যে হাতগুলি ধরে একদিন আমরা পথ হাঁটতে শিখেছিলাম আজ সেই হাতগুলি বড় অশক্ত। অসম্মান‌, অবহেলা‌, মারধর‌, আর্থিক অত্যাচারে তাঁরা জর্জরিত। তাঁদের পাশে বসতে হবে। লিখেছেন পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক ডাঃ গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়

বছরকার দিনে মাকে একটু মিষ্টিমুখ করিয়েছিলেন বৃদ্ধ বাবা। হতেই পারে চিকিৎসকের নিষেধ ছিল। আদিখ্যেতা?‌ হবেও বা!‌ সেই অভিযোগে বৃদ্ধ বাবাকে সপাটে চড় মারছে ছেলে, এই ছবিটা সম্প্রতি ‘‌ভাইরাল’‌ হয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ায় বেশ কিছু মানুষের যুগপৎ অস্বস্তি এবং উদ্বেগ বেড়েছে। সে বাড়িতে এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে কিনা, ছবিটা কে তুলল অথবা ওর অন্তর্গত রসায়ন কী হতে পারে সেসবের কিছুই জানতে না পারলেও সামাজিক পরিশীলনের কাঠামোর এটি নিঃসন্দেহে একটা ধাক্কা, তবে অভিজ্ঞজনে জানেন আজ আর এটা কোনও বিরল ঘটনা নয়। যে সমাজের মরালিটি–‌র পাঠ্যক্রমে ‘‌‌পিতা হি পরমন্তপ’‌ অথবা ‘‌জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী’‌র প্রণোদনার খোলনলচে, সেখানে বাবা, তিনি যতই নগণ্য প্রাণী হ‌ন না কেন, তাঁর গলা টিপে অন্য হাতে থাপ্পড় মারা হচ্ছে এবং সেই নিগ্রহকারী আর কেউ নয়, আত্মজ সন্তান, এটা হজম করা মুশকিল!‌ তবু এই অবসরে সেই সন্তান কতটা নির্মম এবং ঘটনাটি কতটা বিচ্ছিন্ন এমন ছকে না ভেবে যদি আজকের সমাজের বাস্তব ছবিটা একটু নিরপেক্ষ অবস্থান থেকেই দেখি, তবে হয়তো এ ধরনের ঘটনাকে হিমশৈলের চূড়াটুকুই মনে হবে।
একসময় ভারতবর্ষ নিশ্চয়ই বার্ধক্যের বারাণসী–‌ই ছিল। চৌপায়ায় বসে বিশ্রম্ভালাপের ফাঁকে নাতি–‌নাতনি পরিবৃত দাদু অথবা দিদিমা রূপকথার গল্প বলছেন এমন সুখী ছবিটাও হয়তো দুর্লভ ছিল না। কিন্তু বাস্তব বড় বালাই, বিজ্ঞান–‌প্রযুক্তি–‌চিকিৎসাবিদ্যার বাস্তবায়িত চেষ্টা গড় আয়ু এখন অনেকটাই বাড়িয়েছে। দ্রুতগতিতে বাড়ছে এদেশের বয়স্ক মানুষের সংখ্যা, এখনই তা বারো কোটিতে দাঁড়িয়েছে এবং বলা বাহুল্য সংখ্যাটি ঊর্ধ্বগামী। অন্যদিকে সমাজের পরিবর্তনও হয়ে চলেছে দ্রুতগতিতে এবং সেই গতির ভারসাম্য রাখতে ক্ষমতার হস্তান্তর হয়েছে, বয়স্ক পুরুষ এবং নারী প্রায় বেশিরভাগ পরিবারেই এখন আর পরিচালকের ভূমিকায় নেই। এতকাল ধরে মূল যে তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকত আন্তঃপ্রজন্মের সম্পর্ক, সেই কর্তব্যবোধ, সংযোগ এবং সম্মানের জোগানে কোথাও কোথাও ফাঁক ধরা পড়েছে। মূল্যবোধেরও পরিবর্তন হচ্ছে, কালেক্টিভিস্ট কাটামো থেকে ইন্ডিভিজুয়ালিস্টিক কাঠামোয় হাঁটছে সমাজ!‌ যৌথ পরিবার তখন ট্যাক্সির পুরনো মিটার মাত্র, তাই কার্যত যে পরিবারের ওপর এত বয়স্কজনের দেখভালের দায়িত্ব সেই পরিবারও ঘোরতর সংশয়দীর্ণ এবং দ্বন্দ্ব আকুল।
পশ্চিমি কাঠামোর ‘‌এল্ডার অ্যাবিউস’‌ অর্থাৎ বয়স্ক মানুষের নিগ্রহ আজ আমাদের অন্তরমহলে ঢুকে পড়েছে। দৈনন্দিনের অসম্মান, অবহেলা, গুরুত্বহীনতা আর সমালোচনা–‌কটূক্তি কখনও কখনও চড়–‌থাপ্পড়ের ওজন‌ও ছাপিয়ে যায়। আজকের বয়স্কজনের একটা বড় অংশের তাই আত্মমূল্য আর আত্মবিশ্বাস তলানিতে ঠেকেছে। শারীরিক নিগ্রহের চাইতেও বড় হয়ে উঠেছে মানসিক যন্ত্রণা, নিগ্রহ আর নিরাপত্তার অভাববোধ। এদেশের সিনিয়র সিটিজেনদের মূলত চারটি বিষয় ঘিরে নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে, যাদের প্রথমটিই শারীরিক নিরাপত্তাহীনতা। হাঁটুতে, কোমরে বাত, চলতে গেলে হাঁফ ধরে, এদিকে সুগার, প্রেসার, চোখে কম দেখা আর কানে কম শোনা তো আছেই। সেই সঙ্গেই কারও স্মৃতির সমস্যা, মনের বিষণ্ণতা, উৎকণ্ঠা–‌উদ্বেগ, আরও অনেক কিছু। দ্বিতীয় ভয়টা আর্থিক, সময়মতো অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ঘাটতি থাকলে অনেক ভোগান্তি, পরমুখাপেক্ষিতা–‌নির্ভরশীলতা। তৃতীয় সমস্যাটি স্বাধীনতাহীনতা, অটোনমি–‌র অভাব। এটা মেনে নিতে পারেন না অনেক বয়োজ্যেষ্ঠই, আবার বাধ্য হয়েই মানতেও হয়। চতুর্থ ভয়টি তৃতীয় ভয়েরই প্রলম্বন, যোগাযোগবিহীনতা, কেন না সেখানেও তো প্রতি মুহূর্তের নির্ভরশীলতার প্রযোজন হচ্ছেই!‌
কেয়ার গিভিংয়ের ভারটি যাঁদের ওপর ন্যস্ত, তাঁরাও কম বিব্রত নন। এঁরা হচ্ছেন সেই ‘‌স্যান্ডুইচ’‌ জেনারেশন, যাঁদের একদিকে ছেলেমেয়েদের বড় হয়ে ওঠার চাপ, স্কুল, কলেজ, ইউনিট টেস্ট অন্যদিকে বাবা–‌মা–‌শ্বশুর–‌শাশুড়ির ব্লাড টেস্ট, ভুল ভ্রান্তি, ওষুধ ফুরিয়ে পাওয়া, আয়া নিয়ে অশান্তি!‌ এঁদের অনেকেই প্রাণপণ চেষ্টা করেন। তবু দিনের শেষে কারও কারও কণ্ঠে তীব্র হতাশা আর কনফিউশন, ‘‌কী করি বলুন তো?‌ মা আজকাল এমন ছেলেমানুষের মতো জেদ করে যে বাধ্য হয়েই গলা তুলতে হয়!‌ অফিস থেকে ফিরে আর কত সামলানো যায়?‌ পরে খারাপ লাগে!‌’‌ মনোবিদের ক্লিনিকে বসে অঝোরে কেঁদেই চলেছেন বউমা!‌ ক‌দিন আগেই শাশুড়ি মা দেহ রেখেছেন আর বউমা এই মৃত্যুর জন্য নিজের চিৎকার–চেঁচামেচিকেই দায়ী করছেন। একই সঙ্গে অনেক হিসেবি ছেলে–‌মেয়ে–‌বউমা–‌জামাতাদেরও দেখছি। কেউ ভারমুক্ত হতে চান, কেউ বা চূড়ান্ত ‘‌কেয়ার গিভার স্ট্রেস’‌–‌এর শিকার। অর্থাৎ এটা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে আসছে যে এল্ডার কেয়ার–‌নেগলেক্ট এবং এল্ডার অ্যাবিউস সান্ধ্য সিরিয়ালের মতো সরলরেখায় চলে না, অনেক ওঠানামা আছে এখানে।
বয়স্ক নিগ্রহ বাড়ছে সেখানেই, যেখানে বয়স্ক মানুষটি শারীরিকভাবে ভীষণরকম অশক্ত, স্মৃতিভ্রংশ অথবা মানসিক সমস্যায় রয়েছেন, ওষুধও খাচ্ছেন সেজন্য। যেখানে চলাফেরার সমস্যা, মলমূত্র ত্যাগ নিয়েও সমস্যা। টাকাপয়সা থাকলে একরকম সমস্যা, না থাকলে অন্যরকম। বেশিরভাগ সময়েই নিগ্রহকারী নিজেরই সন্তান, কখনও তাঁর স্ত্রী অথবা স্বামী। আর্থিক দুর্বলতা, নেশায় আসক্তি, সম্পত্তির প্রলোভন এ সবও বেশ কিছু ক্ষেত্রে নিগ্রহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার বয়স্ক মানুষটি প্রতিবাদী হলেও সমস্যা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ সব মারধর এবং মানসিক নিগ্রহের কথা বাইরের কাউকেই বলতে চান না অনেকেই, তবু ফাঁকফোকর দিয়ে কিছু কথা, কিছু কষ্টের ইতিবৃত্ত প্রকাশ হয়েই পড়ে।
সম্প্রতি একটি বড়সড় সমীক্ষায় এ দেশের বয়স্ক নিগ্রহের ছবির আদলটা অনেকাংশেই ধরা পড়েছে, যদিও এ নিয়ে আরও অনেক বেশি সচেতনতার প্রয়োজন। তবে সে আলোচনায় পৌঁছনোর আগে আমরা বরং দেখে নিই ঠিক কীরকমভাবে টিকে আছেন এ দেশের রুপোলি রেখার দল!‌
*‌ * ‌*‌
–‌‌ মালতী, ও মালতী, একটু আয় না মা, বাথরুম যাব!‌ খুব অসহায় গলায় গত দু–‌তিন মিনিট ধরেই ডেকে চলেছেন‌ একদা ডাকসাইটে হেড মিস্ট্রেস কুমুদিনী সান্যাল, যে ‘‌বড়দি’‌কে যুগপৎ শ্রদ্ধা আর ভয় করে চলত এককালের গার্লস স্কুলের মেয়েরা। বাইরের ঘর থেকে টিভির গমগমে আওয়াজ ভেসে আসে, মালতী নামের সহায়িকা মেয়েটি তাতেই মজে আছে। রোজই এ সময়টা ওর সিরিয়াল না দেখলেই নয়, আর এ বাড়ির ঠাকুমারও ওই সময়েই যত বাথরুম পায়। ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে ওঠে কুমুদিনীর গলা। কিছুক্ষণ চুপচাপ, তারপর একটা ভারী কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দে ছুটে আসে সেই মালতী–‌ই। আর ওপরতলা থেকে তাঁর চিৎকারে ছুটে আসেন হাউসকোট পরা বউমাও। ‘‌আপনি একা একা বাথরুম গেছেনই বা কেন, ডেকেছিলেন মালতীকে?‌’‌ বাথরুমের স্যাঁতসেঁতে মেঝেয় আধা শুয়েই কিছু একটা বলতে চান কুমুদিনী, শোনার ধৈর্য থাকে না বউমার, ‘‌পাঁচ মিনিট অন্তর অন্তর বাথরুম গেলে ওরাই বা কী করে, নিন উঠুন এবার’‌‌, ‘‌শাশুড়ির বাঁ হাতটা ধরে টানতে থাকেন বউমা, যাক ভাঙেনি তা হলে। অতিকষ্টে বিছানায় উঠে হাঁফাতে থাকেন কুমুদিনী, এরপর তো আর কিছু বলাই চলে না। তাঁরই পেনশনের টাকায় এই আয়ার ব্যবস্থা কিছু বলতে গেলেই.‌.‌.‌ এ তো তবু ভাল, ছুটে এসেছে। ক‌দিন আগের মেয়েটা তো হাতে জল দিতে বলায় গরম জল ঢেলে দিয়েছিল, দু‌দিন পরে হাতে ফোস্কা দেখে ছেলে অবশ্য একবার জিজ্ঞেস করেছিল, ‘‌হাতে কী হল মা?‌’‌ কিছু বলেননি কুমুদিনী। কেন না বলার আগেই লক্ষ্য করেছিলেন মোবাইল ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তাঁর একমাত্র সন্তান!‌
––––––
দোতলার পিছনের দিকের কোনার ঘরটাই পছন্দ অসিতাভের। একটু নির্জন, আঁধার, আঁধার, তবু এ ঘরটা সরমারও বড় পছন্দের ছিল। আজ দু‌ বছর সরমা নেই, কেমন ড্যাং ড্যাং করে চলে গেল। গিয়ে অবশ্য ভালই হয়েছে, তিনিও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিকেল পাঁচটা, বাইরের গেটের শব্দ হল, তার মানে দাদুভাই ফিরল স্কুল থেকে, আগে ছুটে ছুটে আসত, এখন তো সেও আসে কদা–‌ক্বচিৎ। হাঁটুর ব্যথাটা খুব বেড়েছে, বাইরে আর হাঁটতে যেতে পারছেন না অসিতাভ। ক‌দিন আগে বাড়ির কাজের লোক অনন্তকে দিয়ে একটা সেলফোন কিনে আনিয়েছেন, তা নিয়েও অশান্তি!‌ পরের দিন অফিসে যাওয়ার আগেই ছেলে এল, ‘‌ফস করে একটা দামি মোবাইল কিনে ফেললে?‌ বললেই তো আমার পুরনো একটা দিয়ে দিতাম। মার্কেটের কী হাল দেখেছ?‌ তোমার ওষুধের পিছনেও কতগুলো করে টাকা যায় জানো না?‌ একটু ভেবেচিন্তে চলতে হয় বাবা!‌’‌ যেমন এসেছিল, তেমনিই ঝড়ের বেগে ফিরে যায় ছেলে। অসিতাভ কেবল ভাবেন, মুখে কিছু বলেন না, মনটা বিষিয়ে গেছে। ওষুধপত্রগুলো ক‌দিন হ‌ল আর খাচ্ছেন না তিনি, এভাবে চললে আর ক‌টা দিন পরে ছেলের এই ভাবনাটাও কমে যাবে, ভালই হবে। বন্ধু–‌বান্ধবদের সঙ্গে একটু কথা বলবেন বলেই কিনেছিলেন সাধের যন্তরটা, বালিশের একধারে কেমন অনাদরে পড়ে রইল।
*‌ * *‌
নিজের নামেই ফ্ল্যাট। তা ছাড়া শ্বশুরবাড়ির জমি জেরাতের একটা অংশ, দোকানপাট স্বামী বেঁচে থাকতে তাঁর নামেই করে দিয়েছিলেন, তাই মাথা গোঁজবার ঠাঁই কিংবা অর্থচিন্তা তেমন নেই ঝর্নার। মেয়ের বিয়ে হওয়া ইস্তক বিদেশে আর ছেলে হায়দরাবাদে, মাঝে মধ্যে আসে দু–‌একদিনের জন্য। নাতিটা বড় হচ্ছে, ছেলে আজকাল প্রায়ই ওর পড়াশোনার খরচ ইত্যাদির কথা শোনায়। যদিও ছেলে–‌বউমার অর্থের অভাব হওয়ার কারণটা বুঝে উঠতে পারেন না ঝর্না। যতবারই এসেছে, নাতিটার নাম করে কিছু না কিছু দিয়েছেন তিনি। যদিও ছেলের আপত্তি মায়ের খরুচে স্বভাব নিয়ে, এর–তার জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, পরীক্ষার রেজাল্ট সব কিছুতেই মা কিছু না কিছু দিয়েই চলেছেন, মাঝেমধ্যেই মা বলে থাকে, আমি চলে যাওয়ার আগেই বাড়িটা কোনও সেবাকাজের জন্য দিয়ে যাব, ফেলে রাখব না, কাজে লাগবে। মায়ের এই ধরনটাতেই সংশয় ছেলের। খুচমুচ এ নিয়ে দু–এক বছরে কথাও হয়েছে কয়েকবার, তবে সমস্যাটা প্রকট হল যখন থেকে ছেলে অফিসের কাজের অজুহাতে মায়ের আধার কার্ড, প্যান কার্ড এ সব চেয়ে পাঠাল। কাছেই বাড়ি দিদির, পরামর্শ করে ঝর্না, ‘‌ওর অফিসের কাজে আমার পরিচয়পত্রটত্র কী হবে?‌’‌ দিদি বলেন, ‘‌ওকেই জিজ্ঞেস করো না‌!‌’‌ ‘‌করেছিলাম তো, সদুত্তর পাইনি, আচ্ছা দিদি আমাকে কোথাও পাঠানোর মতলব করছে না তো ছেলেটা?‌ নাকি যাতে আর কাউকে বাড়ি–ঘরদোর না দিয়ে ফেলি, সেই ব্যবস্থাই করছে?‌’‌ চিন্তিত দুই বোন–‌ই। গত তিন মাস ছেলে আর ফোনটুকুও করেনি, ভাল লাগে না ঝর্নার কিছু। তিনি তো ছেলে–‌বউমার কাছে কিছুই চাননি কখনও, নাতিটাকেও তো বেশ ক‌বছর দেখেননি, তার পরেও কেন এমন?‌
*‌ *‌ *‌
ভিজে সপসপে বিছানাটা, কখন যে এমন হল বুঝতেই পারেননি চপলারানি। আজকাল এমনটা হয় মাঝে মাঝেই। বউমা জানতে পারলে এক্ষুনি চিৎকার করবে, ‘‌কটা চাকরানি রেখেছে তোমার ছেলে?‌ বাপ–‌মা বিয়ে দিয়েছিল কি তোমার কাঁথা পরিষ্কার করার জন্য?‌’‌ কথায় কথায় এমনতরো খোঁটা!‌ সেদিন তো আরেক কাণ্ড, খাওয়ার পর একটু বমি করে ফেলেছিলেন চপলা, শরীরটা ভাল ছিল না। বউমা সেদিন লাঠি হাতে এসে দাঁড়ালে, ‘‌এক্ষুনি পরিষ্কার করো, নইলে এ লাঠি তোমার পিঠে পড়বে, রাতের খাওয়া বন্ধ আজ।’‌ কথাটা মনে পড়তেই শরীরটাকে প্রাণপণ চেষ্টায় ভিজে চাদর থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করতে থাকেন চপলারানি সাহা।
*‌*‌*
সেই কোন দুপুর থেকে স্টেশনের এককোণে গুটিশুটি মেরে বসে আছেন মানদা, কখন ছেলেটা ফিরবে কে জানে?‌ গাড়ি আসছে, থিকথিকে ভিড় ছড়িয়ে পড়ছে, হট্টগোল বাড়ছে আবার কিছু পরে একটু শান্তও হয়ে যাচ্ছে স্টেশন। ছেলেটা কি খাবার আনতে গিয়ে এত দেরি করছে, নাকি কোনও অঘটন ঘটল?‌ কথাটা মনে আসতে একবার ছেলের মঙ্গলকামনায় ‘‌দুগ্গা দুগ্গা’‌ বলে ওঠেন মানদা, বালাই ষাট, বাছার আমার কিচ্ছু হবে না, একটু পরেই ফিরে আসবে ঠিক!‌ ক্যাম্বিসের ব্যাগটাকে আঁকড়ে ধরেন ভাল করে, যা সব চোর–ছ্যাঁচোর চারদিকে!‌ সন্ধে নামছে, এবার তো গঙ্গার ধারে একটা ধর্মশালা–‌টালায় উঠতে হয়!‌ শরীরটা ঠিক লাগে না মানদার, ব্যাগটা মাথায় দিয়ে দেওয়ালের এক কোণে শুয়েই পড়েন তাই। ঘোলাটে চোখে খুঁজে বেড়ান এদিক–ওদিক ছেলের মুখ, আসবে ঠিকই, হয়তো হোটেল–‌টোটেল ঠিক করে আসছে— মাকে তীর্থ ঘোরাবে বলেছে যখন, ভাল ব্যবস্থাই করবে খোকা!‌ খিদে পেটে ঘুম জড়িয়ে আসে মানদার দু‌চোখে, জানতেও পারেন না সেই কোন দুপুরের ফিরতি ট্রেনে খোকা কখন কলকাতার পথে রওনা হয়েছে।
–––––
জানি, এসব শুনতে ভাল লাগছে না আমাদের, কিন্তু বিশ্বাস করুন এর কোনওটাই বানিয়ে, সাজিয়ে বলতে হচ্ছে না। নিদারুণ লাঞ্ছনা আর গ্লানির মালিন্যে প্রতিটা দিনই কোনও না কোনও ঘরে তৈরি হচ্ছে অসম্মানের পাঁচালি। আবার এমনও অসংখ্য পরিবারের কথা আমরা জানি, তাঁরা প্রাণপাত করেও চেষ্টা করেন বুড়ো মানুষগুলোকে একটু শান্তিতে–‌স্বস্তিতে রাখতে, কিন্তু এর পাশাপাশিই যে ছবিটা একটু একটু করে অবয়ব পাচ্ছে সে বড় সুখের নয়। 
প্রসঙ্গ:‌ বয়স্ক–নিগ্রহ
দৈহিক, মানসিক যাই–‌ই হোক না কেন, বয়স্ক মানুষের প্রতি ইচ্ছাকৃত অথবা অনিচ্ছাকৃত যে কোনও আচরণ, যাতে তাঁদের শারীরিক, মানসিক, আর্থিক যে কোনও ধরনের ক্ষতি হতে পারে বা হচ্ছে সেটাই বয়স্ক–নিগ্রহ। খাদ্য, পোশাক–আসাক, বাসস্থান এবং ওষুধপত্রের নিয়মিত ব্যবস্থার অভাব ও অবহেলা। যা হোক করে তাঁদের ফেলে রাখা অথবা যে কোনও জায়গায় পরিত্যাগ করার তো প্রশ্নই উঠছে না। এদের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই বয়স্কজনের সব রকম ক্ষতি তথা মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। আর পাঁচটা অপরাধের সঙ্গে এ বিষয়টির তফাত হল, এখানে সবচাইতে বড় ভরসাস্থলটি থেকেই বিপদ আসছে। বাইরের চোর–ডাকাতকে সারা জীবন ধরে ঠেকানোর চেষ্টা করি আমরা, কিন্তু বয়স্ক–নিগ্রহের প্রধান অংশটাই অন্দরমহলের।
শারীরিক নিগ্রহের কথাই প্রথমে আসবে। কিল, চড়, ঘুসি, লাথি মারা, ধাক্কা দেওয়া, হাত মুচড়ে দেওয়া, চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে রাখা, তালাবন্ধ করে আটকে রাখা, শাস্তিমূলক আচরণ হিসেবে খেতে না দেওয়া, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ইচ্ছেমতো ওষুধ প্রয়োগে আচ্ছন্ন করে রাখা এ সমস্তই এ ধরনের নিগ্রহের প্রকারের মধ্যে পড়ে। ডিমেনসিয়া রোগী, অন্যান্য মানসিক অসুখে যাঁরা ভুগছেন, অবসন্ন মানুষের সঙ্গেই এ ধরনের আচরণ বেশি করে হয় এবং বয়স যত বাড়ে এ ধরনের নিগ্রহও ততই বাড়তে পারে। কোনও আপাত কারণ ছাড়াই ক্রমশ শরীরের ওজন কমছে এমনও দেখা যায়।
মানসিক নিগ্রহের প্রকারভেদ আরও বিচিত্র। অসহায় বয়স্ক মানুষের নির্ভরশীলতাকে নিদারুণ বিদ্রুপ থেকে শুরু করে প্রতি মুহূর্তের সমালোচনা, বক্রোক্তি, খোঁটা দেওয়া, চিৎকার, গালিগালাজ, বিশ্রী নামে ডাকা, তুই–‌তোকারি করা এ সব কিছুই মানসিক নিগ্রহের আওতায় পড়ে। আবার মুখে কোনও কথা না বলেও নিগ্রহ চলে। বৃদ্ধ অথবা বৃদ্ধা মানুষটির বারংবার প্রশ্নের কোনও উত্তরই না দিয়ে চলে যাওয়া, তাঁদের কাছে কাউকেই আসতে না দেওয়া। মতামতের কোনও রকম তোয়াক্কা না করে শারীরিক অঙ্গভঙ্গিতে তার অকিঞ্চিৎকরতাটি চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া, এমন সমস্ত ছোট ছোট ঘটনায় বয়স্ক অভিভাবকদের আত্মমূল্য এবং আত্মবিশ্বাস গুঁড়িয়ে যায়। ক্রমেই এঁরা বাকরুদ্ধ, অবসাদগ্রস্ত, উদ্বেগপ্রবণ, কখনও বা সন্দেহবাতিকগ্রস্তও হয়ে ওঠেন। যাঁরা দীর্ঘদিন যাবৎ মনের অসুখের ওষুধ খাচ্ছেন তাঁরা তো এমনিতেই গুরুত্বহীন, তদুপরি নির্ভরশীলতা যত বাড়ে ততই বাড়ে মানসিক নিগ্রহের মাত্রা।
‌‌আর্থিক নিগ্রহের দিকটিও বড় কম নয়। যেহেতু এ বয়সের অনেকেই অনেক কথা মনে রাখতে পারেন না, ভুলে যান অনেক কিছু, তাই টাকাপয়সা, দামি জিনিস বাড়িতে থাকলে প্রায়ই চুরি হওয়ার ভয় থাকে। এক্ষেত্রে দোষারোপ করাও সহজ স্মৃতিদৌর্বল্যকে। ব্যাঙ্কের কাজকর্মের বিষয়ে বয়স্ক মানুষ প্রায়ই নির্ভরশীল, সম্পত্তির বিষয়, কাগজপত্র এসবের ক্ষেত্রগুলিও অন্যের সাহায্যের ওপর বেশ কিছুটা নির্ভর করে। গোলযোগের সূত্র‌ও এখানেই রয়ে যায়। ভয় দেখিয়ে জোর করে বাড়ির হস্তান্তর, নানান ‘‌ইমোশনাল ব্ল্যাকমেলিং’‌ এসবও চলে। মাঝে মধ্যেই খবরের কাগজে এসবের উল্লেখ দেখা যায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কতজন বয়স্ক মানুষই বা প্রতিবাদী তথা সাহসী হয়ে উঠতে পারেন?‌
গায়ে পিঁপড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, পোশাক শতচ্ছিন্ন, শীতবস্ত্রটুকু নেই, খাবারের থালায় কী পাচ্ছেন, কখন পাচ্ছেন জানা নেই, অসুখ হলে ডাক্তার দেখানো হয় কিনা, ওষুধপত্র পান কি ঠিক সময়ে!‌ এ সবই অবহেলা। নিন্দনীয়। অফিসের কাজের চাপে পাঁচ–‌সাতদিন‌ ধরে বাবার ওষুধটা অথবা চোখের ড্রপটা আনাই হচ্ছে না, ভুল হয়ে যাচ্ছে অথবা মায়ের ঘরের সিলিং ফ্যানটা প্রবল গ্রীষ্মের মধ্যেও ছ–‌সাতদিন ধরে খারাপ হয়ে রয়েছে অথচ সময়াভাবে কোনও সুরাহা হচ্ছে না। এটা কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কথা নয়, অবশ্যই অবহেলা।
এ ছাড়াও আছে মা অথবা বাবাকে যেখানে খুশি রেখে চলে আসা, তিনদিনের জল–‌বিস্কুট রেখে তালাবন্ধ বাড়িতে বন্দি রেখে সিমলা বেড়াতে যাওয়া। কী বলবেন, অমানবিক?‌‌ 
এ দেশের বয়স্কজন সবচাইতে বেশি অপছন্দ করেন অসম্মান, প্রতি পদেই কিন্তু তাই–‌ই ঘটছে। বেতনভোগী আয়া অর্থাৎ সহায়ক–‌সহায়িকারাও বহু ক্ষেত্রে নিগ্রহকারীর ভূমিকায়। বয়স্কদের তথাকথিত কেয়ার সেন্টার, কখনও কখনও ওল্ড এজ হোমগুলিও ব্যতিক্রম নয়— দীর্ঘস্থায়ী অসুখে ভোগা বয়স্ক মানুষ, চলৎশক্তিবিহীন মানুষের ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে এখানেও নির্মমতার কথা শোনা যায় কিন্তু। 
কথাটা হল, এইসব অসহায় মানুষগুলি যাবেন কোথায়?‌ সমাজের প্রচলিত কাঠামোয় এঁরা উদ্বৃত্ত, এঁদের নাগরিক অধিকার কিংবা ভোটাধিকারেরও তোয়াক্কা করেন না অনেকেই, সংসারে এঁরা বোঝা। তা হলে এই বিপুল সংখ্যক সিনিয়র সিটিজেনের নড়বড়ে মালগাড়ি নিয়ে আমরা কোন আবর্জনার মাঠ খুঁজে বেড়াচ্ছি?‌ নাকি দীর্ঘকালীন উদাসীনতার উর্মিপথের শেষে বিপুল ব্যয়ে বৃষোৎসর্গ শ্রাদ্ধেই আমাদের যাবতীয় উদ্‌যাপন?‌ আমাদের পথ তবে কোনটা?‌
মেইনটেনান্স অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার অফ পেরেন্টস অ্যান্ড সিনিয়র সিটিজেনস অ্যাক্ট (‌২০০৭)‌
একটা আইন তৈরি হয়েছে, বছর দশেক ধরেই সেটি বহাল। বয়স্ক বাবা–‌মা এবং নিকটাত্মীয়কে না দেখলে আর চলবে না এমনটাই উল্লিখিত সে আইনে। যাঁরা নিঃসন্তান, তাঁদের নিকটাত্মীয়, যিনি আইনত সম্পত্তির উত্তরাধিকারীও বটে এটি তাঁদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নতুন সংশোধনীতে জামাতা এবং পুত্রবধূও এর আওতায় আসছে। আইন মোতাবেক ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে পারেন বয়স্ক মানুষটি, অশক্ত হলে তাঁর হয়ে কোনও এনজিও–‌র প্রতিনিধিও। নানান রকম শাস্তির বিধান আছে এই আইনে, কিন্তু প্রশ্ন হল কতজন বয়স্ক মানুষ এ বিষয়ে জানেন, দ্বিতীয়ত নিকটজনকে অগ্রাহ্য করে কতজনাই বা এর সুবিধে নিতে পারছেন?‌ তবু এমন আইন জরুরি, কখনও কখনও পরোক্ষভাবে এই আইনের সুবিধা পাচ্ছেন বইকি বয়স্ক মানুষেরা। তবে ভেবে দেখতে হবে দু‌হাজার সাত সালের শেষভাগে আইনটি তৈরি হলেও প্রথম নথিভুক্ত ঘটনাটি অন্তর্ভুক্ত হতে কেনই বা প্রায় চার বছর সময় লেগে গেল!‌ রাজ্য সরকারের দায়িত্বে প্রতিটি জেলায় একটি করে বৃদ্ধাশ্রম খোলার পরামর্শ আছে এ আইনেই। অর্থাৎ ছ‌শো ত্রিশটি জেলায় ছ‌শো ত্রিশটি, যাদের প্রত্যেকটিতে দেড়শো জন বয়স্ক মানুষ থাকতে পারেন, কুল্লে এক লক্ষ বৃদ্ধ–‌বৃদ্ধা মাত্র!‌ বারো কোটির মধ্যে এক লক্ষ মানুষের সংস্থান হল বটে, বাকিরা?‌ এ নিয়ে আরও বিশদ ভাবনা জরুরি। অন্যদিকে যাঁরা ইতিমধ্যেই এই আইনের আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেছেন, তাঁদের মধ্যে কতজনের সমস্যার সদর্থক সমাধান হল, সেটি জানাটাও আবশ্যক।
সঙ্কটের স্বরূপ:‌ একটি সমীক্ষা এবং তার ফলাফল
বিগত চল্লিশ বছর ধরে এদেশে বয়স্ক মানুষের অধিকার এবং অন্যান্য জরুরি বিষয় নিয়ে কাজ করে চলেছে হেল্প এজ ইন্ডিয়া নামের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। সম্প্রতি বয়স্ক–নিগ্রহ বিষয়ে তাঁদের দীর্ঘ সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয়েছে, এই আলোচনায় যার কিছু উল্লেখ প্রাসঙ্গিক হবে বলে মনে হয়।
এদেশের তেইশটি ছোট–‌বড় শহরের মোট পাঁচ হাজার চোদ্দো জন ষাটোর্ধ্ব মানুষের ধারণা এবং অভিজ্ঞতা নিয়েই এই সমীক্ষা, যার মূল প্রতিপাদ্যটি বয়স্ক মানুষের নিগ্রহ। সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের গড় বয়স ছেষট্টি থেকে সাতষট্টির মধ্যে হলেও মোট উত্তরদাতাদের একুশ ভাগের বয়স ছিল সত্তর থেকে আশি–‌র মধ্যে এবং আট–‌নয় ভাগ অশীতিপর। উল্লেখ্য, এঁদের একটি ক্ষুদ্র অংশ একাকী হলেও শতকরা পঁচাশি জন উত্তরদাতা পরিবারের সঙ্গেই থাকেন।
সমীক্ষার উল্লেখযোগ্য প্রশ্নাবলির মধ্যে প্রথমটি হল, সমাজে এবং পরিবারে বয়স্ক–নিগ্রহ বাস্তবিক হয় কিনা, এ সম্পর্কে তাঁদের ধারণা কী?‌ এ প্রশ্নের উত্তরে একটা বড় অংশের উত্তরদাতারা সদর্থক উত্তরই দিয়েছেন। তাঁদের ধারণায় সমাজে বয়স্ক মানুষের প্রতি কটূক্তি, অসম্মান, অবহেলা যথেষ্ট মাত্রাতেই আছে, এমনকী শারীরিক নিগ্রহের কথাও তাঁরা জানেন। দিল্লি, ফরিদাবাদ, কানপুর, আমেদাবাদ এবং নাগপুর শহরের বয়স্ক মানুষেরা দৈহিক নিগ্রহ যে বৃদ্ধ–‌বৃদ্ধাদের ক্ষেত্রে করা হচ্ছে সেকথা বলেছেন। কলকাতার বয়স্ক উত্তরদাতারা অসম্মান (‌৫৮%‌)‌, অবহেলা (‌২৮%‌)‌, মারধর (‌৩২%‌)‌ এবং আর্থিক অত্যাচার (‌২৮%‌)–এর উল্লেখ করেছেন দৃঢ়ভাবে।
এর পরের প্রশ্নটি আরও কঠিন এবং সংবেদী, কেন না প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, ধারণা নয়, বাস্তবে তাঁরা এমন নিগ্রহের শিকার হয়েছেন কিনা?‌ উত্তরদাতাদের এক চতুর্থাংশ মেনে নিয়েছেন তাঁরা ভুক্তভোগী এবং নানান নিগ্রহের শিকার। সন্তান এবং কাছের মানুষের কাছে নিগৃহীত হওয়ার কারণ হিসেবে তাঁরা নিজেদের নির্ভরশীলতা, মূল্যবোধের দায় এবং কেউ কেউ সন্তানের মদ্যপানের উল্লেখ করেছেন। অমৃতসরের এক বৃদ্ধ বলছেন, আমার ছেলেরা বলে, তুমি মরবে কবে?‌ তা হলে বাড়িটা বিক্রি করে টাকাটা ব্যবসায় ঢালতে পারতাম। কলকাতারই একজন বলছেন, ছেলে আমাকে দেশে গিয়ে থাকতে বলছে। দিল্লির বাসিন্দা একজন উত্তরদাতার বক্তব্য, ছেলে–‌বউমা বলেছে, সারাদিন ঘরে বসে করোটা কী?‌ দু–‌চারটে সংসারের কাজ করলে তো উপকারই হত!‌
নাগপুরের পঁচাত্তর বছর বয়সির কথায়, তাঁর ছেলে আর ছেলের বউ–‌এর কেবল ঝগড়া হয় তাঁর বাথরুম–পায়খানা নিয়েই। কেউ চায় বেঁচে থাকতেই বৃদ্ধ মা–বাবার সম্পত্তি ছেলে–‌মেয়ের নামে লিখে দেওয়া হোক, কেউ বা আবার বলছেন, ছেলের নামে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর থেকেই অত্যাচার–‌অবহেলা আরও বেড়েছে। কলকাতা শহরের উত্তরদাতাদের তেইশ শতাংশ স্বীকার করেছেন তাঁরা পারিবারিক এই নিগ্রহের শিকার তো বটেই। এঁদের মধ্যে সত্তর শতাংশের অভিযোগ অসম্মান নিয়ে, গায়ে হাত দেওয়ার কথা বলছেন অবশ্য এঁদেরই শতকরা কুড়ি ভাগ মানুষ, যদিও সেটুকুই বা কম কীসে?‌
কিন্তু নিগ্রহটা করছে কে বা কারা?‌
শতকরা বাহান্ন ভাগ ক্ষেত্রে পুত্র আর বত্রিশভাগ ক্ষেত্রে পুত্রবধূ। কন্যা‌র উল্লেখও কেউ কেউ করেছেন, কিন্তু সে পরিমাণ এখনও অবধি নগণ্য। বৃদ্ধারা পুত্রবধূ উল্লেখ করেছেন বেশি করে, বিশেষত তাঁরা একলা হয়ে যাওয়ার পর থেকে, বয়সবৃদ্ধি এবং বেশি করে অশক্ত হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অত্যাচারের মাত্রা বেড়েছে, এ অভিযোগ করছেন তাঁরা।
কেন ওরা এমনটা করে চলেছে, এ প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই বলেছেন, ওরা আসলে নিজেদের মতো থাকতে চায়, কেউ বা বলেছেন, আমাদের কথাবার্তা, হাঁচি, কাশি, বকবক করা কোনও কিছুই ওরা পছন্দ করে না, তাই এমন করে। অনেকেই আর্থিক অসুবিধা, বাড়ি–‌ঘর–‌সম্পত্তি–‌রোগভোগ–‌নির্ভরশীলতা এসবের কথা বললেও বেশ বড় একটা অংশ বলছেন, আমরা আসলে এক একটা বোঝা, ওরা সেটা না পারছে নামাতে, না পারছে বইতে, তাই এমন করে। মোবাইল ফোন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেলেমেয়েদের, নাতি নাতনিদের বাড়তি মনোযোগও বয়স্কদের প্রতি সময় কম দেওয়ার একটা বড় কারণ হিসেবে প্রায় পঁয়ত্রিশ শতাংশ বয়স্ক মানুষ মনে করেন। কিন্তু এত সব ঘটে চলার পরেও তাঁরা এ বিষয়ে কাউকে কিছু জানাচ্ছেন না কেন?‌ নিগৃহীত বৃদ্ধ–‌বৃদ্ধাদের অন্তত বিরাশিভাগ বলেছেন, কী–ই লাভ?‌ বাড়ির সম্মানটাই তো নষ্ট হবে এতে!‌ কেই কেউ বলেছেন, কীভাবে কী অভিযোগ জানাতে হয় সেটাই তাঁদের জানা নেই। অনেকেই প্রতিহিংসার ভয় পান, কেন না থাকতে হবে তো সেই ছেলে–‌বউমারই কাছে, সিঁড়ির নিচের এককোণে আশ্রয় পেলেও তো বেঁচে আছেন কোনওমতে, এসব করলে হয়তো সেটাও পাবেন না।
তবু অনেকেই মনে করছেন, পুলিস–কোর্ট– কাছারি এসব করার থেকে চেনাশোনা লোক, ঘনিষ্ঠ বন্ধু অথবা দায়িত্বশীল আত্মীয় কাউকে জানাতে পারলে ভালই হয়। নিজের ছেলে–‌মেয়ে–‌নাতি–‌পুতি–‌বউমার বিরুদ্ধে কাকেই বা জানাবেন?‌
এঁদের শতকরা পঁয়ত্রিশ ভাগ পুলিস হেল্প লাইনের কথা জানেন, আর মাত্রই এগারো শতাংশ সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী বয়স্ক মানুষ মেইনটেনান্স অ্যাক্টের কথা শুনেছেন। কলকাতার মাত্র ছয় শতাংশ বৃদ্ধবৃদ্ধা এই আইনের ব্যাপারটা জানেন বলেই জানাচ্ছে সমীক্ষা। তবে তাঁরা টিভিতে এমন খবর শুনেছেন, খবরের কাগজে পড়েওছেন, অন্যদের মুখেও শুনেছেন কথাগুলো, তবু তেমন সাহস পাননি।
তা হলে উপায় কী?‌
সর্ষের মধ্যেই যেখানে ভূতের বাসা, সেখানে উপায় নির্ধারণ বেশ কঠিন। তবু সমাধান–‌প্রস্তাবনার আগে আমি আরেকবার পুরো বিষয়টি ভাবতে অনুরোধ করব। সমীক্ষায় যেটি লক্ষণীয়, তা হল এক চতুর্থাংশ বয়স্ক মানুষ নিগ্রহের কথা বললেও বাকি অংশের মানুষ কিন্তু তেমনভাবে এ নিয়ে কিছু বলছেন না। হতে পারে ছোটখাটো অসম্মান, অবহেলা এসব মানিয়ে নিয়েই তাঁরা বেঁচে রয়েছেন অথবা এসব নিয়ে মুখ খোলার কথা ভাবছেনই না। তাঁরা যে সক্কলে খুব দুর্দান্ত আছেন তা বলছি না, কিন্তু বিষয়টা তাঁদের ক্ষেত্রে একটা সহনসীমার গণ্ডির মধ্যে রয়েছে। সমীক্ষার প্রসঙ্গ সরিয়ে রেখে যদি সাধারণভাবে বিষয়টি অনুধাবন করি তা হলে দেখব, তিনটি নির্ণায়কের ভূমিকা বয়স্ক নিগ্রহে থেকেই যাচ্ছে। তার প্রথমটি, বয়স্ক মানুষটির নানাবিধ রোগের ক্রমবর্ধমান জটিলতাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নির্ভরশীলতারও দ্রুতবৃদ্ধি!‌ দ্বিতীয়টি, ‘‌কেয়ার গিভার স্ট্রেস’‌!‌ ছোট ছোট পরিবার এখন, কে এতটা করবেন?‌ আর্থিক জোগান দেবেনই বা কে?‌ দিনের পর দিন যিনি রাত–দিন জেগে এটি সামলাচ্ছেন তাঁর চাপের অংশভাগ বহন করার জন্য কাউকেই সেভাবে পাচ্ছেন না। নিজের খুশিমতো কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও নেই। এমনকী কোথাও দু’‌দিনের জন্য ঘুরে আসার সুযোগও নেই। নমাসে–ছ‌মাসে আসা আত্মীয়বর্গের ‘‌আহা–‌উহু’‌ ও তাই তাঁর অসহ্য লাগে। সেই জ্বালা–‌র আঁচ পড়ে ওই নির্ভরশীল বয়স্ক মানুষটির ওপরেই। সঙ্কটের সমাধানে তাই এই ‘‌কেয়ার গিভার স্ট্রেস’‌ কমিয়ে আনার ব্যবস্থা করাই প্রধান কাজ। দীর্ঘস্থায়ী রোগভোগে, ডিমেনসিয়া বা অবসাদের ক্ষেত্রে এই কাজটা কেয়ারগিভারের জন্য জরুরি ভিত্তিতে করা দরকার। এখানে পরিবারের সকলের তথা অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের সহায়তাও খুব প্রয়োজন।
তৃতীয় নির্ণায়কটি অর্থ!‌ দারিদ্র‌্য সংসারের ফুটফাটা বাড়িয়ে তোলে, সংসারের এককোণে পড়ে থাকা নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ বা বৃদ্ধাটি প্রায় সময়ই আরও হতমান আরও নিগৃহীত হন এমন সংসারে।
সমস্যার সমাধানে গৃহীত মতগুলি তাই কেবলমাত্র আইন প্রণোদন এবং প্রয়োগ নয়, প্রয়োজন আন্তর্প্রজন্মের ব্যবধান ঘোচানো। দাদু–‌ঠাম্মা–‌নাতি–‌নাতনির মধ্যে যেখানে সম্পর্কটা ঘনিষ্ঠ সেখানে নিগ্রহ, অপমান, অবহেলার মাত্রাও বেশ কম। আজকের সমাজে এই কাজটাই এখন অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য, সত্যিকারের ইন্টার জেনারেশনাল বন্ডিং–‌ই পারে প্রাণের প্রবাহকে সঙ্কটমুক্ত করতে। দু’‌দণ্ড কাছে এসে বসুক তারা, পারলে লুডো খেলুক, রোদ পোহাক একসঙ্গে, একসঙ্গেই সেলফি তুলুক না!‌ বার্ধক্যজনিত অবসাদও অনেক কেটে যাবে এতে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হ‌ল বয়স্ক মানুষের নিজস্ব সামর্থ্য বাড়ানো। পাড়া প্রতিবেশীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, নতুন কোথাও যাওয়ার কথা হলে জানিয়ে যাওয়া, দু–‌এক জন কাছের মানুষের নিয়মিতভাবে খোঁজখবর করাটা খুব কাজে দেয়। বেশি বয়সের ভয় কাটাতে গেলে সবার আগে হাত–পায়ের জোর আর পকেটের জোরটা বজায় রাখতে হয়। সেজন্য নিয়মিত সামান্য হলেও হাঁটাহাঁটি, নিয়মিত ক্রনিক রোগের জন্য চেক আপ খুব দরকার। নিজেকে গুটিয়ে রেখে লাভ নেই, একটু সহজভাবে সংসারের বাকিদের সঙ্গে মেলামেশাটাও যেমন দরকার, তেমনই কোথায় কতটা বলব, কতটা করব, কোন সমালোচনাটার প্রয়োজনই ছিল না সেটিও বুঝতে হবে। প্রয়োজন একটু মজার, খুশির, তৃপ্তিরও। কত সামান্য প্রশংসাতেই একটা পরিস্থিতি সহজ হয়ে যায়, ‌অনেকেই তা বোঝেন। প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছনোর আগে থেকেই আর্থিক–‌পরিকল্পনাটা দরকার, অসুখবিসুখের জন্যও দরকার, বেঁচে থাকার জন্যও দরকার। সাত তাড়াতাড়ি সম্পত্তি–‌বাড়ি এসব পরের প্রজন্মকে লিখে দিতেও যাবেন না, প্রয়োজনে আইনি পরামর্শ নিন। তাতে কেউ অসন্তুষ্ট হলে হতে দিন। নিজেকে অবহেলা করবেন না, তাতে ভবিষ্যতের নিগ্রহের শঙ্কা আরও বাড়বে বরং। আত্মীয় স্বজন–‌বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন, টেলিফোনটা তো আছেই!‌ সেল্ফ হেল্প গ্রুপ তৈরি করাটাও বেশ কাজের। আইন এবং তার প্রয়োজনীয়তার কথা আরও একটু বেশি করে প্রচার হওয়া দরকার, এতে সমাজের সচেতনতা বাড়তে বাধ্য। কোনও কোনও ক্ষেত্রে আইন ছাড়া কোনও গতি নেই। সরকারি এবং বেসরকারি বেশ কিছু সহায়তার ব্যবস্থা এখনও এদেশে রয়েছে, সেগুলির পদ্ধতি ও প্রয়োগ আর একটু সহজ করে তুললে বয়স্ক মানুষদের মনোবল বাড়ে এবং আর্থিক ভাবেইও তাঁরা কিছুটা স্বনির্ভর হতে পারেন।
যাঁরা একলা থাকেন অথবা একটি বাড়িতে কেবল বৃদ্ধ দম্পতিই থাকেন তাঁরাও একটু সতর্ক থাকবেন। 
যে হাতগুলি ধরে একদিন আমরা পথ হাঁটতে শিখেছিলাম আজ সেই হাতগুলি বড় অশক্ত। যাঁদের প্রশ্রয়ে–‌আদরে–‌বকুনিতে আমাদের বড় হয়ে ওঠা তাঁদেরই কেউ কেউ আজ শিশুসুলভ হতেই পারেন, তাঁকে এমন করে হারিয়ে ফেলবেন না।
আজ তাঁদের পাশে এসে বসুন, সময় নেই?‌ না হয় অল্পক্ষণই থাকলেন!‌ দোহাই, এখন মোবাইল নয়, তাঁর পাশে বসলেন তো তিনি খুশি। অন্যদিকে আপনার সন্তান‌সন্ততিও কিন্তু এই সবই দেখছে, দেখছে আপনার আচরণ, উদাসীনতা, ভালবাসা, শ্রদ্ধা, সবকিছু।

জনপ্রিয়

Back To Top