর টেরাকোটা, মুঘল মিনিয়েচার, কালীঘাট পট, অবনীন্দ্রনাথের ওয়াশ পেইন্টিং, নন্দলালের কালি–কলমের ড্রইং, বিনোদবিহারীর ফ্রেস্কো, রামকিঙ্করের ভাস্কর্য, গায়িতোন্ডের বিমূর্ত ছবি, গণেশ পাইনের টেম্পারা, যোগেন চৌধুরীর রেখাচিত্র এবং .‌.‌.‌। সারা পৃথিবীর দর্শক আকুল তৃষ্ণায় দেখছে সেইসব শিল্পকার্য। কোনওদিন সত্যি হতে পারে না সেই জাদুজগৎ?‌ কোনওদিন?‌‌‌‌‌‌

 

অসামান্য ভাস্কর্য ‘‌ভিকট্রি অফ সামোথরেস’

লিওনার্দোর আঁকা ‘‌লা বেল ফেরোনিয়ের’‌। 

ল্যামবার্ট সাসত্রিসের আঁকা এক মায়ের বিস্ময়কর তৈলচিত্র। 

জনপ্রিয়

Back To Top