পার্থ নাগ: আলো নেভার পরই শুরু হয় আরেক নাচ।  মঞ্চে আলো যতক্ষণ জ্বলছে, ততক্ষণই চলে পিঠ চাপড়ানো। প্রশংসা। বাংলা লোকনাচের জয়ধ্বনি। কিন্তু আলো নেভার পর? তখন শুধুই অন্ধকার। কোথায় বা গেল দর্শক! প্রশংসা! বিশিষ্টজনদের পিঠ চাপড়ানি। বাংলায় প্রচুর লোকগান এবং নাচ রয়েছে। তবু একটি ফুলের নাম বললে সবাই যেমন ঝট করে বলে ফেলে গোলাপ, তেমনই একটি লোকনাচের নাম বললে বেশির ভাগ লোকই প্রথমেই বলে থাকেন, ছৌনাচ।
ভারতের মুখ্যত তিনটে জায়গায় ছৌনাচ দেখা যায়। তার একটি ঝাড়খণ্ডের সরাইকেল্লা। আর অপরটি ওডিশার ময়ূরভঞ্জ। বাংলার গর্বের ছৌনাচ দেখা যায় পুরুলিয়ায়। বাঁকুড়া এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে ছৌনাচ হয় ঠিকই কিন্তু পুরুলিয়ার মতো অতটা জনপ্রিয় নয়। তার মূলে যে মানুষটি সেই পদ্মশ্রী গম্ভীর সিং মুড়ার কাছে বালি থেকে গিয়ে ওয়ার্কশপ করেছিলাম পুরুলিয়ার চড়িদায়। সেটা আজ থেকে প্রায়  সাতাশ-আঠাশ বছর আগের কথা। ছৌনাচ হাতেকলমে জানার ফলে এটা বুঝেছি আর্ট ফর্ম হিসেবে এটা বেশ কঠিন। তালিম নিতে গেলে বোঝা যায়, বাজি মানে ওই যে ভল্ট দিতে যে দেখা যায় ছৌশিল্পীদের, সেটা আয়ত্ত করা খুব কষ্টকর। এর সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন স্টেপ বা চলন। ছৌ–এর ভাষায় একে বলা হয় চাল। কোনওটি দৈত্যের, আবার কোনওটি পশুপাখির চলনকে মাথায় রেখে। কয়েক বছর আগের ঘটনা। একটি স্কুলের পক্ষ থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হল। উদ্দেশ্য, তাদের স্কুলের শতবার্ষিকী উৎসবের অনুষ্ঠান করিয়ে দেওয়ার জন্য। শুরু হল সেই অনুষ্ঠানের তোড়জোড়। প্রথমে তিন মাস ধরে সেই স্কুলের ছাত্রদের নাচের তালিম দেওয়া হল। শেখানো হল গান। করানো হল নাটক। সেই সঙ্গে বিভিন্ন লোকনাচের দলের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হল। সেই স্কুল চাইছিল পুরুলিয়ার একটি ছৌনাচের দল। কিন্তু ওই দল আনতে যা টাকা লাগবে সেটা তাদের ছিল না। অতএব কোথায়, কোন সরকারি দপ্তরে গেলে ছৌনাচের ভাল দল পাওয়া যাবে, আমি তার হদিশ দিলাম। সেই সন্ধান জেনে স্কুলের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হল। এবং একটি দল এলও সেই অনুষ্ঠানে।
দলটি আসার পর দেখলাম, দলের যে প্রধান সেই সুব্রত মাহাতো আমার পূর্বপরিচিত। তার বাবা নেপাল মাহাতো। তিনিও ১৯৮৩ সালে পদ্মশ্রী পেয়েছেন। তবে সেবার নেপালদা নিজে আসতে পারেননি। শরীর খারাপ ছিল। তাই দল নিয়ে এসেছিল সুব্রত। সুব্রতকে আমি একেবারে ছোটবেলায় দেখেছিলাম, তাদের গ্রাম আদাবনা রায়গাড়ায়। সেই ছেলে এখন সদ্য যুবক। ভারি চমৎকার অনুষ্ঠান করল তারা। স্কুলের সবাই তো বটেই। দর্শকরাও তারিফ করতে-করতে বাড়ি ফিরলেন। স্কুলের সব শিক্ষক গিয়ে দাঁড়িয়ে সুব্রতদের সঙ্গে ছবিও তুলতে লাগলেন। এই পর্যন্ত সব ঠিক ছিল।
সুব্রত এবার আমায় জানাল, ওর দল গ্রামে ফিরে যাবে। কিন্তু ওকে এখানে থাকতে হবে এক রাতের জন্য। থাকলে সরকারি দপ্তর থেকে অনুষ্ঠান বাবদ প্রাপ্য টাকার আবেদনপত্র এবং প্রয়োজনীয় নথি পরদিন জমা দিয়ে যেতে পারবে। না হলে শুধু এইটুকু কাজের জন্য সুদূর পুরুলিয়া থেকে ওকে ফের কলকাতা আসতে হবে। আমি গিয়ে সেই কথা জানালাম স্কুলের শিক্ষকদের। বিশেষ করে সেই শিক্ষককে যিনি নিজে ছিলেন অনুষ্ঠানের দায়িত্বে। 
কিন্তু আগেই বলেছি, আলো নিভলে সব অন্ধকার। এবার দেখলাম সেই শিক্ষকের অন্য রূপ। তিনি বেমালুম বলে দিলেন, ‘‌স্কুলে থাকা যাবে না। যদি কোনও জিনিস নিয়ে চলে যায় তার দায়িত্ব কে নেবে?’‌
কথাটা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। তখন অনেক রাত হয়েছে। ছেলেগুলোকে ভাল করে খেতে পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। অভিজ্ঞতা থেকে জানি, ছৌনাচ নাচতে গেলে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। অনুষ্ঠানের পর শিল্পীদের খিদে পায়। কিন্তু ওদের হালকা টিফিন ছাড়া আর কিছুই প্রায় দেওয়া হয়নি। তার ওপর এমন মন্তব্য। আমি অনেক করে বোঝালাম। কিন্তু ভবি ভোলবার নয়। তাঁর সেই একই কথা। যে শিল্পীকে একটু আগে মাথায় করে নিয়ে তাঁরা নেচেছিলেন। এবার তাঁকে বিশ্বাস করে রাতটুকু আশ্রয় দিতেও তাঁরা নারাজ। সুব্রত খানিক দূরে দাঁড়িয়েছিল। সে কিছুতেই বুঝতে পারছিল না, কী এমন হল যে এক রাতের জন্য স্কুলের একটা ঘরে থাকতে পারা যাবে না! নিক্বণ সংস্থা থেকে জায়গাটার দূরত্ব অনেকটাই। তবু সুব্রতকে প্রস্তাব দিলাম নিক্বণে, আমার বাড়িতে এসে থাকার জন্য। কিন্তু সুব্রত রাজি হচ্ছিল না। ওখান থেকে কলকাতা যেতে সুব্রতর বেশি সুবিধে। এই পরিস্থিতির মধ্যে ছেলেগুলোর খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করলাম। ততক্ষণে আমি দায়িত্ব নেওয়ায় স্কুলের পক্ষ থেকে একটা ফাঁকাঘর খুলে দেওয়া হল সুব্রতর জন্য। লক্ষ্য করলাম, এমন ঘর দেওয়া হল যেখানে কোনও মালপত্র নেই।
আমি আর কথা বাড়ালাম না। সুব্রত সেই রাত ওখানে কাটিয়ে পরদিন ভোরে বেরিয়ে গিয়েছিল কলকাতা। কিন্তু আমি কিছুতেই ওর সঙ্গে ভাল করে কথা বলতে পারিনি।  শিক্ষকদের ওই আচরণে আমার মাথা হেঁট হয়ে গিয়েছিল। ■

জনপ্রিয়

Back To Top