শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়: এই যে বলা হয় কোলাঘাটের ইলিশ। পলতার ইলিশ। ডায়মন্ডহারবারের ইলিশ। কথাটা ঠিক নয়। জলের রাজাধিরাজ ইলিশের কোনও ঠিকানা নেই। সে ডিম ছাড়তে গঙ্গায় ঢোকে। ঢোকে রূপনারায়ণে। ওপারের পদ্মায়। মেঘনায়। আড়িয়াল খঁায়েও ঢেকে। যেখানটায় সে ধরা পড়ে— সেখানকার নাম তার চিরস্থায়ী বন্দীদশার কপালে জুড়ে যায়। 
রূপনারায়ণে ধরা পড়লেও সে কোলাঘাটের। গঙ্গায় বিভিন্ন জায়গায় সে ধরা পড়ে বিক্রি হয়। যেমন ডায়মন্ডহারবার, পলতা, ব্যারাকপুর, সেই সেই জায়গার নাম সে পেয়ে যায়। আসলে সে মোহনা থেকে নদীতে ঢোকে। ঢুকে ডিম ছাড়ার জায়গা খোঁজে। 
মুম্বইয়ে পঁয়ত্রিশ বছর আগে ভিক্টোরিয়া টারমিনাসের ভাত আর ইলিশের ঝোল খেয়ে বুঝেছিলাম— ওখানকার বাঙালিরা কেন ইলিশ নিয়ে মাথাই ঘামান না। অাসলে ওদিকে ওঠে চন্দনা। যেমন পাওয়া যায় ওড়িশায় মহানদী বা কাঠজুরিতে। মাত্র দুটি বঙ্কিম রেখার টানে যামিনী রায়ের আঁকা ইলিশের ফিগার দেখে মনে হয় গঙ্গা, রূপনারায়ণে ঘুরতে আসা‌ ইলিশের দল তাঁদের ফিগার মেইনটেনই করে। সরু মাথা। তাতে ধরা পড়ার সময় ব্যথা পেয়ে একবিন্দু রক্তের দাগ। মৃত্যুর ঠিক আগে তাকিয়ে থাকা দুটি চোখ বিশেষ কোনও দিকে তাকিয়ে নেই। অথচ আমি তাকালে মনে হবে, আমার দিকেই তাকিয়ে। অনেকটা যেন ছবির মানুষের চোখ। যেখান থেকেই দেখি মনে হয় আমারই দিকে তাকিয়ে। বুক বলতে মাঝখানটিই চওড়া। আবার লেজ মাথার মতোই সরু। একেবারে সই সই। রামমোহন–‌দ্বারকানাথে কোথাও ইলিশ পাইনি। দেবেন্দ্র–‌শিবনাথ শাস্ত্রীর আত্মচরিতেও পাইনি। হুতোমে ইলিশ নেই। রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্রে ইলিশ আছে। শরৎচন্দ্রে আছে কি?‌ মনে পড়ছে না। বিভূতিভূষণ–‌তারাশঙ্করে নেই। আসলে খাবার জিনিস নিয়ে তখন কথা বলা অসভ্যতা ছিল।
আমি নিজের হাতে প্রথম ইলিশ কিনি ১৯৪০ সালের বর্ষাকালে। মফঃস্বল শহরে স্কুলের মাইনে দিয়ে হাতে একটা কাঁচা টাকা থেকে যায়। জেলেরা মাছ ধরছিল। রাস্তার পাশেই লঞ্চঘাটে নেমে দেখছি। কি হল— এক টাকার ভেতর প্রমাণ সাইজের পাঁচটি ইলিশ কিনলাম ১৫ আনায়। বাকি ১ আনায় রিকশয় বসে পড়ি। খুব মার খেতে হয়েছিল। কারণ তখন সর্ষের তেলের দাম বেড়ে সাড়ে আট কিংবা দশ আনা। তখনও এশিয়ায় মহাযুদ্ধ আসেনি।
কলকাতার দুটি বাজারে সদ্য ধরা ইলিশ আসে। বরানগর বাজারের গায়েই গঙ্গা। সেখানে আসে। আর আসে বেহালা বাজারে। ম্যাটাডরে চড়ে। আস্ত ইলিশ কিনে বাড়ি ফেরার একটা স্টাইল আছে। কানকো আর লেজে সুতোলি বেঁধে বড় কুমড়োর ফালি প্রায় ধনুক ভঙ্গিতে ইলিশকে হাতে ঝোলাতে হয়। সেই সময় ধুতি পাঞ্জাবি সঙ্গে পায়ে পাম্পসু থাকলে ভাল মানায়।
ইলিশের কেজি কয়েকদিন ১৫০ টাকায় উঠেছিল। এখন ৯০ টাকা থেকে ১১০ টাকার ভেতর ঘোরাফেরা করছে। এখনও কচুর শাক তেমনভাবে কোনও বাজারেই আসেনি। এলেই দেখা যাবে ইলিশের কেজি ৬০–‌৭০ টাকায় নেমেছে। নয়ত ১০০ টাকা কেজির মাথার সঙ্গে ৪–‌৫ টাকার কচুর শাক যে মেশে না। শুনি আলুর দাম কমে গেছে। 
৩০ জুলাই ১৯৯৭
(‌আজকাল‌‌ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‌
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা ‘‌বাজার সফর ‌সমগ্র’ বইটি থেকে অংশবিশেষ নেওয়া।)‌‌ 

জনপ্রিয়

Back To Top