লোপামুদ্রা ভৌমিক: সোনায় গড়া শরীর। তার ওপরে আলো ছড়াচ্ছে হীরে, চুনি, পান্না। চারিদিকে ঠিকরে পড়ছে সেই ছটা। ধাঁধিয়ে যাচ্ছে চোখ। 
না, পৃথিবীর কোনও আশ্চর্যের কথা হচ্ছে না। এ কাহিনী নিতান্ত নিরীহ এক টিফিন কৌটোর। যদিও উপাদান আর উৎসে সে একেবারেই ছাপোষা নয়। কারণ, জন্ম তার নিজাম–নিকেতনে। হায়দরাবাদের ষষ্ঠ নিজাম মির মেহবুব আলি খানের নাকি বড় ‘‌পেয়ারি’‌ ছিল চার কেজির ওই টিফিন কৌটোটি। আর সেটাই রাতের অন্ধকারে হাপিশ করে দিল হাইটেক নিশিকুটুম্বরা। নিশিকুটুম্বই বটে। না হলে নিজামের তিন পাল্লার ঢাউস টিফিন কৌটোয় কিনা কয়েকদিন ধরে দেদার খানাপিনা সারলো মামুলি চোরের দল!‌ টিফিন বাক্সের প্রশ্নে সত্যিই আকবর বাদশার সঙ্গে হরিপদ কেরানির (‌‌পড়ুন চোরেদেরও)‌‌ কোনও ভেদ নাই। তবে নিজামের মতো চোরেদের টিফিন বাক্সের মেনুতে মণ্ডামিঠাই, চপ–কাটলেট, খাজা কিংবা লুচি ছিল কিনা সে প্রশ্নের উত্তর জানা নেই। এই জন্যই বোধহয় সুকুমার রায় পাগলা দাশুর ‘‌টিফিনের বাক্সে’‌ তালাচাবির বন্দোবস্ত করেছিলেন। টিফিন বাক্স এবং তার ভেতরের রসনা–বস্তু সম্পর্কে অতি কৌতূহল থাকলে দাশুর বন্ধুদের মতোই নাস্তানাবুদ হতে হয়— এটাই চিরকালীন দস্তুর। 
বাঙালিদের মধ্যে কিন্তু ওসব টিফিন বাক্স–টাস্কের বালাই ছিল না একটা সময়। ব্রিটিশ সরকার যখন কেরানি তৈরির দিকে মনোযোগী হল, তখন থেকেই কিছুটা প্রয়োজনে আর কিছুটা দেখাদেখি বাঙালির হেঁশেলে থালাবাসন রাখার জায়গায় ফাঁকতালে ঢুকে গেল টিফিনের কৌটো। প্রতিদিন সকালে যেটি কর্তার হাতে দুলতে দুলতে গিয়ে হাজির হত কোনও অফিসের টেবিলে। সাহিত্যিক বিনয় ঘোষ তাঁর ‘‌কালপেঁচার বৈঠক’‌–এ দারুণ ছবি এঁকেছেন—
‘‌চাকরি পেলাম ব্যাঙ্কে— বংশগত চাকরি কেরানীগিরি।.‌.‌.‌ প্রথম যেদিন চাকরি করতে যাব সেদিন ঠিক অভিষেকের মতন আয়োজন হল বাড়িতে। বাবার পাশে খেতে বসলাম, অস্তগামী কেরানীর পাশে উদীয়মান কেরানী। মাছের মুড়োটা নিজের বাটি থেকে বাবা আমাকে তুলে দিলেন। মাকে বললেন:‌ যাবার সময় টিফিন কৌটোটা ওকে মনে করে দিয়ে দিও‌।’‌
 অ্যালুমিনিয়ামের টিফিন কৌটোয় রুটি, লুচি, পরোটা। সঙ্গে হরিহর আত্মার মতো টাইট তরকারি। কদাচিৎ তার সঙ্গে একটা দানাদার বা একমুঠো বোঁদে। যাওয়ার পথে হাতের দুলুনিতে যা মিলে মিশে ত্রিবেণী সঙ্গম। এই ছিল সে আমলের টিফিন–বৃত্তান্ত। ক্রমে একবাটির জায়গা দখল করল দু’‌বাটি। ক্রমে তিনবাটি, চারবাটির ক্যারিয়ার। ক্যারিয়ারের ফলে বাঙালির চিরকালীন অতিথিপরায়ণাতেও এল নবযুগ। ঝটপট ক্যারিয়ারে ভরো আর আত্মীয়বাড়িতে পাঠাও খাবার দাবার। ‘‌সোহিনী বললে, একটু মুখে দিতে হয় বাবা, ঘরে তৈরি তোমারই উদ্দেশে। ফরমাশে তৈরি বড়োবাজারের এক চেনা দোকানে। রেবতী হাত জোড় করে বললে, এ সময়ে খাওয়া আমার অভ্যাস নয়। বরং অনুমতি করেন যদি বাসায় নিয়ে যাই। সোহিনী বললে, সেই ভালো। অনুরোধ করে খাওয়ানো আমার স্বামীর আইনে বারণ। তিনি বলতেন, মানুষ তো অজগরের জাত নয়। একটা বড় টিফিন কেরিয়ারে থাকে থাকে সোহিনী খাবার সাজিয়ে দিলে’‌ (ল্যাবরেটরি, রবীন্দ্রনাথ)‌‌।

 
ক্রমে অ্যালুমিনিয়ামের ত্যাপতেপে চেহারার দুর্বলতা ঢাকতে হু হু করে হেঁশেলে ঢুকল রাফ অ্যান্ড টাফ স্টিল। রূপেও এল বাহার। চৌকো, লম্বা, চ্যাপ্টা, তিনকোনা, ডিম্বাকৃতি, ঢেউখেলানো‌। টিফিন কৌটোর ওপর নতুন সংযোজন হল আটকানো চামচ। তখন কৌটো প্রায় গৌণ। চামচটিই যেন সবেধন নীলমণি। যেসব বাবা–মা স্কুলে যাওয়ার আগে একদা ছেলেমেয়েদের ভারী গলায় হুকুম দিতেন, ‘‌ঘরে পেট ভরে খেয়ে যাও’,‌ তাঁরাই পরবর্তীতে একশো আশি ডিগ্রি উল্টে গিয়ে  মিনি, মন্টুদের ব্যাগে টিফিন কৌটো ভরে দিয়ে আধো আধো আদুরে গলায় বলতে শুরু করলেন, সুজির উপমা করে দিয়েছি। খেয়ে নেবে কিন্তু সোনা। স্কুলেও কি বিপদের শেষ আছে?‌ যত নষ্টের গোড়া ওই টিফিন বাক্সের ভেতরের বস্তুটি। কার টিফিন যে কার অজ্ঞাতে কে খেয়ে গেল!‌ ক্রমে আর সুজির হালুয়া, চিঁড়ের পোলাও, সেঁকা পাউরুটি, সাবু ভেজায় মন ওঠে না মিনি, মন্টুদের। অতঃ কিম। বাবা বাজার থেকে কিনে আনেন রেডিমেড খাবার দাবার। কেক, বিস্কুট, মিষ্টি, ডালমুট.‌.‌.‌। কিন্তু স্টিলে বড্ড হ্যাপা। পড়ে গেলে দুমড়ে–মুচড়ে তালগোল। ব্যাগের বপু বাড়াতেও জুড়ি মেলা ভার। অভিযোগের সুযোগে স্টিলকে পাশ কাটিয়ে টুক করে ঢুকে পড়ল প্লাস্টিক। ততদিনে দূরদর্শন এসে গেছে। সারা বিশ্ব ঘরের মধ্যে। পশ্চিমি খাবারের ছবিও যেন সুগন্ধ ছড়ায়। সুতরাং কে আটকায় চাউমিন, ম্যাগি, প্যাটিস, পিৎজার রমরমা। সঙ্গে নতুন সংযোজন স্যস। স্কুল তো বটেই অফিসের টিফিন বক্সেও দ্রুত অধিকার দখল করল তারা। ‌
তবে এসব খাবার আবার গরম গরম না খেলে মজা নেই। কী উপায়?‌ টিফিন বক্সে এল হটপট সিস্টেম। প্লাস্টিকের ভেতরে সেঁটে বসে গেল তাপ নিরোধক প্রযুক্তির বাটি। এবার যখন খুশি খাও। পরম সুখে গরম খাবার। স্কুলের কচিকাঁচাদের ঝামেলা কমাতে আবার অনেক সময় জলের বোতলের সঙ্গেই জুটি বেঁধে ‘‌ইয়ে দোস্তি হাম নেহি তোড়েঙ্গে’‌ টাইপের একটা ভাব–ভালবাসা ঘোষণা করল টিফিনের কৌটো। তার দেখনদারিই আলাদা। অমল গুপ্তের ‘‌স্ট্যানলি কা ডাব্বা’‌ ছবিটার কথা মনে পড়ছে?‌ স্কুলে টিফিন নিয়ে যেতে পারত না বলে বেচারা স্ট্যানলি ফার্নান্ডেজের কী অবস্থা!‌ পেটুক স্যর বাবুভাই ভার্মা ওরফে খাদুসের কোপে তার জীবন ওষ্ঠাগত। খুদে স্ট্যানলির অভিশাপেই কিনা কে জানে টিফিন বক্সের পরের গল্পটা মোটেই সুখের নয়। তার অহঙ্কারি মুখে ঝামা ঘষতে হইহই করে বাজারে এসে পড়েছে সুইগি, জোমাটো, উবের ইটস, ডোমিনোজ, পিৎজাহাট, টেস্টিখানারা। তাও অনলাইনে। শুধু অ্যাপ ডাউনলোড করো। আর এক ডাকেই হাজির হালফিলের পাস্তা থেকে বিরিয়ানি। টিফিন বাক্স বইবার নো–ঝঞ্ঝাট। মুম্বইয়ের ডাব্বাওয়ালারাই প্রথম দেখিয়েছিলেন রাস্তাটা। তবে হাইটেক সংস্করণটি অনলাইনের দখলে। সাম্প্রতিক ‘‌হামি’‌ ছবিতে পরিচালক শিবপ্রসাদ –নন্দিতা জুটি অতীতের সেই নস্টালজিয়া ফেরত দিতে চেয়েছিলেন ‘‌তোর জন্য খোলা টিফিন বক্স, ভাগ করে খাওয়া টিফিন বক্স’‌ শুনিয়ে। কিন্তু.‌.‌.‌। এখন প্রশ্ন একটাই, ১০ বছর পর কি আর কোথাও থাকবেন তিনি?‌ উত্তর অনলাইনের মারপ্যাঁচে। ‌‌‌‌‌‌■

 

নিজামের সোনার টিফিন বক্স

জনপ্রিয়

Back To Top