পবিত্র সরকার: বয়েস যা হল, এবং শরীরে ইনসুলিন-বান্ধব যে-রোগ আশ্রয় নিয়েছে, নেমন্তন্ন পেলেই বিয়েবাড়ি যাওয়ার কথা শুনলে বিজ্ঞ লোকেরা ভুরু কোঁচকান। সেটা তাঁদের উচিত কর্তব্য বলেই। আর আমি সে সব কোঁচকানো ভুরুতে হাত বুলিয়ে সমান করার চেষ্টা না করে সেগুলির সামনে দিয়ে দিব্যি সেজেগুজে বিয়েবাড়ির নেমন্তন্নে যাই। যাই যে, সেটা মুখ্যত খাওয়ার জন্যে নয়। হ্যাঁ, এককালে খাইয়ে হিসেবে মাঝারি মাপের ওপরের দিকে ছিলাম বলে আমার সুখ্যাতি বা কুখ্যাতি ছিল। নাট্যগুরু অজিতেশের বোনের বিয়েতে, অন্যান্য পদকে অবহেলা বা অপমান না করে, ৪৩ টুকরো মাছ উদরসাৎ করা এখনও আমার রেকর্ড। অবশ্য তার ফলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস নেওয়ার দায় থেকে পরের তিনদিন আমাকে বাধ্যতামূলকভাবে টানা অব্যাহতি চাইতে হয়েছিল, কিন্তু সেটা বিজ্ঞাপন দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়। যাই হোক, এখন আমার খাওয়া কমেছে, যথোচিতের চেয়েও কম হয়েছে বলা যায়। তাতে ভালই আছি। এখন বিয়েবাড়ি যাই মূলত দেখতে।  
কী দেখি? দেখি, জায়গাটা যেন আলোতে-সজ্জায়–আনন্দে–হাসিতে হঠাৎ আমাদের রোজকার পৃথিবীর অনেক বাইরে, কোনও একটা বিশেষ সুরক্ষিত নক্ষত্রলোকে চলে এসেছে। সেই ‘নবান্ন’ নাটকেই পড়েছিলাম বিয়েবাড়ির বাইরের গেটে ভিখারিদের আর্তনাদ আর অভিমান। এখন তা আর শোনা যায় না। আর শোনা গেলেও যে সব জায়গায় মধ্যবিত্ত বা তার ওপরকার বিয়ের অনুষ্ঠান হয়, সে সব জায়গা ওই সব আর্তনাদ, যদি থেকেও থাকে কাছে বা দূরে, কখনও পৌঁছয় না। না, আমি মুকেশ আম্বানির মেয়ের বিয়ের কথা বলছি না, সেখানে আমিও তো ভিখিরি হওয়ারও যোগ্য নই। আমাদের এই মধ্যবিত্ত বিয়ের প্রতিবেশেই লক্ষ্য করি, চারপাশের খিটিমিটি, খেঁচাখেঁচি ঝেড়ে ফেলে আমাদেরই ঘরের মেয়েরা হঠাৎ অসম্ভব হাসিখুশি আর সুন্দর হয়ে উঠেছে, রঙিন শাড়িতে, অলংকারে, নেচে চলার উত্তরঙ্গ সচলতা আর উচ্ছলতায় তারা ঝলমল করছে, চেনা মুখগুলোও কেমন অন্যরকম হয়ে গেছে। আজকাল মধ্যবিত্ত বিবাহে অনেক মেয়ে বিয়ের নেমন্তন্নে যাওয়ার আগে একবার পার্লার হয়ে আসে, ফলে তাদের মুখ, ভুরু, চুল সবকিছুরই ছবি পাল্টে যায়। লিপস্টিকের ছোঁয়ায় ঠোঁটের রেখা পাল্টে যায়। স্বর্গে গিয়ে অপ্সরী–কিন্নরীদের দেখার সুযোগ আমার হয়নি, স্বর্গে বিশ্বাস করি না বলে নিজেই সেই সম্ভাবনার শেকড়সুদ্ধ কেটে রেখেছি, তবু আমাদের মেয়েরা এই উপলক্ষে অপ্সরীদের সখী-সঙ্গতির মধ্যে ঢুকে যায় বলে আমার  ধারণা। বিয়েবাড়িতে মেয়েদের যে সৌন্দর্য-প্রদর্শনী তৈরি হয় তা খানিকটা অলৌকিক, আর আজকালকার উজ্জ্বল-রুপালি, মায়াপূর্ণ, বহুবর্ণিল বিদ্যুতের আলোয়, চারপাশের মণ্ডপসজ্জার সমারোহে, সানাইয়ের রাগমূর্ছনায় সেই সৌন্দর্য আরও অপার্থিব হয়ে ওঠে। 
শুধু বিয়ের দিন কেন, বউভাতের দিনও এই অলৌকিক দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হয়। বউভাতে একটা তফাত হয় শুধু— বিয়ের দিন যে বর ধুতি-পাঞ্জাবি পরেছিল, সে সেদিন স্যুট-টাই অথবা কাবুলি স্যুট পরে। আর আমি শুনেছি, শাড়ির দোকানে বিয়েতে পরে যাওয়ার শাড়ি আর বউভাতে (এখন বাংলাতে বলে রিসেপশন) পরে যাওয়ার শাড়ি আলাদা করে চিহ্নিত থাকে। সে কী চিহ্ন, এই জীবনে আমার আর তা জানা হবে না, দেখে আমি কিছুই বুঝতে পারব না। আর আমাদের যৌবন পর্যন্ত আমরা যা দেখিনি, সালোয়ার কামিজ, লেগিংস, জেগিংস, প্যারালাল ও কামিজ, নানা ঢলঢলে লেহেঙ্গা না কী সব, ঘাগরা আর ওড়না, বিচিত্র সব কুর্তি আর কোটি পরে সব নানা বয়সের মেয়েরা আসে, বিয়েবাড়িতে রঙের দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। আমি এক অশীতিপর বৃদ্ধ, নির্লজ্জ আর কুণ্ঠাহীন চোখ মেলে বসে বসে এই সব দেখি। আমার দেখার দিন আর বেশি সংসারে জমা নেই, তাই আমি এখন দেখার কাঙাল।  
আর দেখি ছোটদের। আজকাল কত কী সাজগোজ বেরিয়েছে তাদের জন্যে— মনে মনে দেশের রেডিমেড বস্ত্রশিল্পকে ধন্যবাদ দিই— কত বিচিত্র পোশাক তারা রোজ সৃষ্টি করে চলেছে ছেলেমেয়েদের জন্যে! মেয়েদের পোশাকের মতোই কত রং, কত জরির নকশা, কত অভিমুখ। শুধু পুরুষদের পোশাককেই এই উৎসবসজ্জার মধ্যে একটু পানসে আর ম্যাড়মেড়ে মনে হয়। যারা চোস্ত-পাঞ্জাবি-কোটি পরে তাদের কথা আলাদা, তাদের জন্যে নানা রং, নানা ডিজাইন, ভারতের ফ্যাবইন্ডিয়া থেকে বাংলাদেশের আড়ং এবং আরও হাজারো বিপণি তৈরি থাকে, কিন্তু অনেকে দেখি প্যান্ট-শার্ট-সোয়েটার পরেই চলে আসে ভোজ খেতে। হয়তো অফিস থেকে সোজা আসে, তাই আর বাড়িতে গিয়ে পোশাক বদলানোর সময় পায় না। তাদের পার্লারও নেই, চুল সেট করার প্রশ্নও নেই।   
আজকাল দেখি, আমাদের মধ্যবিত্ত বিয়েবাড়িতে বউভাতে এক সেট সাহেব-মেম ছাড়া দৃশ্যটা সম্পূর্ণ হয় না। হবেই বা কেন? বাঙালি আন্তর্জাতিক হয়েছে, ঘরে মেম-বউ বা সাহেব জামাই এসেছে, এবং বিয়ে-বউভাতে তারা তো আসবেই। এ তো চেখভের সেই ‘বিবাহ’ নাটকের মতো নয় যে, কন্যাপক্ষ এক জনকে পঁচিশ রুবল দিয়েছিল একজন মিলিটারি ‘জেনারেল’-কে নিয়ে আসার জন্যে— অভ্যাগতদের মধ্যে একজন জেনারেল থাকলে বিয়েবাড়ির সম্মান বাড়বে। সে লোকটা টাকা নিজে পকেটস্থ করে এক বুড়োহাবড়া দ্বিতীয় শ্রেণির জাহাজি ক্যাপ্টেনকে নিয়ে এসেছিল, আর সে বুড়ো জাহাজের কথা বলে বলে লোকের কানের পোকা বার করে দিয়েছিল। শেষে ধরা পড়ে যায় লোকটা জেনারেল নয়, ফালতু ক্যাপ্টেন, আর তাকে আনতে একজন পয়সা নিয়েছে শুনে সে দিশেহারা হয়ে পড়ে। না বাঙালির বিয়েতে সাহেব-মেমরা ওভাবে আসে না। তারা আমাদের মধ্যবিত্ত অস্তিত্বে ঢুকে পড়েছে। আমার মনে পড়ে গেল বহুদিন আগে এই রকমই এক অনুষ্ঠানে বন্ধুবর ডেভিড কফের ছেলের কথা। তার বয়েস তখন পাঁচ। অন্যরা যখন হামলে পড়ে কেটারারের সবরকম খাবারের প্লেটভর্তি স্তূপ নির্মাণ করছে— যার এক-চতুর্থাংশ তারা খাবে আর বাকিটা বিয়েবাড়ির নিয়মমতো ফেলে যাবে, তখন সে ছেলে বলল, ‘আই লাইক দ রাইস পার্ট মোস্ট!’ বলে শুধু ভাত নিল প্লেট ভরে, আর পরমানন্দে তাই চামচের পর চামচ মুখে পুরতে লাগল। পড়ে রইল ফিশফ্রাই, চিকেন তন্দুরি, ডাল ভাজি, চিংড়ির মালাইকারি, মাটন কারি আর বিপুল পদের সারি। চারপাশের লোক স্তম্ভিত ও কেউ কেউ হয়তো মূর্ছিত, কেউ হয়তো ভাবল ছেলেটা বেশিদিন বাঁচলে হয়, আবার অন্যরা হয়তো গোপনে গোপনে তাকে অভিশাপও দিতে লাগল।  
বিয়েবাড়ির খাদ্যের এমন অপমান হয়তো শুধু অহঙ্কারী আমেরিকানরাই করতে পারে এমন যাঁরা ভাববেন, সেই দেশপ্রেমিকরা যেন তখন ওই ছেলেটির পাঁচ বছর বয়সের কথা ভেবে তাকে ক্ষমা করে দেন।‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top