জয় গোস্বামী: লকডাউনে যখন সবাই গৃহবন্দি, তখন রবিবাসর–এর সম্পাদক জানতে চেয়েছেন আমি, এই ব্যক্তিমানুষটি, সারা জীবন কবিতাবন্দি হয়ে আছি কিনা। এ–বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা ও ধারণা কী, সে–সম্পর্কে একটি লেখা প্রস্তুত করতে বলেছেন সম্পাদক।
‘কবিতাবন্দি’ শব্দটি সম্পাদকের মুখ থেকে যখন আমার কানে এল, তখন থেকে নানা ধরনের ভাবনার জাগরণ শুরু হল আমার মনে। সত্যিই তো, ১৩ বছর বয়সে প্রথম কবিতা লিখি, ১৯ বছর বয়সে আমার কবিতা প্রথম বেরোতে শুরু করে লিটল ম্যাগাজিনসমূহে, আর এখন আমার ৬৬ বছর বয়স চলছে— এখনও তো কবিতা লেখার চেষ্টা করে চলেছি— তাহলে তো এক হিসেবে আমার জীবন কবিতা দ্বারা বন্দিই বলা যায়।
অথচ, কবিতা রচনা করতে পারলে তো একরকম মুক্তি ঘটে। আমি যখন কবিতা লিখি তখন পরপর কবিতা আসতেই থাকে। দ্রুত কয়েক দিনের মধ্যে একগুচ্ছ কবিতা লেখা হয়ে যায়— যার ওপর আমার প্রায় কোনও হাত থাকে না, নিয়ন্ত্রণ থাকে না, প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সম্পন্ন হয় এইসব কবিতাগুচ্ছের লিখনক্রিয়া। কয়েক সপ্তাহ পর সেই কবিতাগুচ্ছ নিয়ে নতুন করে পুনর্বার বসি। তখন চলে প্রতিটি কবিতা ধরে ধরে সংশোধনের কাজ। সে–সময় এক মুক্তির স্বাদ পাই আমি।
‘মুক্তির স্বাদ পাই আমি’ এই বাক্যটি লিখেই কয়েকটি জরুরি কথা মনে পড়ল, যা বলা একান্তই দরকার। আমার একদম প্রথম যৌবনে যে সব বইয়ের সংস্পর্শে আসি তার মধ্যে একটি কবিতাগ্রন্থের নাম: ‘আমি কীরকমভাবে বেঁচে আছি’।‌ বইটির রচয়িতা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সেই বইয়ের আরম্ভে ছোট একটি ভূমিকা ছিল। সে–ভূমিকায় নিজের সম্পর্কে কবির উক্তি ছিল এইরকম: ‘এ জীবন, সজ্ঞানে, আত্মত্যাগে নয়, সর্বগ্রাসে, সর্বভূক কবিতার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।’ আমার মনের মধ্যে ধারালো আলোর ফলার মতো এই লাইনগুলি ঢুকে এসেছিল। আর, ‘আমি কীরকমভাবে বেঁচে আছি’, এই গ্রন্থনাম আমার পরবর্তী জীবনে প্রায় পথনির্দেশক একটি তীরচিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ ‘আমি’ যেরকমভাবে বেঁচে রয়েছি সেই বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতাই আমাকে দিয়ে কবিতা লিখিয়ে নিক, এই ছিল আমার মনের প্রাথমিক গন্তব্য।
‘প্রাথমিক’ কথাটা বলা ভুল হল। বলা উচিত আমার প্রথম জীবন থেকে আজ পর্যন্ত আমি কেবল আমি কীরকমভাবে বেঁচে আছি সে–কথাই লেখার চেষ্টাটুকু জারি রেখেছি। সর্বভূক কবিতার জন্য আজও, এখনও রোজ প্রস্তুত হচ্ছি আমি। এই যে বললাম প্রস্তুত হচ্ছি আমি— এই ‘আমি’ বস্তুটা ঠিক কী? কীরকম? অন্তত আমার নিজের কাছে? বাইরের জগতের মানুষ, বা যাকে বলে সমাজ–সংসার, আমাকে নিয়ে কী কী ভাবছে বা ভাবতে পারে সে–চিন্তাকে কোনও দিনই অগ্রাধিকার দিইনি। কিন্তু আমার অনুভবের মধ্যে এই ‘আমি’ জিনিসটা নানারকম গোলমাল তৈরি করে রেখেছে। এক এক করে বলি।
একটা নির্দিষ্ট নাম ধরে ডাকলে আমি সাড়া দিই। সেটা একটা ‘আমি’। সেই ‘আমি’‌র নামের নীচে বিশেষ একটি ঠিকানা লেখা থাকলে চিঠি বা বুকপোস্ট পৌঁছোয় আমার কাছে। অর্থাৎ বিশেষ একটি বাসস্থানে এই ‘আমি’ বসবাস করে। এই ‘আমি’ বিশেষ একজন মহিলাকে ‘আমার স্ত্রী’ বলে পরিচয় দেয় এবং এক তরুণীকে বলে ‘এ আমার মেয়ে’। এই ‘আমি’‌, বিশেষ কয়েকটি কর্মস্থলে যায়। কোনও সভায়, মঞ্চের ঘোষক এই ‘আমি’র নামটি ঘোষণা করলে সেই ‘আমি’ স্টেজে উঠে মাইকের সামনে তার বক্তব্য পেশ করে।
অর্থাৎ বিশেষ একটি নাম, বিশেষ একটি পরিবার, বিশেষ একটি ঠিকানা ও বিশেষ কয়েকটি কর্মস্থল দ্বারা তৈরি এক ঘেরাটোপের মধ্যে এই ‘আমি’র জীবন অবস্থিত বা বন্দি। সেইসব উপাদান ও সে সব সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা যে সেই ‘আমি’ লিখিত কবিতায় বা গল্পে বা উপন্যাসে মাঝে মাঝে ঢুকে পড়ে নিজেদের স্থান করে নেয় না তা কখনওই নয়। সেই বিশেষ ‘আমি’র প্রত্যক্ষ উপস্থিতি সে সব লেখায় দেখা দেয়।
কিন্তু শুধু সেইটুকু দিয়েই কি ‘আমি কীরকমভাবে বেঁচে আছি’ এই পথনির্দেশ তার নিজের কাজ সম্পূর্ণ করে? না।
এই যে আমি বিভিন্ন কর্মস্থলে যাই, রাস্তায় বেরোই, সংবাদপত্র দেখি বা চোখ রাখি টিভির খবরে— তখন অনুভব করি, গর্জমান এক সামাজিক জীবনস্রোত আমার চতুর্দিকে প্রবাহিত হয়ে চলেছে। সেই জীবনস্রোতে অংশ নিচ্ছে বিচিত্র ও বিভিন্ন সব ঘটনা ও চরিত্র। সেইসব ঘটনা ও চরিত্রের নানারকম অভিজ্ঞতা যখন এই বিশেষ ‘আমি’ জানতে পারে, তখন সেই সকল অভিজ্ঞতাই ওই ‘আমি’র জীবনেরও অন্তর্গত হয়ে যায়।
যখনই এমন হয়, তখনই, কবিতা রচনার সময় সেইসব ঘটনা ও চরিত্রসকল কবিতার অংশ হয়ে ওঠে। যেমন ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে জেহানাবাদে, লছমনপুর বাথে নামক গ্রামে ৬১ জন কৃষককে হত্যা করে জমিদার–আশ্রিত রণবীর সেনার দল। সংবাদপত্রে এর বিবরণ প্রকাশিত হয় তিনদিন ধরে। তখন আমি লিখি ‘ন হন্যতে’ নামক দীর্ঘ কবিতা। ২০০২ সালে গুজরাটে রাষ্ট্রসমর্থিত গণহত্যা ও ধর্ষণলীলা অবাধে চলে। প্রধানত মুসলিমধর্ম অবলম্বনকারী নরনারীরাই এর শিকার হন। উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ সাহেবের সমাধি উপড়ে ফেলা হয়। তখন আমি লিখি ‘শান্তিকল্যাণ’ নামক দীর্ঘ কবিতা এবং ‘আজ’ নামক একটি দশ লাইনের কবিতা, যার শেষ লাইন ছিল এরকম: ‘আমার সমস্ত শিল্প আজ থেকে গণহত্যাকারী’। ২০০৭ সালের মার্চে নন্দীগ্রামে গুলিচালনায় ১৪ জন কৃষক নিহত হন। ধর্ষণ সেখানেও ঘটে। ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে নেতাই নামক গ্রামে তৎকালীন শাসক দলের গুন্ডারা ৭ জনকে হত্যা করে গুলি চালিয়ে, তার মধ্যে এক কৃষকরমণীও ছিলেন, যাঁর নাম সবস্বতী ঘোড়াই। নন্দীগ্রাম ও নেতাই–এর ঘটনাস্থলে কলকাতা থেকে নাগরিক সমাজের একটি দল গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলার জন্য উপস্থিত হন। সেই দলে আমিও ছিলাম। নেতাইয়ে কংসাবতীর তীরে সাতটি কালো পোড়া চিতাশয্যা দেখে আসি নিজের চোখে। দেখি দেওয়ালে গুলির দাগ, সেখানে সরস্বতী ঘোড়াই–এর একটি লম্বা চুল আটকে আছে। ২০০৭ এবং ২০১১ সালে আমার দুটি ক্ষুদ্রাকার কবিতার বই প্রায় সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ পায় যে–বইদুটির নাম যথাক্রমে ‘শাসকের প্রতি’ এবং ‘হার্মাদ শিবির’।‌ প্রথমটিতে ছিল ৩৭টি কবিতা, দ্বিতীয় বইয়ে ২৭টি।
এই যে জেহানাবাদ, গুজরাট, নন্দীগ্রাম ও নেতাইয়ে যাঁরা নিহত হলেন তাঁদের পরিজনবর্গের মর্মবেদনা কি আমি অনুভব করতে পেরেছিলাম? নন্দীগ্রাম ও নেতাইয়ে গিয়ে নিহতদের, পরিজনদের সঙ্গে, ধর্ষিতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পেলেও আমি কি অনুভব করেছিলাম তাঁদের মানসিক অবস্থা? না। আমি কেবল অসহায় বোধ করেছিলাম। কবিতা লিখে যাঁদের যন্ত্রণা দূর করা যাবে না জেনেও আমি শেষপর্যন্ত কয়েকগুচ্ছ কবিতাই লিখেছিলাম নিরুপায়ভাবে। তবে বুঝেছিলাম আমার স্ত্রী–কন্যা, বাসস্থানের ঠিকানা, বিভিন্ন কর্মস্থল দ্বারা পরিবৃত এই বিশেষ ‘আমি’র একটি মুক্তিলাভ ঘটেছে সাময়িকভাবে। যদি অনুসরণ করতে হয় ‘আমি কীরকমভাবে বেঁচে আছি’ এই পথনির্দেশটিকে, তাহলে তো আমার পড়শি–প্রতিবেশীরা কীরকমভাবে বেঁচে আছে সে সব অবস্থাও আমার বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতার মধ্যে ঢুকে পড়তে বাধ্য। এ সব ক্ষেত্রে তেমনই হয়েছে হয়তো।
আবার অন্য একটি দিকও আছে এই বিশেষ ‘আমি’র। আমার যখন উনিশ বছর বয়স, তখন শঙ্খ ঘোষের একটি কবিতার বই আমার হাতে আসে, যার নাম: ‘আদিম, লতাগুল্মময়’। সে–বইয়ের প্রথম কবিতাটিরই একটি লাইন আমার কাছে ধর্মগ্রন্থের মতো অনুসরণযোগ্য হয়ে ওঠে। লাইনটি হল:‌ ‘‌একা হও একা হও একা হও একা হও একা’। লাইনটিতে কোথাও কোনও যতিচিহ্ন নেই। লাইনের একেবারে শেষ শব্দ ‘‌একা’‌‌র পরেও নেই। ‘‌‌একা’‌ শব্দটিকে লাইনের শেষে চরমতম একাকী রেখে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সেই সময় থেকে আমার মনকে আমি বলে গেছি চরমভাবে একা হতে হবে যদি কবিতা রচনার কাজ আমি চালিয়ে যেতে চাই। এখন যত মানুষের সঙ্গে কথা বলি, যত কর্মস্থলে যাই, যত সভায় উপস্থিত হই— তা একরকম বাধ্য হয়ে। মনের ভিতরদেশে আমি সবসময় একাকিত্বকে বহন করে চলি। কারণ কবিতারচনা শুধু ভাষার অনুশীলন নয়, মনের অনুশীলন। মন–ই কবিতা লেখকের একমাত্র সম্পদ। একমাত্র সম্বল। সেখানে যেন কোনওভাবে বিদ্বেষ এসে না মিশে যায়, মন যেন কখনও অপরের ত্রুটিসন্ধানী হয়ে না ওঠে। যেন কোনও নিন্দার প্রত্যুত্তর দিতে উদ্যত না হয়। সে–বিষয়ে সতর্ক থাকার মন্ত্র হল: ‘একা হও একা হও একা হও একা হও একা’।‌‌‌
মনকে ‘একা’ রাখতে পারলে কীরকম অভিজ্ঞতা হয় তা জানানো দরকার। ১৯৮৭ সালে সংবাদপত্রে পড়লাম ১০০০ খ্রিস্টাব্দে আমাদের গ্যালাক্সির থেকে অনেক দূরে অবস্থিত একটি মহাকায় তারা বিস্ফোরিত হয়। যাকে বলে সুপারনোভা এক্সপ্লোশন। পৃথিবীর গ্রাহকযন্ত্রে সেই বিস্ফোরণের তরঙ্গ এসে ধরা দেয় ৯৮৭ বছর পর। জানা যায়, ওই ১০০০ খ্রিস্টাব্দে নাকি চীনদেশের আকাশে অকস্মাৎ একটি তারা ২৩ দিন ধরে জ্বলে থাকে— তারপর ধীরে ধীরে দীপ্তি হ্রাস হয় তার, শেষে মিলিয়ে যায়। সেই তারার উজ্জ্বলতা এতটাই বেশি ছিল যে, তাকে চন্দ্রালোকের চেয়েও জ্যোতির্ময় বলে উল্লেখ করা আছে চীনদেশের প্রাচীন পুঁথিপত্রে। 
এই খবর যখনই জানতে পারলাম তখনই আমার আয়ু যেন পিছনের দিকে ৯৮৭ বছর বেড়ে চলল। যুক্ত হয়ে গেল সেই সুপারনোভা এক্সপ্লোশনের সঙ্গে। ১৯৯৮ সালে মহাকাশবিজ্ঞানী ড. সোমক রায়চৌধুরি একটি প্রবন্ধ লিখলেন, যে–প্রবন্ধে বলা হল— ১২০০ কোটি বছর আগে এই ব্রহ্মাণ্ডের একেবারে একটি প্রান্তদেশে দুটি নিউট্রন তারার মধ্যে বিরাট সঙ্ঘর্ষ ঘটে এবং তারা দুটি একে অপরের মধ্যে মিশে যায়। বিজ্ঞানী জানালেন তাঁর লেখায়, যে, সেই বিস্ফোরণে মাত্র ২০ সেকেন্ডে যতখানি শক্তি বেরিয়ে এসে মহাকাশে আছড়ে পড়েছিল, আমাদের এই মিলকিওয়ে গ্যালাক্সির সমস্ত তারা, অর্থাৎ ১ হাজার কোটি তারা মিলে যদি সেই শক্তির উৎপাদন ঘটাতে চায়, তাহলে, এই ১ হাজার কোটি তারার সময় লাগবে দুই শতাব্দীকাল। ১২০০ কোটি বছর মহাকাশে পাড়ি দিয়ে সেই গামারশ্মির এক জোরালো ঢেউ এসে আঘাত করে মহাশূন্যে স্থাপিত স্পেস স্টেশনের রাডারে। সেই গামারশ্মির ঝলককে বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, এই সঙ্ঘর্ষ যদি আমাদের গ্যালাক্সির আরও একটু নিকটে ঘটত তাহলে আমাদের এই গ্যালাক্সি একেবারে ভেঙেচুরে অন্যরকম চেহারা নিত। বিজ্ঞানীরা এখনও পর্যন্ত এই ক্রমপ্রসারমান ইউনির্ভাসের আয়তন যা মাপতে পেরেছেন তা হল ১৪ হাজার বিলিয়ন আলোকবর্ষ। তার পরেও কিছু থাকতে পারে কিন্তু বিজ্ঞানীরা এই পর্যন্ত মাপতে পেরেছেন বলে সোমক রায়চৌধুরি জানান। সেই ইউনিভার্সের দূরতম এক স্থানে দুটি নিউট্রন তারার সঙ্ঘর্ষ ঘটেছিল ১২০০ কোটি বছর আগে। 
১২০০ কোটি বছর? আমাদের এই পৃথিবী নামক গ্রহটির বয়স ৪৫০ কোটি বছরের একটু বেশি বা কম। তার মানে পৃথিবীর সৃষ্টি হওয়ারও প্রায় সাড়ে ৭০০ কোটি বছর আগে ঘটেছিল এই বিস্ফোরণ। 
যুধিষ্ঠিরকে যক্ষরূপী বক জলপান করতে যাওয়ার আগে যে–‌পাঁচটি প্রশ্ন করেছিল, তার একটি হল বায়ুর চেয়েও গতিশীল কী?
যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, চিন্তা। 
এখন কথা হচ্ছে, চিন্তা করে কে? চিন্তা করে মন। 
এই ‘একা হও একা’ কবিতামন্ত্রটি আমার মনকে ‘একা’ রাখতে অবিরল চেষ্টায় প্রেরণা দিয়ে এসেছে বলেই হয়তো আমার মন চলে যেতে পারে পিছনের দিকে, ১২০০ কোটি বছর পিছনের দিকে বেড়ে চলে আমার বয়স। এই বিশেষ দুটি নিউট্রন তারার সঙ্ঘর্ষ ও তার প্রতিক্রিয়া এবং তার বিবরণ যখন এসে পৌঁছল আমার লেখায় তখন আমাকে আর ‘বন্দি’ বলার অবকাশ রইল না। মনে মনে ‘একা’ হওয়ার অনুশীলন যদি চালিয়ে না যেতাম তাহলে এই অকল্পনীয় অনন্তের মধ্যে আমার মুক্তি দেওয়ার অভিজ্ঞতাটিই ঘটত না।
আমার ২৮ বছর বয়সে আমি শঙ্খ ঘোষের একটি প্রবন্ধে কয়েকটি লাইন পড়েছিলাম, যা এইরকম: ‘এই একটা সময়, যখন আরো বেশি ব্যক্তিগত সাহসের দরকার হল কবির, আরো বেশি ব্যক্তিগত আড়াল থেকে আজ ধরতে হবে মহাসময়ের জটকে, আত্মবিলোপে নয়, সর্বস্বজোড়া আত্মোদ্‌ঘাটনে।’ 
এই ‘সর্বস্বজোড়া আত্মোদ্‌ঘাটন’ আসলে কী বস্তু তার একটি পরিচয় আমি লাভ করি যখন ১২০০ কোটি বছর পিছনের দিকে উড়ে চলে আমার বয়স এবং মন, যা বাতাসের চেয়েও দ্রুতগামী, সেই মন যখন আমাকে সংযুক্ত করে দেয় মহাজগতের সঙ্গে, আকাশের সঙ্গে, ব্রহ্মাণ্ডের ক্রমপ্রসারণের সঙ্গে। সেই হল আরেকরকম মুক্তি, বন্দিত্বের থেকে। লেখার মাধ্যমেই আসে এই মুক্তি। 
উস্তাদ বিলায়েত খানকে একটি ইন্টারভিউয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল: কামইয়াবি কেয়া হ্যায় খান সাব? এর উত্তরে বিলায়েত খান বলেছিলেন: ‘রেওয়াজ, রেওয়াজ, রেওয়াজ। সাধ্‌না, সাধ্‌না, সাধ্‌না। সোচ্‌, সোচ্‌, সোচ্‌। ঔর উসকি ইমপ্লিফিকেশন হোতা হি চলা যায়ে ওহি মজা হ্যায়।... ইয়ে হি কামইয়াবি কেয়া কম হয় কে মরে দম পর বোঁলু কে ইয়ার ম্যায় কামাইয়াব হো সকা ইয়া না হো সকা লেকিন সারি জিন্দগি জং তো করতা হি চলা গয়া।’...
ইউটিউবে এই সাক্ষাৎকারটি দেখে আমার এ প্রৌঢ় বয়সে আমি মনে সাহস পাই। কারণ এখনও পর্যন্ত আমি আমার কবিতার কোনও সুপরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট ভাষাপথ খুঁজে পাইনি। কেবলই খুঁজে চলেছি বইয়ের পর বই ধরে। বিলায়েত খান বলছেন: সোচ্‌, সোচ্‌, সোচ্‌। অর্থাৎ রাগ সম্পর্কে, স্বর সম্পর্কে অবিরল চিন্তা করে যাওয়া। যাতে মৃত্যুর সময় একজন সুরশিল্পী বলতে পারেন ‘আমি সফলতা পেয়েছি কি পাইনি সেটা বড় কথা নয়, আমার সাধনা আমার যুদ্ধ আমার অনুশীলন তো আমি চালিয়ে গেছি সারা জীবন ধরে। কবিরও একই পথ। চিন্তা। শব্দ নিয়ে চিন্তা। ছন্দ নিয়ে চিন্তা। ভাষা নিয়ে চিন্তা। কবিতার অন্তর্বস্তু নিয়ে চিন্তা। কনস্টান্টাইন কাবাফি নামক একজন গ্রিক কবি বলেছিলেন: ‘দ্য পোয়েট হু নোজ্‌ হিজ্‌ অডিয়েন্স ইজ্‌ লিমিটেড, হি ক্যান এনজয় ট্রিমেনডাস ফ্রিডম ইন হিজ্‌ রাইটিং।’ অস্বীকার করব না কোনও কোনও কবিতার বই লেখার সময় আমিও সেই ‘ট্রিমেনডাস ফ্রিডম’–এর অনুভব লাভ করেছি। সে সব বই হয়তো পাঠক তেমনভাবে গ্রহণ করেননি, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনও কবিতাগুচ্ছের লিখন–অবস্থায় আমি একবারও পাঠকের কথা চিন্তা করার অথবা পাঠক কী ভাবতে পারেন এ–কবিতা হাতে পেলে এ সব ভাবার অবসর পাইনি। কারণ কবিতা লেখার সময় উপযুক্ত ভাষা খোঁজার চেষ্টা আমার মনকে এমন তোলপাড় করতে থাকে, ভাষাসন্ধানে এতখানি দিশেহারা তথা ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে, সেই কবিতাগুচ্ছ সম্পূর্ণ করার চেষ্টাতেই আমার সমস্ত অভিনিবেশ, সমস্ত অন্তঃসারকে ব্যয় করতে হয়। অন্যের কথা চিন্তা করব কখন? এ কথা বলতেই হবে, কবিতা লেখার সময়, মাঝে মাঝে, একরকম উত্তাল স্বাধীনতার আনন্দ আমাকে বিপুলভাবে তরঙ্গায়িত করে তুলেছে। যেমন ‘সূর্য–পোড়া ছাই’ বা ‘মৌতাত মহেশ্বর’ অথবা ‘হরিণের জন্য একক’ বইগুলি লেখার সময় ঘটেছিল। 
তাই আমার জীবন কবিতাবন্দি নয়। বরং ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, কর্মস্থল ও সভাসমিতির জীবন থেকে অনেকবার আমাকে স্বাধীন করে দিয়েছে আমার কবিতা লেখার চেষ্টা, আমার অনুশীলন। এখনও, এই ৬৬ বছর বয়সেও, গন্তব্য পুরোপুরি অনিশ্চিত জেনেও, আমি সেই অনুশীলনই চালিয়ে যাচ্ছি।‌ 

জনপ্রিয়

Back To Top