সানাইয়ের জাদুকর বিসমিল্লা খাঁর জন্মদিন চলে গেল ২১ মার্চ। তাঁকে নিয়ে তথ্যচিত্র করতে গিয়ে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন তিনি।আজ শ্রদ্ধা, ভক্তি, ভালবাসায় সে কথা মনে করে দিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষ। 

দেখেছিলাম তাঁকে, প্রতিটি রক্তকণায়–‌কণায় সে একজন বিশুদ্ধ মানুষ। 
এখনকার মতো কিছুটা ভাব–‌আবেগহীন আপাদমস্তক টুরিস্ট ‌স্পটে তখনও বেনারস পরিণত হয়নি। তাঁর কাছে শুনেছিলাম, ‘বেনারস’ নামটার একটা দারুণ তর্জমা।
‘বনারস, যাঁহা প্যার বনতা হ্যায় রস’, অর্থাৎ রসের আঁতুড়ঘর, প্রকৃত অর্থে যেখানে রসের জন্ম হয়। একজন শিল্পীর অন্তর্রসের কথা বোঝাতে চেয়েছিলেন তিনি। গঙ্গার হাওয়া যেন ঠিক তখনই দূর থেকে বয়ে আনছিল বেনারসের ঘাটের সন্ধ্যা–‌আরতির মাহাত্ম্য।
কোনও মানুষের শিকড় কতটা গভীরে প্রশস্ত হলে একজন খাঁটি শিল্পী হওয়া যায়?
– এই কথাটা আমি বুঝেছিলাম উস্তাদ বিসমিল্লা খাঁর জীবনের গহীনতাকে দেখার সুযোগ পেয়ে। ওঁকে নিয়ে ছবি করার পর আমার জীবনের দর্শনটাই বদলে গিয়েছিল। ওঁকে নিয়ে ছবি করতে পারাটা আমার জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি।
আলাপ
তখন সবেমাত্র ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ শেষ করেছি। সেই সময় আমার ভীষণভাবে মনে হচ্ছিল, যাঁরা মননশীল, সৃষ্টিশীল এবং নিজের আসনে প্রতিভাত— সেই সব শিল্পী–‌স্রষ্টাদের নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করি। তাঁদের জীবনের অভিজ্ঞতা, জ্ঞানের আলো ও গুণের ওম— সে সবের সান্নিধ্যে এসে জীবনকে উপলব্ধি করি। ‘অন্তর্জলী যাত্রা’–‌র পর আমি উৎপল দওকে নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলাম। সময়টা ১৯৮৮–‌৮৯, আমার কাছে একটা সুযোগও এসে যায়। এনএফডিসি, আইসিসিআর, সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি— এই তিন প্রতিষ্ঠান সিদ্ধান্ত নেয়, ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতকারদের নিয়ে ছবির প্রোডাকশন করবে। আমার কাছে যখন প্রস্তাব আসে, সেই প্রস্তাব আমি সানন্দে গ্রহণ করি ও কিছুটা সময় নিয়ে ভাবনাচিন্তা করে মনস্থ করি, উস্তাদ বিসমিল্লা খাঁকে নিয়েই ছবি করব। আর বেনারস যেহেতু তাঁর জীবনে ও যাপনে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, তাই ঠিক করেছিলাম, আমার ছবিতে যতটা সম্ভব বিসমিল্লা ও বেনারসকে সমার্থক করে তোলার প্রাণপণ চেষ্টা করব। ভাবলাম, ইসলামধর্মে সব কিছুর শুরুয়াত ‘বিসমিল্লা’ দিয়ে হয়, অতএব উস্তাদজিকে দিয়েই শুভযাত্রা শুরু হোক।
বেনারসে ওঁর সারাইয়ারার বাড়িতে যখন প্রথম প্রস্তাব যায় এনএফডিসি–‌র পক্ষ থেকে পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবির, শুনে তখনই নাকচ করে দেন। বলেন, ‘‌আমার মতো অতি সামান্য একজন সানাইবাদককে নিয়ে ছবি করার কোনও প্রয়োজন নেই। তাছাড়া সিনেমার ধকল সাইবে না শরীরে।’‌ তাঁকে যখন বোঝানোর চেষ্টা করা হল, ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতে তাঁর অবদান অপরিসীম এবং তা পরবর্তী প্রজন্মের জানা জরুরি। সেই সব শুনে উনি বলেছিলেন, ‘‌মিঞা তানসেনকে নিয়ে তো কোনও ছবি হয়নি, তবুও কি আমরা তাঁকে ভুলে গেছি!‌’‌
উস্তাদজির এমন প্রতিক্রিয়া জানতে পেরে আমার মনখারাপ হল। তখন আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখা করতে চাইলাম। উনি তো সিনেমা দেখতেন না, স্বাভাবিকভাবেই আমাকেও চিনতেন না। আমার নাম করে উনি আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব মহলে জিজ্ঞাসা করেন। ততদিনে আমার বেশ কয়েকটা ছবি হয়ে গেছে ও মানুষও একটু–‌আধটু চেনেন। উস্তাদজির পরিচিতদের মধ্যে কেউ বলেন, ‘‌গৌতম বহুত সিন্সিয়র ফিল্মমেকার হ্যাঁয়। বড়িয়া কাম করতা হ্যায়।’‌ প্রথম সাক্ষাতে আমাকে উনি দারুণ আপ্যায়ন করে বলেন, ‘‌মুঝে পতা নহিঁ থা, আপ তো বহুত বড়া কলাকার হ্যায়।’ ‌
এই কথাটায় আমার অসম্ভব লজ্জা পেয়ে ধুলোয় মিশে যেতে ইচ্ছা করছিল। ছিঃ ছিঃ! আমি কার সামনে দাঁড়িয়ে আছি! যন্ত্রসঙ্গীতের অন্যতম সম্রাট উস্তাদ বিসমিল্লা খাঁ!‌
ওঁর মাথা ছিল অঙ্কের মতো স্বচ্ছ। আমাকে শর্ত দিলেন, উর্দুতে দশটা পয়েন্টে আমি যেন লিখে নিয়ে আসি ওঁর থেকে ঠিক কী কী চাইছি, যা ছবিতে চিত্রায়িত করব।
আমি আসলে একটা তথ্যমূলক বয়োপিক করতে চাইনি। উস্তাদ বিসমিল্লা খাঁ, তাঁর দর্শন, সঙ্গীত ভাবনা–‌চেতনা, সমাজ, ইতিহাস, পরম্পরাকে তুলে ধরতে চেয়েছিলাম। আমার বন্ধু, কবি ও পুলিশ–‌প্রশাসক আয়ান রসিদ খাঁ আমাকে উর্দুতে সহায়তা করেছিলেন। শেষপর্যন্ত উস্তাদজিকে রাজি করানো গেল। কিন্তু উনি বললেন, চারদিনের বেশি সময় দিতে পারবেন না। আমি একটু চিন্তিত হয়ে পড়লাম, প্রায় ৯০–‌১০০ মিনিটের ছবি এত সামান্য সময়ের মধ্যে কী করে শেষ করব! পাল্টা বললেন, ‘‌আপলোগ ম্যানেজ কর লিজিয়ে।’‌
সিঙ্ক সাউন্ড, ৩৫ বিএল ক্যামেরায় শুটিং— সে সব সরঞ্জামসহ পুরো ইউনিট নিয়ে জুন–‌জুলাই মাস নাগাদ আমরা পৌঁছে গেলাম বেনারস। শুটিং শুরু হল, খাঁসাহেবও দারুণ মজে গেলেন তাতে। কাজ হচ্ছে, একই সঙ্গে নানা গল্প–‌আড্ডা, সঙ্গীত, খাওয়াদাওয়া সবই চলছে— এইভাবে যেন ক্রমশ ইতিহাসের দ্বার উন্মোচন হতে থাকছে আমাদের কাছে। আমি লক্ষ্য করেছিলাম, একটা অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছিল আমার প্রত্যেকটি ইউনিট মেম্বারের মধ্যে। মনের দিক থেকে এক অন্যরকম স্থিরতা, কিছুটা ধ্যানস্থভাব। অন্য একটা বিদ্যুৎ‌প্রবাহ উনি আমাদের সকলের মধ্যে চালিত করতে পেরেছিলেন। এইভাবে দেখতে–‌দেখতে ১১ দিন কেটে গেল। শুটিংও প্রায় শেষ, কেবল মহরমের সময় বিশেষ পর্বের শুটিং অবশিষ্ট থাকবে। সে কথা শুনে খাঁসাহেব অবাক হয়ে বললেন, ‘‌ইতনা জলদি জলদি! এখন তো সবে শুরু হয়েছে। আমার তো আরও অনেক কিছু বলার আছে!‌ অনেক কিছু শোনানোর বাকি!‌ আরও অনেক কিছু দেওয়ার আছে!‌’‌ সত্যি, আশ্চর্য এক ফকির মানুষ তিনি।
মেঠো সুর
একেবারে মাটির মানুষ যাকে বলে খাঁসাহেব ছিলেন ঠিক তাই। আমি জীবনে পরবর্তী সময়ে যখনি পেরেছি বেনারস ছুটে গেছি। ওঁর সানাইয়ের সুর যেন আমাকে টানত বেনারসে। কোনও কাজ শুরুর আগে খাঁসাহেবের আশীর্বাদ নিয়ে এসেছি বারবার। যেন পেতাম ফকিরের দোয়া। তিনি আমাকে ‘গৌতমবাবা’ বলে ডাকতেন। ওঁর সঙ্গে বেশ খানিকক্ষণ কথা বললে অদ্ভুতভাবে মনের যাবতীয় গ্লানি, অনুযোগ, অভিতাপ কেটে যেত। আনন্দ নিয়ে ফিরতে পারতাম। সাঙ্ঘাতিক রকমের সরলতা ছিল খাঁসাহেবের মধ্যে। উনি অতি সামান্যতে সন্তুষ্ট থাকতে পারতেন। এখন যাঁরা শিল্প নিয়ে বড়াই করেন, তাঁরা বোধহয় সে সব ভাবতেও পারবেন না। অবশ্য সময়ও বদলেছে বিস্তর।
স্বাধীনতার পর প্রথম প্রজাতন্ত্র দিবস। সেই অনুষ্ঠান উপলক্ষে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানান বিসমিল্লা খাঁ ও তাঁর ভাইকে সানাই বাজানোর জন্য। একটা পদযাত্রা হবে দিল্লিতে তাতে সানাই বাজাতে হবে। এই প্রস্তাব শুনেও প্রথমে নাকচ করে দেন তিনি। বলেন, ‘‌একমাত্র মহরমের দিন ছাড়া কখনও দাঁড়িয়ে সানাই বাজাই না।’‌ নেহরু তাঁকে পুনরায় অনুরোধ করলেন, বোঝালেন, ইতিহাসে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এর সঙ্গে যুক্ত। কাজেই যদি উনি নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে পদযাত্রায় সানাই বাজান খুব ভাল হয়। এবং পদযাত্রার প্রথম সারিতে সানাই বাজাতে–‌বাজাতে যাবেন উস্তাদজি ও তাঁর ভাই। দ্বিতীয় সারিতে থাকবেন রাষ্ট্রপতি ও তারপর প্রধানমন্ত্রী। পদযাত্রা পৌঁছবে লালকেল্লা। খাঁসাহেব ভাবনায় পড়ে গেলেন, সেদিন কী বাজানো যায়। হঠাৎ তাঁর মাথায় বেনারসের গঙ্গায় মাঝিদের মেঠো সুর মনে ভেসে এল। ‘‌গঙ্গা দুয়ারে বধাইয়া বাজে...।’ তাঁর সানাইয়ে সেদিন সমগ্র দেশবাসীর কাছে পৌঁছে গেল দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের মেঠো সুর।
তাঁর মন সর্বদা সমাজের একেবারে নীচের সারিতে থাকা মানুষের জন্যই কাঁদত। উস্তাদজির বিরাট পরিবার ছিল। বেনারসে যে সমস্ত দুঃস্থ মিউজিসিয়ানদের কাজ থাকত না, তাঁদের নিত্য খাঁসাহেবের বাড়িতে দুবেলা পাত পড়ত। বিশেষত সারেঙ্গিবাদকদের কোনও কাজ মিলত না, তাঁরা সকলে ছিলেন খাঁসাহেবের এই প্রসারিত পরিবারের অঙ্গ। এ সবই তিনি করতেন নিঃশব্দে ও নীরবে। যেন এটাই তাঁর কর্তব্য। তিনি মজা করে বলতেন, ‘‌বিসমিল্লা খাঁ অ্যান্ড হিজ পার্টি’‌।
একবার আমেরিকা থেকে প্রস্তাব এল, বিসমিল্লা খাঁ যেন তাঁর সম্প্রদায়ের অন্যদের নিয়ে ওই ‌মুলুকে ঠাঁই নেন। সেখানেই নিয়মিত বাজাবেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এবং মিউজিক স্কুল করে শেখাবেন সকলকে। খাঁ–‌সাহেব রীতিমতো সেই নাছোড়বান্দা আমেরিকান সাহেবকে বোঝাতে চেষ্টা করেন, অনেক বড় টিম, সানাইয়ের লোকলশকর–‌লটবহর নিয়ে খরচের অঙ্কটা বিপুল। কিন্তু সেই আমেরিকান ভদ্রলোককে কিছুতেই নিবৃত্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। বরঞ্চ তিনি রাজি হয়ে বলছেন, ‘‌নো প্রবলেম’‌। তখন খাঁসাহেব বললেন বিনয়ের সঙ্গে, ‘‌আমি যখন দেশের বাইরে বাজাতে যাই তখন আমার মাথায় থাকে আমার দেশ, ভারতবর্ষ। আবার যখন আমি এ দেশের মধ্যেই নানান শহরে বাজাতে যাই তখন আমার মাথার মধ্যে থাকে বেনারস। বেনারসের গঙ্গা, মন্দির, মসজিদ, পূজাপাঠ, কীর্তন, অলিগলি... আরও কতো কী ! এসব পারবেন আপনার দেশে আমাকে এনে দিতে?’‌
হতাশ হয়ে আমেরিকান ভদ্রলোকটি বললেন, ‘‌ইম্পসিবল!’‌
সুফিয়ানা
বিসমিল্লা খাঁ–‌সাহেবের রের্কড প্রায় সর্বাধিক বিক্রি হয়েছে। তিনি ছিলেন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। কারণ সব ধর্মের যে কোনও অনুষ্ঠানে সানাই বাজানো হত। বিশেষত হিন্দুধর্মের। তাছাড়াও এমন মানুষ খুব কমই আছেন যিনি বিসমিল্লার সানাই শোনেননি। এত বিক্রি, তার রয়্যালটি কোথায় যায়, কে পায়— সে সব নিয়ে কোনও মাথাব্যথাই ছিল না। কোনও বস্তুতাত্ত্বিক সামগ্রির উপর তাঁর  বিন্দুমাত্র লোভ ছিল না। ‌ভারতরত্ন‌, ‌পদ্মবিভূষণ‌ থেকে যাবতীয় পদ্ম–‌উপাধি, তানসেন সম্মান, সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি আরও অনেক পুরস্কার, সম্মান ও প্রাপ্তি তাঁকে বিন্দুমাত্র অবিচল করতে পারেনি। ভাবলেও অবাক লাগে। এই বিষয়টা আমাকে বিমুগ্ধ করে দিয়েছিল।
একদিন শুটিং চলাকালীন বললাম, ‘‌আপনার অল্প বয়সের অনেক ছবিতে দেখেছি, আপনি সাফা পরে, জ্যাকেট পরে বাজাতেন। বুকে অনেক মেডেল ঝোলানো থাকত। এখন তো সে সব পরেন না?‌ খুব সাধারণ পোশাক পরেন। ছোট একটা জহর কোটের মতো পরেন। সেই আগেকার মতো পোশাক পরে যদি একটা সিকোয়েন্স করতে পারি তবে খুব ভাল হয়।’ উনি একটু ভেবে বললেন, ‘‌দাঁড়াও, সে সব আমার ট্রাঙ্কে তোলা আছে। তাতে সব গোল্ড মেডেলও রাখা আছে।  এলাহাবাদ কনফারেন্সে পেয়েছিলাম, গোয়ালিয়রের মহারাজা দিয়েছিলেন। আরও সব বিভিন্ন জায়গায় মানুষকে আনন্দ দিতে পেরে পেয়েছিলাম। সে সব পুরনো দিনের লম্বা তালিকা। আরেকটা জিনিস আমার মনে হচ্ছে, মাঝখানে আমি একটু মোটা হয়ে গিয়েছিলাম, তাই সে সব জামা আমার গায়ে উঠত না। তবে অবশ্য এখন আমার যা চেহারা তাতে সেই সব পোশাক-পরিচ্ছদ আবার ফিট করতে পারে।’ আসলে এসব জিনিসের রক্ষণাবেক্ষণ ওঁর কন্যা করতেন। তাঁকে খাঁ–‌সাহেব খুব ভালবাসতেন। গানও শিখিয়েছিলেন। তিনি খুব অল্প বয়সে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর থেকে বোধহয় খাঁ–‌সাহেব সে ট্র্যাঙ্কে আর হাত দেননি। খাঁ–‌সাহেব রাজি হয়ে বললেন, ‘‌ঠিক হ্যাঁয়। তো কাল ওই পোশাকেই বাজাব।’ নির্ধারিত সময়ানুযায়ী পরের দিন ওঁর বাড়িতে শুটিংয়ে গিয়ে দেখি থমথমে পরিবেশ। কেউ পরিষ্কার করে কোনও কথা বললেন না। এমন সময়ে হঠাৎ ওঁর ছেলে এসে আমাকে জানালেন, শুটিং হবে না। উস্তাদজির মন ভাল নেই। একথা শুনে আমার তো মাথায় হাত, একদিন গোটা ইউনিট নিয়ে বসে থাকা মানে, প্রডিউসারের অনেকটা ক্ষতি। ঠিক কী হয়েছে জানতে আমি ওঁর কাছে যেতে চাইলাম। আমি ও আয়ান রশিদ খান সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলাম। খাঁ–‌সাহেবের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি থাকতেন চিলেকোঠার ছোট্ট একটা ঘরে। ওই ঘরটিতে আমি প্রথম গেলাম। খুব সাধারণ জীবনযাপন ও ন্যূনতম সামগ্রী— একটা খাটিয়া, কিছু বইপত্র, টিনের কিছু তোরঙ্গ, সকালবেলা রেওয়াজের জন্য সানাই রাখা আছে। আমাদের দেখে প্রথমেই বললেন, ‘‌আইয়ে... আপলোগো কে সামনে মেরা নাক কাটওয়া গয়া।’‌ আমরা জানতে পারলাম জামা, পাগড়ি আছে কিন্তু সোনার মেডেলগুলো একটাও নেই!‌
‘‌পয়সা কি লালচ মেঁ কোঈ উসে লে গয়া।’‌ এই কথাটা বলে খাঁ–‌সাহেব খুব ভেঙে পড়লেন। বললেন, ‘‌আপনাদের কথা দিয়ে খেলাপ করলাম, খুব লজ্জা লাগছে। ওই মেডেলগুলোর সঙ্গে যে কত স্মৃতি ছিল, আজ সেগুলোও চলে গেল!‌ থাকল না আমার কাছে!’‌
এখনকার এই লোভলালসার সময়ে বিসমিল্লা খাঁ ছিলেন সত্যি এক আত্মভোলা সুফি মানুষ। সুফি হচ্ছে ইসলামের হৃদয়। সেখানে সরাসরি ঈশ্বরের সঙ্গে যোগ স্থাপন করা যায়। কোনও রকম মাধ্যমের প্রয়োজন হয় না। আর সুফি–‌হৃদয় না থাকলে এমন আনন্দে আত্মত্যাগ ও সাধনা করা যায় না। সঙ্গীত সাধনার মধ্যে দিয়ে খাঁ–‌সাহেব সরাসরি আল্লাতালার কাছে পৌঁছতে পারতেন।
আমি যে সময় এই ছবির শুটিং করি, চারপাশে তখন চাপা অস্থিরতা চলছে, সেটা বাবরি মসজিদ ঘটনাকাণ্ডের ঠিক আগের পর্ব। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, কোনও একটা বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে চলছি আমরা। লালকৃষ্ণ আদবানিজির রথযাত্রা তখন বেরিয়ে গিয়েছে। এই রকম পরিস্থিতিতে খাঁ–‌সাহেব খুব অবাক হতেন এবং একই সঙ্গে খুব মর্মাহত। তিনি ছিলেন আদ্যন্ত নিষ্ঠাবান, শিয়া সম্প্রদায়ের এক ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। পাঁচবার নমাজ পড়তেন, সমস্ত ধর্মীয় আচার–‌অনুষ্ঠান পালন করতেন। আবার একই সঙ্গে ছিল অসম্ভব উদার মন তাঁর। পরধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাবান ছিলেন। কোনও রকম ধর্মীয় গোঁড়ামি ছিল না। খাঁ–‌সাহেব সব সময় সমন্বয় সাধন করতে চাইতেন।
শুটিংয়ের সময় একদিন বললেন, ‘‌আদবানিজির সঙ্গে আমার দেখা হলে বলব, আপনি রামনাম করছেন, আমার প্রত্যেকটা অনুষ্ঠানের শেষে অনুরোধ আসে ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম’ বাজানোর এবং আমি তা নিষ্ঠাভরে বাজাই। অতএব আমার থেকে বেশি রামনাম তো আপনি করেননি!‌ আমি জীবনে যতবার প্রোগ্রাম করেছি, ততবার রামনাম করেছি।’‌
সমগ্র পৃথিবীতে আজ প্রচণ্ডভাবে উগ্রবাদের আগ্রাধিকার। এমনকি ধর্মীয় অনুশাসন ও উৎসব এতটাই প্রাধান্য পাচ্ছে যে, মানুষ তার বাস্তব বুদ্ধি হারাচ্ছে। এ ধ্বংসের পৃথিবী আমাদের লজ্জার। এখন যেন রাজনীতি ও সম্প্রদায়িকতা দুটো সমার্থক শব্দ হয়ে গেছে। এই মারামারিতে হিন্দুরা মরছেন, আবার মুসলমানরাও মরছেন, অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষেরাও মরছেন— এতে আদপে কিন্তু মনুষ্যত্বের মৃত্যু হচ্ছে।
একবার খাঁ–‌সাহেব আমাকে বললেন, ‘‌দেখ গৌতমবাবা, কে হিন্দু, কে মুসলিম, তা দিয়ে কি শিল্পের বিচার হয়, না সঙ্গীতের? খুব ছোটবেলা থেকেই আমরা বড় হয়েছি রাধাকৃষ্ণের গল্প শুনে। আর বরাবরই মনে করে এসেছি, রাধাকৃষ্ণ আমাদেরই মধ্যেকার মানুষজন। তাদের প্রেমলীলাকে সঙ্গীতের ভিতর দিয়ে এমনভাবে পরিবেশন করতে হবে, যাতে শ্রোতারা আমার গায়ন–‌বাদনে রাধাকৃষ্ণের গল্প খুঁজে পান। শত–‌শত বছর ধরে কত মুসলিম সঙ্গীতশিল্পী ও বাদ্যকার এই রাধাকৃষ্ণের প্রণয়কাহিনী পেশ করে আসছে, সেখানে হিন্দু–‌মুসলিম সঙ্ঘাত, ধর্ম কোথা থেকে আসছে? আমি যখন এই পর্বে সানাই বাজিয়েছি, তখন বাজাতে–‌বাজাতে একটা সময় পর রাধার কষ্ট–‌যন্ত্রণায় আমার গাল বেয়ে চোখের জল অঝোরে নেমেছে। বাজাতে–‌বাজাতে মনটা আমার বৃন্দাবনে চলে গেছে।’‌
খাঁ–‌সাহেব বারবার বুঝিয়েছেন, যেমন সুরের কোনও ধর্ম হয় না, তেমন শিল্পীরও কোনও ধর্ম হয় না। সমাজে একজন শিল্পীর দায় থাকে যথেষ্ট। মানুষে–‌মানুষে সমন্বয় সাধন করাই তার কাজ, সেটা ভুলে গেলে চলবে কেন?
বিসমিল্লা খাঁ ছিলেন ভারতবর্ষের কম্পোজিট কালচারের প্রতিভূ। মোবাদ, দারাশুকো, লালন, কবির, নানক, রাজা রামমোহন রায়দের কথা মনে পড়লে একই সঙ্গে আমার খাঁ–‌সাহেবের কথাও মনে পড়ে। খাঁ–‌সাহেব একদিন তাঁর ছেলেবেলার কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘‌শৈশবের দিনগুলো
কীভাবে কেটেছে জানো? প্রতিদিন ভোরবেলা পবিত্র গঙ্গায় স্নান করতাম, তারপর মসজিদে গিয়ে নমাজ পড়তাম, তারপর সারাটা দিন বালাজি মন্দিরে গিয়ে সানাই বাজাতাম। কই কোনও দিন তো কিছু সমস্যা হয়নি! এর থেকে আনন্দের জীবন আর কী হতে পারে!’‌
এটাই তো প্রকৃত সেকুলারিজম। এটাই সেকুলার ইন্ডিয়া। আমরা ভারতের এই চেহারাটাকেই নষ্ট করে ফেলছি।
সুর ও ঈশ্বরসাধনা
‘‌লোকে বলে বিসমিল্লার ফুঁ, বিসমিল্লার আঙুল... এর কোনও তুলনা নেই। তাঁদের সকলকে বলি, আমি কে? কৌন হ্যায় বিসমিল্লা? আমাকে যিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁরই তো তারিফ হওয়া উচিত।’‌ খাঁ–‌সাহেব কিন্তু মনেপ্রাণে নিজেকে আল্লার ‘সামান্য সেবক’ মনে করতেন। তিনি একদিন দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘‌জানো, আমাদের ধর্মে একদল লোক সঙ্গীতকে ‘হারাম’ বলে চিহ্নিত করেছেন। তাঁরা বলছেন, সঙ্গীতচার্চা একেবারে ঠিক কাজ নয়, সঙ্গীত ‘হারাম’। গৌতমবাবা তুমি কি জানো, সকালে যে আজানের সুর তা
সম্পূর্ণভাবে সঙ্গীতে ভরপুর?‌’‌
উনি তখন আমাদের আজানটা শুনিয়ে বুঝিয়ে দিলেন। ভৈরবীতে তান করলেন, দেখলাম আজানের একই সুর।
সুরের দর্শনই খাঁ–‌সাহেবের জীবনকে চালনা করে নিয়ে গেছে। উনি মনে করতেন, সততা জীবনে না থাকলে, তিনি সুরকেও আর নিজের কাছে রাখতে পারবেন না। সুর
তাঁর সঙ্গ পরিত্যাগ করবে। সুরের সাধনা করতে গেলে মিথ্যাকে বর্জন করতে হবে। তিনি প্রতিদিন সুরচর্চার মতো এটাকেও অভ্যাসে পরিণত করতে পেরেছিলেন। জীবনের জটিলতাকে বিসর্জন দিয়ে আমরা কতোজনই বা পারি এমন হতে?
আমি শুটিংয়ে কলকাতা থেকে এইচএমআই আলো নিয়ে গিয়েছিলাম। চাঁদনি রাতের সিকোয়েন্স তৈরি করলাম। সেখানে ঠিক হল, খাঁ–‌সাহেব কেদার বাজাবেন। হঠাৎ
তাঁর আঙিনা ভরা ঝলমলে চাঁদের আলো দেখে উনি তো দারুণ খুশি। বললেন, ‘‌দেখা, সাইন্স কা কামাল!’‌ তো যাইহোক, খাঁ–‌সাহেব একদম বুঁদ হয়ে বাজাচ্ছেন। তাঁর
মাথার উপর একটা বাল্বসেড ছিল। তাতে ফোটোফ্লাড আলো দিয়েছিলাম। দৃশ্যভাবনা অনুসারে হাওয়ায় সেই আলোটা একটু–‌একটু দুলছিল। হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো বাল্বটা শব্দ করে ফেটে গেল। শুটিং বন্ধ। গোটা ফিল্ম ইউনিট নির্বাক। ক্ষমা চাওয়ার কোনও ভাষা নেই। সকলে ব্যতিব্যস্ত হয়ে খাঁ–‌সাহেবের গা, ‌মাথা থেকে কাচের টুকরো ঝাড়ছেন। তবুও যেন তাঁর কোনও দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। আমি দ্বিধা, লজ্জা, সঙ্কোচে খাঁ–‌সাহেবের সামনে ক্ষমা চাইবার জন্য দাঁড়াতেই তিনি একগাল হেসে বলে উঠলেন, ‘‌দেখা, একদম সম পে গিরা। আমি ঠিক সম–‌এ আসতেই বাল্বটা ফাটল, উসকা মতলব সুর মেঁ হ্যায় সব।’‌ এই হলেন উস্তাদ বিসমিল্লা খাঁ। জীবনের প্রতিটি আকস্মিকতায়, অভিব্যক্তিতে, প্রকাশে তিনি খুঁজে পেতেন সুরের মূর্ছনা। যেন তিনি তাঁর গোটা জীবন দিয়ে সুরেরই
অন্বেষণ করে বেড়াতেন। আমাকে বারবারই ধুয়োর মতো বলতেন, ‘‌সুর মেঁ হ্যায় সব।’‌
একদিন গল্প করেছিলেন খাঁ–‌সাহেব তাঁর পরিচিত এক বিচারকের কথা। তিনি নাকি শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদণ্ড ছাড়া আর কিছু দিতেন না। খাঁ–‌সাহেব সেই বিচারককে বললেন , সুরের তালিম নিতে এবং স্বয়ং বিসমিল্লা খাঁ তাঁকে সুর ও সঙ্গীতশিক্ষা দেবেন। এতে আশ্চর্যভাবে সেই বিচারক মানুষটি সম্পূর্ণ বদলে গেলেন। আর মৃত্যুদণ্ড দিতেন না!‌ প্রয়োজনে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিতেন।
একদিন শুটিংয়ের ফাঁকে আমি নিজের হাতে রান্না করে খাঁ–‌সাহেবকে খাইয়েছিলাম। সন্তুষ্ট হয়ে, খুশি হয়ে আমার পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘‌সুর মেঁ হ্যায়।’‌
আরেক দিন বললেন, ‘‌সাইন্স দারুণ কাজ করেছে, কিন্ত একটা জায়গায় গণ্ডগোল করে ফেলেছে। সবাই সুইচ টিপলে আলো জ্বলছে, পাখা চলছে– এটা ঠিক হয়নি। শুধু
যারা সুরেলা মানুষ, সৎ মানুষ একমাত্র তারা সুইচ টিপলে আলো–‌পাখা চলবে।’‌ প্রকারান্তে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন দুষ্ট মানুষের হাতে বিজ্ঞান দেওয়া ঠিক নয়।
তার ফল যুদ্ধের পর যুদ্ধ। এর কোনও অন্ত নেই। সুইচ টিপে নিমিষে সব শেষ।
খাঁ–‌সাহেব বিশ্বাস করতেন, মানুষের জীবনকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা সুরের আছে। তিনি বলতেন, ‘‌আমার হাতে রাজ্যপাট থাকলে আমি আইন করতাম— প্রত্যেক মানুষকে সুরশিক্ষা গ্রহণ করতে হবে, সুরের মানুষ হতে হবে। কারণ, সুর মানুষকে ভাল করে দেয়।’‌
এই প্রসঙ্গে মজা করে খাঁ–‌সাহেব বলতেন, ‘‌যাঁরা আমাদের দেশের মাথায় আছেন, তাঁদের কোনও পরীক্ষা নেওয়া হয় না। শুধু ভোট নেওয়া হয়। কিন্তু একটা একজামিনেশন বোর্ড থাকা দরকার। সে প্রেসিডেন্ট অফ ইন্ডিয়াই হোক বা প্রাইম মিনিস্টার, পরীক্ষা সকলকে দিতেই হবে। পরীক্ষা কারা নেবেন? একটা বোর্ড–‌প্যানেল তৈরি হবে, সেখানে সত্যিকারের প্রতিষ্ঠিত বা শ্রেষ্ঠত্বের খেতাব অর্জনকারী মিউজিশিয়নরা থাকবেন। যেমন, আলি আঁকবর খাঁ, রবিশঙ্কর, ভীমসেন যোশি, বিলায়েত খাঁ, আমি— সকলে প্যানেলে থাকবেন এবং কিছু শর্ত থাকবে। যেমন রাষ্ট্রপতিপদের জন্য যারা আবেদন করবেন, তাঁদের ন্যূনতম
পাঁচটা রাগ ও দশটা তাল জানতে হবে। প্রধানমন্ত্রীপদের জন্য হলে তিনটে রাগ ও ছয়টা তাল জানতে হবে। আর বাকি মন্ত্রী ও আমলাদেরও কম করে একটা রাগ ও দুটো তাল জানতে হবে। এটা আবেদন করার সর্বনিম্ন যোগ্যতা। এর পরে সুর‌জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব অনুসারে আসল সুরেলা মানুষটির উপর দেশশাসনের ভার নিযুক্ত করা হবে।’‌
খাঁ–‌সাহেব, এই আশ্চর্য চিন্তাধারার মধ্যে দিয়ে বলার চেষ্টা করেছিলেন, সুর হল সত্য। বিসমিল্লা খাঁর এই ইউটোপিয়া আজকের অসহিষ্ণু সময়ে এসে বেশি রকমের প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে। ক্ষমতার নির্বাচন যদি এই পথে হত, তবে হয়ত বৃহদাংশে সমস্যার কিছুটা সমাধান হতে পারত।
অনুলিখন সুদেষ্ণা গোস্বামী

ছবি: রঞ্জন ঘোষ
 

জনপ্রিয়

Back To Top