বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম মহীরুহ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন চলে গেল ৮ শ্রাবণ। এই বর্ণময় মানুষটিকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন বিশিষ্ট লেখক ও প্রকাশক সবিতেন্দ্রনাথ রায়। তিনি এই পাতার জন্য লিখলেন ‘‌তারাশঙ্করকে যেমন দেখেছি’‌। ছবি: দেবব্রত ঘোষ

নিদারুণ অর্থকষ্ট এবং সেই সঙ্গে উথাল–‌পাতাল রাজনৈতিক ঘটনা অনেক মানুষের জীবন–‌গতিপথ অদ্ভুতভাবে বদলে দেয়। বেড়ে উঠেছি মামার বাড়ির আশ্রয়ে, পিতা চোখে দেখতে পেতেন না। মামারা বাড়ি করেছিলেন পার্ক সার্কাসে। আমরা পড়তাম সেখানকার মডার্ন হাইস্কুলে। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট শুরু হল ভয়ংকর ঝামেলা‌।  আমরা উদ্বাস্তু হয়ে এলাম ঢাকুরিয়ায়। এখানে এক মামা থাকতেন। তাঁরই বাড়িওলা সম্পর্কে কুটুম্ব, তাঁদের আশ্রয়ে। তারপর স্বতন্ত্র বাড়ি ভাড়া। কসবা চিত্তরঞ্জন হাই স্কুলে ভর্তি হলাম। নবম শ্রেণিতে। মাস্টারমশাই আমাকে বাজিয়ে দেখলেন, তারপর অভিভাবকের কাছে নির্দেশ। একটু কোচিং করালে ম্যাট্রিকে ভাল ফল হতে পারে।
মা বললেন, চিরকাল ভাইদের আশ্রয়ে থাকা, খাওয়া–পরা, কোন মুখে বলব কোচিংয়ের কথা। যে পাড়ায় উঠেছিলাম, সে পাড়ায় শুনতাম প্রতিমা মিত্রর অনারারি কোচিং ক্লাস। মা গিয়ে ধরলেন প্রতিমাদেবীকে আমাকে একটু দেখিয়ে দেওয়ার জন্য পড়াশোনা, কীভাবে ভাল নম্বর ওঠে। প্রতিমাদেবী মায়ের অনুরোধ ফেরাতে পারলেন না। তখনকার দিনের বেথুনের গ্র‌্যাজুয়েট।
প্রতিমাদেবীর একটু পরিচয় দিই। ইনি সাহিত্যিক গজেন্দ্রকুমার মিত্রের পত্নী। গজেন্দ্রকুমার মিত্র ও তাঁরই সাহিত্যিক বন্ধু সুমথনাথ ঘোষের প্রতিষ্ঠিত এ কালের বিখ্যাত প্রকাশন প্রতিষ্ঠান মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স।
প্রতিমা মিত্রর কোচিংয়ে দেখলাম নানান শ্রেণির পড়ুয়া। পঞ্চম শ্রেণি থেকে অষ্টম। আমিই একমাত্র নবম শ্রেণির ছাত্র। দেখতে দেখতে নবম শ্রেণি উত্তীর্ণ হয়ে দশম শ্রেণি এবং ম্যাট্রিক পরীক্ষাও দিয়ে ফেললাম। কাকিমা (‌আমরা প্রতিমা মিত্রকে সবাই কাকিমা এবং গজেন্দ্রকুমার মিত্রকে কাকাবাবু বলতাম)‌‌ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ভানু ম্যাট্রিক পাশ করে কী করবে?‌
আমি বললাম, সকালে একটা চাকরি করব, আর রাত্রে পড়ব।
কাকিমা বললেন, তাই যদি করবে তুমি এখনই মিত্র–‌ঘোষে ঢুকে পড়ো। আমি বলে দিচ্ছি, ওখানে সকালে কাজ করবে আর সন্ধেবেলায় সুরেন্দ্রনাথ, বঙ্গবাসী বা সিটি যেখানে সুবিধে পাও পড়বে। সবই কাছাকাছি।
১৯৪৯ সালের মে মাসের গোড়ার দিকে ‘‌মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স’‌–এ প্রবেশাধিকার পেলাম। তখনও ম্যাট্রিক পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোয়নি।
সেই সময় শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট এখনকার মতো এত অপরিসর ছিল না। দোকান ঘর বা স্টল নিজস্ব জায়গা উপচে রাস্তার ওপর নেমে আসেনি। ট্যাক্সি বা তখনকার ল্যান্ডমাস্টার গাড়ি অনায়াসে যাতায়াত করতে পারত। আমাদের কাউন্টারে তখন তিনজন কর্মী— ম্যানেজার প্রফুল্লকুমার বসু, সহকারী কৃষ্ণচন্দ্র পাল এবং নবীনতম আমি।
দেখতাম যত না বই কেনা–‌বেচা, তার থেকে বেশি আড্ডা। কাউন্টারের একদিকটা বই বেচা–‌কেনা, বাকি অর্ধেকটা টেবিলজুড়ে বসে কবিশেখর কালিদাস রায়, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সজনীকান্ত দাস, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। বনফুল, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় কলকাতা এলে, প্রবোধকুমার সান্যাল–‌প্রমথনাথ বিশী–‌কে নয়! গজেন্দ্রকুমার মিত্র, সুমথনাথ ঘোষ, গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য তো রোজ থাকতেনই। গৌরীদার পৃথক প্রকাশনী–‌মিত্রালয় নামে। তাঁর প্রকাশিত বই অবশ্য বিক্রি হত মিত্র–‌ঘোষ কাউন্টার থেকেই।
এখন ভাবি, ভাগ্যিস অর্থকষ্ট ছিল, ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েই এখানে এসেছিলাম। তা না হলে কি এই জ্যোতিষ্ক‌মণ্ডলী দেখতে পেতাম!‌ বিভূতিভূষণ ঠিকই বলেছিলেন— দারিদ্র‌্য মানুষের জীবনে এক মহৎ সম্পদ!‌ অবশ্য যে বুঝতে পারে।
একদিন কাউন্টারে বসে আছি। একজন–‌দুজন ক্রেতা আসেন। আমি, মাঝে মাঝে প্রফুল্লদা ক্যাশ মেমো কাটি। আমরা দুজনেই যখন স্বল্পব্যস্ত, একটি হিন্দু্স্তান ফর্টিন গাড়ি কাউন্টারের সামনে এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে নামলেন সাদা আদ্দির পাঞ্জাবি পরা ফর্সা পাটভাঙা ধুতি, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা, পাশের দরজা দিয়ে দোকান–‌ঘরে ঢুকলেন। ঘরে ঢুকে প্রফুল্লদাকে তাঁর ডাক নামে বললেন, মন্টু, গজেন, সুমথ, গৌরী কেউ আসেনি?‌
প্রফুল্লদার পাশে আমাকে দেখে বললেন, এটি নতুন?‌ প্রফুল্লদা বললেন, মামারা এসে পড়বেন এখনই। আমাকে অনুচ্চ স্বরে বললেন, ভানু প্রণাম করো, ইনিই তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, যাঁর বই বিক্রি করলে এখনই।
প্রণাম করতে তারাশঙ্কর মাথায় হাত দিলেন, পরে প্রফুল্লদাকে বললেন, একে আমি কোথাও দেখেছি।
প্রফুল্লদা বললেন, ওকে ঢাকুরিয়ার মামার বাড়িতে দেখেছেন। মাসিমার কাছে পড়ত।
তারাশঙ্কর বললেন, ঠিক ঠিক, ওখানেই দেখেছি। মন্টু, আমার আজ তাড়া আছে, গজেনদের সঙ্গে দেখা হবে না। তুমি আমাকে কবি, মন্বন্তর আর পঞ্চগ্রাম দুই কপি করে দাও। ওই ড্রাইভার ‌করালীকে নিয়ে যেতে বলো। একজন চেয়েছে।
তারাশঙ্কর উঠতে না উঠতে কবিশেখর কালিদাস রায় কাউন্টারের বাকি অর্ধেকটায় বইয়ের র‌্যাকে ঠেস দিয়ে জুত করে বসলেন। তারাশঙ্কর কালিদাসবাবুকে দেখেই গিয়ে প্রণাম করলেন, কতদিন পরে দেখা হল কালিদা।
প্রণাম করতে কালিদাসবাবু বিব্রত। কী যে করিস, ব্রাহ্মণ হয়ে পায়ে হাত দিস না।
তারাশঙ্কর বললেন, কালিদা, আপনি কবি, ঈশ্বরতুল্য। উপনিষদে ঈশ্বরকে বলেছে, কবিমনীষী পরিভুঃ স্বয়ম্ভুঃ।
কালিদাসবাবু বললেন, সে যাক তো, তোর আর আমার পাড়া নিয়ে বাংলায় একটা প্রবাদ বেশ চালু হয়ে গেছে। টালা থেকে টালিগঞ্জ, তোর টালা আর আমার টালিগঞ্জ। তবে তফাত একটা আছে। তোর মাথার ওপর টালার বিরাট জলের ট্যাঙ্ক, অফুরন্ত জল। আমার পাড়ায় কিছু একটা হলেই জল বন্ধ, কর্পোরেশনের লোক আসবে, তবে জল পাব।
মনে পড়ে, আমরা তখন কাকিমার কাছে পড়ছি, আমার কান কিন্তু সজাগ থাকত, সাহিত্যিকরা এলে তাঁদের আড্ডার দিকে। বিভূতিভূষণ এসে উঠেছেন, কাকাবাবুর বাড়িতে। তারাশঙ্করবাবু এসেছেন দেখা করতে। বারান্দায় আমরা পড়ছি। আমার চোখ অবশ্য বইয়ের দিকে। কাকিমা তারাশঙ্করবাবুকে দেখে এসে প্রণাম করলেন।
পাঠরত ছাত্রছাত্রীমণ্ডলীকে দেখে তারাশঙ্কর বলেছিলেন, বউমা, তোমার এ সন্দীপন পাঠশালা তো বেশ জমে উঠেছে।
কাকিমা বোধহয় একটু ধরা গলায় বলেছিলেন, দাদা ঈশ্বর তো সন্তান দিলেন না, তাই এদের নিয়েই সময় কাটে।
তারাশঙ্কর আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, বউমা, সব গাছে ফল ধরে না। সব গাছ বীজ থেকেও জন্মায় না। তবে সে সব গাছের ডাল থেকে অন্য জায়গায় গাছ ছড়িয়ে পড়ে। গোলাপ ফুলের গাছের কথাই ভাবো না, সারা পৃথিবীর কোথায় গোলাপ নেই! তুমি যাদের পড়াচ্ছ, উত্তরকালে তারাই তোমার সন্তানের কাজ করবে।
এত বড় কথা আমি জীবনে আর শুনিনি। পরবর্তীকালে আজীবন মনে রাখার চেষ্টা করেছি।
সে সময়ে তারাশঙ্করের দেশজোড়া নাম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শরৎচন্দ্র পুরস্কার দিয়েছে। ওই খ্যাতির গম্ভীর ভাবের জন্য আরও সমীহ জাগত। তবু মাঝেমধ্যে নতুন সংশোধিত ‘‌কবি’ উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি আনতে যেতে হত। তারাশঙ্করবাবুর সংশোধন  মানে উপন্যাস প্রায় এক চতুর্থাংশ বেড়ে যেত।
তখন আমাদের ‘‌কথাসাহিত্য’‌ সবে বেরিয়েছে। ‘‌কথাসাহিত্য’‌ পত্রিকার জন্ম বলতে গেলে ওই আড্ডাতেই। ওই আড্ডার মধ্যেই একদিন বিভূতিভূষণ বললেন, আপনারা ‘‌কথাসাহিত্য’‌–তে  তারাশঙ্করের নামে একটা সংবর্ধনা সংখ্যা করুন। তারাশঙ্করের এখন খুব নাম। সবাই হইহই করে সমর্থন করল। আমার ওপর ভার পড়ল, কথাটা তারাশঙ্করবাবুকে পৌঁছে দেওয়ার। আমি কাকাবাবু গজেন্দ্রকুমারের পত্র নিয়ে গেলাম। সংখ্যাটি বেরোবে, উনি যেন অসন্তুষ্ট না হন। ‘‌কথাসাহিত্য’ পত্রিকায় উনি তখন ধারাবাহিক স্মৃতিকথা ‘‌আমার কালের কথা’‌ লিখছেন। আমি গিয়ে চিঠি দিতে উনি একটু হেসে বললেন, তারার সংবৃদ্ধি কেন। গজেনকে বোলো, ওটা যেন ‘‌অভিনন্দন সংখ্যা’‌ বলা হয়। সংবর্ধনা নয়। হ্যাঁ শোনো, বিভূতি লিখছে তো?‌ বললাম, হ্যাঁ, উনিই তো প্রস্তাব করলেন।
তারাশঙ্কর বললেন, হ্যাঁ, বিভূতি যেন অবশ্য লেখে।
সংখ্যাটি বেরোলে সংখ্যাটি হাতে নিয়ে গজেন্দ্রকুমার, প্রমথনাথ, গৌরীশঙ্কর— এঁদের সঙ্গে প্রফুল্লদা ও আমিও ৮ শ্রাবণ প্রায় ভোর–‌ভোরই টালায় তারাশঙ্করের বাড়ি পৌঁছলাম। একটু পরে তারাশঙ্কর তসরের ধুতি পরে এলেন, বোধহয় পুজো করছিলেন। তারপর ডেস্কের সামনে খাতা খুলে ইষ্টমন্ত্র বা ওইরকম কিছু লিখলেন। আমাদের প্রণাম ও মালা দেওয়ার পর আশীর্বাদ করে ডেস্কের সামনে বসলেন। ‌কথাসাহি‌ত্যের তারাশঙ্কর অভিনন্দন সংখ্যাটি উল্টেপাল্টে দেখলেন। বেশ খুশি হয়েছেন মনে হল।
একটু পরে সজনীবাবু এলেন, সজনীকান্ত দাস, সঙ্গে পাটুদা, হাতে ছোট একটু পুঁটুলি, বললেন, বড়বাবুর জন্য একটু মৌরলা মাছ নিয়ে এলাম।
সজনীবাবুও পত্রিকাটি উল্টেপাল্টে দেখলেন, বললেন, তোমরা একটা ভাল দৃষ্টান্ত রাখলে। বেশ ভাল কাজ।
ভেতর থেকে খাবার এল। বালুসাই দেখে গজেনবাবু বললেন, এ কি লাভপুরের বালুসাই?‌
তারাশঙ্কর বললেন, হ্যাঁ, কালই আনানো হয়েছে, তোমাদের জন্য। আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমরা হাত গুটিয়ে বসে কেন!‌ তোমরাও নাও।
কথায় কথায় তারাশঙ্কর বললেন, তোমরা এবার বিভূতির ওপর একটা সংখ্যা করো। এত বড় লেখক এবং এমনই নিরভিমান যে বলার নয়। আমার এই বাগানের মর্নিং গ্লোরি ফুল দেখে শিশুর মতো উৎফুল্ল। আমি তাই দেখে এই ফুলের বীজ দিলাম। ও যত্ন করে নিল, বলল কিছু লাগাব দেশে, ব্যারাকপুরে, আর কিছু ঘাটশিলায়।
ঠিক হল পুজোর পর অগ্রহায়ণ সংখ্যা বিভূতিভূষণের সংবর্ধনা সংখ্যা হবে। জন্মদিন তো ২৮ ভাদ্র, এত তাড়াতাড়ি হয়ে উঠবে না সংবর্ধনা সংখ্যা।
কিন্তু তার আগেই অঘটন ঘটে গেল। পুজোয় সব সাহিত্যিকরা ঘাটশিলা যান বিভূতিভূষণের আকর্ষণেই। এবারেও গিয়েছিলেন। গজেনবাবু যেতে পারেননি কী কারণে। বিভূতিভূষণ একটা বিজয়া সম্মিলনীতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। গজেনবাবু শুনেই ঘাটশিলা রওনা দিলেন। ৩১ অক্টোবর ১৯৫০। পরদিন দোকান খুলে বাজ পড়ার মতো খবর এল। বিভূতিভূষণ ওইদিন ভোরবেলা চিরতরে বিদায় নিয়েছেন। তাঁর বাড়িতেই। চিকিৎসা করছিলেন তাঁর ভাই ডাক্তার নুটুবিহারী। সব চিকিৎসা বিফলে গেল। এখন মনে হয়, সেটা হয়তো ছিল করোনারি থ্রম্বোসিস। 
খবরটা শোনা মাত্র দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেল।
কলেজ স্ট্রিটে দোকানে আমরা চারজন— সুমথনাথ ঘোষ, গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য, প্রফুল্লদা আর আমি। বার্নার্ড’‌শ বেশ কিছুদিন যাবৎ ভুগছিলেন। তিনিও ওইদিন মারা গেছেন। তাঁর জীবনী, সাহিত্যকর্ম সাংবাদিকরা তৈরি করে রেখেছে।

বিভূতিভূষণের খবর কে করবে?‌ ইতিমধ্যেই তারাশঙ্করবাবুর ফোন এল, কাকাবাবুকে চাইলেন, গজেন নেই?‌ সুমথকাকা ফোন ধরে বললেন, না, ও তো কালই ঘাটশিলা গেছে।
তারাশঙ্করবাবু বললেন, তা হলে তুমি, গৌরী— সবাই মিলে চলে এসো। পারলে কাগজ–‌কলম সঙ্গে এনো। কয়েকটা। কাগজ আমি দিতে পারব অবশ্য, তবে কলম লাগবে। বিভূতিভূষণের জীবনী একটা তৈরি করতে হবে।
অতঃপর আমরা সবাই মিলে টালা পার্কে তারাশঙ্করের বাড়ি পৌঁছলাম। সেখানে বসে গৌরীদা বিভূতিভূষণের জীবনী মৃত্যুসংবাদ দিয়ে একটি লেখা তৈরি করলেন। তারাশঙ্করবাবু দেখে বললেন, বইয়ের নামগুলো সব দাও।
লেখা দাঁড়ালে তারাশঙ্কর বললেন, সবাই কাগজ–‌কলম নিয়ে বসে কপি করো। 
তখন তো জেরক্স, ফটো কপি— এ সব স্বপ্নকথা। তারাশঙ্কর আমাকে বললেন, ভানু তুমি আমার ডেস্কের এইধারে বসে কপি করো। অনেকগুলো লাগবে, ইংরেজি, বাংলা, রেডিও অফিস, পিটিআই— সব জায়গায় দিতে হবে।
সেই প্রথম তারাশঙ্করের অত কাছে বসা। বিভূতিভূষণই যেন হাত ধরে নিয়ে গেলেন।
পরদিন সব কাগজে বার্নার্ড’‌শ ও বিভূতিভূষণের তিরোধান সংবাদ একসঙ্গে বেরোল, ২ নভেম্বর, ১৯৫০–‌এ।
তারাশঙ্কর গ্রাম থেকে এসে শহরে বাড়ি ভাড়া করে বাস করেন শিল্পী যামিনী রায়ের পরামর্শে। উনি বলেছিলেন, কালীসাধনা যেমন শ্মশান‌ ছাড়া প্রকৃষ্টভাবে হয় না, সাহিত্যসাধনাও সেইরকম কলকাতায় এসে করতে হবে। প্রথমে ভাড়াবাড়ি, তারপর টালা পার্কে নিজস্ব বাড়ি, অবশ্য ধারধোর করেও টাকা সংগ্রহ করতে হয়েছিল। অত টাকা তখন রয়্যালটিতে কোথায়!‌
টালায় বাড়ি করলেও গ্রামের সাহচর্য ভুলতে পারেননি। বাড়ির পিছনের জমিতে একটা কুঁড়েঘর করে মাঝেমধ্যে থাকতেন। বাড়ির সামনে ফুলগাছের পরিচর্যা করে চাষের শখ মেটাতেন। এই সময়ে লেখক সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায় একবার বিপদে পড়েছিলেন। তাঁর ‘‌মুখর লন্ডন’‌, ‘‌দূরের মিছিল’–‌এর খুব নাম। লোকের মুখে মুখে ফেরে। একদিন তিনি তারাশঙ্করকে তাঁর দু’‌খানা বই দিতে গেলেন। গেট খুলে দেখেন, এক ব্যক্তি বাগানে মাটি খুঁড়ছে। তাকেই জিজ্ঞেস করলেন, হ্যাঁ হে, তারাশঙ্করবাবু আছেন?‌
লোকটি মুখ না তুলেই বললেন, আছেন।
সুধীরঞ্জন বললেন, একবার ওঁকে খবর দাও, বলো সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায় এসেছেন।
লোকটি বললেন, আপনি দরজার সামনে যান, খবর দিচ্ছি।
সুধীরঞ্জন দরজার সামনে দাঁিড়য়ে। সেই বাগান পরিচর্যাকারী গলায় কাপড়ের খুঁট জড়িয়ে বললেন, আমিই তারাশঙ্কর। আসুন, বসুন।
সুধীরঞ্জন পরে আমাকে বলেছিলেন, বুঝলেন ভানুবাবু, সেদিন আমার কী অবস্থা!‌ মনে হচ্ছে ধরণী কেন দ্বিধা হচ্ছে না। আমি তারাশঙ্করকেই মালী ভেবে বসে আছি।
তারাশঙ্কর যেমন মাটির সঙ্গে যোগ রেখেছিলেন, স্বগ্রাম এবং স্বগ্রামের মানুষের সঙ্গেও অবিচ্ছেদ্য যোগ ছিল। লাভপুরের মানুষ, আত্মীয়‌স্বজন কলকাতায় এলে অনায়াসে তারাশঙ্করবাবুর বাড়িতে উঠতেন। এক এক সময়ে সকালে–রাত্রে ৫২/‌৫৩ পাত পড়ত। লাভপুরে গেলে নসুবালাকে অনায়াসে গলা জড়িয়ে কথা বলতে পারতেন। হাঁসুলী বাঁকের উপকথা যাঁরা পড়েছেন, নসুবালাকে তাঁরা ভুলবেন না। কবিশেখর কালিদাস রায় একবার আড্ডার মধ্যে বলেছিলেন, দ্যাখ‌, সাধারণ মানুষের সঙ্গে যারা অক্লেশে মিশতে পারে, তাদের লেখার ক্ষমতা থাকলে বড় কথাসাহিত্যিক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এখনকার সাহিত্যিকদের মধ্যে তারাশঙ্কর ও বিভূতির মধ্যে এই সাধারণ মানুষদের সঙ্গে অক্লেশে মেশার ক্ষমতা দেখি। এদের সাহিত্য উত্তরোত্তর জনপ্রিয় হবে।
ব্যবসার কাজের জন্যই মাঝেমধ্যে তারাশঙ্করবাবুর বাড়ি যেতে হয়। কখনও পাণ্ডুলিপি আনতে, কখনও বই পৌঁছতে।
এই সময়ে অবধূত এলেন বাংলাসাহিত্যে তাঁর ‘‌মরুতীর্থ হিংলাজ’ নিয়ে। সে কী বিপুল আলোড়ন ও জনপ্রিয়তা, আজ কল্পনা করাও দুঃসাধ্য।
তারাশঙ্করই আবিষ্কার করেন অবধূতকে। চন্দননগরে এক সাহিত্যসভায় গিয়ে আলাপ হয় অবধূতের সঙ্গে। সেখানেই ‘‌মরুতীর্থ হিংলাজ’‌–‌এর পাণ্ডুলিপি দেখেন। সাগ্রহে নিয়ে এসে তাঁর পরিচালনায় প্রকাশিত ‘‌তরুণের স্বপ্ন’‌ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশ করেন। তবে তাঁর তৃতীয় গ্রন্থ ‘‌উদ্ধারণপুরের ঘাট’‌ পড়ে সন্তুষ্ট হননি। তন্ত্রের নানা গুহ্যকথা ওভাবে প্রকাশ করা, তাঁর মতে, সঙ্গত নয়।
আমাকে দেখেই উনি সামনে এসে বসতে বললেন। বললেন, দ্যাখো তোমরা, ও বইটি ছেপে ঠিক করোনি। তন্ত্রের সাধনকথা সকলের সামনে এভাবে কেউ প্রকাশ করে‍‌!‌ তারপর তারাশঙ্কর আমাকে বোঝাতে বসলেন, তন্ত্রসাধক কীভাবে বসেন, তাঁর উত্তরসাধিকা কোথায় কীভাবে বসে। উনি তখন ভুলে গেছেন, যে ছোকরাকে তিনি এ সব বোঝাচ্ছেন, তার তিনগুণ তাঁর বয়স। আমার শুনতে শুনতে কান গরম হচ্ছে। এমন সময়ে তারাশঙ্করের জ্যেষ্ঠপুত্র সমরদা এসে পড়লেন। দেখে বুঝলেন আমার অবস্থা। বললেন, বাবা, ভানুকে একটু ছাড়বেন?‌ ওর সঙ্গে আমার ব্যবসার কথা আছে একটু।
অনিচ্ছায় তারাশঙ্কর ছাড়লেন, বললেন, অবধূতকে বলে দিও আমার কথা। ওকে তো আমিই এনেছিলাম সাহিত্যজগতে।
এরপর ঘটনাচক্রে আমার বিবাহ হয়ে গেল তারাশঙ্করের বন্ধু–‌কন্যা তথা কুটুম্বকন্যা অর্চনার সঙ্গে। বিয়ের দিন তারাশঙ্করবাবু অর্চনাকে দিয়েছিলেন তাঁর রচনাবলির প্রথম খণ্ড, বউভাতে আমাকে দ্বিতীয় খণ্ড।
আরও একটু সাহস বাড়ল তাঁর কাছে যাওয়ার। সৌভাগ্য হল তাঁর স্নেহ পাওয়ার।
কথায় কথায় একদিন বলেছিলেন, আজ আমার গাড়ি–‌বাড়ি দেখে লোকে বলে, তারাশঙ্কর এখন বড়লোক। গরিবদের কথা কী লিখবে!‌ কী কষ্ট করেছি জানো?‌ কলকাতায় এসে ভালভাবে থাকব, সে পয়সার জোর কোথায়!‌ নামেই জমিদার, আসলে তো সাড়ে সাত গন্ডার জমিদার। মনোহরপুকুর রোডে একটা টিনের ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতাম। রাস্তার টাইম কল থেকে জল তুলে এনে ঘরে রাখতে হত। তাতেই চা তৈরি, খাওয়া, স্নান— সব। আর দু’‌বেলা পাইস হোটেলে খাওয়া। গল্প লিখি, বিভিন্ন পত্রিকায়, কাগজে দিই। কেউ ছাপে, কেউ ছাপে না, কেউ পয়সা দেয়, কেউ দেয় না। একটা উপন্যাস লিখলাম, বউ–‌এর গয়না বিক্রি করে নিজেই ছাপলাম। দপ্তরীকে দিয়ে একশো বই বাঁধিয়ে দোকানে দোকানে জমা দিলাম। কেউ দাম দেয় অল্প, কেউ বলে বিক্রি হয়নি। দপ্তরীর বিল মেটাতে পারি না। একদিন বঙ্গশ্রী অফিসে গেছি লেখা দিতে। সেখানে দপ্তরী ধরল। এই যে বাবু, সেই যে বই নিলেন, টাকাও দিলেন না, কোনও খবর নেই। আমি আপনার ওই সব ছাপা কাগজ বিক্রি করে দাম উসুল করে নেব। চেঁচামেচি শুনে বঙ্গশ্রীর অফিসের ভেতর থেকে সজনীবাবু বেরিয়ে এলেন, সজনী তখন বঙ্গশ্রী পত্রিকা দেখাশোনা করে। ও সব শুনে দপ্তরীকে খুব ধমক দিল। ‘‌তুমি কাকে কী বলতে হয় জানো না, তোমার যা বিল পাওনা আছে আমায় দিও, আজ থেকে জানবে, ওই বইয়ের সব দায়িত্ব আমার। তুমি এঁকে একদম বিরক্ত করবে না। তারাশঙ্করবাবু বলেছিলেন, বুঝলে ভানু, আমি সেইদিন থেকে সজনীর কাছে বন্ধুঋণে আবদ্ধ। স্বেচ্ছায় ওকে, ওর প্রকাশনী রঞ্জন পাবলিশিং হাউসকে ধাত্রীদেবতা ও রাইকমল কপিরাইট দিয়েছিলাম। পরে অবশ্য সজনী কপিরাইট ফেরত দেয়।
আমি বলেছিলাম, সজনীবাবুর কথা বুঝতে পারি। কিন্তু ‘‌আগুন’‌ বইটার কপিরাইট কাত্যায়নী বুক স্টলকে দিলেন কেন?‌
তারাশঙ্কর বললেন, তা হলে সে দুঃখের কথাও তোমাকে বলি। কলকাতায় বাসাভাড়া করে আছি। লিখে রয়্যালটি থেকে কত আর আয়, টানাটানির সংসার। এমন সময় বড় মেয়ে গঙ্গার জ্বর হল, ছাড়ছে না, ডাক্তার সন্দেহ করছে হয়তো টাইফয়েডে দাঁড়াবে। মনে পড়ল প্রবাসীতে কিছু টাকা পাওনা আছে। গেলাম দুপুর ১১টা নাগাদ প্রবাসী অফিসে। কর্মচারীরা বলল, হ্যাঁ, আপনার পাওনা আছে। তবে বড়বাবু না এলে তো হবে না। বড়বাবু মানে বুঝলে, কেদারবাবু, রামানন্দবাবুর বড় ছেলে। তা কেদারবাবু এলেন গাড়ি করে। আমাকে দেখেই বললেন, হ্যাঁ, তারাশঙ্করবাবু, আপনার কিছু টাকা পাওনা আছে, তা আজ তো দেওয়া যাবে না, অন্য লোককে বলা আছে, আপনি আর একদিন আসুন। অফিসে জেনে যান, কবে আসতে হবে। বলে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। একটিও বাক্যব্যয় না করে। খুব অপমান লাগল। ওখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে গেলাম শ্রীমানী মার্কেটে, গিরীনের দোকানে, ওই কাত্যায়নী বুক স্টলে। গিরীন আমার চোখ লাল দেখে ভাবল, আমি অসুস্থ। ব্যস্ত সমস্ত হয়ে কুশল প্রশ্ন করল। আমি বললাম, আমার শরীর ঠিক আছে। আমার কিছু টাকার দরকার গিরীনবাবু, মেয়ে অসুস্থ। গিরীন আমাকে বসিয়ে এক গ্লাস জল ও প্লেটে দুটি রসগোল্লা রেখে বললে, আগে এটুকু মুখে তুলুন তারাশঙ্করবাবু। আপনার রোদ লেগে গেছে। তারপর দুশো টাকা দিয়ে বলল, আমি কাল–‌পরশু আরও দুশো টাকা আপনার বাড়ি গিয়ে দিয়ে আসব। তা এমন মানুষকে ‘‌আগুন’‌ বইটার কপিরাইট দিয়ে কি অন্যায় করেছি!‌
এ সব কথা যখন বলছেন তারাশঙ্করবাবু, তখন তাঁর শরীর ভাঙতে শুরু করেছে। ব্লাডপ্রেসার ওঠা–‌নামা করছে। অনিয়মিত। লিখতে বসলেই শরীর খারাপ হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে ছবি আঁকা ধরলেন। প্রথম ঘরের দেওয়ালে। স্ত্রী বললেন, দেয়ালে আর কত আঁকবে, কাগজ, প্যাস্টেল, তুলি, রং আনাই।
বেশ কিছুদিন ছবি এঁেকছিলেন, কতকগুলি তো দেখবার মতো। নারী কল্পনা করে মৃত্যুর ছবি বা মৃত্যুদেবীর ছবি এখনও চোখে ভাসছে। গাছের টুকরো–‌টাকরা দিয়ে কাটুম–‌কুটুম করেছিলেন কিছু। কিছু বোধহয় লাভপুরে দেশের বাড়িতে আছে। টালাতেও থাকতে পারে।
এ সময়ে গিয়ে কথা বলতাম মাঝে মাঝে, একটু ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে যেতেন। এ শরীরটা আর কিছু পারবে না ভানু, যুঝল তো অনেকদিন। তোমার কাছে বলতে লজ্জা নেই, জ্ঞানপীঠের টাকাটা পাওয়ার পর বাড়ির দেনা শোধ হয়েছে। তাইতে একটু নিশ্চিন্ত বোধ করছি।
তখন নকশালদের হিটলিস্টে তাঁর নাম ছিল। এ জন্য সরকার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিল। সেটাও তারাশঙ্কর আদৌ পছন্দ করতেন না।
এই পছন্দ–‌অপছন্দ, ভাল–‌মন্দের মিশেলে একদিন জ্ঞান হারালেন। কয়েকদিন অজ্ঞান থেকে ১৯৭১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তারাশঙ্কর অমরলোকে যাত্রা করলেন। বাংলায় সেদিন তারিখ ছিল ২৮ ভাদ্র, তাঁর প্রিয় বন্ধু বিভূতিভূষণের জন্মদিন। কী আশ্চর্য সমাপতন!‌ 
শেষযাত্রায় বেরোবার সঙ্গে আমরা সঙ্গী ছিলাম। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র সেই যাত্রার ধারাবিবরণী দিচ্ছিলেন। আকাশবাণীতে প্রচারিত হচ্ছিল। তখন তো দূরদর্শন বা টেলিভিশন আসেনি। যাত্রায় সকলের পিছনে আমি। বাড়িটির দিকে তাকালাম। আত্মীয়–‌স্বজন, পুত্র–‌কন্যারা সজল চোখে দাঁিড়য়ে। ভাবলাম, কাল থেকে এই বাগানে কেউ মাটি খুঁড়বে না, মর্নিং গ্লোরির ফুল ফোটাবে না। শ্রাদ্ধের দিন বন্ধুবান্ধব, লেখক, কবি, ভক্ত,পাঠকরা আসবেন, তারপর শুধুই মহীরুহ–‌হীন উদ্যান। তারাশঙ্কর তো ছিলেন এই পরিবার–‌মণ্ডলীর বটগাছের মতো। সেই বটগাছের অভাবে সংসার কী নিদারুণ রিক্ত, সেই দিন বুঝলাম।      ‌‌‌‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top