বিজ্ঞানে আবিষ্কারের ঔজ্জ্বল্য যতই চোখ ধাঁধিয়ে দিক, প্রশ্ন উঠছে তার ভবিষ্যৎ নিয়েও। বিজ্ঞান ফ্র‌্যাঙ্কেনস্টাইনের দৈত্য হয়ে উঠবে না তো?‌‌ উত্তর খুঁজলেন আশীষ লাহিড়ী

বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নিয়ে কথা বলার বিপদ অনেক। ভেবে দেখুন, এ বিষয়ে মহা‌–‌মহা বিজ্ঞানীদের ভবিষ্যদ্বাণী কতবার ভুল প্রমাণিত হয়েছে। উনিশ শতকের শেষে জগদ্বিখ্যাত পদার্থবিদ লর্ড কেলভিন ‘‌‌প্রমাণ’‌ করে ছেড়েছিলেন, সূর্য নিভতে চলেছে, আর শক্তির অভাবে পৃথিবীর ‘‌ফুটুর ডুম’‌। কিন্তু শেষের সেই ভয়ঙ্কর দিনের ভবিষ্যদ্বাণীকে একেবারে তছনছ করে দিয়েছিল শক্তির এক নতুন উৎসের আবিষ্কার। সে–‌উৎস নিহিত পরমাণুর মধ্যে। সে–‌ভাণ্ডার কার্যত অনিঃশেষ। আর যাই হোক, শক্তির অভাবে শুকিয়ে মরতে হবে না পৃথিবীকে। তবে মরবার অন্য অনেক সুচারু পন্থা তৈরি করে নিতে পারবে পরিবেশ‌হন্তা মানুষ, এমন ‘‌ভরসা’‌ আছে।
মলিকিউলার বায়োলজির প্রশস্ত মোহানায় আজ এসে মিশেছে জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন। ওইদিকেই কি বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ? শোনা যাক আণবিক জীববিজ্ঞানী তুষার চক্রবর্তীর কথা। ‘‌১৯৮০-র শেষে যখন মানব জিনোম প্রকল্প হাতে নেওয়া হল, তখন অনেকে মনে করেছিলেন, জীবনের সমস্ত রহস্য বুঝি এবার চিচিং ফাঁকের মতো খুলে যাবে। প্রকল্পের প্রোমোটাররা এই ধারণাকে প্রশ্রয় দিয়ে যান একনাগাড়ে।’‌ ‌কিন্তু প্রকল্প শেষে কবুল করা হল, এ নিয়ে অকারণ বড্ড মাতামাতি করা হয়েছিল। ‘‌জিনোম ঘেঁটে নতুন কিছুই জানা যায়নি।’‌ জিনোম–‌উত্তর কালে একুশ শতকের জীববিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে ‘‌সিন্থেটিক বায়োলজি’‌, যা ব্যাকরণ না–‌মানা ‘‌সৃষ্টিছাড়া জীব নির্মাণের এক অভিনব কর্মসূচি।’‌ ভবিষ্যতে সে ‌পথেই কি বিজ্ঞানের ক্রমমুক্তি হবে? এই নতুন বিষয়টির ‘‌বর্তমান উত্থানের পিছনে কিন্তু বাণিজ্যবৃদ্ধির ভূমিকা কিছু কম নয়।’‌ (তুষার চক্রবর্তী, জৈবনিক)। কেনই বা কম হবে। বিজ্ঞানে বসতে লক্ষ্মী, এ তো এখন স্বতঃসিদ্ধ। 
মর্ত্যসীমা পেরিয়ে প্রাণের সন্ধানে বিজ্ঞানের আরেক অপ্রতিরোধ্য ভবিষ্যৎ রচিত হচ্ছে কম্পিউটারকে ঘিরে। সেও নয় অবিমিশ্র আনন্দের কাহিনী। স্টিফেন হকিংয়ের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বলে বলীয়ান কম্পিউটাররা একদিন মানুষের ওপর টেক্কা দেবেই। তারা ব্রহ্মাণ্ডের কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর সঙ্গে ‘‌লাইন’‌ করে মর্ত্যের মানুষকে স্রেফ চাকরবাকর বানিয়ে ছাড়বে। এসব কথা অবশ্য সায়েন্স ফিকশনে আমরা অনেক দিন ধরে পড়ছি। এত রবীন্দ্রনাথ, এত শেক্‌সপিয়ার, এত দান্তে-কালিদাস কপচে, শেষকালে কিনা কতকগুলো রোবটের ঘর ঝাঁট দেওয়ার চাকরি জুটবে মানুষের কপালে! না, হকিং বলেছেন, এই ভয়ানক পরিণাম থেকে মুক্তি পাওয়ার রাস্তাও দেখাবে ওই বিজ্ঞানই। রাস্তাটা হল, দেশ— মানে পৃথিবী— ছেড়ে পালানো, গ্রহান্তরী হওয়া।
এ ভাবনাটাও অবশ্য নতুন নয়। স্বপ্নদর্শী বিজ্ঞানী জে ডি বার্নাল ১৯২৭ সালেই মহাকাশে মানুষের কৃত্রিম বাসস্থানের একটা মডেল এঁকেছিলেন, যা পরে নাসার কল্যাণে ‘‌বার্নাল স্ফিয়ার’‌ নামে খ্যাত হয়েছে। যদিও তখন মহাকাশভ্রমণ দূরস্থান, রকেট–‌প্রযুক্তিই ভালো করে বিকশিত হয়নি।
তত্ত্বগতভাবে বিজ্ঞান মাঝে মাঝেই ‘‌সবজান্তা’‌ হয়ে গেছি বলে হাত–‌পা ছোঁড়ে।  ক্রিক–‌ওয়াটসনের ঘোরানো–‌প্যাঁচানো সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে প্রাণের স্বরূপ নিয়ে এরকম দাবি হরদম শোনা যায়, যার সবটা একেবারে ফেলনা নয়। পদার্থবিজ্ঞানের দিক থেকে হকিংও ‘‌থিওরি অব এভরিথিং’‌-এর কথা বলেছেন। স্টিভেন ওয়াইনবার্গ–‌এর একটি বিখ্যাত বইয়ের নামই তো ‘‌ড্রিম্‌স অব এ ফাইনাল থিওরি’‌–‌ চরম তত্ত্বের স্বপ্নদর্শন। অথচ বিজ্ঞানের ইতিহাস বলছে, যতবারই ওইরকম ‘‌সব–‌জানি’‌ তত্ত্বের কথা উঠেছে, ততবারই দেখা গেছে, থিওরিটা ফাইনাল নয়, বড়জোর কোয়ার্টার ফাইনাল। সেখান থেকে ‘‌ডিস্‌কোয়ালিফাইড’‌ হয়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু নয়। ওয়াইনবার্গ আশাবাদী। তিনি বলছেন:‌ ‘‌এই চরম তত্ত্বে পৌঁছতে হয়ত শত শত বছর কেটে যাবে। হয়ত দেখা যাবে, এখন আমরা যা-কিছু কল্পনা করতে পারি, তা থেকে একেবারেই অন্যরকম হবে সেই চরম তত্ত্ব।’‌ সেটা খুব আশ্চর্যর নয়:‌ থালেস-এর পক্ষে কি নিউটনের ভাবনা ভাবা সম্ভব ছিল, কিংবা নিউটনের পক্ষে আইনস্টাইনের? 
ধরা যাক, সুদূর কোনো ভবিষ্যতে মানুষ একখানা চরম তত্ত্ব সত্যিসত্যিই আবিষ্কার করে ফেলল, ‘‌চিরপ্রশ্নের বেদিসম্মুখে’‌ সে আর ‘‌অবাক নিরুত্তর’‌ রইল না। সেক্ষেত্রে কী হবে? তখন ‘‌আমাদের হয়ত আক্ষেপ হবে এই ভেবে যে প্রকৃতি বড়ো ম্যাড়মেড়ে হয়ে গেল, এখনকার মতো আর বিস্ময় ও রহস্যে ঠাসা রইল না।’‌ তখন কি বিজ্ঞানের সামনে চর্চা করিবার মতো বিষয় কম পড়িবে? মোটেই নয়। ‘‌অজস্র বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন তখনো থাকবে, আর অনুসন্ধানের জন্য আস্ত একখানা ব্রহ্মাণ্ড তো থাকবেই’‌ কিন্তু, ওয়াইনবার্গ বলছেন, ‘‌সেদিনের বিজ্ঞানীরা আজকের পদার্থবিজ্ঞানীদের একটু একটু হিংসে করবে এই ভেবে যে, আজকে আমরা সেই চরম তত্ত্ব আবিষ্কারের রোমাঞ্চকর অভিযাত্রায় এখনো মেতে আছি। ‘‌অর্থাৎ আমার— আমাদের–‌ এই পথ-চাওয়াতেই আনন্দ।’
বিজ্ঞান সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের কথাই মানতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। মাঝে মাঝে বিচক্ষণ অবিজ্ঞানীদের কাছ থেকে একটু আধটু কানমলা খেলে বিজ্ঞানীদের উপকারই হবে। ইংরেজি সাহিত্যের স্বনামধন্য অধ্যাপক গৌরীপ্রসাদ ঘোষ আধুনিক বিশ্বতত্ত্ব সম্বন্ধে প্রগাঢ় জিজ্ঞাসুও বটেন। তিনি নানা দিক থেকে বিজ্ঞানের- মূলত কসমোলজির- ছুঁড়ে-দেওয়া প্রশ্নগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করেছেন। আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘‌বিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য এই যে বিশ্ব আমাদের বোধগম্য।’‌ গৌরীবাবুর ভাষায়, ‘‌এই বিপুল ও বিচিত্র বিশ্বের গঠন যে আমরা কিছুটা বুঝতে পারি, এর থেকে মনে হয়, বিশ্বকে এমনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছিল যাতে সেখানে মানুষের মতো মেধাসম্পন্ন জীব জন্মায়, যারা বিশ্বের এই পরমাশ্চর্য গঠন ও তাৎপর্য নিয়ে চিন্তা করতে পারে।’‌ (‘‌মহাবিশ্বে মহাকাশে’‌)। এককথায়, সৃষ্টির মূলে রয়েছে এক ‘‌বুদ্ধিজাত পরিকল্পনা’‌, অনেকে যাকে বলেন ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন। কে সেই বুদ্ধিধর? 
‘‌পারসোনাল গডে’‌ অবিশ্বাসী জয়ন্তবিষ্ণু নারলিকর অবাক হয়েছেন ভেবে যে, পৃথিবীর মানুষের তৈরি অঙ্ক কোটি কোটি যোজন দূরের জ্যোতিষ্কদের গতিবিধির হিসেব এমন নিখুঁতভাবে মেলাচ্ছে কী করে? ঘুরেফিরে তাহলে আমাদের কি সেই ‘‌নিহত উজ্জ্বল’‌; ঈশ্বরেরই দ্বারস্থ হতে হবে?
এর পালটা মতটাও কিছু কম জোরালো নয়। সে-শিবিরের অন্যতম সেনাপতি সুব্রহ্মণ্যম চন্দ্রশেখর। আর  ওয়াইনবার্গ-এর উক্তিটি তো কিংবদন্তিসম প্রসিদ্ধি অর্জন করেছে:‌ বিশ্বটা যতই বোধগম্য হয়ে উঠছে, ততই যেন মনে হছে এটা অর্থহীন। এর পেছনে কারও কোনো সচেতন পরিকল্পনা ছিল না। অল্পকাল আগে হকিংও সেই কথাই বলেছেন। ফ্রান্সিস ক্রিকের মত, মানুষের চৈতন্যর মূলে আছে অণু-পরমাণুরই জটিল কারসাজি। 
‘‌চরম’‌ সত্যর সন্ধান কোনোদিনই কি পাবে মানুষ?
কেবল একটা ব্যাপার নিশ্চিত:‌ বিজ্ঞানের সঙ্গে প্রশ্ন-থামানো যোগনিদ্রার বরাবরের আড়ি। বিজ্ঞান কখনো ছাত্রীকে যাজ্ঞবল্ক্য ঋষির মতো ধমক দিয়ে বলবে না:‌ খবরদার গার্গী, আর প্রশ্ন কোরো না, অত প্রশ্ন করলে মুণ্ডু খসে পড়বে। আজকের মুনাফা আর যুদ্ধতাড়িত বিজ্ঞানের শত কুকীর্তির মধ্যেও শুধু ওই স্বাধীনতার পরিসরটুকুর জন্যই আমরা তার আশ্রয় কখনো ছাড়ব না।‌‌ ■

লেখক  বিশিষ্ট বিজ্ঞান–‌লেখক। ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top