একসময়ে বাঘ–শিকারের নামে নৃশংসতার উৎসব চলত। সেই উৎসব ছিল জঙ্গলে ঢুকে একের বিরুদ্ধে একশো জনের যুদ্ধ। নির্বিচারে বাঘ হত্যা করা ছিল ক্ষমতা, বীরত্ব, সাহসের প্রতীক। গুলি করে, খুঁচিয়ে, পিটিয়ে বাঘ মেরে বুকফুলিয়ে থাকাটাই ছিল শিকারির গর্ব। ভাবতেও লজ্জা হয়। বাঘ নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে, কিন্তু আজও সেই নিষ্ঠুরতা রয়ে গেছে মানুষের জিনে। বাঘ জনবসতিতে ঢুকে পড়লে তাকে হত্যার ভয়ঙ্কর আনন্দে মানুষ মেতে ওঠে। আমাদের দুর্ভাগ্য জিম করবেটের মতো কেউ আর এদেশে নেই। করবেট থাকলে কিছুতেই এভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করে লোকলশকর নিয়ে বাঘ মারতে দিতেন না। রুখে দিতেন ব্যাঘ্রনিধন। রক্ষা পেত ‘‌অবনী’‌রা। বাঘ–শিকারের পাশাপাশি বাঘ–ভালবাসার গল্প শোনালেন সমীরকুমার ঘোষ

ব্যাঘ্র বা শার্দূল–‌এর মতো ওজনদার শব্দের দরকার নেই। ‘‌বাঘ’ শব্দটা শুনলেই কেমন অদ্ভুত অনুভূতি‌, রোমাঞ্চ হয়। হওয়াটাই স্বাভাবিক। এমন একই সঙ্গে শক্তি, সৌন্দর্য, সাহস আর বুদ্ধির সুচারু মিশ্রণ আর কোন প্রাণীর মধ্যে ঘটেছে! সুন্দরবনে টাইগার রিজার্ভের এক অফিসার একবার একটা বাঘকে ৯০ কিলোর এক দাঁতালকে কাদা ও জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মাইলখানেক টেনে নিয়ে যেতে দেখেছিলেন। ধৈর্যের পরীক্ষায় বাঘ হার মানাতে পারে যে কোনো মানুষকে। মাইলের পর মাইল ডাঙা দিয়ে নৌকোর সমান্তরালভাবে চলতে চলতে নজর রাখে। তারপর একসময় নিঃশব্দে সাঁতরে হানা দেয়। ঘুমন্ত দুই জেলের একজনকে নৌকোয় উঠে তুলে নিয়ে যায়, অন্যজনে টের পায় না। প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে ওঠার জন্য ওরা অসম্ভব বুদ্ধি ধরে। কোনো রকম জানান না দিয়ে মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে শিকার করে জঙ্গলে উধাও হয়ে যায়। সামান্য ঝোপঝাড়েও নিজেদের লুকিয়ে ফেলতে পারে। স্থানীয় মানুষের কাছে তাই ওরা ‘‌চলমান অশরীরী’, কিম্বা দক্ষিণ রায় বা কালু মিঞা। অনুসরণকারী বাঘা শিকারীকেও কীভাবে পাকদণ্ডীতে ফেলে ঘায়েল করে, সে গল্প অনেকেরই জানা। এই কারণেই কাউকে বাঘ বলার দরকার নেই, ‘‌বাঘের বাচ্চা’‌ বললেই তার বুকের ছাতি ফুলে একসা হয়। লড়াই, এমনকি খেলাতেও প্রতিপক্ষের ওপর আমরা ‘‌বাঘের মতো’‌ ঝাঁপিয়ে পড়ি। ‘‌ব্যাঘ্রবিক্রম’‌ প্রিয় বীরত্বব্যঞ্জক শব্দ।
এহেন বাঘের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের রসায়ন বিচিত্র। তাকে ভয় পাই, সমীহ করি, আবার একই সঙ্গে ভালওবাসি। সে গল্প–‌কবিতায় হয়ে ওঠে আমাদের প্রিয় ‘‌বাঘমামা’‌। হিতোপদেশের গল্পে আকচার এসেছে বাঘ। সে বাঘ নিরীহ, বোকা। তাকে শিয়াল যখন–‌তখন বোকা বানায়। শিশুদের সঙ্গে মধুর সম্পর্ক গড়ে তুলতে ‘‌এক যে ছিল বাঘ, তার গায়ে ডোরা দাগ।/‌ লক্ষ্মীসোনা ছেলে এমন কেউ বকে না, কেউ মারে না, কেউ করে না রাগ।’ বলে গান বাঁধি। কখনও বাঘের ঘরে অনধিকার প্রবেশ করে ‘‌পায়ে পড়ি বাঘমামা, কোরো নাকো রাগ মামা, তুমি যে এ ঘরে কে তা জানত!‌’ বলে‌ ক্ষমা চেয়ে নিই। ‘‌জঙ্গল এর নাম জঙ্গল/‌ জানোয়ার আছে এক দঙ্গল/‌ বাঘমামা ধারেকাছে আমাদের বসে আছে/‌ ঘাড়ে এসে পড়বে ধপ করে/‌ দুটোকেই গিলে নেবে গপ করে।’,‌ এমন কৃত্রিম ভয়মিশ্রিত রসিকতা করতেও বাধে না। এমনকি শিবরাম চক্রবর্তীর ‘‌আমার বাঘ শিকার’‌ বা ত্রৈলোক্যনাথের ডমরুধরের বাঘ শিকার–‌এ রয়েছে নির্মল আনন্দ।
এত কিছু সত্ত্বেও কী এমন হয়, যে বাঘ মারার জন্য আমাদের হাত নিশপিশ করে ওঠে! এটা সবাই জানে, শিকার করা বাঘের নিতান্তই জীবন–‌জীবিকার প্রশ্ন। করবেট উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জঙ্গল চষে, একাধিক মানুষখেকোর মোকাবিলা করে বুঝেছিলেন, জঙ্গলে স্বাভাবিকভাবে শিকার করতে না পারলে বাঘ সহজ শিকার হিসাবে বেছে নেয় মানুষকে। কারণ খালিহাতের মানুষ বাঘের সামনে সম্পূর্ণ অসহায়। এমনকি হাতে বন্দুক থাকলেও সবসময় যে খুব ফারাক পড়ে এমন নয়। একটা শিকার করতে পারলে তার অন্তত সাতদিনের খোরাক নিশ্চিত। সুযোগসন্ধানী বাঘও আছে। শীতে বা গরমকাল পড়ার মুখে শিকারে বেরোয়। সুন্দরবনের নোনাজল সেখানকার বাঘকে নরখাদক করে তোলে কিনা তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা চলছে। কিছুদিন আগেই লালগড়ে ঢুকে পড়া এক বাঘকে নৃশংসভাবে মারা হয়েছে। আর উত্তরপ্রদেশে ‘‌অবনী’‌কে হত্যা করার জন্য রীতিমতো এক কর্মযজ্ঞেরই আয়োজন করা হল। যা করার আদৌ দরকার ছিল না। সারা দেশে সঙ্গত কারণেই নিন্দার ঝড় উঠেছে। মানেকা গান্ধী ওখানকার বনমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন। এ খবর সবার জানা।
বাঘশিকার নতুন কিছু নয়। এক সময় রাজারাজড়াদের প্রিয় বিনোদনই ছিল শিকার। বিশেষত বাঘ। সারা দেশে কত যে বাঘ তাদের হাতে মারা পড়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। আমরা ব্রিটিশদের উঠতে–‌বসতে গালি দিই। কিন্তু এক ব্রিটিশই আমাদের শেখালেন, বাঘ মারা কোনো বিনোদন হতে পারে না। প্রকৃতিতে তাদেরও বাঁচার অধিকার আছে, তারাও মানুষের ভালবাসা পেতে পারে। তিনি জিম করবেট। বাঘ সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিলেন। ঘটনাচক্রে তাঁকে নিরুপায় হয়ে বেশ কিছু নরখাদক বাঘকে মারতে হয়েছিল। কুমায়ুন, গাড়োয়ালের দীনদরিদ্র কিন্তু সরল, সৎ মানুষদের তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়, বিপদে ত্রাতা। ওঁদের ‘‌কার্পিট সাহাব’‌ ছিলেন দেবতুল্য। মূর্তিমান যমদূত মানুষখেকো বাঘ মেরে হাজার হাজার মানুষকে তিনি ভয়াবহ দিন ও রাতযাপনের অভিশাপ থেকে মুক্ত করেছিলেন। একই সঙ্গে বাঘেদের ‘‌লার্জ হার্টেড জেন্টলম্যান’‌ বলে সম্মান জানাতেও দ্বিধা করেননি। সেই ১৯২৫ সালে তিনি রুদ্রপ্রয়াগের মানুষখেকো চিতাবাঘকে মেরেছিলেন। আজও করবেটের স্মরণে সেখানে বসে মস্ত মেলা।   
করবেট–‌কাহিনীতে ঢোকার আগে বাঘ ও সেকালের বাঘ–‌শিকার নিয়ে একটু আলোচনায় আসা যাক। বিশিষ্ট শিকারী কুমার শ্রীজিতেন্দ্রকিশোর আচার্যচৌধুরী ‘‌অরণ্য–‌বিহার’‌–‌এ বাঘেদের শ্রেণীবিভাগ করেছেন এরকম— ‘‌আমাদের দেশের প্রধান শিকার— ব্যাঘ্র। তাহারা নানাশ্রেণীতে বিভক্ত হইলেও, কতকগুলি বাঘকে গেম–‌কিলার ও কতকগুলিকে ক্যাট্‌ল–‌লিফটার বলে। প্রথমোক্ত শ্রেণীর বাঘগুলি অত্যন্ত স্ফূর্তিবিশিষ্ট;‌ শেষোক্ত বাঘগুলি অপেক্ষাকৃত ধীর। নাগপুর, উত্তর–‌পশ্চিম প্রদেশ প্রভৃতি অঞ্চলে, এমনকি আমাদের এ অঞ্চলেও গজারি বনে ক্যাট্‌ল–‌লিফটার অপেক্ষা গেম–‌কিলার–‌এর সংখ্যাই অধিক। কিন্তু ‘‌হাওড়ে’‌ ও নেপালে ক্যাট্‌ল–‌লিফটার অধিক দেখিতে পাওয়া যায়। গেম–‌কিলার জাতীয় ব্যাঘ্র অপেক্ষা ক্যাট্‌ল–‌লিফটারগুলি অনেক ভারী, আকারেও কিছু বড়। ক্যাট্‌ল–‌লিফটারগুলির আক্রমণ চেষ্টা অপেক্ষাকৃত অল্প, কিন্তু গেম–‌কিলারগুলি খুব উৎসাহের সহিত হঠাৎ আক্রমণ করে। বস্তুত, এই উভয়–‌শ্রেণীর ব্যাঘ্রের আকারগত পার্থক্য এত অল্প যে, সকলে তারা ধরিতে পারে না;‌ এমন কি বহুদর্শী শিকারী ভিন্ন, অন্যলোকে তাহাদের প্রভেদ সহসা বুঝিতে পারে না।
আবার লোপার্ড ও প্যান্থার— এই দুই জাতীয় ব্যাঘ্রের মধ্যেও পার্থক্য আছে। লোপার্ডগুলি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রাকৃতি;‌ তাহাদের স্ফূর্তি অন্ত্যন্ত অধিক;‌ তাহাদের শরীরও অনেকটা হাল্কা— ‘‌চাবুকের মত’ শরীর বলিতে যাহা বুঝায়, সেইরূপ। ‘‌প্যান্থর’‌গুলি অপেক্ষাকৃত ধীর;‌ তাহারা লোপার্ড–‌অপেক্ষা কিঞ্চিৎ বৃহদাকার।’‌‌
শিকার–‌আয়োজন
বাঘ–‌শিকার মানে তখন ছিল বিপুল আয়োজন। একের বিরুদ্ধে বহুর লড়াই। তাতেই বীরত্ব জাহির। বাঘ মেরে তার মুণ্ডুটা বৈঠকখানায় সাজিয়ে রাখা। ছাল এবং মৃত বাঘের গায়ে এক পা রেখে ছবি তুলে দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখা হত। পাঁচজন যাতে বুঝতে পারে, তিনি যেমন–‌তেমন কেউ নন। কুমার জিতেন্দ্রকিশোর জানাচ্ছেন, ‘‌শিকারে যাইতে হইলে, যথেষ্ট সরঞ্জামের আবশ্যক— আয়োজনে কোন ত্রুটি থাকা বাঞ্ছনীয় নহে। শিকারের সময় যে সকল দ্রব্যের আবশ্যক, তাহা সংগ্রহে ত্রুটি হইলে অত্যন্ত অসুবিধায় পড়িতে হয়। শিকারের প্রধান সরঞ্জাম বন্দুক, টোটা। তাম্বু, খাটুলি, বিছানা প্রভৃতিও অপরিহার্য;‌ এতদ্ভিন্ন, যাঁহার যেরূপ খেয়াল ও সখ তদ্রূপ দ্রব্য তাহাকে সঙ্গে লইতে হয়। আমরা শিকারে যাইবার সময় গোটা দশেক তাম্বু সঙ্গে লই;‌ প্রত্যেক তাম্বুতে দুইজন করিয়া বাস করি— কেহ কেহ বা একটি তাম্বু একাকী দখল করিয়া থাকি।.‌.‌.‌ আহার্যসামগ্রীর অভাবে কষ্ট বা অসুবিধা না হয়, এজন্য শিকারে যাইবার সময় আমরা কতক কতক খাদ্যদ্রব্য সঙ্গে লইয়া যাই। লোকালয় হইতে বহুদূরে, দুর্গম গহন কাননের অভ্যন্তরে যেসকল সামগ্রীসংগ্রহ করা কঠিন এবং যথাযোগ্য বন্দোবস্ত সত্ত্বেও যাহা পাইতে অনেক বিলম্ব বা অসুবিধা হইবার সম্ভাবনা, তাহা সঙ্গে লওয়াই কর্তব্য;‌ যথা চা, বিস্কুট, মিহি চাউল, ঘৃত, তৈল, মসলা প্রভৃতি। এসকল সামগ্রী সঙ্গে না লইলে অত্যন্ত অসুবিধায় পড়িতে হয়। উদর বেশ পরিতৃপ্ত না হইলে, শিকারে উৎসাহদান করিবে কে?‌ আবার, সেই দূরদেশে, লোকালয় বিরহিত বিজন বিপিনে, শরীর অসুস্থ হওয়াও বিচিত্র নহে— কোন না কোন দুর্ঘটনা ঘটিতে পারে। সুতরাং সঙ্গে একজন ডাক্তার লওয়া আবশ্যক। যাহা হউক, আমাদের শিকার ‘‌পার্টিতে’‌ (‌দলে)‌ সাধারণত ৪০–‌৫০টি হাতি, খানকুড়িক গরুরগাড়ী লওয়া হয়। ‘‌পার্টি’‌ খুব বড় হইলে, এসকলের সংখ্যাও তদনুসারে বর্ধিত করা আবশ্যক।’‌‌
হাতি ও হাতিয়ার
‘‌হাওদায় দুই প্রকার ‘‌রাইফেল’ রাখা কর্তব্য;‌ এবং ভাল ‘‌প্লেনবোর’ বন্দুক থাকা উচিত। প্লেনবোর বন্দুক খুব নিকটস্থ শিকারের পক্ষে অত্যন্ত উপযোগী। ‘‌এক্সপ্রেস রাইফেল’‌‌‌, বিশেষত Vardite‌গুলির পেনিট্রেটিং পাওয়ার, অর্থাৎ বিদ্ধ করিবার শক্তি অধিক। অথচ শকিং–‌পাওয়ার, অর্থাৎ ধাক্কা দিবার শক্তি অল্প, কিন্তু সাধারণ রাইফেলের ধাক্কা দিবার শক্তি অধিক, বিদ্ধ করিবার শক্তি অল্প। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যাইতে পারে যে, যদি ৫০–‌৬০ গজ দূর হইতে এক ব্যাঘ্র সবেগে আক্রমণ (‌চার্জ)‌ করিতে আসে ও সেইসময়ে যদি তাহাকে .‌৩০৩ বা .‌৪৫০, অথবা .‌৪৭০ এক্সপ্রেস বা কডাইট–‌দ্বারা গুলি করা যায়, তাহা হইলে, তাহার মগজে বা মর্মে (‌হার্ট অর লাংস) গুলি প্রবেশ করিলে, তাহার গতিরোধ হইলেও হইতে পারে, নচেৎ নিষ্ফল;‌ কিন্তু ‘‌১২ বোর’‌ রাইফেল বা ঐ ম্যাগনাম দ্বারা গুলি করিলে, সেই গুলি তাহার যেখানেই লাগুক, তাহাকে এক ‘‌পটকান’‌ খাওয়াইবেই স্থির;‌ সুতরাং ইত্যবসরে শিকারী একটু সময় পাইবেন। বাঘেরা পটকান খাইলেই অনেক সময় ফিরিয়া যায়।’ জানাচ্ছেন কুমার জিতেন্দ্রকিশোর।
জাত শিকারি
কিছু কিছু পরিবার বংশ পরম্পরায় শিকারি। তাদের শিকারে হাতেখড়ি হত ছোট বয়সেই। যেমন জিতেন্দ্রকিশোরের প্রথম শিকার–‌অভিযান বাংলা ১৩০৭ সালে, ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে, অগ্রহায়ণ মাসে। তখন তিনি নিতান্তই কিশোর। লিখছেন, ‘‌নিকটে কোথাও বাঘ আসিয়াছে, শুনিলে, আমাদের কিরূপ আনন্দ, উৎসাহ, স্ফূর্তি হইত— ব্যাঘ্র বিনাশের জন্য হৃদয় কিরূপ ব্যাকুল ও আগ্রহে পূর্ণ হইত, তাহা অনধিকারীকে বুঝাইবার নহে।
মুক্তাগাছার রাজবংশে শিকারপ্রিয়তা বহুকাল হইতেই বর্তমান। ইহা কতকটা যেন, আমাদের বংশগত শখ। যদিও স্বর্গীয় মহারাজ সূর্য্যকান্ত আচার্য–‌বাহাদুর ও কেশবচন্দ্র আচার্যচৌধুরী মহাশয়দ্বয় সর্বপ্রথমে ‘‌শিকারী’‌ বলিয়া খ্যাতিলাভ করিয়াছিলেন, তবে তাঁহাদের পূর্বেও আমাদের বংশে শিকারীর অভাব ছিল না। স্বর্গীয় গৌরকিশোর আচার্য, রামচন্দ্র আচার্য, গোলোককিশোর আচার্য, রামকিশোর আচার্য, দুর্গাদাস আচার্য ও অমৃতনারায়ণ আচার্য প্রভৃতি অনেকেই প্রতিষ্ঠাপন্ন শিকারী ছিলেন। ইঁহাদের মধ্যে গৌরকিশোরই প্রথম, মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে ব্যাঘ্র কর্তৃক আহত হন। তাঁহার মৃত্যুর পর রামচন্দ্র এই পন্থার অনুসরণ করেন। অনন্তর গৌরকিশোরের পুত্র ভবানীকিশোর শিকারে যোগদান করিয়াছিলেন। ভবানীকিশোরের মৃত্যুর পর গোলোককিশোর ও গৌরকিশোরের দত্তকপুত্র রামকিশোর এই বংশে শিকারের সখ অক্ষুণ্ণ রাখিয়াছিলেন।.‌.‌.‌ গোবরডাঙ্গার সুপ্রসিদ্ধ জমিদার জ্ঞানদাপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়ও প্রসিদ্ধ শিকারী ছিলেন।’‌ জানিয়েছেন জিতেন্দ্রনারায়ণ। গোয়ালপাড়া জেলার রূপসীর সুপ্রসিদ্ধ জমিদার, লেপ্টেনান্ট ভূপেন্দ্রনারায়ণ সিংহচৌধুরী লক্ষ্মীপুর শিকার ক্যাম্পে সঙ্গী খাসিয়া যুবকের গুলিতে মারা যান। তখন তাঁর বয়স মাত্র ছাব্বিশ। খবরটি ছবি–‌সহ প্রকাশিত হয়েছিল ভারতবর্ষ পত্রিকার বৈশাখ ১৩৩০ সংখ্যায়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাঘ–‌শিকারে যে রাজা–‌নবারদেরই হক তা অবনী–‌হত্যাতেও প্রমাণিত। যে দুই শিকারিকে ডাকা হয়েছিল তাঁরা হলেন নবাব শফত আলি খান ও তাঁর পুত্র নবাব আসগর আলি খান। আসগরের গুলিতেই অবনী মারা যায়। 
জিম করবেট বা কেনেথ অ্যান্ডারসন দুজনেরই প্রকৃতি আর বন্যপ্রাণীর জন্য ছিল অপরিসীম ভালবাসা। এঁরা নিজেদের লেখায় অহেতুক বাঘ বা অন্য প্রাণীহত্যার বিরোধিতা করেছেন। করবেটের কথাই ধরা যাক, এমনও হয়েছে বহুবার সরকার থেকেই অনুরোধ করেছে, বাঘ মারতে, নইলে নাকি দেশে আর মানুষ থাকবে না!‌ করবেট রাজি হননি। ওঁর ‘‌দ্য পিপলপানি টাইগার’‌–‌এর কথা অবশ্য-উল্লেখ্য। পিপলপানি নদীর ধারে একদিন এক বাঘের বাচ্চার পায়ের ছাপ দেখতে পান করবেট। সেটি মায়ে‌খেদানো। করবেট জানাচ্ছেন, পুরুষ ছানা বড় হয়ে উঠলেই মা আর তাকে কাছে ঘেঁষতে দেয় না। দু দিন আগেও যে ছানার জন্য মা নিজের প্রাণ দিতে রাজি ছিল, সেকথা তার মনেই পড়ে না। চোখের মণি চক্ষুশূল হয়ে ওঠে। শাবক বলে আদর করে করবেট তার নাম রাখেন শাবু। ওর ওপর মায়া পড়ে যায়। বেশ কয়েকবার সুযোগ পেয়েও গুলি করেন না। ওকে স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠতে দেন। শাবুও ওঁকে কখনও আক্রমণের চেষ্টা করেনি। তাছাড়া শাবু তখন মানুষ তো দূরে থাক গৃহপালিত পশুকেও হিংসা করেনি। বাঘেরা আগের রাতে শিকার–‌করা পশুর মাংস খেতে ফিরে আসে। শিকারিরা সেই সুযোগ নেই। একবার শাবুও এসেছিল। কিন্তু যেহেতু শৈশবেই ওকে ওর মা তাড়িয়ে দিয়েছে, তাই ওর এই তালিমটা ছিল না, যে দিনের আলো মিলিয়ে যাওয়ার আগে বাসি মড়ার কাছে আসতে নেই। কারণ তাতে মাচায় বসা শিকারির নিশানা হতে হয়। এক্ষেত্রে করবেট না হয়ে অন্য শিকারি হলে শাবুর ভাগ্যেও তাই হত। কিন্তু করবেট ঠিক করলেন, গুলি চালাবেন, তবে শাবুর কান ঘেঁষে। ওর গায়ে আঁচড়টি লাগবে না, ও কেবল এইটুকু শিক্ষা নিয়ে যাবে যে, এভাবে দিনের আলোতে বাসী মড়ার কাছে আসতে নেই। সে শিক্ষা শাবু মনে রাখলে, ভবিষ্যতে অনেক বিপদ এড়িয়ে যেতে পারবে। এই ভেবে করবেট .‌৪৫০ রাইফেল থেকে গুলি চালালেন। শাবুর কান ঘেঁষে গুলি গিয়ে বিঁধল পাশের গাছে। শাবু লাফিয়ে হাওয়া। করবেট এই আশা নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন যে, সেদিনের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে বোকা শাবু পরে বুদ্ধির পরিচয় দেবে। কিন্তু শাবু শিক্ষা নিতে পারেনি। ঘটনার কয়েক বছর পর সে শিকার করা বাসী মড়ার কাছে ফিরে আসে দিনের বেলাতেই। গাছে গাছে ওত পেতে ছিল গ্রামবাসীরা। তারা গুলি করে। কাঁধে গুরুতর জখম নিয়ে সে বিকেলে ইনস্পেকশন বাংলোয় একটা খালি গুদাম ঘরে আশ্রয় নেয়, তাকে দেখার জন্য অজস্র লোকের ভিড়কে উপেক্ষা করে। শরণাগত হলে হিংস্র পশুকেও হত্যা করতে নেই, এ নীতিবাক্য মেনে গ্রামবাসীরা কিছু করে না। পরের দিন যখন ও চলে যাচ্ছে কেউ একটা ঢিলও অতিথির দিকে ছোঁড়েনি! (‌এখন কোথাও কারও বাড়িতে বা গোয়ালে চিতাবাঘ ঢুকলে পিটিয়ে মারতে একটুও দেরি করে না।)‌ এর পর অনেক বছর কেটে যায়। পূর্ণবয়স্ক শাবুর চরিত্র বদলাতে থাকে। করবেট জরুরি কাজে পিপলপানি এসেছিলেন হপ্তাখানেকের জন্য। তাঁর ওপরেই ভার পড়ে শাবুকে নিকেশের। করবেট একটি ছেলেকে নিয়ে বাঘের গোপন আড্ডার কাছে হাজির। গুহার কুড়ি গজ দূরে একটা গাছের নিচে দাঁড়ালেন। ছেলেটিকে গাছের ডালে তুলে দিলেন এমন জায়গায়, যেখান থেকে পা ঝুলিয়ে দিলে তার পা করবেটের মাথা ছোঁবে। ওকে বলে দিলেন, বাঘ দেখলে মুখ দিয়ে আওয়াজ না করে পা দিয়ে মাথায় টোকা দিতে। তখনও দিনের আলো যায়নি। করবেটের আরেক গুণ ছিল বাঘের ডাক নকল করতে পারা। যার সাহায্যে তিনি একাধিকবার বাঘকে কাছে এনে গুলি করেছেন। এবারেও সেই চাল চাললেন। বাঘিনীর আদুরে ডাক ডাকতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পরেই সাড়া মিলল। এদিকে বাঘিনী ডাকে, ওদিকে বাঘ। বাঘ ক্রমশ কাছে আসছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক ডাকাডাকির মাঝেই গাছের ওপরে থাকা ছেলেটি মাথায় চাপ দিল। করবেট ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এগিয়ে গেলেন কয়েক গজ। শেষ দিনের আলোয় দেখলেন তাঁর শাবুকে, যে তখন পিপলপানির আতঙ্ক। রাইফেলের এক গুলিতেই ভবলীলা সাঙ্গ। শাবুর অন্তিম নিঃশ্বাস পড়ার সঙ্গে সঙ্গে করবেটের বুক থেকেই বেরিয়ে এল গভীর দীর্ঘশ্বাস। তাঁর চোখে জল। শত্রুকে মারার সঙ্গে সঙ্গে তিনি যে তাঁর পিপলপানির বন্ধুকেও হারালেন। এই কাহিনী পড়লে রবীন্দ্রনাথের ‘‌গান্ধারীর আবেদন’‌–‌এ ধৃতরাষ্ট্রকে বলা গান্ধারীর সেই বিখ্যাত লাইনগুলো মনে পড়ে— ‘‌দণ্ডিতের সাথে দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার। যার তরে প্রাণ কোনো ব্যথা নাহি পায় তারে দণ্ডদান প্রবলের অত্যাচার।’ জিম করবেট কতখানি মানবিক ছিলেন এই ঘটনাটাই তার প্রমাণ। অবনীর হত্যাকারীরা যে দুঃখিত এমন কথা শোনা যায়নি। উল্টে ওঁরা নিস্পৃহভাবে বলেছেন, ‘‌আমাদের কাজটা অনেকটা ফাঁসুড়ের মতো। ফাঁসুড়েকে আপনারা নিন্দা করতে পারেন না!‌’‌ 
করবেট মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, বাঘ বা চিতাবাঘেরা স্বাভাবিক কারণে মানুষখেকো হয় না, তাদের মানুষখেকো হওয়ার পিছনে ‘‌ট্রিগার হ্যাপি’‌ অথবা আনাড়ি–‌অনভিজ্ঞ কিছু শিকারির বালখিল্যতাই দায়ী। ‘‌ম্যান ইটার্স অভ কুমায়ুন’‌ বা অন্য বইতে মৃত্যুদূত নরখাদক মারার যে রোমহর্ষক বিবরণ আছে, তা পড়লে বনজঙ্গল, বন্যপ্রাণী এবং আমাদের দেশের অতি গরিব, নিরুপায় ও সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর যে অসাধারণ দরদ ও ভালবাসা ছিল, সে সম্বন্ধে জানা যায়। ‘‌ম্যান ইটার্স অভ কুমায়ুন’‌ লিখে যে রয়্যালটি পেয়েছিলেন তা দান করেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দৃষ্টিশক্তি হারানো সৈনিকদের জন্য। ছোট হলদোয়ানিতে ২১১ একর জমি কিনেছিলেন। ভারত ছেড়ে আফ্রিকায় চলে যাওয়ার আগে ৪০ জন গ্রামবাসীকে ভাগ করে দিয়ে যান সেই জমি, বিশেষত যাঁরা মূলত তাঁর খেতখামার দেখাশোনা করতেন। বিদ্যাসাগর যেমন শেষজীবনে অভিমানে সব কিছু ছেড়ে কর্মাটাঁড়ে চলে যান, ভারত স্বাধীন হওয়ার পর করবেটও তাঁর প্রিয় ‘‌মাই ইন্ডিয়া’‌, ‘‌মাই পিপল’‌দের ছেড়ে চলে যান। শোনা যায়, উত্তরপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী গোবিন্দবল্লভ পন্থ ওঁকে পছন্দ করতেন না। করবেট আবার রাজনীতি ও রাজনীতিকদের অপছন্দ করতেন। সম্ভবত এই কারণেই উনি দেশ ছাড়েন।
আমাদের দুর্ভাগ্য জিম করবেটের মতো কেউ আর এদেশে নেই। করবেট থাকলে কিছুতেই এভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করে লোকলস্কর নিয়ে বাঘ মারতে দিতেন না। রুখে দিতেন শিকারের নামে ব্যাঘ্রনিধন। রক্ষা পেত প্রকৃতির এই আশ্চর্য সুন্দর সৃষ্টি।

জনপ্রিয়

Back To Top