অমরেন্দ্র চক্রবর্তী:
ফেরার পথে তাসখন্দ থেকে খুব ভোরে ফ্লাইট। আগের দিন কিয়েভ থেকে তাসখন্দ আসতে প্রায় সন্ধে। তার আগের সন্ধেয় কিয়েভে জারের আমলের, শুনলাম আড়াইশো বছরের পুরনো, একটা রেস্টোর‌্যান্টে চিলি ভদকা আর চিকেন আ–লা–কিয়েভে মন ভরে গেছে। মন ভরার আরও একটা বড় কারণ, ইউক্রেনের একদল তরুণ–তরুণীর কোরাস গান। তার মধ্যে একটা গান আবার দু’‌বার গাইল তারা। দ্বিতীয়বার গানের পরই তাদের মধ্যে থেকে একটা মেয়ে আমাদের ছ’‌জনের ভারতীয় দলের টেবিলে এসে বেশ একটা গর্বের হাসিতে মুখ ভরিয়ে রুশ ভাষায় কী বলল। রীতিমতো সুন্দরী, দীর্ঘ চোখের পাতা, সূক্ষ্ম লৌহ শলাকার তৈরি মায়ানমারের শায়িত বুদ্ধের ঘুমন্ত চোখের পাতার মতো, তার ওপর হাসিতে মুখটা এতই রমণীয় দেখাচ্ছে যে কথা না বুঝলেও আমরা বোধহয় প্রত্যেকেই তার মুখের দিকে চেয়ে আছি। আরও দু’‌প্লেট চিকেন আ–লা–কিয়েভ টেবিলে রাখতে রাখতে ওয়েটার বলল, শি সেড নাও দে উইল সিং এ ট্র‌্যাডিশনাল সং অব ইউক্রেন।
মেয়েটা ওয়েটারকে ‘‌পার্সিবা’‌ বলেই আমার একটা হাত ধরে এবার যা বলল, ওয়েটারের তাৎক্ষণিক দোভাষিত্বে তা হল, হোয়াই ডোন্ট য়ু কাম অ্যান্ড জয়েন আস, মাই ফ্রেন্ড ফ্রম ইন্ডিয়া।
তাদের লম্বা বিরাট টেবিলে চার–পাঁচটা ভদকার বোতল। কিন্তু সকলের হাতেই ছোট্ট ছোট্ট গ্লাস। আমাকেও ওরকম একটা গ্লাসে একটা জার থেকে হালকা রঙিন সুরা হাতে ধরিয়ে দিয়ে প্রথমেই আমার উদ্দেশে সমবেত টোস্ট করল। তারপরই তারা তাদের ট্র‌্যাডিশনাল গান ধরল, তাদের পীড়াপীড়িতে আমাকেও ভুলভাল গলা মেলাতে হল। গানটা শেষ হওয়ামাত্র আবার সকলের সেই ছোট্ট গ্লাস নতুন করে ভরে পরস্পরের উদ্দেশে টোস্ট করা হল। ভদকা–পর্বও চলল তাদের সঙ্গেই। নিমন্ত্রণকর্ত্রীর পাশের চেয়ারেই বসানো হয়েছে আমাকে।
এর মধ্যে আমাদের ভারতীয় টেবিল থেকে কলকাতার যশস্বী উঠে এসে আমার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলে বলে গেল, ভদকায় ভেসে যেও না ভাই। কাল বাদে পরশু ভোরে ঘরের ছেলে ঘরের পথে।
পানাহার হইহুল্লোড় শেষ হতে মধ্যরাত পেরিয়ে গেল।
উঠে আসবার সময় গালিনা (‌আমার নিমন্ত্রণকর্ত্রীর নাম, নিজেই বলেছে)‌ তার হাতব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট আয়না বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল, ইয়া বাস লুবলু।
কথাটার মানে কী?‌ মুখটা এত সুন্দর, দু’‌হাতে ধরতে ইচ্ছে করে। সে তো সম্ভব নয়। জিজ্ঞেস করি, হোয়াট ডাজ ইট মিন?‌
সেই চেনা ওয়েটার আমাকে দেখতে পেয়ে টেবিলের গ্লাস প্লেট কাঁটা–চামচ তুলতে তুলতে বলল, ইয়া বাস লুবলু মিনস আই লাভ ইউ।
তার হাতব্যাগের চামড়ার গায়ে চন্দন রঙের যে পাতলা কাচের কুচি বসানো, যেন তারই গুঁড়ো ছোট হাত–আয়নার ঢেউতোলা ফ্রেমেও সাঁটা। ভেতরের উত্তেজনা চেপে আমি এইসব দেখছি, কী বলা যায় ভেবে না পেয়ে বললাম, ইন্ডিয়ায় গেছ কখনও?‌ যাবার কথা ভাবো কখনও?‌
ইংলিশ— নিখ্‌ট্‌। পেঁচ মিনুৎ। বলে দূর থেকে সেই ওয়েটারকেই ডেকে এনে তাকে রুশ ভাষায় কিছু বলল। ওয়েটারের কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তরে মিথ্যে বললাম, জানতে চাইছিলাম ব্যাগের ওই হালকা রঙিন কুচি কুচি কাচগুলো ঠিক কী?‌
ওয়েটারের কাছে রুশ ভাষান্তর শুনে গালিনা আমার দিকে ফিরে মৃদু হেসে যা বলল, ওয়েটারের তর্জমায় তা হল— ও তো আমাদের উরাল পাহাড়ের পাথরের চাঁছ।
দূরের টেবিলে জাপানি ও আমেরিকান পর্যটকদের গাইডের সঙ্গে আমাদের গাইডও ডিনার সারছিলেন, শেষ করে আমাদের গাইড আমার কাছে এসে বললেন, টুমরো ইউ উইল লিভ ফর তাসকেন্ট।
মস্কো, লেনিনগ্রাদ, সোচি ঘুরে, ভিড়ের মধ্যে জারদের সামার প্যালেস, উইন্টার প্যালেস দেখে, দেশে ফেরার ঠিক আগে এক ইউক্রেন–কন্যার হৃদয়ের ছোঁয়ায় আমার মনের মধ্যে অদ্ভুত একটা আনন্দের ঢেউ বইছে টের পেলাম। দিল্লি থেকে প্রথম এসে নেমেছিলাম তাসখন্দে। উজবেকিস্তানের এই রাজধানী শহরকে কেন্দ্র করে পরপর ক’‌দিনে সমরখন্দ বুখারা ইত্যাদি তন্নতন্ন করে দেখে উজবেকিস্তানের অপরূপ লোকনৃত্যে মাতোয়ারা হয়ে দু’‌সপ্তাহ ধরে প্রায় পুরো সোবিয়েত ইউনিয়ন সফর শেষের মুখে এমন একটা অভাবনীয় অভিজ্ঞতা। মস্কোর বলশইয়ের চমকপ্রদ দীপ্তি বা মে–ডেতে রেড স্কোয়্যারে গর্বাচভের ভাষণ সামনে দাঁড়িয়ে শোনার রোমাঞ্চও এর কাছে কিছুটা ম্লান।
সোবিয়েত রাশিয়ায় তখন লুকোচুরির খোলাবাজারে রুবলের দাম রোজই পড়ছে, সরকার যদিও জোর করে কৃত্রিম একটা বিনিময়মূল্য ধরে রেখেছে, ব্যাঙ্কে, বিদেশিদের কেনাকাটার দোকানে এক ডলারে একটা গোটা রুবলও পাওয়া যায় না। অথচ রাস্তায় অচেনা লোকজনও এক ডলার ভাঙিয়ে দশ–বারো রুবল দেবার জন্যও বিদেশি ট্যুরিস্ট দেখলেই সাধাসাধি করে।
হোটেলে ফেরার পথে দিল্লির প্রবাসী বাঙালি বসুরায় আমার কাছ ঘেঁষে এসে বললেন, ইউক্রেন বলে পার পেয়ে গেলেন। না হলে লোকাল ইয়ং জেনারেশনের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে অত মাখামাখি, অত রাত অব্দি— ফেঁসে যেতেন। গাইড মহিলা তো সব কিছু কড়া নজরে রাখছিল।
একটু বিরক্ত হয়ে বললাম, এর মধ্যে ফাঁসবার মতো কী ঘটল বলুন তো?‌
—মস্কো হলে বুঝিয়ে দিত। বিকেলের পার্কেও যদি রুশ তরুণীর সঙ্গে লম্বা সময় কাটাতেন, ঠিক জায়গায় খবর চলে যেত। আপনাকে ইন্টারোগেশনের জন্য তুলে নিয়ে যেত। ট্যুরিস্ট গাইডরাই হয়তো আসলে সরকারি স্পাই।
—সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক মানে কি মগের মুল্লুক না কি?‌ দোষ থাকুক না–থাকুক যাকে খুশি তুলে নিয়ে যাবে?‌
—গত বছরও এসেছিলাম একবার, ব্রাদার। সেবার শুধু মস্কোয়। ওই যে, কী পার্কটা যেন?‌ ক্রেমলিনের প্যালেসের সামনেই?‌ কতগুলো ঘোড়ার মূর্তি আছে না?‌ ফোয়ারা আছে। সেখানে এক সুন্দরী রুশ তরুণীর ইশারায়—
বিরক্ত ও অধৈর্য হয়ে বলতেই হল, সঙ্গে গাইড ছিল না বুঝি?‌
—মাথা ধরার ওষুধ খেয়ে কোচে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
—অতই যদি কড়াকড়ি, কই কেউ তো আমাকে কিছু বলল না!‌ কিয়েভ মস্কো সবই তো সোবিয়েত ইউনিয়নের মধ্যেই।
—তাতে কী, ইউক্রেনের মানুষ তো আর রুশ না। যেমন বোলোনিয়ার লোকেরা নিজেদের ইতালীয়দের থেকে আলাদা ভাবে। ক্যাটাল্যানদের গর্ব, তারা স্পেনীয়দের থেকে আলাদা, মিউনিখের বাভারিয়ানদের লাইফ স্টাইল জর্মানদের থেকে অন্যরকম।
সমস্ত রাস্তাটাই ভদ্রলোক তার বিপুল জ্ঞানভাণ্ডার আমার কানে উজাড় করে দিতে লাগলেন।
তাসখন্দে ফিরতে পরদিন বিকেল হয়ে গেল। সন্ধের মুখে, আকাশে তখনও দিনের আলো, হালকা ডিনার সেরে সবাই যে যার সুটকেস গোছাতে ব্যস্ত। এয়ারপোর্টে যখন পৌঁছলাম, রাত তখনও শেষ হয়নি। আমাদের সরকারি গাইড সকলের নাম ডেকে ডেকে হাতে–হাতে পাসপোর্ট ফিরিয়ে দেওয়া শেষ করে হঠাৎ আমার কাছে এসে অন্যদের কান বাঁচিয়ে বললেন, ইফ ইউ গিভ মি এ প্যাকেট অব ফরেন সিগারেটস, আই উইল গিভ ইউ এ স্পেশ্যাল গিফট।
ফরেন সিগারেটের জন্য এদের এই হ্যাংলামো আগেও দেখেছি। হাতের ব্যাগ থেকে প্যাকেট বের করার সময় আমার গড়িমসি দেখে মহিলা তাঁর ব্যাগ থেকে উরাল পাহাড়ের রঙিন ছবি ছাপা একটা লম্বাটে এনভেলাপ আমার নাকের ডগায় দুলিয়ে দিলেন। অচেনা ফুলের গন্ধ পেলাম।
বেনসন অ্যান্ড হেজেসের পুরো একটা প্যাকেট দিয়ে রঙিন, সুগন্ধি খামটা অন্যদের চোখ এড়িয়ে ব্যাগে ঢোকালাম।
লাউঞ্জ থেকে এয়ারক্র‌্যাফট পর্যন্ত হেঁটে যেতে ঠান্ডায় কাঁপুনি ধরে যায়। গরম জ্যাকেটের কলার তুলে নাক ঢেকে ঢাকা জায়গায় গরম নিঃশ্বাস ছড়িয়ে একটু যেন আরাম হল।
বিমানে ওঠার এক–দেড় ঘণ্টার মধ্যেই দেখলাম প্যাসেজের এদিক–ওদিক দু’‌দিকেই আমাদের সঙ্গীরা সবাই ঘুমোচ্ছে। এই সুযোগে ব্যাগ থেকে খামটা বের করতেই ফুলের মৃদু গন্ধ নাকে এসে লাগল। সাবধানে খামের একটা কোণ একটুখানি ছিঁড়ে সেই ফাঁক দিয়ে বলপেনের ডগা ঢুকিয়ে খামের মুখটা কেটে ভেতর থেকে একটা ভাঁজকরা কাগজ বের করলাম। খুলে দেখি রুশ ভাষায় হাতে লেখা। মনে হয়, চিঠি। ওপরে সম্বোধনের জায়গায় কী একটা লেখা, শেষে ছয় অক্ষরের একটা শব্দ। তার মধ্যে অনেকটা ইংরেজি হরফের মতোও দেখলাম। শব্দটা নিশ্চয়ই গালিনা। আর সংশয় নেই— গালিনা আমাকে চিঠি লিখেছে। ভেরি স্পেশ্যাল গিফট তো নিশ্চয়ই।
তারই হাতের লেখা, খামেও তাদের উরাল পাহাড়শ্রেণির ছবি, তার ওপর ফুলের গন্ধ, এ–ও নিশ্চয়ই কিয়েভেরই ফুল। কী লিখেছে?‌ জানবার উপায় নেই। একজন রুশ এয়ারহস্টেসকে দিয়ে পড়িয়ে নেওয়া যায় না?‌ ভেবে দেখলাম সেটা সম্ভব নয়, উচিতও না।
হঠাৎ জানলা দিয়ে চোখে পড়ল কারাকোরাম পর্বতমালার ওপর সূর্যোদয় হচ্ছে। পাহাড়টা দেখাচ্ছে যেন বিশাল একটা পাথুরে চত্বর। তার গায়ে সবে গোলাপি আভা ধরেছে।
কলকাতায় পৌঁছে রোজকার কর্মচক্রে বাঁধা পড়েও কিয়েভের জাদুকরী সেই সন্ধ্যা, সেই মায়াময় মধ্যরাত দূর থেকে আমার মনে হানা দেয়। চিঠিটা হাতে নিয়ে ভাবি, কী লিখেছে এতে?‌ জানতে ইচ্ছে হয় খুব। উপায় তো নেই। শুধু মনে মনে গালিনার সঙ্গে কথা হয়। স্বপ্নের অবাস্তব যেমন স্বপ্ন দেখার সময় বাস্তব হয়ে ওঠে সেভাবেই আমাদের কথা চলতেই থাকে।
মাঝে মাঝে কিয়েভের সেই সন্ধ্যা মনে পড়তে লাগল। রুশ ভাষা জানে অথচ এ চিঠি তাকে ভরসা করে পড়ানোও যায়, এমন কাউকে খুঁজি। পাই না।
হঠাৎ মনে পড়ল, একদিন বিকেলে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের পূর্ণদাস রোডের একতলার ছোট বাসায় ক্বচিৎ–কখনও যেমন যাই তেমনই দাবা খেলতে গিয়ে একদিন প্রগাঢ় লেনিনভক্ত রাশিয়া–প্রেমিক এক তরুণের কথা শুনেছিলাম। বেশ কিছুদিন মস্কোয় থেকে সে রুশ ভাষা শিখেছিল। রুশ যুবতীর প্রেমে পাগল হয়েই তার ভাষাটা শিখতে হয়েছিল তাকে। মস্কো থেকে ফিরে প্রায়ই আসত শীর্ষেন্দুর বাসায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাশিয়ার নিন্দায় খই ফুটত তার মুখে।
শীর্ষেন্দু তার বর্ণনা দিয়ে একদিন বললেন, ছিল গোঁড়া রুশভক্ত, হল সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার তীব্র নিন্দুক— তার এই ডিগবাজি শুনে প্রথম থেকেই আমার সন্দেহ হয়েছিল। একদিন আবার তার রুশবিরোধী ভাঁট বকা শুরু করতেই তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘‌রোজ আমার সামনে যা বলে যান সেটা তো আপনার আসল কথা না, এবার একটু ঝেড়ে কাশুন তো মশাই।’‌
‘‌ছেলেটা ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে যা বলল, তার নিহিতার্থ হল— মাসের পর মাস এক রুশ যুবতীর প্রেমে উভয়পাক্ষিক হাবুডুবু খাবার পর একদিন হঠাৎ তার স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ামাত্র লেনিন–ভক্ত রুশপন্থী বাঙালি যুবকের রুশদের নৈতিক জীবন সম্পর্কেই উচ্চ ধারণা ভেঙে চুরমার। স্বামী থাকতেও এক বিদেশি যুবকের সঙ্গে প্রেমে ডুবে যাওয়া— লেনিনের সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ায় এ–ও কি সম্ভব?‌ এ তো ক্যাপিটালিস্ট আমেরিকায় শুধু ঘটে।’‌
প্রেমের কারণে রুশ ভাষা বলতে পড়তে শেখা যুবকটির ঠিকানা নানা জায়গা ঘুরে শেষ পর্যন্ত ঠিকই জোগাড় করলাম। রুশ ভাষার চিঠি শুনেই ভদ্রলোক খেপে গেলেন। অনেক বুঝিয়ে–সুঝিয়ে চিঠিটা তাঁর হাতে দিয়ে তাঁর বিরক্ত মুখের দিকে উদগ্রীব হয়ে চেয়ে রইলাম। চিঠিটার আগাগোড়া পড়ে শুধুই বললেন, ছেনাল রুশ মেয়েদের কথা আমার কাছে তুলবেন না কখনও।
গালিনার দেওয়া আয়নাটার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। একদিন হঠাৎই মনে পড়ল। বের করে ভাল করে নেড়েচেড়ে দেখি, শুধু ফ্রেমেই না, আয়নার পিঠেও সেই গুঁড়ো গুঁড়ো কাচের মতো উরাল পাহাড়ের পাথরের চাঁছের কুচি ছড়ানো। ভাল করে নজর করে অবাক হয়ে গেলাম। কুচি কুচি পাথর চাঁছ দিয়ে সামান্য উঁচুনিচু করে একটা নারীর মুখ জীবন্ত করে তোলা হয়েছে। আরও আশ্চর্যের, মুখটার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে মনে হল, এ তো গালিনার মুখ!‌ সেই লম্বা লম্বা চোখের পাতা ভুল হবার নয়।
আয়নাটার সামনের দিকেও খুঁজতে থাকি, যদি এখানেও থাকে কিছু। আশ্চর্য যে আমার মুখ আয়নায় দেখাই যাচ্ছে না। এদিক– ওদিক ঘুরিয়েও সামনের কোনও কিছুর প্রতিবিম্ব আয়নায় ফুটল না। তার বদলে সেখানে ক্ষুদ্রাকারে উরাল পাহাড়শ্রেণি, তার পাদমূলে শ্যামলিমা, তারও সামনে আরও ঝাপসা ভেড়ার পাল!‌ চেয়ে থাকতে থাকতে ভেড়ার পালের মধ্যে ইউক্রেনের চিরাচরিত কস্টিউমে সাজা গালিনা!‌ মনে হয় যেন গান গাইছে। হয়তো ওদের কোনও ফোক সং, হয়তো সেই সন্ধ্যার সেই তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবহ গানটি।
যদি ধারটার করে কিছু টাকা জোগাড় করতে পারি, সেই আশায় ভিসার খোঁজ নিয়ে জানলাম সোবিয়েত রাশিয়ায় একা কোনও ট্যুরিস্টকেই ভিসা দেওয়া হয় না। কোনও ট্র‌্যাভেল এজেন্সির সঙ্গে গ্রুপ ট্যুরের জন্যই শুধু ভিসা পাওয়া গেলেও যেতে পারে।
এরপর কমিউনিজম ও রুশ প্রজাতন্ত্রের পতনের ফলে ইউক্রেন আগের মতোই আলাদা, স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার খবর কাগজে টিভিতে দেখি আর ভাবি এবার অন্তত একবার গালিনার দেশে যাবই। গালিনাকে খুঁজে বের করব। খুঁজতে হবে তার দেওয়া আয়নার উরাল পাহাড়শ্রেণি, তার পাদমূলে শ্যামলিমা, তারও সামনে আরও ঝাপসা ভেড়ার পাল, তার মধ্যে ইউক্রেনের চিরাচরিত পোশাকে গালিনা, সে যেন গেয়ে চলেছে সেই তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবহ গানটি।‌‌ ■

ছবি: দেবব্রত ঘোষ।

জনপ্রিয়

Back To Top