রাজ্য, দেশ, ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতির সীমানা অতিক্রম করে কলাভবন আক্ষরিক অর্থেই একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। সেই কলাভবনের শতবর্ষ।
লিখলেন কৌশিক মুখোপাধ্যায়

‘‌ব্রহ্মচর্যাশ্রমের পুরনো কাঠামো নতুন ক’‌রে গড়বার সূচনা যখন, সেই মুহূর্তে আমি ব্রহ্মচর্যাশ্রমে যোগ দিয়েছিলাম। কলা, সংগীত এবং গবেষণা— এই তিনের সংযোগে বিশ্বভারতীর কল্পনা রবীন্দ্রনাথের মনে জেগেছিল। আনুষ্ঠানিক-ভাবে বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বেই কলাভবনের সূচনা হয়। সকালে ক্লাসে চলেছি বই-আসন নিয়ে, এমন সময় ধীরেনকৃষ্ণের সঙ্গে শালতলায় আমার সাক্ষাত। ধীরেনকৃষ্ণ আমাকে বললেন, ‘গুরুদেব কলাভবন খুলেছেন, আমরা যারা ছবি আঁকতে চাই, সেখানে যেতে পারি। আমি চলে গেছি, তুমিও চল। আমার চেয়ে তাঁর উৎসাহ বেশী। তিনি তখনই আমাকে নিয়ে গেলেন তৎকালীন অধ্যক্ষ বিধুশেখর শাস্ত্রীর কাছে। ক্লাসের বইখাতা ও আসন তখনো আমার হাতে। ‘কলাভবন’ বলে নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে, এখবর শাস্ত্রীমশাই জানতেন না। যাই হোক বাড়ি থেকে অনুমতিপত্র আনিয়ে দেব, এই প্রতিশ্রুতিতে কলাভবনে যোগ দেবার অনুমতি পেলাম। এরপর ধীরেনকৃষ্ণই আমাকে নিয়ে গেলেন জগদানন্দবাবুর কাছে। জগদানন্দবাবু শুনে অবাক, ‘কলাভবন, সে আবার কবে হল?’ সব শুনে জগদানন্দবাবু অনুমতি দিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রাবাস থেকে বাক্স-বিছানা দুজনে ধরাধরি ক’রে শমীন্দ্র-কুটিরের ছোট ঘরে আমরা উপস্থিত হলাম। ধীরেনকৃষ্ণ বললেন, ‘তুমি ও আমি এ ঘরেই থাকব।’ শমীন্দ্র-কুটির তখনও তৈরি হচ্ছে। 
...দ্বারিকের দোতলায় তখন কলাভবন, নিচে সঙ্গীতভবন। একখানা মাদুর, সামনে নড়বড়ে জলচৌকি এবং ডানপাশে জলের গামলা। এরই মধ্যে অন্যের মতন আমিও স্থান পেলাম। বেশ কিছুদিন নন্দলাল আমাকে সুনজরে দেখেননি। তাঁর মনে হয়েছিল, গুরুদেব জোর করে এমন একজনকে তাঁর ঘাড়ে চাপালেন যে শিল্পজগতে প্রবেশের অনধিকারী। যার চোখ নেই, সে ছবি আঁকবে কী করে?
একদিন সকালে গুরুদেব কলাভবনে এসেছেন, নন্দবাবু তাঁকে আমার কথা এবং এ বিষয়ে তাঁর আপত্তি জানালেন। গুরুদেব বললেন, ‘নন্দলাল, ও কি নিজের কাজ করে ?’ ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, মনোযোগী ছাত্র। কিন্তু এই লাইনে...।’ কথা থামিয়ে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘যদি ও নিয়মিত আসনে বসে এবং মনোযোগ দিয়ে কাজ করে তবে ওকে স্থানচ্যুত কোরো না। ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা কোরো না। সকলকে নিজের নিজের পথ খুঁজে নিতে দাও।’‌
আজ পৃথিবীবিখ্যাত প্রতিষ্ঠান, কলাভবন-এর শতবর্ষের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের লেখা থেকে ১৯১৯ সালের, কলাভবনের শুরুর দিনের এই স্মৃতিকথাটি হুবহু তুলে না দিলে ইতিহাসের প্রতি বোধহয় অবিচার করা হত। কারণ রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তার মূল ভাবনাটির যথাযথ প্রতিফলন ঘটেছে বিনোদবিহারীর কলমে...প্রথাগত ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ভেঙে বেরিয়ে এসে ব্রহ্মচর্যাশ্রমের ভাবনা, বিশ্বভারতীর ভাবনা, শিক্ষার মধ্যে দিয়েই মুক্তচিন্তার প্রসারের ভাবনা।
১৯১৯ সালেই রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘বর্তমান যুগ য়ুরোপীয় সভ্যতার যুগ। ইহাই হয় গায়ের জোরে, নয় সম্মোহনের দ্বারা সমস্ত পৃথিবীকে বশ করিতেছে।...হৃদয়বৃত্তির দ্বারা মানুষ আপন ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করে। এই ব্যক্তিত্বের বৈচিত্র্য থাকিবেই আর তাহা থাকাই শ্রেয়। ইহাকে নষ্ট করা আত্মহত্যা করারই সামিল। এই হৃদয়বৃত্তির প্রকাশ কলাবিদ্যার সাহায্যেই ঘটে। সভ্য অসভ্য সকল দেশেই এই সকল কলাবিদ্যার পরে দেশের লোকের দরদ আছেই। কেবল আমাদের বিদ্যা-দানের ব্যবস্থায় এই কলাবিদ্যার কোনো স্থান নেই। স্থান থাকার যে গুরুতর প্রয়োজন আছে সেই বোধ পর্যন্ত আমাদের শিক্ষিত লোকের মন হইতে চলিয়া গিয়াছে। ইহার প্রধান কারণ আমাদের দেশের বিদ্যা অভাবের অনুচর। ইংরেজি শিখিলে চাকরী হইবে বা রাজসম্মানের সুযোগ ঘটিবে, দরিদ্রের এই মনোরথ আমাদের দেশের বিদ্যাকে চালনা করিতেছে।...বিশ্বভারতী যদি প্রতিষ্ঠিত হয় তবে ভারতীয় সঙ্গীত ও চিত্রকলা শিক্ষা তাহার প্রধান অঙ্গ হইবে এই আমাদের সঙ্কল্প হউক।’‌
আপাতভাবে এই লেখার মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের কলাভবন প্রতিষ্ঠার ভাবনা নিহিত আছে মনে করলে বোধহয় ভুল পাঠ হবে।
১৯১৫ সালের ৮ মে, রবীন্দ্রনাথের চুয়ান্নতম জন্মদিন পালন হয় জোড়াসাঁকোয়। কালিদাস নাগ তাঁর ডায়েরিতে রবীন্দ্রনাথের সেই জন্মোৎসবের কথা প্রসঙ্গে লিখছেন, ‘সন্ধ্যায় উপরে মেয়ে-পুরুষ সব একত্র হয়ে কবিকে সম্বর্ধনা— কবি এই উপলক্ষে কলা-বিজ্ঞানের চর্চার জন্য একটি কেন্দ্র তাঁর বাড়ীতেই স্থাপন করলেন ও আনন্দের উৎস রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় আমাদের দেশের কি দুর্গতি হয়েছে বললেন...।’‌
এই প্রসঙ্গে হাতে লেখা ‘শান্তি’ পত্রিকার সে বছরের আশ্বিন-সংখ্যায় লেখা হয় : ‘গুরুদেব কলিকাতায় কলা ও শিল্পের উন্নতির জন্য একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। এই উপলক্ষে তিনি নিজের বাটি দান করিয়াছেন ইহার নাম হইয়াছে কলাভবন।’
১৯ জুন ১৯১৫ রবীন্দ্রনাথ চিঠিতে পিয়র্সনকে এই বিদ্যালয়ের পরীক্ষাবর্জিত মুক্তশিক্ষার কথা জানান। ৯ জুলাই নগেন্দ্রনাথকে লেখা পিয়র্সন-এর চিঠিতে জানা যায়, মূলত ২২ জন আত্মীয় ছাত্র নিয়ে এই বিদ্যালয়ের ভাবনা, বেতন ৩৫ টাকা, শিল্প এবং সঙ্গীতশিক্ষা ছাড়াও পাঠ্যক্রমে ছিল মৃৎশিল্প, দারুশিল্প, ইংরেজি এবং অঙ্ক। ১ জুলাই ১৯১৫ প্রতিষ্ঠা হয় এই বিদ্যালয়ের এবং প্রতিদিন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং ১১টা থেকে ৫টা পর্যন্ত শিক্ষকতা করছেন।
কাজেই, এই ইতিহাস-পাঠে, হয়তো বলা যায় যে, ‘কলাভবন’-এর বীজবপন ১৯১৫ সালে এবং তা জোড়াসাঁকোতে।
এই বছরেই ১২ জুলাই রবীন্দ্রনাথের নামকরণে ‘দ্য বিচিত্রা স্টুডিও ফর আর্টিস্টস অফ দ্য নন-বেঙ্গল স্কুল’ প্রতিষ্ঠা হয়, সংক্ষেপে যা ‘বিচিত্রা’ নামেই পরিচিত। জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্রনাথের লালবাড়ির একতলায় তৈরি হয় লাইব্রেরি। সকালে এটি হত কলাভবন, সন্ধেয় নানা মানুষজন জড়ো হতেন লাইব্রেরিতে আর একদিন, বেশিরভাগ সময় শনিবার, এটি হত কলা ও সঙ্গীতশিল্পীদের সামাজিকতার চর্চাকেন্দ্র।
রবীন্দ্রনাথের নানা ব্যস্ততার কারণে বিচিত্রার কাজকর্ম ক্রমশ অনিয়মিত হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে ১৯১৮-র ৮ পৌষ, ২৩ ডিসেম্বর বিশ্বভারতীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় এবং ১৯১৯-র ৩ জুলাই আনুষ্ঠানিক ভাবে বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠা হয়। শান্তিনিকেতন পত্রিকা শ্রাবণ-সংখ্যায় বিশ্বভারতীর, কার্যপ্রণালী, পাঠ্য বিষয়সূচি, বিষয়ভিত্তিক অধ্যাপক তালিকা, বেতন ইত্যাদি প্রকাশিত হয় এবং এখানেই ‘কলাবিদ্যা’-কে ‘চিত্রবিদ্যা’ ও ‘সঙ্গীত’ বিভাগে ভাগ করে বলা হয় ‘চিত্রবিদ্যা’ বিভাগে পড়াবেন নন্দলাল বসু ও সুরেন্দ্রনাথ কর। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ব্রহ্মচর্যার্শ্রমের নাম হয় ‘পূর্ববিভাগ’ এবং অন্যান্য সকল শাখার সম্মিলিত নাম হয় ‘উত্তরবিভাগ’। উত্তরবিভাগের অধ্যক্ষ ছিলেন বিধুশেখর শাস্ত্রী।
এই বছরই গরমের ছুটির পর নন্দলাল বসু এসে যোগ দেন। সুরেন্দ্রনাথ কর তার আগের বছরই শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন। ‘দ্বারিক’ বাড়ির দোতলায় শিল্পকলা শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়, নাম হয় ‘কলাভবন’।
জোড়াসাঁকোর বিচিত্রার নামের মধ্যেই ‘নন-বেঙ্গল’ শব্দটি লক্ষণীয়।

গগনেন্দ্রনাথ-অবনীন্দ্রনাথের ‘বেঙ্গল স্কুল’–এর সীমাবদ্ধতা রবীন্দ্রনাথ অনুভব করেছিলেন। অবনীন্দ্রনাথের ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও আধুনিক শিল্পকলার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছিলেন বলেই নন্দলাল বসুকে নিয়ে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সে কারণেই আধুনিক শিল্পকলা আন্দোলনের জনক যে রবীন্দ্রনাথ, সে বিষয়ে বোধহয় দ্বিধার অবকাশ নেই। রবীন্দ্রনাথের হাতেই প্রতিষ্ঠা হয় ভারতবর্ষের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে প্রথম কলা-বিভাগ।
প্রথম দফায় নন্দলাল অবশ্য বেশিদিন থাকেননি। ১৯১৯-এ হঠাৎ করেই আশ্রম ছেড়ে ফিরে যান ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট-এ। কলকাতা সরকারি আর্ট স্কুল ছেড়ে শান্তিনিকেতনে নন্দলালের জায়গায় শিক্ষকতায় আসেন অসিতকুমার হালদার।
পরে নন্দলাল আবার ফিরে আসেন শান্তিনিকেতনে এবং কলাভবনের আচার্যের পদ গ্রহণ করেন ১৯২২ সালে,বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার পর।‌ আর ১৯২৩ সালেই কোনও অজ্ঞাত কারণে অসিতকুমার শান্তিনিকেতন আশ্রম ছেড়ে চলে যান।
নানা অসুবিধের মধ্যে দিয়েও রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে গড়ে ওঠে কলাভবন। রচিত হয় ভারতবর্ষের শিল্পকলার স্বর্ণযুগ।
একটি বিষয় রবীন্দ্রনাথ যথার্থ অনুধাবন করেছিলেন...ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্নেই। বিশ্বের দরবারে তাঁর শিক্ষাভাবনা পৌঁছে দিতে গেলে বিশ্বকে নিয়ে আসতে হবে তাঁর দরবারে...বিশ্বভারতীতে। কলাভবনের ভাবনার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে নিয়ে এসেছেন শিল্পীদের, শিল্প-সমালোচকদের। লন্ডন থেকে স্টেলা ক্রামরিশ, ফ্রান্স থেকে আঁদ্রে কারপেলে এসেছিলেন কলাভবনের একেবারে শুরুর দিনে। এই রেওয়াজ অক্ষুণ্ণ থেকেছে পরবর্তীতেও। ছাত্র থেকে অধ্যাপক হয়েছেন, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়, রামকিঙ্কর বেইজ। মূলত এঁদের হাত ধরেই শিল্প গণ্ডি ছাড়িয়েছে ফ্রেম-এর, এমনকী স্টুডিওর চার দেওয়ালেরও...মিশে গেছে প্রকৃতির সঙ্গে। ম্যুরাল, এনভায়রনমেন্টাল স্কাল্পচার, দেশকে নতুন ভাবে শিল্প সম্বন্ধে ভাবতে শিখিয়েছে। নন্দলাল বসু পাল্লা দিয়ে খুলেছেন নতুন নতুন শিল্প বিভাগ। নন্দলালের সুদূরপ্রসারী ভাবনার কারণেই স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষের পরিবর্তিত প্রেক্ষিতেও কলাভবনের উৎকর্ষের ঊর্ধ্বমুখী প্রসার রুদ্ধ হয়নি। অধ্যাপক হিসেবে একে একে এসেছেন ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্মন, দিনকর কৌশিক, সোমনাথ হোর, শর্বরী রায়চৌধুরী, সনৎ কর, অজিত চক্রবর্তী, কে জি সুব্রহ্মণ্যন, যোগেন চৌধুরী, জনক ঝঙ্কার নার্জারী, লালুপ্রসাদ সাউ, সুহাস রায়-এর মতো প্রথিতযশা শিল্পীরা।
নন্দলাল থেকে শুরু করে এই সমস্ত সেরা মাস্টারমশাইদের হাতেই তৈরি হয়েছেন তাঁদের যোগ্য উত্তরসূরীরা। সুধীর খাস্তগীর, শঙ্খ চৌধুরী, রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, ভি হরিহরন, বিনায়ক মাসোজি, জয়া আপ্পাস্বামী, সত্যজিৎ রায়, পৃথ্বীশ নিয়োগী, কিরণ সিংহ, বিনোদিনী দেবী, কৃপাল সিং শেখাওয়াৎ, দেবীপ্রসাদ গুপ্ত, কৃষ্ণা রেড্ডি, মীরা মুখোপাধ্যায়, রীতেন মজুমদার, ইরা চৌধুরী, রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়, এ রামচন্দ্রন, ধর্মনারায়ণ দাশগুপ্ত, জয়শ্রী বর্মন, জয়শ্রী চক্রবর্তী, পিনাকী বড়ুয়া, টি ভি সন্তোষ, মিঠু সেন...দীর্ঘ তালিকা। 
এরই মধ্যে বিশ্বভারতী কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। আরোপিত হয়েছে নানা বিধি-নিষেধের গেরো, মূল্যায়ন পদ্ধতি এমনকী অতি সম্প্রতি সেমেস্টার সিস্টেমও। যে খোলা ভাবনায়, খোলা মনে, খোলা মাঠে, বিনা সিলেবাসে, পরীক্ষার চোখ রাঙানি ছাড়াই একের পর এক বিশ্ববিখ্যাত শিল্পকর্ম করে গেছেন বিনোদবিহারী, রামকিঙ্করেরা, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে, যেতে হচ্ছে কলাভবনকে। যে ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার মূলটি কেটে এই প্রতিষ্ঠানের জন্ম আজ সেই মূলটির সঙ্গেই নিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে কলাভবনকে। সেমেস্টার সিস্টেমে শিল্পচর্চা সম্ভব কিনা তা সময় বলবে। কিন্তু যে ভাবনার বীজটি আজও লুকিয়ে আছে কলাভবনের সংস্কৃতির মধ্যে তার ডালপালা আটকে রাখাও মনে হয় দুঃসাধ্য।
আজকের কলাভবন-এ মূল বিভাগের সংখ্যা ৫। ডিজাইন, গ্রাফিক আর্ট, স্কাল্পচার, হিস্ট্রি অফ আর্ট এবং পেইন্টিং। অধ্যাপকের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ। এ ছাড়াও আছে নন্দন মিউজিয়াম। ভারতবর্ষের সমস্ত প্রান্ত থেকে তো বটেই এমনকী ভারতবর্ষের বাইরে, প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের নানা দেশ থেকে অনেক দিন থেকেই পড়তে আসেন ছাত্রছাত্রীরা। রাজ্য, দেশ, ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতির সীমানা অতিক্রম করে আজ কলাভবন আক্ষরিক অর্থেই একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। স্বভাবতই তার প্রতিফলন ঘটছে ছাত্রছাত্রী এমনকী অধ্যাপকদের শিল্পকর্মের মধ্যেও। নানা দেশের রং–রূপ মিলেমিশে, নানা সংস্কৃতির আদানপ্রদানে দিগন্ত খুলে যাচ্ছে নতুন নতুন শিল্পভাবনার, শিল্পমাধ্যমেরও।
তবু প্রশ্নচিহ্ন আজও অনেকের মনেই। কী হবে কলাভবনে পড়ে? কী হবে শিল্পী হয়ে?
১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ‘কলাবিদ্যা’ প্রবন্ধে যা লিখেছিলেন আজ ২০১৮–তে দাঁড়িয়ে সেই একই সুর শুনতে পাওয়া গেল কলাভবনের প্রাক্তন অধ্যাপক এবং প্রখ্যাত শিল্পী যোগেন  চৌধুরীর কথাতেও। তিনি বলছেন, ‘শিল্পকলা, ছবি আঁকা বিষয়গুলি আজ উন্নত সমাজের লক্ষণ। আমরা সেইরকম উন্নত অবস্থায় এখনও পৌঁছইনি। আমাদের সমাজে শিল্পকলাকে এখনও খুব অপ্রয়োজনীয় বলেই ধরা হয়। কেউ কেউ বাবা-মা-পরিবারের কথা না শুনে, জোর করে, মতিগতি স্বাভাবিক নয় বলেই প্রায় শিল্পকলার মধ্যে ঢুকে পড়ে। এরকম একটা সামাজিক অবস্থা আমাদের দেশে এখনও রয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয় যখন একটা সমাজ সত্যিই উন্নত হবে, তখন শিল্পকলা সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করবে। আজও আমাদের সমাজে শিল্পকলার কোনও আদর নেই তার কারণ শিল্পকলা যে সমাজে কতটা বিবর্তন নিয়ে আসতে পারে, সৌন্দর্য নিয়ে আসতে পারে, মানুষকে কোথায় পৌঁছে দিতে পারে, সেই শিক্ষা আমাদের মধ্যে এখনও হয়নি। আমরা বুভুক্ষু। আমরা এখনও ঠেলেঠুলে ছেলেকে পড়তে বসাই। বলি পড়ছিস না কেন! বাবা-মা সবাইকে ডাক্তার করবে, ইঞ্জিনিয়ার করবে অথবা নিদেনপক্ষে কেরানি। এই সমাজ আমার কাছে মনে হয় এখনও খুব অনুন্নত। শিল্পকলা মানে শুধু ছবি আঁকা নয়। ডিজাইন আছে, আর্কিটেকচার আছে, টাউন প্ল্যানিং আছে...শিল্পকলা একটা সামগ্রিক বিষয়। শিল্পকলা যখন সামাজিক বিবর্তন নিয়ে আসবে, তখন আমাদের মানসিক পরিবর্তন আসতে বাধ্য। আমি বিশ্বাস করি সামগ্রিক শিল্পকলার মাধ্যমে মানুষের মনে সৌন্দর্যবোধ আসবে, শান্তি আসবে, কমে যাবে রেষারেষি, খুনোখুনি।’
শিল্পীরা দূরদর্শী হন। কলাভবনের শতবর্ষে না হোক, সার্ধশতবর্ষে হয়তো এমন একটা দিন আসবে যেদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে ডেকে দুধের গেলাস হাতে দিয়ে মা ছেলেমেয়েকে বলবেন ‘আঁকতে বোস বাবা!’ ■

 

 

গান্ধীজিকে হরিপুরা পোস্টার দেখাচ্ছেন নন্দলাল বসু। নন্দন-এ যোগেন চৌধুরী

তথ্যসূত্র :
১। রবীন্দ্র রচনাবলী
২। রবিজীবনী : প্রশান্তকুমার পাল
৩। চিত্রকর : বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়
৪। চিত্রকথা : বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়/কাঞ্চন চক্রবর্তী (সম্পাঃ)
৫। কলাভবন: এন ওভারভিউ : সৌমিক নন্দী মজুমদার, অংশুমান দাশগুপ্ত (সম্পাঃ)
৬। দা মেকিং অফ আ কন্টেক্সচুয়াল মডার্নিজম : আর শিবকুমার

ঋণ শ্বীকার :
১। নন্দন মিউজিয়াম, বিশ্বভারতী
২। রবীন্দ্রভবন, বিশ্বভারতী
৩। অধ্যাপক গৌতম দাস, অধ্যক্ষ, কলাভবন, বিশ্বভারতী‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top