শুনেছি, নতুন বই চুক্তি করার সময়ে প্রকাশকদের কাছ থেকে একটা করে গিনি নিতেন নীহাররঞ্জন। আমাদের সঙ্গে অন্যরকম সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। লিখেছেন বিশিষ্ট প্রকাশক, লেখক সবিতেন্দ্রনাথ রায়।

আমরা যখন ষষ্ঠ–‌সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি, তখন আমাদের ‘‌কালো ভ্রমর’‌ বইটি অত্যন্ত প্রিয় ছিল। বইটির চারটি পার্ট বা ভাগ। কালো ভ্রমর ১ম, ২য়, ৩য়। ৪র্থ ভাগটির প্রথমে নাম ছিল ‘‌রক্তলোভী নিশাচর’‌। সেই বয়সে এই বইটির আকর্ষণ এমন, ক্লাসে নিয়ে গিয়ে টিফিনের সময়ে পড়তাম, টিচার আসার আগে পর্যন্ত। পাশের সহপাঠী টিচারকে দেখিয়ে দিলে, টিচার বইটি কেড়ে নিলেন। বেঞ্চির ওপর সারা ক্লাস দাঁড় করিয়ে রাখলেন। বইটি ফেরত চাইতে গেলে বললেন, কাল পাবি। পরদিন বইটা ফেরত দিলেন। দেওয়ার সময়ে অবশ্য বললেন, বইটা দারুণ, ধরলে ছাড়া যায় না, তবে ক্লাসে আর আনবি না।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমার থেকে বছর ২/‌৩ ছোট ছিলেন। একদিন কালো ভ্রমরের কথা উঠল। সুনীলও স্বীকার করলেন, তাঁরও স্বপ্নের মানুষ ছিলেন কিরীটী রায়। আমার মতো সে বয়সে সুনীলেরও মনে হত, কিরীটী রায়ের বাড়ি টালিগঞ্জে, তাঁর স্ত্রীর নাম কৃষ্ণা, ড্রাইভার শিখ পাঞ্জাবি, নাম হীরা সিং, পরিচারক ‘‌নাম’‌ জংলি। কিরীটী রায় কিমোনো পরে চুরুট খেতে খেতে সিঁড়ি দিয়ে গাড়ি বারান্দায় মাঝে মাঝে নেমে আসেন।
আমাদের বয়সি সেকালের কিশোরদের কিরীটী রায় ছিল সেরা আকর্ষণ। তখন ব্যোমকেশ এত জনপ্রিয় হয়নি, কোথায় ছিল ফেলুদা বা কাকাবাবু।
বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনেরও স্বপ্নের লেখক নীহাররঞ্জন গুপ্ত। সেই টানে তিনি গিয়েছিলেন ইতিনা গ্রামে। যশোর জেলায় ইতিনা গ্রাম। এখন বাংলাদেশে অনেক মহকুমা জেলা হয়ে গেছে। ইতিনা এখন পড়েছে নড়াইল জেলায়। ইতিনা বা এখনকার ইতনা গ্রাম বিখ্যাত নীহাররঞ্জন গুপ্তের জন্মভূমি বলে। ইমাদাদুল পুরনো স্মৃতির টানে চলে গিয়েছিলেন নীহাররঞ্জনের বাড়ি। বাড়ির নাম ‘‌আনন্দ অন্নদা কুটির’‌। তিনটি ভবনের মাঝেরটি দোতলা। নীচতলার বারান্দার ভেতর দিককার কপাটহীন দরজার ওপরের দেওয়ালে লেখা আছে বাড়ির নাম।
নীহাররঞ্জনের আত্মীয়–পরিজন কেউ নেই এখানে। এই বাড়ি এখন সরকারের।.‌.‌.‌ ইমদাদুল লিখছেন— ‘‌আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো বাড়িটি ঘুরে ঘুরে দেখছি। কোথাও কোনও যত্নের চিহ্ন নেই। চারদিকেই অবহেলার চিহ্ন।.‌.‌.‌
বাড়ির পুজো মণ্ডপের দেওয়ালে শ্বেত পাথরে লেখা আছে—
স্মৃতি পীঠ
ডাঃ মনোরঞ্জন গুপ্ত
জন্ম:‌ ২১ অগ্রহায়ণ ১২৮৪
মৃত্যু:‌ ১৩ই মাঘ ১৩৫৯
গ্রাম:‌ ইতিনা, জিলা:‌ যশোহর
কেউ একজন ইমদাদুলকে বললেন, মনোরঞ্জন নীহারবাবুর কাকা বা জ্যাঠা হবেন। ইমদাদুলের স্মৃতি সমন্বিত এই মনোরম ভ্রমণকাহিনিটি বেরোয় ১৪০৫ সালের শারদীয় ভ্রমণ পত্রিকায়।
।।২।।
মধুমতী নদীর ধারে এই বাড়িতেই বড় হয়ে উঠেছেন নীহাররঞ্জন তাঁর ভাই–বোনদের সঙ্গে, খেলাধুলো করেছেন, লেখাপড়া করেছেন আর প্রায় গোগ্রাসে পড়েছেন গল্পের বই। বই পড়তে উৎসাহ দিতেন মা লবঙ্গলতা। কিন্তু পিতা সত্যরঞ্জনের কড়া লক্ষ্য ছিল ছেলের পড়াশোনায়। ভাল ফল করতে হবে স্কুলের পড়াশোনায়। তিনি নিজে কবিরাজ। একান্ত বাসনা, ছেলেকে ডাক্তার করে তুলবেন।
ম্যাট্রিক পাশ করে নীহাররঞ্জন এসে ভর্তি হলেন কারমাইকেল মেডিক্যাল স্কুলে। তখন স্কুলই ছিল। প্রথমে এখানে আইএসসি পাশ করলে মেডিক্যালে ভর্তি হত। কারমাইকেল স্কুল পরে কারমাইকেল কলেজ হয়। স্বাধীন দেশে নাম পরিবর্তিত হয়, ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের মাস্টারমশাই রাধাগোবিন্দ করের নামে, রাধাগোবিন্দ কর কলেজ, সংক্ষেপে আরজিকর কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল।
কলকাতায় পড়তে আসার সময়ে মা লবঙ্গলতা বলে দিয়েছিলেন, দেখ বাবা, যা পড়ছিস পড়, গল্পের বই পড়া ছাড়িস না। পারলে লেখারও অভ্যাস করিস। একদিকে পিতার ইচ্ছাপূরণ, আর একদিকে মায়ের বাসনা, দুটোতেই মন অভিনিবেশ করলেন নীহাররঞ্জন।
তখন বইপাড়ায় আশুতোষ লাইব্রেরি ছোটদের বইয়ের স্বর্গরাজ্য ছিল। স্কুল, লাইব্রেরি সবাই ভিড় করত ছোটদের বই কেনবার জন্য। এঁদের একটি পত্রিকা ছিল ছোটদের জন্য, নাম ছিল ‘‌শিশুসাথী’‌। নীহাররঞ্জন তাতে একটা গল্প পাঠালেন। তখন আইএসসি পড়েন। গল্পটি মনোনীত ও ছাপাও হল। তাঁর লেখা ছাপা পত্রিকার সংখ্যাটি পাঠিয়ে সম্পাদক আরও লেখা চাইলেন। পারলে দেখাও করতে বললেন।
একটা লেখা নিয়ে দুরু দুরু বুকে গেলেন নীহাররঞ্জন সেই ‘‌শিশুসাথী’‌ পত্রিকার সম্পাদকের দপ্তরে। সম্পাদক দেখে অবাক হলেন, এহে, তুমি তো নিতান্তই ছেলেমানুষ!‌ কী পড়ছ ইত্যাদি জিজ্ঞেস করলেন। দেশ কোথায়, বাবা কী করেন ইত্যাদি। তা তোমার তো লেখার কাগজপত্র কিনতে হয়। দাঁড়াও ক্যাশিয়ারকে বলে দিই। ওহে, এই ছেলেটির লেখা বেরিয়েছে এই সংখ্যায়, এঁকে লেখাটির সম্মান দক্ষিণা দিয়ে দাও। আর কিছু এনেছ?‌
নীহাররঞ্জন সলজ্জ বললেন, একটা উপন্যাস আছে, যদি ধারাবাহিক বার করেন। নাম–‌ রাজকুমার।
সম্পাদক অবাক। একেবারে উপন্যাস!‌ আচ্ছা রেখে যাও, পড়ে দেখি। এসব কথা নীহাররঞ্জনের মুখে আমার শোনা। সেই প্রথম দক্ষিণা পেলেন— পাঁচ টাকা। তখন তো তাই রেওয়াজ। তবে তখন পাঁচ টাকারও অনেক দাম ছিল, সময়টা ১৯২৯ সাল। নীহাররঞ্জনের বয়স তখন মাত্র ১৮। পাঁচ টাকা দিয়ে কত কী কিনবেন ভেবে পান না।
‘‌রাজকুমার’‌ পড়ে সম্পাদক মশাই খুবই সন্তুষ্ট। ছেলেটির বয়স কম হলেও লেখায় অর্থাৎ কলমে জোর আছে।
‘‌শিশুসাথী’‌ তে ধারাবাহিক শুরু হল। মায়ের আশীর্বাদ সত্যিই ফলল। ‘‌খোকা, ডাক্তারি পড়তে যাচ্ছিস যা, তবে লেখা ছাড়িস না, লেখার অভ্যাস ছাড়িস না।’‌
পাঠকদের প্রশংসা পেয়ে সম্পাদকও খুশি। ‘‌রাজকুমার’‌ লেখার পর নীহাররঞ্জন ভাবছিলেন কী বিষয় নিয়ে লিখবেন। সম্পাদকই ধরিয়ে দিলেন সূত্র— গোয়েন্দাকাহিনি লেখো না।
নীহাররঞ্জন সেই বিরল সাহিত্যিকদের অন্যতম যাঁরা প্রথম লেখাতেই সম্মানদক্ষিণা পেয়েছেন। আর সেই সঙ্গে সম্পাদকের ফরমাস— আরও লেখো। এইরকম লেখো।
নীহারবাবু পরে আমাদের কাছে গল্প করতেন, জানো ভানু, এই সময়ে তিনটি সদ্য তরুণ বাঙাল কলকাতা শহরে ভাগ্যান্বেষণ করছে। আমরা কৌতূহলী হতে বললেন,— প্রথম তো আমি, আইএসসি পড়ছি, উদ্দেশ্য পাশ করলে ডাক্তারি পড়ব, দ্বিতীয় হল প্রতুল— প্রতুলচন্দ্র সরকার। বর্তমান পিসি সরকারের পিতা, তৃতীয় হল আশু বন্দ্যোপাধ্যায়— আর্ট কলেজের ছাত্র, পরে যে নাম–‌করা কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হয়।
সম্পাদক গোয়েন্দা কাহিনির ফরমাস করলেও নীহাররঞ্জনের পরের বই ‘‌শঙ্কর’‌। সেও মন কাড়ল পাঠকদের। তার পর সাহিত্যের আসরে প্রবেশ করল ‘‌কালো ভ্রমর’‌। পাঠকের হৃদয়ে পাকাপাকি জায়গা করে নিলেন নীহাররঞ্জন। তাও ‘‌কালো ভ্রমর’‌ ১ম পর্বে কিরীটী আসেননি। এলেন ২য় পর্বে, ৩য় পর্বে, ৪র্থ পর্বে। ৪র্থ পর্বটি প্রথমে নাম ছিল ‘‌রক্তলোভী নিশাচর’‌। যেটা পড়ে আমি ক্লাসে শাস্তি পাই। আগেই বলেছি, তখনও নীহাররঞ্জন মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র।
ডাক্তারি পাশ করার পরই পিতা পুত্রের বিবাহ দিয়ে দিলেন। তখন তো এইরকমই রেওয়াজ ছিল। কিন্তু অর্থোপার্জন তো করতে হবে। পিতা তো গ্রামের কবিরাজ, তাতে তো সংসার চলবে না। কলকাতায় এসে চেম্বার খুলে প্র‌্যাকটিস করাও সহজসাধ্য ছিল না। ইতিমধ্যে সমর–‌বিভাস ‘‌ডাক্তার চাই’‌ বিজ্ঞাপন দিলেন। তখন তো দেশ পরাধীন, ইংরেজ সরকার। যাই হোক, মাইনে তো দেবে। কপাল ঠুকে নীহাররঞ্জন দরখাস্ত করে দিলেন। সমর–বিভাগ থেকে যখন চাকরির নিয়োগপত্র এসে পৌঁছোল তখন শিশুকন্যাকে, (‌প্রথম সন্তান নীলা)‌ নিয়ে তাঁদের বাড়ি আনন্দে মাতোয়ারা। এইসব ছেড়েই নীহারবাবুকে চলে যেতে হল পুনায়, কর্মজীবনে যোগ দিতে।
নীহারবাবু বলেছিলেন, ভানু, তখন মনে হয়েছিল, কেন মরতে দরখাস্ত করেছিলাম!‌ এই গ্রাম, এই মধুমতী নদী, আর ফুলের মতো মেয়েকে রেখে কোথায় না কোথায় যাব।
এর পর, তো পুরোদমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। জাপানি আক্রমণে পূর্বরণাঙ্গনে ডাক্তারদের সঙ্গে যেতে হল নীহারবাবুকে। কলকাতায় বিমানে নেমে মোটর ওয়াগনে এখনকার বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। পথে পড়বে যশোর। নীহারবাবু কর্তৃপক্ষকে বললেন একটু যশোরে তাঁদের গ্রামের কাছে রাখতে। সেখানেই তাঁর পরিবার থাকে। আগেই খবর পাঠিয়েছিলেন বাবাকে। বাবা–‌মা, স্ত্রী কনক ও জ্যেষ্ঠা কন্যা নীলাকে নিয়ে তাঁরা দেখা করলেন নীহাররঞ্জনের সঙ্গে। নীহারবাবু বলছিলেন, ভানু, সেই শিশুকন্যাকে কোল থেকে নামাতে যে কী কষ্ট হয়েছিল কী বলব।
নীহাররঞ্জনের প্রথম পোস্টিং কক্সবাজারে। তখন যে নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজের সঙ্গে লড়াই হচ্ছে সে কথা ইংরেজ সরকার সেনাবাহিনীর কাকেও জানতে দেয়নি। ওঁরা জানতেন জাপান আক্রমণ করেছে, বর্মা (‌এখনকার মায়ানমার)‌ পুরো দখল করে ভারতের দিকে এগোচ্ছে। নীহারবাবু তখন প্রতিষ্ঠিত লেখক। তাঁর প্রধান প্রকাশক— বেঙ্গল পাবলিশার্স। সেখানকার কর্তাকে চিঠি লিখতেন। রয়্যালটি পাওনা হলে বাবার কাছে পাঠাতে বলতেন। বাবার যাতে কিছুটা সাশ্রয় হয়।
‌একবার কক্সবাজারে জাপানি প্লেন বোমাবর্ষণ করল। মাঝরাতে সাইরেন বাজল। সকাল হলে দেখা গেল, ভাঙাচোরা বাড়ি, সাগরের জলে মৃতদেহ ভাসছে, সমস্ত শহর যেন ধ্বংসস্তূপ।
নীহারবাবু প্রকাশক বন্ধুকে চিঠিতে লিখেছিলেন—সাদা পায়রাদের অত্যাচারে উপকূল সাগরজল নোংরায় ভরে গেছে। জাপানি বোমাবর্ষণের চিত্রটা বোঝাতে চেয়েছিলেন প্রকাশক বন্ধু শচীন মুখোপাধ্যায়কে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বাড়িতে পাঠানো চিঠি সেন্সর হয়। এতটা কাব্যিক উপমা হয়তো ধরতে পারবেন না কর্তৃপক্ষ, ভেবেছিলেন নীহারবাবু। কিন্তু ইংরেজ সেনা গুপ্তচরদের বাংলা ভাষায় দক্ষ লোকের অভাব ছিল না। ওই চিঠি দিয়েই নীহারবাবুর ওপর কোর্ট মার্শালের তলব হল। নীহারবাবু যতই বলেন, তিনি লেখক, তাঁর তখনই তিরিশটির মতো বই, তিনি বই নিয়েও দেখালেন, এটা কাব্য মাত্র, কিন্তু অফিসাররা অনড়। ‘‌সাদা পায়রা বলতে তুমি জাপানি প্লেনই বুঝিয়েছো।’‌ শেষকালে আরও একদিন জেরা হবে বলে বিচারসভা মুলতুবি রইল। পরদিন কোর্ট মার্শালের প্রধান মেজর, তিনিও ডাক্তার, কী জন্য একাই ডেকে পাঠালেন নীহারবাবুকে। বললেন, ডাঃ গুপ্ত, তোমাকে আমি স্নেহ করি। এখানে কেউ নেই, তুমি সত্য করে বলো তো, জাপানি বোমাবর্ষণ বোঝাতে চেয়েছো কিনা।
সেই অভিভাবক–তুল্য ওপরওলার স্নেহময় কণ্ঠস্বরে নীহারবাবু সত্য স্বীকার করতে বাধ্য হলেন। মেজর বললেন, ঠিক আছে, এবার আমি সামলে নেব, কিন্তু পরে যেন এরকম আর না হয়!‌
মনে হল মাথা থেকে যেন পাষাণভার নামল। ক্যাম্পে ফিরে স্নান করে মনে হল, একটু বাজারে যাই, আঙুর দেখে কিনতে যাবেন, দু’‌জন মিলিটারি পুলিশ এসে তাঁর হাত ধরল, বলল, ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট। নীহারবাবু কিছু বুঝতে না পেরে অগত্যা তাদের সঙ্গে চললেন!‌ তারা নীহারবাবুকে নিয়ে হাজির করাল সেই মেজরের সামনে। যিনি কয়েক ঘণ্টা আগেই তাঁকে অব্যাহতি দিয়েছেন। তিনি পুলিশদের সঙ্গে নীহারবাবুকে দেখেই তো অগ্নিশর্মা। ‘‌ডাঃ গুপ্ত, তুমি কি আমায় পাগল করে ছাড়বে?‌’‌ নীহারবাবু বুঝতেই পারছেন না তাঁর অপরাধটা কী?‌ মেজর তাঁর ডান কাঁধ দেখিয়ে বললেন, ‘‌বাঁ কাঁধে ব্যাজ পরেছ, ডান কাঁধে ব্যাজ কোথায়?‌’‌
নীহারবাবু ডান কাঁধে হাত দিয়ে দেখেন, সত্যিই সেটা পরেননি। কাঁচুমাচু মুখে বললেন, স্যর, সকালের ওই গোলমালে ভুল হয়ে গেছে, আর হবে না।
মেজর বললেন, মনে রেখো, তোমাকে তৃতীয়বার আমি আর ছাড়াব না।
সেই থেকে বুঝলে ভানু, বেরোবার আগে দেখে নিই, দাড়ি ভাল করে কামানো কিনা, ব্যাজ সব ঠিকঠাক পরেছি কিনা। সব থেকে মনে রাখা, পাসওয়ার্ড, ক্যাম্প থেকে জেনে নিয়ে বেরোনো। মনে রেখে সেইটে বলে ক্যাম্পে ঢোকা।
কী সুন্দর নিজের জীবনের গল্প বলতেন নীহারবাবু। তাঁর ছোটবেলার কথা, সাহিত্যজীবনের গোড়ার কথা, যুদ্ধক্ষেত্রের কথা, নিজের বিড়ম্বনার কথাও।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে সমর–বিভাগের কাজে ইস্তফা দিয়ে বিলেত গিয়ে আরও কিছু ডিগ্রি নিয়ে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে যোগ দেন। এই সময়েই তিনি হাসপাতালের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন ‘‌হাসপাতাল’‌ উপন্যাস। এটি নিয়ে তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হলেন। কর্তৃপক্ষের রাগ–ক্রোধ উপেক্ষা করে আবার লিখলেন ‘‌অপারেশন’‌। শেষকালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ছেড়ে নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে যোগ দেন। কিন্তু কখনও কর্তৃপক্ষের কাছে মাথা নোয়াননি।
আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ হল বাংলা ১৩৬৫ সালে। প্রথম ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখলেন আমাদের (মিত্র–ঘোষ প্রকাশন)‌ জন্য ‘‌অস্তি ভাগীরথী তীরে’‌। এই সময়ে নীহারবাবু একাধিক নাটক রচনায় হাত দেন। উল্কা, মায়ামৃগ, রাত্রিশেষ প্রভৃতি।
‘‌উল্কা’‌ নাটকের মঞ্চসাফল্য তাঁকে নাট্যজগতে পাদপ্রদীপের সামনে নিয়ে আসে। এই সময়ে তিনি থাকতেন দমদমের কাছে। পরে চলে আসেন দক্ষিণ কলকাতায়, গোলপার্কের কাছে, পঞ্চাননতলায়, যদিও ঠিকানা ২৬এ গড়িয়াহাটা রোড। বাড়ির নাম দেন ‘‌উল্কা’‌, বোধহয় নাটকটির মঞ্চসাফল্যর জন্যই।
এ সময়ে তাঁর অনেক বই চলচ্চিত্র হয়। চলচ্চিত্রেও জনপ্রিয়তা পায় তাঁর কাহিনি। বাদশা, কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী, সবশেষে ‘‌উত্তরফাল্গুনী’‌। ‘‌উত্তরফাল্গুনী’ চলচ্চিত্র আজও জনপ্রিয়। ‘‌বাদশা’‌ও কম নয়,— একটি বাঁদর, একটি ছাগল ও এক কিশোরকে নিয়ে কাহিনি।
‘‌অস্তি ভাগীরথী তীরে’‌র সূত্র ধরে কলকাতার বাবু সমাজের পটভূমিতে অনেকগুলি উপন্যাস লেখেন নীহারবাবু। তালপাতার পুঁথি, ধীরে বহে ভাগীরথী, ভাগীরথী বহে চলে, মধুমতী থেকে ভাগীরথী প্রভৃতি।
আমরা শুনেছিলাম, নতুন বই চুক্তি করার সময়ে প্রকাশকদের কাছে একটা করে গিনি নিতেন নীহাররঞ্জন। কিন্তু আমাদের সঙ্গে কাজে সেরকম কোনও ঘটনা ঘটেনি। হয়তো আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক অন্যরকম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মনের মিলের জন্য ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছাড়া একটা অন্যরকম সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
সাহিত্য রচনার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্র‌্যাকটিসও কম ছিল না। তিনি চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন। জ্যোতি সিনেমার কাছে তাঁর চেম্বার ছিল। আমরা অনেক সময় চেম্বারে যেতাম, নতুন বইয়ের পাণ্ডুলিপি আনবার জন্য। গিয়ে দেখেছি, রোগী ভর্তি চেম্বার।‌‌
সিগারেট খেতেন প্রায়ই। ‘‌পিকাডেলি’‌ টিন একটি করে রোজ। ‘‌পিকাডেলি’‌ আসা বন্ধ হতে ‘‌গোল্ডফ্লেক’‌ ধরলেন। একদিন হঠাৎ একটা কার্ডিয়াক গোলমাল হওয়ায় ডাক্তার সিগারেট অর্থাৎ ধূমপান নিষেধ করলেন। ৫০টা করে দৈনিক সিগারেট খাওয়া ছাড়লেন একদিনেই। মাঝে মধ্যে লজেন্স বা পান খেতেন। তাও ছাড়লেন। নেশাও, সংযমও তেমনি।
‘‌উল্কা’‌ বাড়িতেই মায়ের পা ভাঙল। ফিমার হাড় বেশি বয়সে ভাঙলে জোড়া লাগা মুশকিল হয়। শেষ পর্যন্ত মা মারা গেলেন। মাতৃশোকে মুহ্যমান অবস্থায় দেখেছিলাম নীহাররঞ্জনকে। মুহ্যমান তো হওয়াটা স্বাভাবিক। এই মা–‌ই তো তাঁকে সফল সাহিত্যিক করে তুলেছিলেন।
দক্ষিণ কলকাতায় আসার পরেই তাঁর চার মেয়ের পর পর বিবাহ হল। নীহাররঞ্জনের কোনও পুত্রসন্তান ছিল না। কিন্তু তার জন্য তাঁর কোনও দুঃখ ছিল না। চার মেয়েকে নিয়ে তাঁর সুখের সংসার ছিল। নীলা, দীপালি, করবী ও কেয়া।
বিখ্যাত জ্যোতিষী ভৃগুজাতক দ্বারেশচন্দ্র শর্মাচার্য তাঁর বন্ধু ছিলেন। বোধহয় ‘‌উল্কা’‌র সাফল্যর আগে দ্বারেশবাবু তাঁকে নীলা রত্ন ধারণ করতে বললেন।
নীহারবাবু বলছেন, নীলা তো পরলাম, দ্বারেশবাবু্ই শোধন করে দিলেন। নীলার আংটি পরে গাড়ি ড্রাইভ করছি, ফাঁকা রাস্তা, গাড়ি সোজা উঠে গেল ফুটপাথে। ভাগ্যিস আস্তে চালাচ্ছিলাম, ল্যাম্প পোস্টে ধাক্কা লাগল, বিশেষ ক্ষতি হয়নি। অনেকে বলল, প্রায় সকলেই বলল— নীলা অনেকের সহ্য হয় না। দ্বারেশবাবুকে বললাম। দ্বারেশবাবু বললেন, আপনি তো পুজো করেন রোজ। আমি বললাম, করি তো। সেই সময়ে একটা বাটিতে কিছুক্ষণ নীলার আংটি দুধে ডুবিয়ে রাখবেন। ‌উনি খাদ্য চাইছেন রোজ। দুধই দেবেন।
নীহারবাবু বললেন, সেই থেকে রোজ তাই করি।
এ ঘটনাটার উল্লেখ করলাম এই জন্য, একটা প্রসিদ্ধ গল্প আছে নীহারবাবুর— রক্তমুখী নীলা। সেটার উৎপত্তি হয়তো এই ঘটনা থেকেই।
নীহারবাবুর লেখা বইয়ের সংখ্যা ২০০’‌র মতো। এগুলেকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগ:‌ ‘‌রাজকুমার’‌ থেকে ‘‌বাদশা’,‌ ‘‌লালু ভুলু’‌ ইত্যাদি কিশোর সাহিত্য:‌ দ্বিতীয় ভাগ ‘‌কালো ভ্রমর’‌ থেকে শুরু করে ‘‌কিরীটী রায়’‌ কেন্দ্রিক গোয়েন্দা কাহিনি। তৃতীয় ভাগ সামাজিক উপন্যাস যার শীর্ষে ‘‌উত্তরফাল্গুনী’‌। চতুর্থ ভাগ— ‘‌অস্তি ভাগীরথী তীরে’‌, ‘‌তালপাতার পুঁথি’‌ প্রভৃতি ঐতিহাসিক উপন্যাস। পঞ্চম হল নাটকগ্রন্থ ‘‌উল্কা’‌, ‘‌মায়ামৃগ’‌, ‘‌রাত্রিশেষ’‌ প্রভৃতি।
এত বাণিজ্যিক সাফল্য বোধহয় সমসাময়িক কোনও লেখক পাননি।
হঠাৎই নীহারবাবুর খেয়াল হল, ভানু, তোমাদের অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করে খাইয়েছি, কিন্তু আড্ডা দেওয়া, বিনা কারণে একসঙ্গে বসে খাওয়া কোনওদিন হয়নি। ১ জুলাই আসবে?‌ সবাই আড্ডা দেবো,‌ আর ডাল–ভাত–মাছ যা হয় খাব।
আমাদের আপত্তি করার কী আছে, বললাম ঠিক আছে, বাড়ি ফেরার পথে হয়ে যাব। আমাদের সবারই তো বাড়ি ঢাকুরিয়ায়। কিন্তু সে আনন্দভোজন হল না। সেদিন সকালেই ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় মারা গেলেন সংবাদ এল। কলেজ স্ট্রিট বইপাড়া বন্ধ হয়ে গেল। দুঃখ নিয়েই ফোন করলাম নীহারবাবুকে। ‘‌আজ আর যেতে ইচ্ছে করছে না।’‌ নীহারবাবুরও ভাঙা গলা। ‘‌না ভানু, আমারও মন চাইছে না, আমারও তো মাস্টারমশাই ছিলেন।’‌
তারপর সুখে দুঃখে আরও বেশ কিছুদিন গেল। নীহারবাবুর নতুন–‌পুরোনো সব বইই আমরা একে একে ছাপছি। প্রতি শুক্রবার আসেন চেম্বার ফেরত। আড্ডা হয়। ডাক্তার সামনে পেলেই সাহিত্যিক বন্ধুরা, এটা–‌ওটা নানা রোগের জন্য পরামর্শ নেন। আড্ডায় প্রমথবাবু (‌প্রমথনাথ বিশী)‌ তো মধ্যমণি, আমাদের এ আড্ডাকে সবাই বলেন— হাউস অফ কমনস। প্রমথবাবু বললেন, এ যেন নাপিত দেখলেই কামিয়ে নেওয়া। হাসির রোল উঠল।
নীহাররঞ্জনের তত দিনে চার মেয়েরই বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ঝাড়া হাত–পা। লেখা আর চেম্বার। সকালে লেকে কুকুরদের নিয়ে বেড়াতে যাওয়া।
এই রকমই একদিন সকালে বেরিয়েছেন, কুকুরদের নিয়ে। তখনও বাস রাস্তা পেরোননি। বুকে কীরকম ব্যথা। বাড়ি ফিরে এলেন। বিছানা নিলেন। বেশি ভোগেননি। দিন দুয়েকের মধ্যেই পাড়ি দিলেন অচিন লোকে। কিরীটী রায়ের জনক হারিয়ে গেলেন চিরকালের মতো।
দিনটি ছিল ২০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৬ সাল।

‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top