অভিজিৎ দাশগুপ্ত:এ কী ধরনের গোলা!‌ দিনের বেলায় যখন ছুটে আসে, প্রায় দেখাই যায় না। রাত্তির হলেই বদলে যায় রূপ। সাঁই–সঁাই শব্দ করে আগুন রঙের গোলাগুলো উড়ে আসে। কোনওটা কেল্লার ওপর দিয়ে ভেসে যায়, কোনওটা দেওয়ালে আছড়ে পড়ে ভীষণ শব্দে। ঝঁাসি শহর আর রানির কেল্লায় একেবারে হাহাকার পড়ে গেছে। ‌শহরের সব মানুষ মনে করছিল, এখুনি আমার ওপর এসে পড়বে গোলা। কিন্তু প্রায়শই সে গোলা পড়ত সাত–‌আটশো গজ তফাতে। দিন নেই রাত নেই অনবরত উড়ে আসছে পঞ্চাশ–ষাট সেরের গোলা। মানুষ মারছে। ইমারত ধ্বংস করছে। টানা পাঁচদিন–ছয়দিন একই অবস্থা।
কেল্লা দখলের অভিপ্রায় নিয়ে ইংরেজ সেনাপতি স্যার হিউ রোজ ১৮৫৭–‌র ২১ মার্চ ঝাঁসির উপকণ্ঠে এসে পৌঁছন। সঙ্গে বিশাল সৈন্যদল আর গোলন্দাজ বাহিনী। এসে কিন্তু তৎক্ষণাৎ আক্রমণ করলেন না। গোটা দিন ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন শহরের স্থিতি আর দুর্বলতা। দূর থেকে নজর করতে লাগলেন কেল্লার গঠন আর কাঠামো। কোন কোন অঞ্চল থেকে মোক্ষম আঘাত করা যায়, হিসেব কষে নিয়ে সেখানে বসালেন দূরপাল্লার তোপ। রুদ্ধ করে দিলেন বাইরে থেকে ঝাঁসিতে ঢোকার সমস্ত রাস্তা। শহরের উপান্তে কয়েকটা টিলার মতো উঁচু ঢিবি ছিল। ঠেলে তোলা হল মর্টার আর কামান। জড়ো করা হল পঞ্চাশ–ষাট সেরের অসংখ্য গোলা। ভাগে ভাগে বিন্যস্ত করা হল বিশাল সেনাদল। প্রতিটি বিভাগের মধ্যে বার্তা বিনিময়ের জন্য‌ বসানো হল তার–যন্ত্র। আরেকটি উঁচু টিলার ওপর চটপট তৈরি হয়ে গেল স্তম্ভ। তার মাথায় বসল দূরবিন। যাতে কেল্লার ভিতরে কী চলছে, স্পষ্ট দেখা যায়। এইভাবে নিজেদের প্রস্তুত করে স্যার রোজ অপেক্ষা করতে লাগলেন ব্রিগেডিয়ার স্টুয়ার্টের জন্য। টিলার মাথায়, অবজারভেটরির গা ঘেঁষে বসে গেল অস্থায়ী অফিস।
২২ তারিখ চন্দেরি থেকে বিশাল বাহিনী নিয়ে এসে পড়েন স্টুয়ার্ট। পরদিন শুরু হয় প্রকাশ্য যুদ্ধ। ঝঁাসির রানি লক্ষ্মীবাইও কিন্তু বসে ছিলেন না। ইংরেজদের সঙ্গে নানাভাবে সদ্ভাব বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। মিত্রতা স্থাপনের প্রস্তাব দিয়ে এক সর্দারকে পাঠিয়েছিলেন ব্রিটিশ শিবিরে। ইংরেজরা সেই সর্দারকে গ্রেপ্তার করে ফঁাসিতে ঝোলায়। অপমানিত রানি আর উপায় না দেখে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন। জীর্ণ কেল্লার সংস্কার করালেন। কৌশলী অবস্থান দেখে তোপ বসালেন। অবশেষে যখন যুদ্ধ শুরু হল, ঝঁাসির বাহিনীর পরাক্রমের সামনে দঁাড়াতেই পারল না গোরা সেনাবাহিনী। কিন্তু সংখ্যায় ইংরেজরা এত বেশি ছিল যে, কখনও এরা এগোয়, কখনও ওরা। নিজের বাহিনীকে রানি জানিয়ে দিয়েছিলেন, যুদ্ধক্ষেত্রের সম্পূর্ণ দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধেই নিচ্ছেন। অতএব কারও কোনও চিন্তা নেই। বেশ কয়েকদিন এইভাবে চলার পর অবশেষে ৩১ মার্চ দুর্গের দখল নিল কয়েক সহস্র গোরা সেনা। তাদের রণকৌশলের কাছে হার মানতে হল রানির বাহিনীকে। রানি কী করে যেন কেল্লার গোপন রাস্তা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
এর তিন মাস পর জুন মাসে আবার যোদ্ধার বেশে ফিরে এসেছিলেন রানি। তাঁর সমরসঙ্গী তখন‌ তাঁতিয়া টোপি। রণাঙ্গন ততদিনে বদলে গেছে। এ শহরের নাম গোয়ালিয়র। বিদ্রোহী সিপাহি আর পলাতকা লক্ষ্মীবাইয়ের সন্ধান করতে করতে স্যার হিউ রোজ গোয়ালিয়রের লাগোয়া মুবারের ছাউনিতে হাজির। তাঁতিয়া ইংরেজদের পথরোধ করতে সেনাদল নিয়ে এগোলেন। ঘণ্টা দুয়েক চলল প্রবল যুদ্ধ। কিন্তু এতকিছুর পরেও মুবার দখল করে নিল দুর্দমনীয় ইংরেজবাহিনী।
এবারে আসরে নামলেন ‌স্বয়ং রানি। পুরুষ যোদ্ধার বেশ ধরে অশ্বারোহী রানি বিদ্যুতের বেগে ছুটে বেড়াতে লাগলেন গোরা সেনাদের মধ্যে। তাঁর তলোয়ারের আঘাতে মারা পড়ল বেশ কয়েকজন ইংরেজ সেনা। এইভাবে তিনদিন যুদ্ধ চলার পর ঘনিয়ে আসে তাঁর শেষ সময়। রানির দাসি মুন্দরাকে তরোয়ালের কোপ মেরেছিল এক গোরা সেনা। আর্তনাদ কানে যেতেই ঘোড়া ঘুরিয়ে আততায়ীকে এক কোপে শেষ করলেন লক্ষ্মীবাই। তারপর আবার ছোটালেন ঘোড়া। এক ইংরেজ যোদ্ধা তাঁকে অনুসরণ করছিল। কিন্তু রানির তেজি ঘোড়ার সঙ্গে এঁটে ওঠা যাচ্ছিল না। দুর্ভাগ্য, সামনে একটা নালা দেখে থমকে দাঁড়াল ঘোড়া। পিছন থেকে এসে পড়ল গোরা অশ্বারোহী। কিছুক্ষণ মরণপণ যুদ্ধ। আচমকাই এক আঘাত এসে পড়ে রানির মাথায়। করোটি ভেঙে দু’‌ফাঁক হয়ে গেল মাথার ডানদিক। ঠেলে বেরিয়ে এল একটা চোখ। প্রচণ্ড আক্রোশে তরোয়াল চালালেন লক্ষ্মীবাই। ছিটকে গেল আততায়ীর মাথা।
ওই অবস্থায় কতক্ষণ মাটিতে পড়েছিলেন রানি, তা জানা যায় না। অবশেষে তাঁকে ধরাধরি করে স্থানীয় সাধু গঙ্গাদাস বাবাজির কুটিরে নিয়ে এল রানির কয়েকজন একনিষ্ঠ সেবক। সেখানে ততক্ষণে পৌঁছে গেছেন লক্ষ্মীবাইয়ের পরম–‌প্রিয় দত্তকপুত্র দামোদররাও। এই দত্তক‌পুত্রকে ঝাঁসির সিংহাসনের উত্তরাধিকার দিতে না চাওয়াতেই ইংরেজদের সঙ্গে এত লড়াই। চোখ ঠেলে বেরিয়ে এসেছে, সমস্ত মুখমণ্ডল রক্তাক্ত। অক্ষত চোখ ঘুরিয়ে অশ্রুসজল প্রিয় পুত্রের দিকে একবার চাইলেন রানিসাহেবা। বাবাজি তাঁর মুখে একটু একটু করে ঢেলে দিচ্ছিলেন গঙ্গাজল। বারদুয়েক ঢোক গেলার পর নিঃশব্দে তাঁর শরীর ছেড়ে বেরিয়ে গেল প্রাণবায়ু। ব্রিটিশ ভারতের প্রথম স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হল বহুকালের মতো। ■

জনপ্রিয়

Back To Top