শহর থেকে গ্রামে দ্রুত গজিয়ে উঠছে রাশি রাশি ব্যাটবল খেলার দোকান। দেবাশিস দত্ত

স্যার, একটু টিফিন করব?‌
—কোথায় গিয়ে?‌ বাইরে যেতে হবে নাকি?‌
—না স্যর, মা দিয়ে দিয়েছে। ব্যাগে আছে।
—ও কে, গো অ্যাহেড। দু’‌ঘণ্টাও মন দিয়ে প্র‌্যাকটিস করা যায় না?‌
ওই ছাত্র যেখানে বসে টিফিন খাচ্ছিল, ক্রিকেট শিক্ষক চুপি চুপি সেখানে হাজির। এবং যা দেখলেন, তাতে চোখ ছানাবড়া হওয়ার জোগাড়। টিফিন বক্সে ছিল না কোনও ফলপাকুড়, কোনও ডাইজেস্টিভ বিস্কুট, কোনও এনার্জি বাড়ানোর জন্য ছোট ক্যাডবেরি বা ভেজানো ছোলা–বাদাম। তিনি গিয়ে দেখেন, টিফিন বাক্স ভর্তি কুরকুরে। নিঃশব্দে ক্রিকেট স্যর ওই অঞ্চল থেকে সরে গেলেন।
●‌ এটা ঘটেছে, আকছারই ঘটে, বিভিন্ন কোচিং ক্যাম্পে। প্রচুর অবাঙালি পরিবার, যেখানে ক্রিকেট খেলার কোনও নামগন্ধ নেই, তারা সকাল–সকাল ক্রিকেট কিটসের মধ্যে এমন টিফিনকারি ঢুকিয়ে দিচ্ছেন, যাতে থাকছে এরকম মশলাদার খাবার। ‘‌খাবার’‌ বলা কি ঠিক হবে?‌ এক্ষেত্রে যে ঘটনার কথা উল্লেখ করলাম, তা শুনেছি শিক্ষকের ভূমিকায়–থাকা গোপাল বসুর কাছে।
অনূর্ধ্ব–১৭ বিশ্বকাপ ফুটবল যখন চলছিল, তখন একদিন সকালবেলা, ভিক্টোরিয়ার কাছে ক্যাসুয়ারিনা অ্যাভিনিউয়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎই মনে হয়েছিল, ‌শহরটা হঠাৎই ফুটবলের হয়ে গিয়েছে। সবে পুজো, দেওয়ালি শেষ হয়েছে। অল্প অল্প ঠান্ডা হাওয়া। দঁাড়িয়ে পড়েছিলাম। দেখলাম, কত কিশোর ছোট চামড়ার বলটাকে নিয়ে কী আনন্দ নিয়েই না খেলছে। ভাল লেগেছিল। দু’‌দিন পর আবার গিয়েছিলাম ওই রাস্তায়। গিয়ে ঠকে গিয়েছিলাম। ভিক্টোরিয়া, ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড, ইস্টবেঙ্গল মাঠের পেছনের খোলা অংশ, মহমেডান মাঠের সামনে–পেছনে শুধুই ব্যাটবলের দাপট। এত তাড়াতাড়ি ফুটবলের আবেশ কেটে গেল?‌ গেল তো গেলই। আবার কবে অনূর্ধ্ব–২০ বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসবে, তখন আবার আমরা ফুটবল–প্রেমে গদগদ হয়ে পড়ব। ক্রিকেট রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে গোটা দেশ। কাজের কারণে কখনও বর্ধমান, দুর্গাপুর, এদিকে অশোকনগর, হাবড়া, অন্যদিকে গুপ্তিপাড়ার দিকে যাওয়ার সময় সবুজ ঘাসের জমিতে শুধু দেখি, ক্রিকেটের উইকেট। ফুটবলটা কোথায় গেল?‌ তাই, এতটুকু অবাক হইনি যখন মরশুমের প্রথম ডার্বিতে মোহনবাগান এবং ইস্টবেঙ্গল দলে বাঙালি প্রায় ছিলই না। ৯০ শতাংশ ফুটবলারই হয় ভিন দেশের, নয়তো ভিন রাজ্যের।
এ শহর আপাতত ক্রিকেটে বুঁদ হয়ে আছে। সৌরভ গাঙ্গুলির অবসরের পর সেভাবে বাঙালি ক্রিকেটার বলতে উঠে এসেছেন ঋদ্ধিমান সাহা। অথচ, শহর জুড়ে রয়েছে শ’‌দেড়েক ক্রিকেট কোচিং ক্যাম্প। এই শিবিরগুলোর মধ্যে কয়েকটির নাম আবার বেশ ভারী। আকাদেমি। মানে কী?‌ আবাসিক না হলে আকাদেমি বলা যায়?‌ সেখানে কারা কোচিং করাচ্ছেন?‌ গত দেড় মাস ধরে ময়দান–সহ শহরের অন্যত্র বেশ কয়েকটি ক্রিকেট শেখার মন্দিরে গিয়ে দেখি, সেভাবে শেখানোই হচ্ছে না। গিজগিজ করছে ছেলেদের দল। নাম–কা–ওয়াস্তে প্র‌্যাকটিস। না আছে অধিকাংশ শিবিরে ভিডিও দেখানোর বন্দোবস্ত, না আছে আধুনিক প্রশিক্ষণের সরঞ্জাম। সল্টলেকের একটি শিবিরে ৬ বছরের বাচ্চাদের গোল করে দঁাড় করিয়ে কিছু একটা করতে বলছিলেন প্রশিক্ষক। ব্যাটবল নিয়ে নাড়াচাড়া। সঙ্গে চলে হালকা পিটি, এক্সারসাইজ। যা দেখলে প্রথমে রাগ হবে, কারণ হাত–পা–কোমর নাড়ানোর পদ্ধতিতে ভুল আগাপাছতলা। একটু দূরে, একটু বেশি বয়সি ছেলেদের দিকে পড়ে রয়েছেন প্রধান পুরোহিত। তিনি যে মাঝেমধ্যে এই কচিকঁাচাদের কাছে এসে কিছু দেখিয়ে দেবেন, এমন আশা করা ভুল। সত্যি সত্যি ঘণ্টা আড়াই ছিলাম ওখানে। এবং একবারের জন্যেও ওই ভদ্রলোক ছোটদের কাছে এলেনই না!‌ খোঁজ নিয়ে জানলাম, এটাই নাকি রুটিন।
এবার গেলাম, তুলনায় বড়দের নেটের কাছে। রানআপ–এর জমি অসমান। অর্থাৎ যে কোনও সময় একজন জোরে বোলারের গোড়ালি ঘুরে যেতে পারে। ক্রমাগত বোলিং করার ফলে যেখানে ডেলিভারির পর পা ল্যান্ড করছে, সেখানটাও অসমান। অর্থাৎ, দ্রুতগতিতে দৌড়ে আসার পর, যখন ফলো–থ্রুর জন্য সমান জমিতে গতিমান দুটো পা নেমে আসার কথা, তখনও থাকছে বিপদের সম্ভাবনা। প্রশ্ন করে জানলাম, ক্লোজ টু দ্য উইকেট থেকে কীভাবে বোলিং করতে হয়, তা শিক্ষার্থী বোলার জানে না। অ্যাওয়ে ফ্রম দ্য উইকেটের ক্ষেত্রেও কোনও পরামর্শ পাননি। শুধু তাকে বলে দেওয়া হয়, দৌড়ে এসে বল করো। কোন ব্যাটসম্যানকে কোন জায়গায় বল করতে হবে, এ সব ব্যাপারে কোনও ধারণাই দেওয়া হয় না। একটা বল দিয়ে বলা হয় বল করতে।
ব্যাটসম্যানদের ক্ষেত্রেও তাই। গুড লেংথ স্পট কোনটা, কেন লো ফুলটসে ইনিংসের শুরুতে প্রলুব্ধ হতে নেই, কোন বলটা পুল মারব, কোন বলটা ডাক করব, চোখের ওপরে আসা বল যে ছেড়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ, এ সব ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়া যে জরুরি, এটা কোচ সাহেব একবারের জন্যও বললেন না শিক্ষার্থীদের। হয়তো পরে বলবেন। হয়তো আগে বলেছেন। আমাদের সামনেই বলতে হবে, এমন তো কোনও নিয়ম নেই। এমন সান্ত্বনা দিয়ে নিজেকে ওই অঞ্চল থেকে সরিয়ে নিলাম। বেরিয়ে আসার সময় দেখি, অভিভাবকরা লাইন দিয়ে দঁাড়িয়ে মাসিক বেতন দিচ্ছেন। অদূরে ক্যান্টিন। সেখানে ধুলোময়লায় জড়িয়ে মড়িয়ে কয়েকটি জলের জাগ রয়েছে। হুটোপাটি করতে করতে প্রায়শই বিনা অনুমতিতে মাঠের বাইরে এসে কয়েক ঢোক জল গলায় ঢেলে আবার মিশে যাচ্ছে প্র‌্যাকটিসে।
অভিভাবকদের ভূমিকা দেখলে অবাক হতে হয়। এঁদের কেউ কেউ শিবিরের কোচকে বলছেন, ‘‌স্যর, ওই সব টেস্ট–ফেস্ট খেলবে না আমার ছেলে। শুধু ছয় মারার টেকনিকটা শিখিয়ে দিন।’‌ এটা একটা আবদার হল!‌ সোজা ব্যাটে খেলতে পারলে যে আইপিএলেও সফল হওয়া যায়, তা তো রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলিরা দেখিয়ে যাচ্ছেন। মরশুমের পর মরশুম। কোনও রকমে ৩৪ পাওয়ার মতো আবদার এটা। আর যখন ইংরেজিতে কঁাচা বলে একদা ২০ পেলেই উত্তীর্ণ হিসেবে গণ্য করা হত, তাতে ছাত্র যদি I goes to school‌ লেখে, তাতে আপত্তি থাকছিল না। এটা তো তেমন ব্যাপার!‌ I go to school‌ যে ঠিক ইংরেজি, এটা বোঝার, ধরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ যাঁদের থাকার কথা, সেই শিক্ষকদের অধিকাংশই হাল ছেড়ে দিয়ে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়ে চলেছেন। অধিকাংশ ক্রিকেট বা ফুটবল কোচিং ক্যাম্পেও এখন চলছে এরকম ভুল প্রশিক্ষণ দেওয়া। খবর নিয়ে জানলাম, শ’‌তিনেক শিশু যে শিবিরে আছে, তাতে কোচদের মাইনে–টাইনে দিয়ে ভালই রোজগার হয় একেকটি কোচিং ক্যাম্পের। সঙ্গে থাকে স্মরণিকা প্রকাশ করার আবদার, যেখানে শিক্ষার্থীদের ছবি ছাপা হয়, অভিভাবকদের ছবি ছাপা হয়। এবং অভিভাবকদের কাছ থেকে বিজ্ঞাপন বাবদ মোটা টাকা তোলা হয়। সবই নাকি শিবির চালানোর খরচ। অথচ, নিয়মিত মাঠে জল দেওয়া হয় না, ঘাস কাটা হয় না, অধিকাংশ শিবিরে নেই রোলার, যা দিয়ে পিচকে সমান করা হয়। এত অসুবিধা, কিন্তু কোনও অনুযোগ নেই। অভিভাবকরা আসেন, বসেন, দেখেন। এবং প্র‌্যাকটিসের শেষে হয় নিজের স্কুটার, অথবা ব্যাগ ভারী হওয়ার কারণে ট্যাক্সিতে চড়ে বাড়ি ফিরে যান। যাঁদের গাড়ি আছে, তাঁদের কথা আলাদা। এমন অনেক শিক্ষার্থী আছে, যারা মাসিক মাইনেটা পর্যন্ত দিতে পারে না, বাসে যাতায়াত করতে হয়। তাঁরাও কিন্তু আশা করছেন, একদিন তঁার ছেলে বাংলার হয়ে খেলবে, ভারতের নীল জার্সি গায়ে তুলে নেবে। বছরের পর বছর এই জিনিস, এই অব্যবস্থা চলছে পূর্ণোদ্যমে। এই ক্রিকেট ব্যবসা চলছে, চলবে। অদ্ভুত এক নেশা এবং স্বপ্নকে তাড়া করতে গিয়ে আজ বিভিন্ন কোচিং ক্যাম্পে যা চলছে, তাকে বোঝাতে ‘‌ঠকানো’‌ ছাড়া আর কোনও শব্দ এই মুহূর্তে ব্যবহার করতে পারছি না। অথচ এইসব শিবিরের অধিকাংশ কোচ কী সব লেভেল–টেভেল পাশ করে এসেছেন। ফরওয়ার্ড খেলার কায়দা দেখাতে গিয়ে বড় ভুঁড়ি হওয়ার কারণে কোচ হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। আবার ধুলোটুলো ঝেড়ে উঠে দঁাড়িয়ে সঠিক কায়দা দেখানোর চেষ্টা করছেন। এই কোচদের কয়েকজনের মুখে থাকে পান জর্দা গুটখা শিখর জাতীয় নানা নেশার বস্তু। কখনও কখনও এগুলো ব্যবহার করা হয় আগের রাতের নেশার দুর্গন্ধ দূর করার জন্য। একটু মন দিয়ে, সময় দিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে, মোটেই ক্রিকেট শেখানোর মতো আবহ নেই অধিকাংশ শিবিরে।‌
তবু প্রবল উৎসাহে অনুশীলন করানোর পালা চলছে শহর থেকে গ্রামে, শহরতলি থেকে ধানখেতেও। যেভাবেই হোক ক্রিকেটার হতে হবে। কিন্তু, কিছুতেই ক্রিকেট বিজ্ঞান অনুসরণ করার ব্যাপারটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল যথেষ্ট উৎসাহ দিচ্ছে। কিন্তু, ক্রিকেট শেখানোর অধিকাংশ শিবির এবং সেখানকার কোচ ও কর্তারা দায়সারাভাবে কোচিং করিয়ে যাচ্ছেন দিনের পর দিন। শিশুদের মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টাই করছেন না অনেক কোচ। সম্প্রতি বাংলার বিশিষ্ট প্রাক্তন ক্রিকেটার রাজু মুখার্জি একটি বই লিখেছেন। শিরোনাম— ‘‌প্লেয়িং উইথ চিলড্রেন।’‌ ওই বইতে শিশুদের কোচিং করানোর জন্য যে মনস্ত্বত্ত্বের প্রয়োজন হয়, সেখানেও রাজু আলো ফেলেছেন। মুখবন্ধে লিখেছেন, ‘‌যদি আপনি শিশুদের ভালবাসেন, যদি আপনি খেলাধুলোকেও ভালবাসেন, তাহলে, এটা বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না যে, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আপনিই হলেন একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব।’‌ সন্তানকে ভালবাসার মতোই যদি খেলাধুলোকে কেউ ভালবাসেন, তাহলে কিন্তু ওই এলাকায় শিশুদের বিকাশ ঘটে দ্রুত। পরোক্ষে রাজু এই বইয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, কেমন কোচ হওয়া জরুরি।
বারবার তিনি সতর্ক করে দিচ্ছেন একথা বলে যে, ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের শেখানোর কায়দায় যেন থাকে উপভোগের রসায়ন। এবং উপভোগ করার মাঝেই চলবে শেখানোর পালা। শেখাতে হবে, কীভাবে নিজের খেলার উন্নতি ঘটানো যায়। এজন্য সব অনুশীলনের পদ্ধতিকে আনন্দময় করে তুলতে হবে। আনন্দের রাংতায় মোড়াতে পারলে শিক্ষার্থীরা দ্রুত তা নিজেদের খেলায় তুলে ধরতে পারবে।
ছোট বই। বাজারি ভাষায়, চটি বই। কভার টু কভার ৩২ পাতা। এ–‌ফোর সাইজের। রাজু এই বই ভেঙেছেন ২০টি চ্যাপ্টারে। তার মধ্যে ভূমিকা আছে, শিশুদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে যে আলোচনা করেছেন, তা তো আগেই বলেছি। আমি বলব, সব কোচের উচিত অন্তত এই বইয়ে চোখ বোলানো এবং তা পড়তে পড়তে যদি কোনও কোচ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আত্মসমালোচনা করতে করতে নিজেকে শুধরে নিতে পারেন, তাতে ওই শিবিরের শিক্ষার্থীরা অবশ্যই উপকৃত হবে। পরোক্ষে এগোবে বাংলার ক্রিকেট।
সৌরভ গাঙ্গুলি দায়িত্বে এসেই যে পরিবর্তনগুলো করেছেন, তার মধ্যে একটি হল, ভাল খেললেই আর্থিক পুরস্কার দেওয়া। এর ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়েছে। মাঠগুলো কিন্তু সেভাবে তৈরি করা হচ্ছে না। এখানে সৌরভের পরিষ্কার বার্তা ছিল, আউটফিল্ড ভাল করতেই হবে। ভাল টাকা দিতে শুরু করেছে সিএবি ওই মাঠ–মালিকদের। অথচ ময়দানের অধিকাংশ মাঠের আউটফিল্ড অসমান। ঠিকঠাক যত্ন নেওয়া হচ্ছে না। মাঠের সাইজ ছোট। ওয়াইএমসিএ বা তালতলা মাঠের ছক্কা ইডেনের মতো বড় মাঠে মারতে গেলে আউট হওয়ার সম্ভাবনা থাকবেই। এই সমস্যা আজকের নয়, চিরকালের। বঙ্গ ক্রিকেট এগোতে না পারার জন্য যে যে কারণ আছে, এটি তার মধ্যে অন্যতম।
পঙ্কজ রায়ের পর হাপিত্যেশ করে বসে থাকতে হয়েছিল আমাদের, বছরের পর বছর, একটা সৌরভ গাঙ্গুলি পাওয়ার জন্য। ঋদ্ধিমান সাহা খেলছেন বটে এখনও, দেশের সেরা উইকেটরক্ষকও বটে। কিন্তু দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু, উত্তরপ্রদেশ থেকে প্রতি মরশুমে যে ঝাঁকে ঝাঁকে প্রতিভাবান ক্রিকেটার উঠে আসছে, সেই গতিতে বাংলা থেকে ভাল ক্রিকেটার পাওয়া যাচ্ছে না। আপাতত চলবে ঈশান পোড়েল। চন্দননগরের এই জোরে বোলার দেশের অন্যতম সেরা প্রতিভা। সৌরভ গাঙ্গুলি থেকে রাহুল দ্রাবিড়, সবাই মেনে নিয়েছেন নিউজিল্যান্ডে অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ভারতের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য যদি ৭–‌৮ জন ক্রিকেটারের আলাদা ভূমিকা থেকে থাকে, অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে আমাদের ঈশানের নাম। নানা গোলমালের কায়দায় ডুবে রয়েছে বঙ্গ ক্রিকেট। সেখানেই, গোবরে পদ্মফুল ফোটার মতো এক–‌আধ টুকরো ভাল ক্রিকেটার মাথা তুলে দাঁড়াবার চেষ্টা করছেন। ওই পর্যন্তই। সামগ্রিকভাবে সুযোগ–‌সুবিধা বাড়ানো সত্ত্বেও পরিকাঠামো মজবুত হচ্ছে না। গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে রাখছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং কোচরা। কর্তাদের কথা কি আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হবে?‌ বছরের পর বছর কর্তারা তো মন দিয়ে আসছেন ক্রিকেটারদের ঠকিয়ে, দর্শকদের ঠকিয়ে কীভাবে আরও বেশি টাকা ঘরে নিয়ে যাওয়া যায়।
দাদাগিরি সিজন ৭–‌এর গ্র‌্যান্ড ফিনালেতে বিশেষ অতিথি হিসেবে এসেছিলেন শচীন তেন্ডুলকার। আমরা সবাই আলোড়িত। আবার সেই শচীন–‌সৌরভ জুটি। অনুষ্ঠানের মাঝপথে সৌরভ তুলে দিয়েছিলেন একটি ব্যাট, শচীনের হাতে। অনুরোধ করা হল, তাঁর বিখ্যাত ড্রাইভের নমুনা দেখানোর জন্য। তারই মাঝে সৌরভ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করে বসলেন শচীনকে, ‘‌তোমার গ্রিপটা দেখাও। কেন তুমি হ্যান্ডেলের নিচের দিকে ডান হাতটা রাখতে?‌ কেন আর একটু ওপরে নয়?‌’‌ উত্তর দিলেন শচীন, ‘‌ছোটবেলায় দাদা অজিতের সঙ্গে খেলতাম বড় ব্যাট দিয়ে। ওই ভারী ব্যাটকে ম্যানেজ করার জন্য হ্যান্ডেলের ওপরের অংশ খালি থাকত। আমাকে ব্যাট নিয়ন্ত্রণ করতে হত হ্যান্ডেলের নিচের দিকে হাত রেখে।’‌ পরিষ্কার হয়ে গেল আরও একবার আমাদের সবার কাছে। কিন্তু শচীন থামলেন না, ‘‌আমি যখন আচরেকার স্যরের কাছে প্রথম দিন গিয়েছিলাম, তখন আমাকে তিনি শুরুতে ব্যাটিং করতে বলেছিলেন। পরপর কয়েকদিন এভাবে ব্যাটিং করার পর আচরেকার স্যর বলেছিলেন, হ্যান্ডেলের নিচের দিকে হাত না রেখে ওপরের দিকে রাখতে। আমি পড়ে গিয়েছিলাম মহাসমস্যায়। সেই স্বাচ্ছন্দ্যটাই পাচ্ছিলাম না। ব্যাপারটা উপলব্ধি করে স্যর আমাকে বলেছিলেন, আমি যেন আর জীবনে গ্রিপ না চেঞ্জ করার কথা ভাবি। সেই থেকে আমি হয়ে গিয়েছিলাম বটম হ্যান্ডেড ব্যাটসম্যান।’‌ এটাই হল আদর্শ কোচের নমুনা। যিনি স্বাভাবিকতাকে ধ্বংস না করে, জাস্ট সাধারণ ব্যাপার–‌স্যাপারকেই ঘেঁটে দিতে চাননি। অথচ আমাদের কলকাতায়, ইদানীং একজন কোচ আম্পায়ারিং করতে করতে বোলিং ব্যাটিং সব শেখানোর চেষ্টা করছেন শিক্ষার্থীদের। এই নব্য কোচ কাম আম্পায়ার বলছেন, ব্যাট আসবে ৩০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেল থেকে, ফ্রন্ট ফুট যেন থাকে এক্সট্রা কভারের দিকে, ৪৫ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে। ব্যাকরণ বই থেকে কোচিং শিখে আসার কারণে জোর করে তিনি চাপিয়ে দিতে চাইছেন শিক্ষার্থীদের খেলার ধরনে। বগলে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বড় বড় ফাইল, যেখানে রয়েছে শুধুই এ–‌ফোর সাইজের প্রিন্ট আউট। তর্ক করতে চাইলেই ফাইল খুলে ওই প্রিন্ট আউট মেলে ধরছেন। কে বোঝাবে তাঁকে, ইতিহাস পড়লেই যুদ্ধ করা যায় না। তাহলে, বাবর, হুমায়ুন, আকবর বাদশাহরা বারেবারে ফিরে আসতেন পরবর্তী প্রজন্মে যোদ্ধা হিসেবে!‌
দল নির্বাচন নিয়ে কারচুপি চলছে। রমরমে ব্যবসা এটা। যোগ্যতা নেই, তবু জোর করে রাজ্য দলে ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য যত রকম অসাধু পন্থা অবলম্বন করা যায়, তা অভিভাবকরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন। জড়িয়ে ফেলছেন কয়েকজন অসাধু নির্বাচককে। চলছে বয়স ভাঁড়ানো। স্কুলের সার্টিফিকেটে বয়স একরকম, সিএবি–‌তে জমা পড়ছে অন্য বার্থ সার্টিফিকেট। আধার কার্ড যদি ২০০ টাকায় পাওয়া যায়, তাহলে নকল বার্থ সার্টিফিকেট পেতে, ওই একই শহরে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আপাদমস্তক দুর্নীতিতে ডুবে আছে অধিকাংশ ক্লাব। নাম শুধু লিখিয়ে রেখেছেন ওঁরা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলে। আর পর্দার পেছনে চলছে ক্রিকেট ব্যবসা। এসব কাহিনী শুনলে অনেক বড় বড় থ্রিলারের লেখকও ভিরমি খাবে। গোল্লায় যাওয়ার জন্য এঁরা সবাই এক পা তুলে দাঁড়িয়ে আছেন। শুধু তাঁদের বলে দিতে হবে, অমুক করলে তমুক পাবেন। ব্যস, খুলজা সিমসিম। একটু–আধটু বয়স ভাঁড়ানো, ভিন রাজ্যের ক্রিকেটারকে নিয়ে এসে নকল আধার কার্ড বানিয়ে খেলানোর উদ্যোগ, উপহার–‌টুপহার কিনে দেওয়া, দল হারার মুহূর্তে পিচ খুলে দেওয়া, জল ঢেলে দেওয়ার যে ঐতিহ্য বছরের পর বছর চলে আসছে, তা গঙ্গার জলের ধারার মতোই তির তির করে এগিয়ে চলেছে। দুর্নীতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে, আমরা বলি বটে, সেটা যে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বাংলার ক্রিকেটকে নিঃশব্দে উইপোকার ঘুণের মতো খেয়ে ফেলছে, সেটা দেখেও ময়দানের বহু ক্লাব চোখ বন্ধ করে বসে আছে। ভাবখানা এরকম, আমি একা কী–‌ই বা করতে পারি। অবশ্যই পারেন। প্রতিবাদের মঞ্চটা তৈরি করতে পারেন। পাশের বন্ধু ক্লাবকে সঙ্গে নিতে পারেন। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধা যাচ্ছে না। ক্রিকেট লিগে নামা ওঠার বালাই নেই, তাতেও গটআপ চলছে রমরমিয়ে। কলকাতা আনন্দনগরী হিসেবে চিহ্নিত। রবীন্দ্রসঙ্গীত, রসগোল্লার জন্য বিখ্যাত এ শহর ইতিমধ্যেই দুর্নীতি এবং গটআপের জন্যও পরিচিত। তাঁদের মতো, ‘‌বেওসা আগে, পোরে ক্রিকেট’‌। ভিন রাজ্যের ছেলেদের জন্য দরজা হাট করে খুলে দিয়ে এই ‘‌বেওসা’‌য় গতি বাড়ছে প্রতি মরশুমে। সময় নেই কারও, উদ্যোগ নেই অভিভাবকদের, এই অশুভ চাকার অগ্রগতি রোধ করার। এক একজন সৌরভ গাঙ্গুলির পক্ষে এমন পুরোনো মারণব্যাধির দাওয়াই দেওয়া কঠিন। ওষুধ দিলেও সে ওষুধ সেবন করলে আর্থিক ক্ষতি হয়ে যাবে বিশাল!‌ তার চেয়ে গোল্লায় যাক ক্রিকেট। তাতেই নাকি মুক্তি, তাতেই নাকি আনন্দ!‌ ‌‌‌■

 

 

ছবি: কুমার রায়

জনপ্রিয়

Back To Top