মীনাক্ষী দত্ত: উপন্যাসে পড়েছি Coming out ‌পার্টির কথা, আমেরিকায় প্রবাসীদের মধ‌্যে তা Sweet Sixteen ‌পার্টিরূপে পরিচিত। ডাঃ ফারুক আজম ‌ও তাঁর স্ত্রী নওরিন কাদিরের তৃতীয় কন্যার ষোলো বছর হল। সেদিন সন্ধ্যায় ‘‌রসুই’‌ রেস্তোরাঁয় ছিল তার দেবুতঁ (‌Debut)‌।
ব্যাঙ্কোয়েট হলে ঢুকে দেখি একেবারে ভর্তি (‌পরে জেনেছি ৩০০ নিমন্ত্রিত)‌। ইতস্তত করছি, ফারুক এগিয়ে এল। সামনের সারি থেকে দুটি তরুণ–‌তরুণীকে তুলে সে আমাদের বসার আসন করে দিল। কিন্তু কথা বলার সুযোগ হল না, কারণ মঞ্চ থেকে সঞ্চালক ঘোষণা করলেন যে ‘‌দেবুতঁ’‌র পিতার মঞ্চে আগমন প্রয়োজন।‌ সেই সৌভাগ্যবান ধীর পদক্ষেপে সস্ত্রীক মঞ্চে উঠে কন্যার দু’‌পাশে দাঁড়ালেন। যৌবন নিকুঞ্জ বনে কন্যাকে উপস্থিত করতে হবে। বাজনা বেজে উঠল। ছোট, কিন্তু অতি মনোরম বক্তৃতার পর ফারুক কন্যার হাত ধরে প্রথম নাচ শুরু করলেন।
এই মুহূর্তটি যে–কোনও অভিবাসীর কাছেই মূল্যবান, এই সন্ধ্যা তারও আমেরিকার মাটিতে সাফল্যের স্বীকৃতি।
ফারুকের জীবনে ‘‌আমেরিকান ড্রিম’‌ বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রিন্সটনের পার্শ্ববর্তী মনমথ জংশনের এক্সক্লুসিভ পাড়ায় তার ম্যানসন, একাধিক মার্সিডিজ, বিএমডব্লু ও মনোচিকিৎসক হিসেবে পসার। তার স্ত্রী মুনমুন (নওরিন)‌ সুন্দরী ও উৎকৃষ্ট গৃহপরিচালিকাই শুধু নয়, সে বিদুষী ও সাহিত্যপ্রেমী। তিন মেয়ে ও এক ছেলে তাদের। গ্যারাজ শুধু গাড়িতে ভরা নয়, বইয়ের তাকেও ভরা। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব নিউ জার্সির সে প্রেসিডেন্ট। সভা, সমিতি, নানান প্রতিষ্ঠানে তার ডাক। সকলের দৃষ্টিতে তার জীবনের পানপাত্র ভরা।
তবু ফারুকের কেবলই মনে হয় অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে। ওর সোনার হরিণ হচ্ছে শিল্প। সে পেতে চায় অভিনেতা, আবৃত্তিকার, কবিরূপে সিদ্ধি। সমাজে যত উচ্চাসনেই সে বসুক, সে চিরমুসাফির, চিরবিরহী।
তার জন্ম:‌ গ্রাম মিরজাখিল, থানা সাতকানিয়া, জেলা চট্টগ্রাম। মা মাহ্‌বুবা খাতুনের আঁচলের আশ্রয় থেকে আব্বা মুজিবুল হক চৌধুরি বালক বয়েসেই তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন সিলেটে, যেখানে চৌধুরিসাহেব সাতটি সন্তান–সহ স্ত্রীকে ফেলে দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে পেতেছেন নতুন সংসার। পরিত্যক্ত পরিবারের ভার নিয়েছিলেন তাঁর প্রথম সন্তান, মেয়ে চমন আরা। চমন আরা ডাক্তার, তাঁর স্বামী আইনজীবী। তাঁরা পুরো পরিবারকে চালিয়ে নিলেন শুধু নয়, দিলেন গতি, দিলেন শিক্ষা। নিজের সন্তানদের সঙ্গে মেয়ের চারটি সন্তানকেও লালন করলেন মাহ্‌বুবা খাতুন।
আর শ্রীহট্টে বালক ফারুক মানুষ হচ্ছে বিমাতার উদাসীনতার নিঃসঙ্গতায়। নিজের নামের আদ্যাক্ষরের মান রেখেছিলেন মাহ্‌বুবা। ছেলেমেয়েদের দেহের শুধু নয়, মনেরও পুষ্টির ভার তাঁর। নিজে প্রচুর পড়তেন এবং ছেলেমেয়েকে পড়ে শোনাতেন। শুধু বাংলা সাহিত্যই নয়, অনুবাদে বিশ্বসাহিত্য। সিলেটে আব্বার নতুন সংসারে ফারুক নির্বাসিত মায়ের বোধ ও মননের জগৎ থেকে। সেই শুরু তার নির্বাসনদণ্ডের। বাবা ভর্তি করে দিয়েছেন ক্যাডেট স্কুলে। সূক্ষ্ম অনুভূতি নয়, চলছে শরীরচর্চার অনুশীলন— হকি, ফুটবল, কুস্তি। অথচ ওর স্বপ্ন ও হবে অভিনেতা, আকাশকুসুম চয়ন করে সে যাবে লন্ডনে রয়্যাল অ্যাকাডেমি অফ ড্রামাটিক আর্টসে (‌রাডা)‌, শিখবে অভিনয়কলা। অথবা যাবে পুনের ফিল্ম ইনস্টিটিউটে নাসিরুদ্দিন–‌স্মিতা–‌জয়ার মতো। বাস্তবে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে তাকে বসতে হচ্ছে মেডিক্যাল কলেজের প্রবেশিকা পরীক্ষায়। পরিবারে দিদি যা বলেন, তা–‌ই হয়। এক্ষেত্রে দিদিও বাবার সঙ্গে একমত, মাও এমন–কি। ডাক্তার ওকে হতেই হবে। নিজের ইচ্ছা–অনিচ্ছার বালাই নেই। কোথায় রাডা!‌ কোথায় পুনে!‌ ভর্তি হল চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে।
আবার চট্টগ্রাম অন্তত। আবার মা–‌দিদির সংসারে একটু অনুভূতি, একটু শিল্পের ছোঁয়া। কলেজ পত্রিকার সম্পাদনা করে, কলেজ নাটকে অভিনয় করে, পড়াশুনোর ফাঁকে ফাঁকে কবিতা পড়ে, কবিতা লেখে— ক্যারিকুলামের বাইরে এইটুকুই যা বিহার।
ডাক্তারি পাস করল ১৯৮৪ সালে। তক্ষুনি পেশার খাঁচায় না ঢুকে মুক্তির অন্যপথ খুঁজতে লাগল। দিদিকে বলল, ‘‌আমি আমেরিকায় গিয়ে ‘‌‘‌ফরেন মেডিক্যাল গ্র‌্যাজুয়েটস’’‌‌‌‌–‌এর পরীক্ষা দেব।’‌ তার আগে অবশ্য তাকে পরীক্ষার্থী হয়ে আবেদন করতে হয়েছিল। ওর আবেদন মঞ্জুর হল, পরীক্ষা দিতে যাওয়ার জন্য ছয় মাসের ভিসা পেল।
আমেরিকায় আসছে, জানে না কোথায় উঠবে।  এক বন্ধু বলেছিল, চলে আয় তো, দেখা যাবে। এয়ারপোর্ট থেকে সেই বন্ধুকে ফোন করে জানা গেল নম্বর বদলে গেছে। আরেক বন্ধুকে ফোন করতে তার স্ত্রী জানাল সে মারা গেছে। একটার পর একটা চেষ্টা করার পর এক বন্ধুকে পেল যে তখনকার মতো বাড়িতে ওঠার অনুমতি দিল। ‘‌আমি নিজেই দারুণ দুরবস্থায় আছি। ঠিক আছে, এসে ওঠ তো, দেখা যাবে।’‌
বন্ধু রেস্তোরাঁর ওয়েটার, ফারুকও সে পেশা ধরল। তাতে সপ্তাহে একশো–দেড়শো ডলার হয়, অন্যদের সঙ্গে একঘর শেয়ার করে থাকে। অন্য বাঙালিদের সঙ্গে আলাপ হচ্ছে, সামাজিক অনুষ্ঠানে একটু–আধটু ডাক পড়ছে। এমন সময় ফোন এল:‌ ‘‌পালাও। ইমিগ্রেশন হানা দিচ্ছে তোমাদের রেস্তোরাঁয়।’‌ পালাল।
এরপর কাজ পেল ম্যানহাটানের এক ‘‌গিফ্ট’‌ শপে, একেবারে টাইম স্কোয়্যারের ওপর। ‘‌গিফ্ট‌ শপ’‌। দোকাটের প্রচ্ছদ, আসল কাজ চলে ভেতরে। নকল আইডি ছাপার কাজ, ছাত্ররা ভিড় করে আসে, বয়স বাড়িয়ে ১৮ করিয়ে নেয় (‌১৮–‌র আগে মদ কেনা যায় না)।‌ নানারকম নারীপুরুষ আসে বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে চোরাই জিনিস এনে বিক্রি করে— ফেন্সিং যাকে বলে। 42nd S‌treet ‌আর 7th Avenue‌–‌তে দিবারাত্র সমান। এই দোকানেই কেটেছে ফারুকের সবচেয়ে মুক্ত, উত্তেজক সময়। ইহুদি মালিক, নাম ছিল ফ্রেডি, অতি দিলদরিয়া, ‌আমুদে ও ধান্দাবাজ মানুষ, কূটবুদ্ধির অভাব নেই। ফারুককে খুব প্রশ্রয় দিত। রোজ লাঞ্চ খাওয়াত।
১৯৮৮–‌তে অ্যামনেস্টি ঘোষণা করা হল। ফারুক পরীক্ষা পাস করে অনায়াসে, সেই ‘‌ফরেন মেডিক্যাল গ্র‌্যাজুয়েটস’‌ পরীক্ষাও পাস করেছে। অ্যামনেস্টিতে পেয়ে গেল গ্রিন কার্ড ও ব্রুকলিন কিংস কাউন্টি হসপিটালে মনোচিকিৎসা বিভাগে রেসিডেন্সি। এখন সারা আমেরিকার দরজা তার কাছে খোলা।
আমাদের বাড়িতে ফারুক এসেছিল বাবার জন্মদিনের ঘরোয়া বৈঠকে। অনীশ মৈত্র ও সুপর্ণা গুহ বুদ্ধদেব বসুর ‘‌পঁচিশ বছর আগে— অথবা পরে’‌ নাটকটি অভিনয় করেছিলেন। স্মৃতি থেকে, সঠিক ছন্দে, আবেগমথিত গলায় বুদ্ধদেব বসুর ‘‌সমর্পণ’‌ আবৃত্তি করেছিল ফারুক।
বাবার শতবর্ষ উপলক্ষে যখন নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সিবাসী বাঙালিরা আমাকে অনুষ্ঠান পরিচালনার ভার দিলেন, আমার প্রথমেই মনে পড়ল ফারুকের কথা। আমার ছেলে গোগো (‌মল্লিনাথ)‌, ফারুক আর আমি মিলে ঠিক করলাম বাবার ‘‌সত্যসন্ধ’‌ নাটকটা করব। কয়েকদিনের মধ্যে বারো–চোদ্দোজন সদস্য হয়ে গেল আমাদের নাটকদল ‘‌আস্থা’‌–‌র (‌American Society for Theatrical Arts)‌। নায়ক অবশ্যই ফারুক, দু’‌দুটি কমিক ক্যামিও রোলে অভিনয় একাই গোগো করে  হাসির রোল তুলেছিল। মঞ্চে খালি গলায় একটি শ্যামাসঙ্গীত গেয়ে সে আমাকে অবাক করেছিল। বনানী ঘোষ বলেছিলেন, ‘‌তোর এত ভাল গলা!‌ কাল থেকে আমার স্কুলে আসবি।’‌
এরপর থেকে ২০০৮ থেকে ১০১৫ অবধি ‘‌আস্থা’‌ বাবার জন্মদিন ৩০ নভেম্বর পালন করেছে মহাসমারোহে।
গোগোর ইংরেজি ছবি 'Full Masti' ‌ও বাংলা ছবি ‘‌কার্তুজ’‌–‌এ ফারুক অভিনয় করেছে। ফাটাফাটি। আরও একটি বাংলা ছবিতেও। কিন্তু ও আরও আরও ক্যামেরায়, মঞ্চে তুলিতে কলমে উত্তরণ চায় জীবনে। ও চায় ওর নিজের জীবনের ছবি হবে একটা Overlap— ‌প্রমথেশ বড়ুয়া, লর্ড বায়রন ও অস্কার ওয়াইল্ড। আমরা প্রত্যেকেই কি একটু একটু তাই চাই না?‌‌‌ ■

ডাঃ ফারুক আজম ‌

জনপ্রিয়

Back To Top