১৯ জুলাই বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের ১২০তম জন্মদিন। তিনি বাঙালির প্রিয় বনফুল। তাঁর সাহিত্যকীর্তি আর বর্ণময় জীবন নিয়ে আজও চর্চার অন্ত নেই।  জন্মদিন উপলক্ষে তাঁকে স্মরণ করলেন তাঁরই ভ্রাতুষ্পুত্র অজয় মুখোপাধ্যায়
বলাইচঁাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন আমার জ্যাঠামশাই। আমার বাবার সবথেকে বড় ভাই।
কালজয়ী লেখক বনফুলের সাহিত্যের মূল্যায়ন করা আমার পক্ষে ধৃষ্টতা হবে। কারণ বহু বিদ্বজ্জন তাঁর লেখনীর পরিমাপ করেছেন। সাহিত্যের আঙিনায় তঁার অবিস্মরণীয় আবদান নিয়ে করেছেন নানা বিশ্লেষণ। আমি শ্রদ্ধেয় বনফুল–‌সুগন্ধে আবৃত।  তঁার পরিবারের অন্যতম সদস্য হিসেবে তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। দেখেছি নানা পরিস্থিতিতে। এই সৌভাগ্য অর্জন করেছি বলে নিজেকে অতি–ভাগ্যবান মনে করি। 
কাছ থেকে দেখার ফলে মানুষ বনফুলের বহু অমূল্য বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেছি। পেয়েছি তঁার সুগন্ধ। তিনি ছিলেন মোহহীন চরিত্রের এক মানুষ। তঁারা ৬ ভাই এবং ২ বোন। প্রত্যেকেই ছিলেন বিশেষ বিশেষ গুণের অধিকারী। এখন আর তাঁরা কেউ জীবিত নন। এঁদের মধ্যে বড় ভাই বনফুল তো বটেই, ছোট ভাই বিখ্যাত চিত্রপরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ও নিজের ক্ষেত্রে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে সাহিত্য, শিল্প জগতে বিরাজ করছেন। আছেন মানুষের মনে। তার মধ্যে যেমন নামী গুণীরা আছেন, আছেন সাধারণেরাও। কিন্তু কখনও, কোনও পরিস্থিতিতেই আমি এঁদের অহমিকার বিন্দুমাত্র প্রকাশ দেখতে পাইনি।
বনফুলের দ্বিতীয় এবং ঠিক পরের ভাই, ভোলানাথও ছিলেন একজন গুণী মানুষ। বনফুলের সঙ্গে বয়সের বিশেষ পার্থক্য ছিল না তঁার। দু’‌জনের মধ্যে প্রায়ই তর্ক–‌বিতর্ক লেগে থাকত। তবে পরস্পরের প্রতি ভালবাসা এবং দুর্বলতাও ছিল দেখবার মতো। সবসময় দু’‌জনের অন্তরে এই ভালবাসা প্রবাহিত হত। 
আমার বনফুল জ্যাঠামশাই স্বদেশি আন্দোলনের জন্যে ছ’‌বছর ডাক্তারি পড়া বিসর্জন দিয়েছিলেন। পরে আবার পরীক্ষা দিয়ে প্রতিটি বিষয়ে প্রথম স্থান অধিকার করলেন। ছোটগল্প লেখার অসাধারণ দক্ষতা ছিল তাঁর। সে–কথা তো সর্বজনবিদিত। সেই সময়ের নামী–‌দামি পত্রিকাতে তাঁর লেখা গল্প সাড়া ফেলে দিয়েছিল। পরিণত বয়সে দু’‌চোখেরই দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে যায়। অথচ সেই অবস্থাতেও বাংলা অনার্সের বিষয় মুখে মুখে নিজের মেয়েকে স্বচ্ছন্দে পড়াতে পারতেন। অসম্ভব মেধা এবং স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। এই গুণ নাকি উনি আমার ঠাকুমার কাছ থেকে পেয়েছিলেন। এ সবই আমার পিতৃস্থানীয়দের কাছ থেকে শোনা।
বনফুলের সাহিত্য–‌প্রতিভা ছিল জন্মগত। বনফুলের পঞ্চম ভাই ছিলেন আমার রাঙাকাকা। নির্মলচন্দ্র। আজ থেকে প্রায় পঁচাশি বছর আগে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক হন। বনফুলের নিজের এবং সব ভাইবোনদের জন্মস্থান ছিল বিহারের প্রত্যন্ত গ্রাম মনিহারিতে। বাগান–‌জমি ইত্যাদি দেখাশোনাতেই অতিবাহিত করেছিলেন সারাজীবন। সেখানে খুবই আনন্দের সঙ্গে দিন কাটাতেন রাঙাকাকা। ছিল অগাধ পড়াশোনা। অত্যন্ত রসিক মানুষ ছিলেন। কথায় কথায় বলেছিলেন, হোল্ড অলের মতো পুঁটলি কথাটাও এসেছে পুট অল (Put all)‌ থেকে।

রাঙাকাকার চাষ এবং বাস একই স্থানে। দীর্ঘদিন দক্ষতার সঙ্গে এই কাজ করে এসেছেন। এতই তঁার অভিজ্ঞতা ছিল যে মেঘের আকার এবং রং দেখে বলে দিতে পারতেন বৃষ্টি হবে কি না!‌ বনফুল বিশ্লেষণ করেছিলেন, রাঙাকাকার এই দক্ষতার কারণ, যেখানে চাষ সেখানে বাসের জন্য। সেইজন্যই প্রচলিত প্রবচন ‘‌চাষ–‌বাস’‌। সেই রাঙাকাকার বিয়ের বরযাত্রী হয়ে বনফুল ভাই এবং বন্ধু–‌সুহৃদদের সঙ্গে দ্বারভাঙায় গিয়েছিলেন ট্রেনে করে। 
বনফুলের তৃতীয় ভাই, গৌরমোহন ছিলেন খুবই আকর্ষণীয় চরিত্রের। অতি–জনপ্রিয় এবং লব্ধপ্রতিষ্ঠ চিকিৎসক। তঁার লেখার হাতও খুব ভাল ছিল। আমাদের বিরাট পরিবারের অনেক গুরুদায়িত্ব আনন্দের সঙ্গে বহন করেছেন। নিজের শখ–‌আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছেন। মহান আর আদর্শবান পুরুষ ছিলেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কাছে বহুভাবে ঋণী। 
বনফুলের প্রতিভার ছোট একটা উদাহরণ দিই। 
ঘটনাটি ঘটেছিল সেই দ্বারভাঙা যাত্রার সময়ে। আনন্দঘন বরযাত্রীদের ট্রেনে। আমার জ্যাঠামশাই অর্থাৎ বনফুলের দ্বিতীয় ভাই, গৌরমোহন একসময় খেয়াল করলেন কুঁজোর জল শেষ। বলে উঠলেন—
‘‌জল নেই, জল নেই ছোটো এ কুঁজো.‌.‌.‌’‌
বনফুল সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন,
‘‌জল যদি পেতে চাও চোখেতে খোঁজো’‌।
প্রতিভা বিকশিত হল অপূর্ব ছন্দ এবং ব্যঞ্জনায়।
বনফুল সাহিত্য জগতে অতি উচ্চমানের লেখক হিসেবে নিজের যোগ্যস্থান অধিকার করেছিলেন। লোকমান্য হওয়া সত্ত্বেও সম্পূর্ণ প্রচারবিমুখ ছিলেন এই মানুষটি। আমাদের ছোটকাকা, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় (‌বনফুলের ষষ্ঠ এবং কনিষ্ঠ ভ্রাতা)‌ জনপ্রিয় এবং মনোগ্রাহী চিত্রপরিচালক। কেউ বেশি প্রশংসা বা প্রশস্তি করলে কুণ্ঠিত হতেন, বিব্রত বোধ করতেন। তঁার সাহিত্য–‌প্রীতি এবং লেখার মান খুব ভাল ছিল। বনফুল জীবনে বহু সম্মান পেয়েছেন। পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত হন। কিন্তু এই প্রাপ্তির জন্য তাঁকে কখনও বিভ্রান্ত হতে দেখিনি। ছিল না কোনও উদ্ধত গর্ব বা বল্গাহীন উচ্ছ্বাস। সম্পূর্ণ অহঙ্কারশূন্য অথচ প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ ছিলেন।
খেতে ও খাওয়াতে খুবই ভালবাসতেন বনফুল।‌ ওঁর খাওয়া এবং খাওয়ানোর ঘটনা তো এক–একটা কিংবদন্তি। একবার প্রত্যক্ষভাবে একটি ঘটনার সঙ্গে জড়িয়েছিলাম। বনফুল এসেছেন ভাগলপুর থেকে কলকাতায়। পাইকপাড়ায় ছোটভাইয়ের বাড়িতে। গল্প–‌আড্ডার সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে খাদ্যগ্রহণ। অতঃপর আমাকে বললেন, ‘‌তুই আমার সঙ্গে চল— তোকে কলেজ স্ট্রিটে নামিয়ে দেব, তোর তো ওখানেই অফিস। আমারও বইপাড়ায় কাজ আছে।’‌ মোটরে রওনা হলাম। শ্যামপুকুরের কাছাকাছি এসে বললেন, ‘‌এখানে ওই ডান দিকে পানের দোকানের নিচে ভাল শিঙাড়া পাওয়া যায়। আলির (‌চালক)‌ কাছ থেকে টাকা নিয়ে গোটা ছয়েক কিনে নিয়ে আয়।’‌ বছর দুই আমি তখন (‌১৯৬৩/‌৬৪ সাল) প্রায়–রোজ ওই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতাম। কই নজরে পড়েনি তো ওই দোকান!‌ উনি কিন্তু কলকাতায় না থেকেও ছাত্রাবস্থার ওই দোকানটি মনে রেখেছেন!‌ যাক শিঙাড়া কিনে আনলাম।

জোর করে জড়োসড়ো অবস্থায় একটা খেতে হল। উনিও খেতে খেতে গল্প করতে লাগলেন। আলিকে লক্ষ্য করলাম সে নির্বিকার। মনে হল এসব ব্যাপারে অভ্যস্ত।
বনফুল খুবই আমুদে ও রসিক ছিলেন। 
আমার বাবা বনফুলের চতুর্থ ভাই (‌লালমোহন)। তঁার‌ কাছে শোনা একটা ঘটনা বলি। 
একবার বাবা ও মায়াদি (‌আমার পিসতুতো দিদি) গিয়েছেন ভাগলপুরের বাড়িতে। দু’‌জনেই খুব ভাল গান গাইতে পারতেন। বাবা পেশায় ডাক্তার, নেশা গান এবং বইপড়া। বিশেষ করে বিদেশি সাহিত্য। বনফুল রোজ গানের মজলিশি আড্ডা বসাতেন। তার সঙ্গে প্রচুর খাওয়াদাওয়া। ওঁর মত ছিল, ভোজন পূর্ণমাত্রায় না হলে ভজন ঠিকমতো ওজনে উতরোয় না। হত‌–ও তাই, যাঁরা উপভোগ করতে আসতেন, তাঁরা কেউ এই গাড্ডা (‌গান +‌ আড্ডা)‌ থেকে চট করে উঠতে পারতেন না। রাত হয়ে যেত, বনফুল সবাইকে রাতের ভোজন করিয়ে বাড়ি ফেরার অনুমতি দিতেন।
বনফুলের বোন রানি, বনফুলের মতোই মুখে মুখে যে কোনও সময় কবিতা বলে সবাইকে মোহিত করে দিতে পারতেন। খুবই বড় ঘরে বিয়ে হয়েছিল। প্রতাপশালী মহিলা ছিলেন আমাদের বড় পিসিমা। ছোট বোন খুকি সবার বড় আদরের ছিল। ছোট বোন এবং ছোট ভাইকে দাদারা কোনও দিন ‘‌বড়’‌ হতে দিলেন না, এতই স্নেহপ্রবণ ছিলেন। বনফুলের খুব গর্ব ছিল নিজের ভাই–বোনেদের নিয়ে।
উদার মানসিকতার মানুষ ছিলেন। সামাজিক পদমর্যাদাকে তুচ্ছ করে জীবন‌যাপন করেছেন। না দেখলে বিশ্বাস হয় না। প্রকৃত মনুষ্যত্ববোধের অর্থ ওঁর দৈনন্দিন জীবন থেকে প্রকাশ পেয়েছে প্রতিনিয়ত। একবার এক সকালে আমি গিয়েছিলাম ওঁর লেক টাউনের বাড়িতে। দেখি, একজন কাঠের মিস্ত্রি নিবিষ্ট মনে চেয়ার সারাচ্ছেন। বনফুল আরেকটি চেয়ারে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে তাঁর সঙ্গে গল্প করছেন। তাঁর পারিবারিক জীবন নিয়ে কত কথাই হচ্ছে!‌ পাশে অর্ধসমাপ্ত লেখা পড়ে রয়েছে। নিচের তলায় কোনও এক দর্শনপ্রার্থী অপেক্ষা করছেন। বনফুলের কোনও দিকেই খেয়াল নেই। তিনি একাগ্র হয়ে মিস্ত্রির পারিবারিক খবরা‌খবর নিচ্ছিলেন। তাঁর সঙ্গে হাসি–‌ঠাট্টা করছিলেন। এই ছিলেন নির্মোহ এবং প্রকৃত অর্থে মানুষ বনফুল। 
বনফুলের কনিষ্ঠা কন্যা করবীর কাছে একটা ঘটনার কথা শুনেছিলাম। একবার ভাগলপুর–‌সাহেবগঞ্জ রেল লাইনের স্টেশনে সপরিবার ট্রেন মিস করেছিলেন বলফুল। ওঁরা যখন স্টেশনে পৌঁছোলেন, ট্রেন বেরিয়ে যাচ্ছিল প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে। ট্রেনের চালক হঠাৎই বনফুলকে দেখতে পান। ট্রেন থামিয়ে সপরিবার তাঁকে তুলে নিয়েছিলেন। মানুষ বনফুলের জনপ্রিয়তার মূল্যায়ন এখানেই।
তাঁর নিষ্ঠা ছিল সাহিত্যে। প্রচারে নয়। সারা জীবন নীরবে বীণাপাণির বন্দনা করেছেন। কোনও প্রত্যাশা না করেই। বহু গুণ, ঐশ্বর্যের অধিকারী ছিলেন বলেই এত নির্লিপ্ত, অনাসক্ত এবং নির্মোহ থাকতে পেরেছেন।
আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম রইল আমার বড় জ্যাঠামশাই, পরিবারের সর্বজ্যেষ্ঠ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ প্রকৃত অর্থে মানুষ বনফুলের চরণে।‌‌‌‌‌ ■

 

স্ত্রী লীলাবতীর সঙ্গে

ভালবাসতেন ছবি আঁকতে
 

জনপ্রিয়

Back To Top