দোল প্রায় ছ’‌হাজার বছরের প্রাচীন উৎসব। হিন্দোল আরও প্রাচীন, প্রায় আট হাজার বছর। এ সব গবেষকদের কথা। জানি না পৃথিবীটা তখন কেমন ছিল। আনন্দ বাতাসে ভাসে।
আকাশের নীল রোদের সোনালি আঁচল উড়িয়ে বলে— আমি সেই সুন্দরী।  ২১ মার্চ দোল উৎসব। সেই উপলক্ষে লিখেছেন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

দোলা, অর্থাৎ ডাইনে, বাঁয়ে অথবা বৃত্তাকারে দুলছে। একবার এদিকে যাচ্ছে, একবার ওদিকে। এরই নাম দোলা। দোলা থেকে দোল। কে দুলছে?‌ কে কাকে দোলাচ্ছে?‌ দুলতে হলে ঝুলতে হবে। ঊর্ধ্বে একটা বন্ধন থাকবে, নইলে তো পতন অনিবার্য। ঝোলা না হলে ঝুলবেন কেমন করে, আর সেই অবস্থাটাকেই তো বলা হবে ঝুলন্ত। কে ঝুলবেন আর সেইটাই পরিণত হবে এক বর্ণময়, গীতিময় উৎসবে। ঘটনাটি ঘটবে দ্বাপরে এবং বৃন্দাবনে। শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীমতী রাধিকা যুগলে ঝুলবেন, দুলবেন। কিশোরী গোপ বালিকারা আনন্দে আত্মহারা হবে। মধু বৃন্দাবনে বসন্তের হিল্লোল, হিন্দোল রাগিণীতে কুঞ্জে কুঞ্জে সুর তুলবে বাঁশি। গোপীরা যে বংশী–‌ধ্বনিকে বলতেন, ‘‌সর্বনাশা বাঁশি’‌।
‘‌বৃন্দাবন কেলিকুঞ্জে সব সখী রঙ্গ ভঙ্গে
ফাগুন মাসে খেলে হোলি, সঙ্গে শ্রী হরি।
মধুর মৃদঙ্গ বাজে আনন্দ সঙ্গীত মাঝে
মুরলী বাজায় শ্যাম বংশীধারী।।
ঝুলনে আবির খেলা খেলে আজি নন্দলালা,
হেরি সে অপূর্ব লীলা বিমোহিত ব্রজনারী
নাচে ময়ূর–‌ময়ূরী কিবা, কুঞ্জবনে কি নবশোভা
গুঞ্জে গুঞ্জে নাচে অলিদল, শুক–‌সারী।। [‌স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ]‌
ধর্ম, ভক্তি, উচ্ছ্বাস, প্রেম, কৃষি, কৃষ্টি, গ্রাম, গোপালন, সন্ধ্যা, দীপ, কীর্তন, লোকগীত, যৌনতা, দস্যুতা, জাতি–‌ধর্ম–‌ভেদ, জন্ম–‌মৃত্যু, শ্মশান, শাক্ত, শক্তি, তন্দ্র, সব একত্রিত হয়ে একটা কিছু হল, যা মানুষের সহজ বুদ্ধির নাগালে। অন্তরালে রয়ে গেল অনেক কিছু, যা হয় তা না জানলেও চলে।‌
প্রথম প্রশ্ন, তিনি ঝুলছেন, তাই ঝুলন, তিনি দুলছেন, তাই দোল, দোলন। তিনি নন্দের নন্দন, বাসুদেব সর্বং।
‘‌একং শাস্ত্রং দেবকীপুত্রগীতমেকো দেবো দেবকীপুত্র এব।
একোমন্ত্রস্তস্য নামানি যানি কর্মস্যেকংতস্যদেবস্যসেবা।
গোপীরা সাধারণ স্তর থেকে অসাধারণ স্তরে উঠে গিয়ে বললেন, ও কৃষ্ণ!‌ তোমার কথাই তো কথামৃতং, কবিভিরীড়িতং কল্পযাপহম্‌ অবণঙ্গলং;‌ এ তো বৃন্দাবনের ধারা!‌ তিনিই সব, তাঁরই কথা, তাঁরই পূজা;‌ কিন্তু দোলের তত্ত্ব তো একটা সহজ নয়!‌ অতীত যে আরও দূর অতীত। মহাকাশে, মহাবিশ্বে যেতে হবে যে। যেতে হবে সূর্য, সবিতার কাছে, জগৎকারণের কাছে, জীবনের কাছে। আর শ্রীকৃষ্ণ–‌কেশব নন, দুলছেন শ্রীবিষ্ণুভগবান। জগদম্বার পালনী শক্তি। সূর্যই সেই শক্তির উৎস, তাপ, উত্তাপ, জীবন, জীববৈচিত্র‌্য। ঋগ্বেদের ঋষিদের কাছে যেতে হবে। তাঁরা বলবেন, ভূমিতে নয় চলো আকাশে, দেখো, রবির উত্তরায়ণ আর দক্ষিণায়ন। রবির উত্তরায়ণ আরম্ভে আর্য ঋষিরা নববর্ষ শুরু করতেন। সে ছ–‌সাত হাজার বছর পূর্বের কথা। আজকের দোল সেই উৎসবের, সেই স্মৃতিরই রূপান্তর। সূর্যদেব দক্ষিণ থেকে উত্তরে আসবেন, আবার উত্তর থেকে দক্ষিণে চলে যাবেন একটি কল্পিত রেখা পথে। তাঁর এই দোলনই হল দোল। ফাল্গুনী পূর্ণিমায় তাঁর এই উত্তরাভিমুখে যাত্রার শুরু। সঙ্গে আসবে মধুর উষ্ণতা। শৈত্য কাটিয়ে ভূমি ফুঁড়ে উঠবে যত শস্য, অঙ্কুরিত হবে বীজ, মুকুলিত হবে ফলবৃক্ষ সমূহ, কানন মুখরিত বিহঙ্গ রবে, পুষ্পে পুষ্পে ভ্রমণরত যত ভ্রমর, মধুমক্ষিকা, প্রজাপতি সুন্দর, চতুর্দিকে সবুজের উল্লাস, ‘‌পাপিয়া বোলে পিউ কাঁহা!‌ কোয়েলিয়া মাত্‌ ফুকারো।’‌
‘‌ওরে ভাই, ফাগুন লেগেছে বনে বনে
ডালে ডালে ফুলে ফুলে পাতায় পাতায় রে.‌.‌.‌’
বেদের ঋষিরা আকাশ-বাতাসের খবর বেশি রাখতেন। চরাচরের সমস্ত ঘটনা থেকে একটি বিজ্ঞান খোঁজার চেষ্টা করতেন। তাঁরা দৃশ্য এবং অদৃশ্য উভয় শক্তিতেই আস্থাবান ছিলেন। যা দেখছেন তা আর কতটুকু! দৃশ্যের আড়ালে আরও যে কত কী আছে, তা জানার উপায় কী! এইটাই তো দর্শন। বুদ্ধি আর কতটা যেতে পারে। আর এর পরেই তো রয়েছে ধ্যানের জগৎ। মানবজীবনে সূর্য এক ভয়ঙ্কর প্রত্যক্ষ উপস্থিতি। সূর্যের তেজ এবং আলোর যে কোনও বিকল্প নেই তা তাঁরা তাঁদের চেতনা দিয়ে বুঝতে পারতেন। সৌরশক্তি এই জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে। এর ক্ষয় থাকলেও ধরার উপায় নেই। সূর্যের উদয়ও নেই অস্তও নেই। পৃথিবী ঘুরে যায় বলেই দিন হয়, রাত হয়। প্রথমেই তাঁরা এই দেবতাটিকে নিজেদের জীবনে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করলেন। নানা স্তোত্রে এবং পুজো পদ্ধতিতে শুরু করলেন বন্দনা। পেলেন গায়ত্রী মন্ত্র। শ্রবণ করলেন ওঙ্কার। এইখানেই ক্ষান্ত হলেন না। তাঁরা প্রথমেই বিশাল একটি প্রান্তরে সম দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা ঋজু দুটি গাছকে নির্দিষ্ট করলেন। প্রতি ভোরে সেই দুটি গাছের মাঝখান দিয়ে সূর্য উদিত হয়। এইবার এল গণিত। সারা বছরের উদয় প্রত্যক্ষ করে তাঁরা একটি তত্ত্ব পেলেন— সূর্য কয়েক মাস একটি দিকে সরে যায়। আবার কয়েক মাস আর একটি দিকে সরে আসে। অর্থাৎ সূর্যের গতি দক্ষিণে এবং বাম দিকে চলাচল করে। আর তখনই দেখা যায় ঋতু পরিবর্তন।
আমাদের আর্য পিতামহগণ বাস করতেন পাঞ্জাবে। সেখানে ভীষণ শীত। উত্তরায়ণ আরম্ভের দিন দশ ঘণ্টা আর রাত্রি দশ ঘণ্টা। আমাদের মাথার ওপর থেকে সূর্য বহু দক্ষিণে থাকলে সেইখান থেকেই শুরু হয় তার দিন যাত্রা। ক্রমে উত্তর দিকে যত সরে আসতে থাকে, ততই বাড়তে থাকে তাপ ও আলোর পরিমাণ। তখন জীবকুল, প্রাণী ও উদ্ভিদদের মধ্যেও আসে বাড়তি প্রাণের সাড়া। সেই কারণেই ঋগ্বেদের ঋষিগণ উত্তরায়ণ আরম্ভের পরের দুটি মাসের সূর্যকে সুন্দর একটি নাম দিয়ে বললেন, আপনি সবিতা। গায়ত্রী মন্ত্রে এই সবিতার উপাসনা আছে। ‘হে দেবী তুমি অন্তরীক্ষ, স্বর্গ প্রসব করেছ। তুমি জীবকুলের রক্ষাকারী।’ আমরা শীত বা শিশির ঋতু বলি। তাঁরা বলতেন ‘হিম’। আর উত্তরায়ণ আরম্ভের দিন থেকে নতুন বছর আরম্ভ করতেন। সেই বছরটিকেও তাঁরা হিম বলতেন। সেই দিনটিতে অর্থাৎ সূর্যের উত্তরায়ণে প্রবেশের দিনটিতে সবিতার পুজো ও হোম করতেন। এই উৎসবকে তাঁরা বলতেন যজ্ঞ।
ইউরোপেও উত্তরায়ণের সূচনায় নতুন বছর আরম্ভ হয়। নিজেদের সুবিধার জন্য তাঁরা এই দিনটি করেছেন পয়লা জানুয়ারি। হওয়া উচিত ছিল ২৩ ডিসেম্বর। আমরাও উত্তরায়ণের দিনটি স্মরণ করি। ষোলো শো বছর আগে পৌষ সংক্রান্তিতে এই দিনটি উদ্‌যাপন হত। পরের দিন পয়লা মাঘ নতুন বছরের প্রথম দিন। সেদিন আমরা পবিত্র নদীতে প্রাতঃস্নান করে বলি— ‘মকর স্নান’।
এইবার আমরা আসব দোলযাত্রায়। আকাশের গ্রহনক্ষত্র ছেড়ে মানব-পল্লীতে। ফাল্গুনী পূর্ণিমার দিন বিষ্ণুর দোল হয়। শ্রীকৃষ্ণ আসবেন পরে। তিনিও তো বিষ্ণু। এই দোলের অনুষ্ঠানটি হত বিশেষ একটি পদ্ধতি ধরে। বিষ্ণু মন্দির থেকে কিছুদূরে একটি মণ্ডল নির্মাণ করা হত। সেটি কেমন? চারদিক খোলা। চারটি খুঁটির ওপর বস্ত্রের আচ্ছাদন। মণ্ডপে একটি বেদি নির্মাণ করা হত। রাখা হত একটি শালগ্রাম শিলা— বিষ্ণুর প্রতিরূপ। সন্ধের আগেই মন্দিরের বেদি থেকে মণ্ডপের বেদিতে স্থাপন করে যথোচিত পুজো করা হত। তারপরে হত হোম। বিগ্রহের সিংহাসনটিকে তিনবার উত্তর-দক্ষিণে দোলানো হত। তারপরে বিগ্রহের অঙ্গে ফাগ স্পর্শ করিয়ে উপস্থিত সকলে সেই প্রসাদ কপালে ধারণ করতেন।
এ তো গেল পুজো পদ্ধতি। উচ্চবর্ণের মানুষের শাস্ত্র পদ্ধতিতে বাঁধা একটি অনুষ্ঠান। কিন্তু জনজীবন অপেক্ষা করে আছে আর একটি উৎসবের জন্য। সেটি হত দোলপূর্ণিমার আগের দিন। এটি একটি বহ্ন্যুৎসব। প্রচলিত নাম চাঁচর। গ্রামের বালক, যুবক এবং বৃদ্ধরাও এই মহা আনন্দের অংশীদার হতেন। খড়, বাঁশ, শরপাতা, তালপাতা— যে গ্রামে যে জ্বালানি বেশি তাই সংগ্রহ করে পুকুরের পাড়ে তৈরি করা হত নানা আকার— যেমন, কোনওটা একটি ঘর, কোনটি পশু, কোথাও একটি মানুষের মূর্তি ইত্যাদি। কোনও কোনও জায়গায় পিটুলি দিয়ে তৈরি করা হত ভেড়া। সেটি রাখা হত ওই ঘরগুলির মধ্যে। এই ভেড়ার আবার একটি নাম ছিল— মেণ্ডাসুর। অসুর ছাড়া আগুন কি জমে! সূর্যাস্তের পর ঠিক যখন সন্ধে নামছে তখন বিপুল হর্ষধ্বনির মধ্যে অগ্নি–সংযোগ। এইবার একটু পাণ্ডিত্য। চাঁচর শব্দটি এসেছে সংস্কৃত চর্চরী শব্দ থেকে। অর্থ হল— উৎসবে হর্ষধ্বনি। আনন্দ কীসের? একটি বছরের জন্যে সমস্ত আপদ আগুন দিয়ে পোড়ানো হল। সামনে অপেক্ষা করবে একটি নিরাপদ বছর। তাই তো এত আনন্দ। শুধু এই বঙ্গে নয় দক্ষিণ ভারত এবং পশ্চিম ভারতেও এই বহ্ন্যুৎসব খুবই জনপ্রিয়। বাংলা, ওডিশা এবং চেন্নাই প্রদেশে যে উৎসবের নাম দোল, উত্তর–পশ্চিম ও মধ্যভারতে তারই নাম হোলি। এই শব্দটির উৎস পণ্ডিত মহলের অজানা। তবে তাঁরা মনে করেন সংস্কৃত হোলাকা শব্দটি হোলিকায় রূপান্তরিত হয়েছে। অনেকে আবার মনে করেন শব্দটি খুবই প্রাচীন, উত্তর ভারতের দেশজ শব্দ। অর্থ হল মেষ বা ছাগ।‌‌‌‌  ‌‌
আগেই বলার চেষ্টা করেছি ‘‌দোল’‌–কে কেন ‘‌দোলযাত্রা’‌ বলা হয়। যাত্রার অর্থ এক অঞ্চল থেকে আর এক অঞ্চলে গমন। যেমন ‘‌রথযাত্রা’‌। দুর্গাপুজোকে বলি দুর্গোৎসব, দুর্গাযাত্রা বলি না। আবার শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে জড়িত ঝুলন–উৎসবকে বলি ‘‌ঝুলনযাত্রা’‌।
পণ্ডিতপ্রবর যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি এই প্রসঙ্গে লিখছেন:‌ ‘‌কেহ কেহ দোলযাত্রাকে বসন্তোৎসব মনে করেন;‌ কিন্তু বসন্তোৎসব নামে কোনও উৎসব পাঁজিতে নাই, স্মৃতিতে নাই, পুরাণে নাই। পূর্বকালে মদনোৎসব হইত, বহুদিন অজ্ঞাত হইয়াছে। কিন্তু সেদিন ফাল্গুনী পূর্ণিমা নয়, চৈত্র শুক্ল ত্রয়োদশী ও চতুর্দশী। দ্বিতীয়ত, দোলযাত্রা একটি নয় বৎসরে দুইটি। একটির নাম দোল, অপরটির নাম হিন্দোল। চলিত নাম ‌ঝুলনযাত্রা।’‌‌
এইখানেই উৎসব দুটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে জ্যোতির্বিদ্যা। সূর্য হলেন বিষ্ণু ভগবান। জগৎপালক। সূর্যরূপ বিষ্ণু বছরে দুবার দোলায় চড়েন। আমরা প্রত্যক্ষ করি;‌‌ উদয়কালে সূর্যের সরে যাওয়া। উত্তরায়ণ, দক্ষিণায়ণ!‌ হিন্দোল বা ঝুলন বর্ষাকালে। বসন্ত বর্ষাকালে আসে কি?‌ তৃতীয় একটি প্রশ্ন, বসন্তোৎসবের সঙ্গে বহ্ন্যুৎসব বা চাঁচরের কোনও সম্পর্ক থাকতে পারে না। বিপরীতধর্মী। এই চাঁচরের আগুনে কে পুড়ল, কাকে পোড়ানো হল। অসুর ছাড়া আর কাকে দগ্ধ করা যেতে পারে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এক বছর বয়স থেকেই অসুর নিধন শুরু করেছিলেন।
পঞ্জিকা যাঁরা প্রস্তুত করেন, তাঁরা গগনচারী। সূর্যের তাপ–‌উত্তাপের প্রভাবেই জগতে জীবনের উল্লাস, প্রাণের বিমর্ষতা। সূর্যদেব তুমি উত্তরায়ণে তোমার দোলনাটি দোলাও। ফাল্গুনী পূর্ণিমায় আকাশপটে পূর্ণচন্দ্র, পূর্ণিমা। চাঁদ কয়ে যায় আলোর বন্যায়, পাখির তানে, বাতাসের শিহরনে, তিনি পা রেখেছেন যথাস্থানে। এইবার শীতের শেষ, গ্রীষ্মের অঙ্গনে দাঁড়িয়েছি আমরা। কাঁচা হলুদ রঙের রোদ যেন পুব আকাশে সূর্যমুখী। শোনো, শোনো, এই সূর্যের নাম ‘‌সবিতা’‌। তপোবনের ঋষিরা এই মধুর উষ্ণতার, স্নিগ্ধ জ্যোতির এই নামটি রেখেছেন। গায়ত্রী ছন্দে গেঁথেছেন আবাহন মন্ত্র, ‘‌ওঁ আয়াহি বরনে দেবীং সে ভালেঃ। আপনারা ওইদিকে থাকুন। আমরা সাধারণ, আমরা বাহিনী চাই, লড়াই চাই। সূর্যকে উত্তরায়ণে আসার পথে বাধা দিচ্ছে এক পদ বিশিষ্ট একটা ছাগ বা মেষ। সূর্যের উত্তরায়ণে আসার পথের ওই বাধাদানকারী অসুরটাকে পোড়াও। ছাই করে দাও। আমরা ঋগ্বেদ জানি না। জানি না ভাদ্রপদ, ফাল্গুনী নক্ষত্র। ঋতুর পরিবর্তন কেনই বা হয়!‌ যা হয়, তা হয়। দোল–উৎসব কোনও কোনও প্রদেশে নববর্ষের উৎসব। আমাদের বঙ্গে দুর্গোৎসবই উৎসব। দোলের তেমন মর্যাদা নেই। উত্তর ও পশ্চিম ভারতে দোল কিন্তু বিরাট ব্যাপার। আমরা কিন্তু আমাদের দুর্গোৎসবকে নববর্ষ উৎসব বলতেই পারি। সব লক্ষণ বর্তমান। ঘরদোর পরিষ্কার করা। রং করা। নতুন বস্ত্র পরিধান। বিজয়ার মিষ্টিমুখ, কোলাকুলি।
ব্যাপারটাকে অতি জটিল না করে এইটুকু বলা যায়, এই দোল প্রায় ছ হাজার বছরের প্রাচীন উৎসব। হিন্দোল আরও প্রাচীন, প্রায় আট হাজার বছর। এসব গবেষকদের কথা। জানি না পৃথিবীটা তখন কেমন ছিল। আনন্দ বাতাসে ভাসে। আকাশের নীল রোদের সোনালি আঁচল উড়িয়ে বলে–‌ আমি সেই সুন্দরী। বৃন্দাবনের সেই ভগবান–‌ তিনি যত দেবতা–‌ সব দেবতার স্বরূপ। তিনি কাল, মহাকাল, কালী, পুরুষ ও প্রকৃতি। তিনি সৃষ্টি আবার সংহার। অথচ কত সহজ। তিনি আমার পাশে বসে ঝাল–‌মুড়ি খেতে পারেন, নৌকোর মাঝি, গ্রামের পথে ফেরিঅলা। গোপীদের হাততালির সঙ্গে নৃত্য করতে পারেন। এই দেবতাটি হলেন–‌ জীবন যে–‌রকম ঠিক সেই রকম। এই ফাল্গুনে, বসন্ত পূর্ণিমায় গোপীদের প্রাণে আবেশ এসেছে। ওগো!‌ তুমি যে প্রিয় হতে প্রিয়। তুমি ছাড়া ওগো সখা কে বুঝবে দেহহীন প্রেমের মর্ম!‌ আরাধ্য ও আরাধনার এক হয়ে যাওয়া। নিজেকে হারিয়ে ফেলার গভীর বিস্ময়।
শ্রীকৃষ্ণের ভারত। শ্রীকৃষ্ণকে ছাড়া ধর্মকর্ম, আমোদ–‌আহ্লাদ, এমনকী পাপপুণ্যও হবে না। ব্রজভূমিতে বসন্ত সমাগমে কিশোরীদের মনে হিন্দোলের দোলা লেগেছে। ওই যে কদম্বতলে বংশীধারী কেদারা রাগে সুর তুলেছেন। ‘‌আজ হোলি খেলব শ্যাম তোমার সনে।’‌
‘‌সুন্দর লালা নন্দ দুলালা নাচত শ্রীবৃন্দাবন মে।
ভালে চন্দন তিলক মনোহর অলকা শোভে কপোলন মে।।
শিরে চূড়া নয়ন বিশালা কুন্দমালা হিয়াপর দোলে।
পহিরণ পীত পটাম্বর বোলে রুনুঝুনু নূপুর চরণ মে।।’‌
যেখানে কৃষ্ণ সেখানেই জীবন, প্রকৃতি, সুর, তাল, লয়, ছন্দ। কারণ, তিনিই তো সূর্য, বিষ্ণু, ভগবান, সবিতা। তিনিই তো ঋতুচক্র। তাঁরই আনন্দ গীত গোপীর রূপ ধরে কুঞ্জকাননে ছড়িয়ে পড়েছে। গিরিশচন্দ্র একটি নাট্যগীতি বা গীতিনাট্য লিখেছিলেন। বেশ জমজমাট। মঞ্চ ভরা নৃত্য–‌গীত। দোলের গানে সুরের ফোয়ারা। তিনি এই সব রাগিণীতে গানের মালা সাজিয়েছিলেন— পিলু, হামির, কালেংড়া, বেহাগ, খাম্বাজ, সিন্ধু, কাফি, সাহানা, মালকোষ, বাহার, পরজ। শেষ গানটি বাহারে নিবদ্ধ:‌
হের লে শোভা নয়ন ভরি,
রাধা সনে দোলে দোল শ্রীহরি
লাল নিধুবন লাল কদমবন
লালে লাল আজি পরী।
হেরি লালে লাল আজি নয়ন জুড়াল
লালযুগল মাধুরী।
‌কিছু কথা এখনও বাকি রয়েছে, সেটি হল ‘‌দোল’‌–‌এর আদ্যোপান্ত। ঋগ্বেদের সৌর–‌সবিতা–‌বিষ্ণু–‌ভগবান, ইত্যাদির সামান্য সামান্য জানা গেছে। তারপর?‌ সময় তো স্থির নয়, অস্থির। দোলের সঙ্গে যুক্ত হল বসন্তোৎসব–‌ ‘‌জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে’‌। কবিও গেছেন। বসন্তোৎসব মিশে গেল মদনোৎসবের সঙ্গে। রূপ–‌রস–‌গন্ধ–‌বর্ণ, আউল–‌বাউল–‌তন্দ্র–‌তান্ত্রিক, বামাচার, ভৈরব–‌ভৈরবী ‘‌শিব সঙ্গে সদা রঙ্গে আনন্দমগনা’‌। সুরাপান করিনে আমি সুধা খাই। ‘‌জয় কালী’‌ বলি, তাই আমি মাতাল নই। এই সুরার তান্ত্রিক নাম তাই ‘‌কারণ’‌। দোলের উচ্ছ্বাস–‌পর্বকে সংযত করে রেখেছে পূজা–‌পর্ব। ‘‌দোলের সময় লোহিত ফাগ (‌ফল্গু)‌ দিয়া শালগ্রামরূপী সবিতার অঙ্গ ভূষিত হয়। ঋগ্বেদে সবিতা হিরণ্যদ্যুতি, হিরণ্যপানি। তাহার রথ হিরন্ময়। শীতকালে বালরবিকে লোহিত বর্ণ দেখায়। লোহিতচূর্ণ দিয়া তাহা প্রকম্পিত হয়। এই রূপে দোলোৎসব ফল্গুৎসব হইয়াছে। বোধহয় পিচকারি দ্বারা লোহিত জল নিক্ষেপ হিরণ্যরশ্মির অনুকরণ’‌ (‌কৃঃ যোগেশচন্দ্র)‌‌।
এইবার শেষ কথা–‌ আর পুরাণ নয়, এইবার ইতিহাস। এই দিনটিকে চিরকালের মতো দখল করে নিলেন, মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য!‌ তিনি এলেন এই বাংলার নবদ্বীপে। বিখ্যাত একটি ঠুংরির লাইন, ‘‌তুম রাতে বনো শ্যাম’‌। সেই রাধা হয়ে এলেন শ্যাম নবদ্বীপের শ্রী গৌরাঙ্গ সুন্দর এই দোলের দিন ফাল্গুনী পূর্ণিমায়। শ্রীল নরহরি চক্রবর্তী ঠাকুরের কী আনন্দ!‌ তিনি গাইছেন বসন্ত রাগে।
জয় জয় জয় মঙ্গলরব ফাল্গুন পূর্ণিমা নিশি নবশোভিত
শচী–‌গর্ভে প্রকট গৌর বরজ (‌‌ব্রজ)‌ রঞ্জনা
ঝলকতবর কনক তনু, কঙ্কুম থির দামিনী ভানু,
চমকত মুখচন্দ মধুর ধৈরজভর ভঞ্জনা.‌.‌.‌
গায়ত কিন্নর সুধঙ্গ, বায়ত মৃদুতর মৃদঙ্গ
ধা ধি ধি ধিকিতা ধিক্‌ ধিক্‌ ধিক্কট তক ধিন্নানা।
গৌরচন্দ্রের উদয় হল নবদ্বীপে। সেই বুঝি নববৃন্দাবন। কত রকমের দোল এই বৈষ্ণব ভক্তগণ জানেন, পালন করেন, ফুল দোল, পঞ্চম দোল, ধুলোট, ভক্তের ভক্তি তরঙ্গে অপূর্ব, স্নিগ্ধ সেই মাতামাতি।‌‌ ■

 

 

 

রাধা–কৃষ্ণের দোল খেলা। নুরপুর অণুচিত্র। ১৭৭০–৮০। লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামের সংগ্রহ।
 

জনপ্রিয়

Back To Top