বিমল মিত্রের জন্ম ১৯১২ সালের ১৮ মার্চ। তঁাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, চিনেছেন বর্ষীয়ান লেখক, প্রকাশক সবিতেন্দ্রনাথ রায়।
তিনি আজ লিখলেন ‘‌সাহিত্যতপস্বী ‌বিমল মিত্র’‌।
জনপ্রিয়তার সঙ্গে অধ্যাপক–‌সমালোচকদের বোধহয় একটা আড়াআড়ি সম্পর্ক আছে। জনপ্রিয় গ্রন্থের আলোচনা এঁদের মুখে কদাচিৎ শোনা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে রম্যরচনা ও ভ্রমণকাহিনির রমরমা শুরু হয়েছিল। যাযাবর–‌এর ‘‌দৃষ্টিপাত’‌, সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘‌দেশে–‌বিদেশে’‌ হ‌ইহই করে বিক্রি হয়েছে।’‌ এর পরে–‌পরেই এল ‘‌রঞ্জন’–এ‌র ‘‌শীতে উপেক্ষিতা’‌, সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘‌পঞ্চতন্ত্র’‌ ও ‘‌ময়ূরকণ্ঠী’‌ — মনে হল উপন্যাসের কাল শেষ। তখনই তদানীন্তন সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায় শুরু হল বিমল মিত্রের ক্লাসিক উপন্যাস ‘‌সাহেব বিবি গোলাম’‌, প্রকাশিত হল তারাশঙ্করের ‘‌হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’‌, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘‌ইছামতী’‌। ‘‌হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’‌ শরৎচন্দ্র পুরস্কারে অভিনন্দিত হল, ‘‌ইছামতী’‌ পেল ‘‌রবীন্দ্র পুরস্কার’‌‌, কিন্তু ‘‌সাহেব বিবি গোলাম’‌ কোনও পুরস্কার পেল না! যদিও তখনকার কালে জনপ্রিয়তায় ছাপিয়ে গেল।
‘‌সাহেব বিবি গোলাম’–এ‌র পটভূমি কলকাতার ক্ষয়িষ্ণু বাবু কালচার। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ। সংসারের কর্তা নানা ব্যসনে টাকা ওড়ান। বাইজির বাড়ি যাতায়াত করেন। কিন্তু বাড়ির মেয়েদের ওপর কঠিন আব্রু। ব্রাহ্ম সমাজের আন্দোলন মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। কলকাতার পথ‌ঘাট ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে। বলা যায় নতুন কলকাতা গড়ে উঠছে, উত্তরে, মধ্যে এবং দক্ষিণে। এই পটভূমিতেই গড়ে উঠেছে ‘‌সাহেব বিবি গোলাম’‌–‌এর কাহিনি। কাহিনির নায়ক এক বনেদি বাড়ির আশ্রিত তরুণ ‘‌ভূতনাথ’–এ‌র বয়ানে বলা হয়েছে, নায়িকা এই বাড়িরই ছোট বউ।
বইটি বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে প্রশংসা ও সমালোচনার ঢেউ উঠল। পাঠকমহলে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা। সমালোচক–‌অধ্যাপকদের বিরূপ সমালোচনা। কিন্তু বইয়ের বিক্রি চলল দুর্দান্তভাবে। সবার ওপরে ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর মন্তব্য— ‘‌এ বই নোবেল পুরস্কারের যোগ্য।’‌
বিমলবাবুর জন্ম ১৯১২ সালের ১৮ মার্চ।
বিমলবাবুদের পৈতৃক বাড়ি ছিল কলকাতার চেতলা অঞ্চলে। দেশ ছিল মাজদিয়ায়। বর্তমানে চব্বিশ পরগনায়, আগে এটি ছিল নদিয়ায়। চেতলা স্কুলে পড়া শেষ করে, আশুতোষ কলেজে বি‌ এ পাশ করার পর ১৯৩৮–‌এ বাংলায় এম‌ এ পাশ করেন বিমলবাবু। তখন বাঙালির স্বপ্ন ছিল সরকারি চাকরি, রেল–‌এ চাকরি পেলেন বিমলবাবু।
কিন্তু চাকরিতে মন বসে না। শখ কেবলই ওস্তাদের গান শোনা। আর বিশেষ শখটি মনে পোষণ করেন, সেটি হল গান লেখা আর তাঁর লেখা গান নামী গায়কেরা গাইবেন।
এইভাবেই লাহাবাড়ির সতু লাহা তাঁর বন্ধু হয়ে গেলেন। বিখ্যাত ধনী পরিবারদের অন্যতম ছিল লাহাবাড়ি। সতুবাবুর সঙ্গে মিশতেই ধনী পরিবারদের নানা কাহিনি শুনলেন বিমলবাবু। শুধু শুনলেন না সেগুলি তাঁর মনে কীভাবে যেন গেঁথে গেল।
এদিকে ধ্রুপদী খেয়াল, ঠুংরি নানা গান শোনেন। একটি চরণ গায়ক কেমনভাবে ঘুরে–‌ফিরে গেয়ে চলেন। শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শোনেন। অভিভাবকেরা কিন্তু তাঁর এই সঙ্গীতপ্রীতি আমল দেন না। সব পিতা‌মাতাই চান ছেলে চাকরিতে উন্নতি করুক। সংসারী হোক। বিমলবাবুর বিয়ে দিলেন অভিভাবকেরা। কিন্তু গানের নেশা ছেড়ে এল সাহিত্যের নেশা।
গল্প লিখতে শুরু করলেন বিমলবাবু। এই সাহিত্যে তিনি নিয়ে এলেন নিজস্ব ঘরানা; সঙ্গীতজগৎ থেকে। ক্লাসিক্যাল গায়ক যেমন গাইতে গাইতে আবার প্রথম পঙ্‌ক্তিতে ফিরে যান, বিমলবাবুও অনায়াসে তাঁর কাহিনিতে পূর্বকল্পিত ঘটনার অংশ অক্লেশে মিশিয়ে দিতেন। পাঠকদের খেই হারাত না, একঘেয়ে লাগত না, গল্প–‌রসের আবেশে তারা মজে যেত। এইভাবে বিমলবাবু তাঁর নিজস্ব এক পাঠকমণ্ডলী গড়ে তুলেছিলেন।
বিমল মিত্রের প্রথম উপন্যাস ‘‌ছাই’‌ কিন্তু আশানুরূপ জনপ্রিয়তা পায়নি। বিমলবাবু তারপরই বসন্ত রোগে অসুস্থ হন। একটি চোখ হারান। রেল–‌বিভাগের অফিসার ছিলেন। চোখের অসুবিধের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে চোখের হালকা কাজের জন্য আবেদন করেন। রেল কর্তৃপক্ষ ওঁকে লেখালিখির কাজ থেকে অব্যাহতি দিয়ে রেল–‌এর দুর্নীতিদমন বিভাগে কাজ দিলেন।
রেল ‌দপ্তরের জগৎ বিশাল। সারা ভারত জুড়ে এর বাণিজ্য। আগে ছিল বেসরকারি ব্যবস্থা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই ইংরেজ সরকার এটি রাষ্ট্রায়ত্ত করে নেন। দেশে কালোবাজারির সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে শুরু হল রেল বিভাগে ওয়াগন–‌চাহিদার দুর্নীতি। যদিও তখন বিমলবাবু স্বাধীন ভারতের রেল ‌বিভাগের আমলা, পুরাতন ইতিহাস ঘাঁটতে ঘাঁটতেই তিনি পেয়ে গেলেন তাঁর দ্বিতীয় বিখ্যাত উপন্যাস ‘‌কড়ি দিয়ে কিনলাম’–‌এ‌র বিশাল পটভূমি ও তাঁর মালমসলা।
এই সময়েই অধুনালুপ্ত ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েটেড পাবলিশিং থেকে বেরোয় তাঁর কয়েকটি গল্পগ্রন্থ। সবগুলিই বেস্ট সেলার। এদের মধ্যে বিক্রিতে সব কটি গ্রন্থকে ছাড়িয়ে গেল ‘‌কন্যাপক্ষ’‌ গল্পগ্রন্থটি। দারুণ চিত্তাকর্ষক প্রচ্ছদ করেছিলেন শিল্পী অজিত গুপ্ত। তখন বিমলবাবুর সব বইয়েরই প্রচ্ছদ অজিতবাবু করতেন।
‘‌সাহেব বিবি গোলাম’‌ বেরোবার পর থেকেই আমরা বিমলবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে থাকি। তখনও যে ‘‌কড়ি দিয়ে কিনলাম’‌ লিখবেন, তা আমরা জানতাম না। লেখক ছাড়া সম্ভবত কেউই ভাবতেন না। আমরা যেতাম নতুন বইয়ের আশায়। তখন বিমলবাবু বিচারপতি মাসুদ সাহেবের চেতলার তিনতলা বাড়িটি কিনে সেখানে বাস করেন। ২৯/‌১/‌১ চেতলা সেন্ট্রাল রোড।
সে–‌সময়ে আমাদের প্রকাশন থেকে অবধূত–‌এর ‘‌মরুতীর্থ হিংলাজ’‌, ‘‌উদ্ধারণপুরের ঘাট’‌ বেরিয়ে গেছে। তবুও একজন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকের বই পাওয়ার প্রত্যাশা ছাড়িনি। আর এই চেষ্টাতেই তো একটি প্রকাশন চলমান থাকে। লেখকদেরও প্রতিষ্ঠা বাড়তে থাকে।
দুর্নীতিদমন বিভাগে থাকাকালীন বিমলবাবুর বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা শুনতাম। এক টন নারকেল তেল টিনে ভর্তি করে পাঠানো হল, পথে কীভাবে সমস্ত টিনই ভেঙে গেল। প্রেরক ক্ষতিপূরণ দাবি করল রেলের কাছে। তদন্তে গেলেন বিমলবাবু। কতটা ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন প্রেরক। সরেজমিনে তদন্তে একটি টিন অক্ষত দেখা গেল। সেটি খুলে দেখা গেল— নারকেল তেল নয়, সবটাই জল। তখন দুর্ঘটনা, ক্ষতিপূরণ দাবি সবটাই সাজানো মনে হল। বিমলবাবু তদন্তের অফিসার। যে বাড়ি ভাড়া নিয়ে আছেন, তার সামনে গাছতলায় দেখেন, একটা নতুন সাইকেল দাঁড় করানো। কার সাইকেল কে জানে!‌ একদিন এক অবাঙালি ভদ্রলোক এসে সরাসরি জিজ্ঞেস করে বসল, সাহেব, আপনি সাইকেলটা ব্যবহার করছেন না, আপনার জন্যেই তো রেখেছি।
বিমলবাবু বললেন, আমার তো সাইকেল–‌রিকশাতেই কাজ চলে যায়। দূরে হলে গাড়ি।
ভদ্রলোক নাছোড়বান্দা। শেষে সরাসরি টাকা ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব। তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে কলকাতা ফিরলেন বিমলবাবু।
এরপর বিমলবাবু রেলের চাকরিতে ইস্তফা দেন।
ততদিনে বেশ কিছু পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়ে গেছে বিমলবাবুর। দেশ পত্রিকায় সাড়ম্বর শুরু হয়ে গেল ‘‌কড়ি দিয়ে কিনলাম’‌— সতী লক্ষ্মী দীপঙ্করের উপাখ্যান। সে কী উৎসাহ পাঠকদের!‌ পাতিরামের স্টলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উৎসুক পাঠকেরা পত্রিকা না কিনেই পড়ে নিত সতী–‌লক্ষ্মীর কী হল?‌ ঘোষাল সাহেবের পরবর্তী মতলব কী?‌ যদিও পত্রিকার দাম তখন অনেক কম ছিল, মাত্র চার টাকা, তবে টাকার দামও তো কম ছিল না!
‘‌কড়ি দিয়ে কিনলাম’‌ প্রকাশের জন্য আমরা আবেদন করলাম। ‘‌সাহেব বিবি গোলাম’‌–এর প্রকাশক বলছেন, ‘‌বিমলবাবু, আমরা কাগজ পাঠিয়ে দিই, যদি ছাপতে দেন আমাদের।’ বেঙ্গল পাবলিশার্সও আবেদন জানিয়ে যাচ্ছেন। আমরা একদিন চেকবই নিয়ে গেলাম। চুক্তিপত্র তৈরি করে। গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‌কত টাকার চেক কাটব?‌’‌
বিমলবাবু জ্যোতিষচর্চা করতেন, জ্যোতিষ মানে ঠিকুজি দেখা। এই নিয়ে শরদিন্দুবাবু (‌বন্দ্যোপাধ্যায়)‌, নকুল চট্টোপাধ্যায় এবং বিমলবাবুদের একটি গোষ্ঠী তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আমার কোষ্ঠীপত্রও বিমলবাবু দেখেছিলেন, ভেবেছিলেন এই মানুষটার সঙ্গে কাজ হলে অসুবিধে হবে না।
বিমলবাবু বললেন, তিন হাজার লিখুন।
আমরা ভাউচার তৈরি করলাম। তিন হাজার টাকার চেক ও নগদ এক টাকা রাখলাম বিমলবাবুর সামনে।
বললেন, নগদ এক টাকা কেন?‌
আমরা বললাম, এটা তো পুজোর মতোই— এক টাকা নগদ রাখলাম সেজন্য।
‘‌কড়ি দিয়ে কিনলাম’‌ ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়ে যাচ্ছে। কে ছাপবে কেউ জানে না। আমরা নীরবে আছি। ‌বিরাট উপন্যাস। বিমলবাবুর সঙ্গে পরামর্শ করা হল। দুটি খণ্ডে প্রকাশিত হবে। তখনও তো ফটো কম্পোজ— ইত্যাদি আসেনি। লাইনো কম্পোজ সবে উঠেছে। বিমলবাবুর সঙ্গে আগেই কথা হয়েছিল। ‘‌কড়ি দিয়ে কিনলাম’‌ দুই খণ্ডে বেরোবে। প্রথম খণ্ড প্রায় হাজার পৃষ্ঠা। দাম ষোলো টাকা। দ্বিতীয় খণ্ড চল্লিশ ফর্মা। ৬৪০ পৃষ্ঠা, দাম চৌদ্দ টাকা। এত দামি উপন্যাস তখনকার দিনে আর ছিল না। আর এইভাবে বিক্রি হবে তাও কেউ ভাবেনি। সবচেয়ে অবাক করা কাণ্ড, এই বইটির সমালোচনা করলেন— অধ্যাপক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। জনপ্রিয় উপন্যাসের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকলেন না। ১৯৬৪ সালে রবীন্দ্র পুরস্কারও পেল গ্রন্থটি।
‘‌সাহেব বিবি গোলাম’‌ ছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকের পটভূমিতে, ‘‌কড়ি দিয়ে কিনলাম’‌ বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি জায়গায়। তারপর বেরোল ‘‌আসামী হাজির’‌— সে বইও আমরা ছাপলাম। তারও পরে বেরোল ‘‌বেগম মেরী বিশ্বাস’‌— সে বই অবশ্য অন্য প্রকাশক ছেপেছিল।
বিমলবাবু ‘‌ঘরোয়া’‌ পত্রিকায় আর একটি ধারাবাহিক উপন্যাস ধরেন ‘‌একক দশক শতক’‌, দেশভাগের ওপর, এদেশে উদ্বাস্তু আগমন এবং রাজনীতির পঙ্কিল পরিবেশ–‌এর ওপর গড়ে উঠেছে ‘‌একক–‌দশক–‌শতক’–এ‌র কাহিনি। রঙ্গমঞ্চে এই কাহিনির নাটক–‌পরিবেশনায় সরকারি হস্তক্ষেপ পড়েছিল।
বিমলবাবু ‘‌বেগম মেরী বিশ্বাস’‌, ‘‌সাহেব বিবি গোলাম’‌, ‘‌কড়ি দিয়ে কিনলাম’‌, ‘‌একক দশক শতক’‌ ও ‘‌চলো কলকাতা’‌— এই পাঁচটি গ্রন্থে তিনশো বছরের কলকাতার ইতিহাস কাহিনিবদ্ধ করেছেন। যা নিশ্চিতভাবেই ভবিষ্যৎকালের ইতিহাস–‌রচয়িতাদের সাহায্য করবে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার মশাই একবার বলেছিলেন, ‘‌জানেন, শিলালিপি দেখে, ভ্রমণকাহিনিকারদের ভ্রমণ বিবরণ দেখে ইতিহাস লেখার দিন এখন চলে গেছে। এখন খাঁটি ইতিহাস লিখতে হলে সমকালীন ভাল উপন্যাস পড়তে হবে। সমাজচিত্র সেখানেই নিখুঁতভাবে ফুটে ওঠে যেখানে লেখক প্রকৃত মানবদরদি হয়ে ওঠেন।’‌
বিমলবাবুর তখন তুঙ্গে বৃহস্পতি। ‘‌দেশ’‌, ‘‌নবকল্লোল’‌, ‘‌ঘরোয়া’‌ একসঙ্গে তিন পত্রিকায় ধারাবাহিক চলছে। সবই লাইন–‌টানা ফুলস্ক্যাপ কাগজে লিখে লিখে দিচ্ছেন, তাও একসঙ্গে সব কিস্তি নয়। কারও তিন পাতা, কারও দুই পাতা, শেষ শব্দটা লিখে রাখতেন পরের পাতায়। কী করে কাহিনি মনে রাখতেন, জানি না। এ এক অসম্ভব শক্তি। আমার নিজের চোখে দেখা।
আমাকে ফোনে মাঝে মাঝেই বলতেন, ভানুবাবু, অফিস যাওয়ার পথে একবার আমার কাছে হয়ে যাবেন?‌ একটা দরকারি কথা আছে।
আমি গিয়ে দেখলাম, লেখার কিস্তি নেওয়ার জন্য ‘‌দেশ’‌ পত্রিকার প্রতিনিধি বসে আছেন। তাঁর পরে পরেই এলেন, ‘‌ঘরোয়া’‌ ও ‘‌নবকল্লোল’‌ পত্রিকার প্রতিনিধি।
তাঁরা যেতেই এলেন এক হিন্দিভাষী ভদ্রলোক। তাঁর হাতে এক বান্ডিল হিন্দি চিঠি ধরিয়ে দিলেন বিমলবাবু। ‘‌ভাই, এতগুলি চিঠি এসেছে। আপনি এই পোস্টকার্ডগুলিতে উত্তর লিখুন, আমি পরে সই করে দেব।’‌
একটু অবসর পেতেই বিমলবাবু বললেন, ‘‌ভানুবাবু, আজকালকার নবীন লেখকদের কথা শুনি, অনেকেই নাকি না ভেবে উপন্যাস শুরু করেন, তারপর দরকার হলে একটা শেষ টেনে দেন। আমি কিন্তু তা করি না। বাড়ি থেকে রওনা হওয়ার সময়ে যেখানে যাব ঠিক করি, সেখান থেকে ফেরার টিকিট আগে কেটে রাখি। অর্থাৎ শেষটা কী হবে আগে ঠিক করে রাখি।’‌
আমি বললাম, ‘‌সে তো আমরা জানিই। সেজন্যই আপনার কাহিনি, উপন্যাস, গল্প সবই এত টান টান।’‌
বিমলবাবু বললেন, ‘‌না, এবারে আমি যেটা করব, সেটা হচ্ছে আমি গল্পের শেষটা পাঠকদের আগেই বলে দেব। তারপর দেখব পাঠকদের শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারি কিনা। বইয়ের নামটাও দিচ্ছি— ‘‌শেষ পৃষ্ঠায় দেখুন’‌।’‌
নিরন্তর গল্প নিয়ে ভাবনা, প্লট নিয়ে ভাবনা বিমলবাবুর সৃষ্টি সাহিত্যকে পাঠকদের কাছে এক অন্য স্তরে নিয়ে গিয়েছিল। তাঁর বই হিন্দি ভাষাতে তো বটেই অন্য বহু ভারতীয় ভাষায়ও অনুবাদ হয়। একবার আমরা হিন্দি ঔপন্যাসিকদের খোঁজে দিল্লি যাই। জৈনেন্দ্রকুমার জৈনের তখন খুব নাম। দরিয়াগঞ্জে তাঁর বাড়ি গিয়ে শুনলাম তিনি দিল্লির বাইরে, ফিরতে দেরি হবে। হিন্দি ভাষায় বই ছাপানোর ভাবনা তখন আমাদের।
আমরা একটি পত্রিকার অফিসে এক বাঙালি বন্ধুর কাছে গেলাম পরামর্শ নিতে, আর কোন হিন্দি কথাসাহিত্যিক আছেন, যাঁর বই ছাপা যায়। বন্ধু বাঙালি সাংবাদিক তাঁর হিন্দিভাষী সহকর্মীর সঙ্গে আমাদের আলাপ করিয়ে দিলেন। আমার উদ্দেশ্যও বললেন। হিন্দিভাষী সাংবাদিক বললেন, ‘‌তা আপনারা তো কলকাতাতেই মসুর হিন্দি সাহিত্যিককে পেয়ে যাবেন!‌’‌
আমরা অবাক হয়ে তাকাতে বললেন, ‘‌আরে বিমল মিত্র তো কলকাতাতেই থাকেন না!‌’‌
আমরা বললাম, ‘‌বিমল মিত্র বাংলা ভাষার সাহিত্যিক, হিন্দি কথাসাহিত্যিক নন।’‌ আমরা তাঁর মূল বাংলা লেখার প্রকাশক।’‌
সে ভদ্রলোক অবাক হয়ে বললেন, ‘‌বিমল মিত্র অরিজিনাল হিন্দি রাইটার নহিঁ থে। হিন্দি লেখার জন্য কত পুরস্কার মিলছেন।’‌
আমরা মাথা নেড়ে ওঁর দুঃখ বাড়ালাম।
আসলে মানবিক আবেদন, সুখ–‌দুঃখ–‌আনন্দ–‌সমস্তই বিমল মিত্রের সাহিত্যে এত মর্মস্পর্শী, সমস্ত ভাষার পাঠকের কাছেই তা তার নিজের মর্মকথা হয়ে ওঠে। শরৎচন্দ্রের পর আমরা আর কোনও বাঙালি লেখকের এমন সর্বভারতীয় জনপ্রিয়তা দেখিনি।
আর আমি স্বচক্ষে দেখেছি, রাশি রাশি হিন্দি পাঠকদের চিঠির উত্তর লেখার জন্য বিমলবাবুকে এক হিন্দিভাষী পত্রলেখককে পয়সা দিয়ে রাখতে হয়েছে।
যশ ও জনপ্রিয়তা শিল্পী মাত্রেরই কাম্য। কিন্তু এই যশ ও জনপ্রিয়তা আবার শিল্পীর জীবনে সঙ্কট সৃষ্টি করে। বন্ধুত্ব ভেঙে যায়। অকারণ শত্রুতার সৃষ্টি হয়। অনেক সময় ঘনিষ্ঠ লেখক বন্ধুও ঈর্ষান্বিত হন।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত উপদ্রব বিমলবাবুর জীবনেও এসেছিল। ‘‌সাহেব বিবি গোলাম’–এ‌র জনপ্রিয়তার সময়ে এর উল্লেখ করেছি। ‘‌কড়ি দিয়ে কিনলাম’‌ যখন বেরোল, তখন এটিই বাংলা সাহিত্যের বৃহত্তম উপন্যাস। দেড় হাজার পৃষ্ঠার ওপর এই বই। অসাধারণ সমাদর ও দারুণ বিক্রি। কিছু (‌দু–‌তিনজন)‌ অসাধু প্রকাশক মাথা খাটিয়ে এক ভদ্রলোককে খুঁজে বার করলেন। তাঁরও নাম বিমল মিত্র, কয়লার দোকান আছে। তাঁকে কিছু টাকা দিয়ে অন্য সস্তার লেখককে দিয়ে জোলো কিছু বই লেখালেন। নাম দিলেন— বিমলবাবুর বইয়ের নাম নকল করে,— যেমন ‘‌কড়ির চেয়ে দামী’‌, ‘‌বিবি গোলাম সাহেব’‌— এই রকম সব। এগুলিও দারুণ বিক্রি হতে লাগল। পাঠক, লাইব্রেরি বিভ্রান্ত হল। লাইব্রেরিতে একই সঙ্গে আমাদের লেখক বিমল মিত্রের বইয়ের সঙ্গে কয়লার দোকানের মালিক বিমল মিত্রের বই মিশে গেল। একজন সমালোচকও বিভ্রান্ত হয়ে দুজনের বই সমালোচনা করলেন একই লেখক ভেবে। আমরা বিমলবাবুকে বললাম— চলুন যাই পুলিশের কাছে— কিছু করা যায় কিনা।
‌বিমলবাবু রাজি হলেন না। না মশাই, এ নিয়ে পুলিশ–‌আদালত আর ভাল লাগে না। এক ‘‌সাহেব বিবি গোলাম’‌ প্রকাশকের কাছ থেকে উদ্ধার করতেই কত ঝামেলা হল। এইরকম জনপ্রিয় বইয়ের বিক্রি দেখাচ্ছিলেন সেই প্রকাশক, বছরে তেইশখানা কী চব্বিশখানা।
শেষকালে জাল বই ঠেকানোর একটা উপায় বার করা হল। জাল বই বোধহয় বলা ঠিক হল না। জাল লেখক বলা যায় হয়তো। বা ডামি লেখক।
ঠিক হল, এবার থেকে ‘‌কড়ি দিয়ে কিনলাম’‌ বাদে সব বই বিলমবাবুর নাম–‌স্বাক্ষর ছাপা হয়ে বেরোবে। এই প্রসঙ্গে প্রতি বইয়ে টাইটেল পৃষ্ঠার সঙ্গে বিমলবাবুর এই বিষয়ে একটি বিবৃতিও ছাপা হতে শুরু হল। বিষয়টি বোঝাবার জন্য একটি পৃষ্ঠার ফটোকপি এইসঙ্গে দিলাম।
বিশেষ বিজ্ঞপ্তি
আমার পাঠক–‌পাঠিকাবর্গের সতর্কতার জন্যে জানাই যে সম্প্রতি অসংখ্য উপন্যাস ‘‌বিমল মিত্র’‌ নামযুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। পাঠক মহলে আমার জনপ্রিয়তার ফলেই এই দুর্ঘটনা সম্ভব হয়েছে। ও–‌নামে কোনও দ্বিতীয় লেখক নেই। পাঠক–‌পাঠিকাবর্গের প্রতি আমার বিনীত নিবেদন এই যে, সেগুলি সম্পূর্ণ জাল বই। একমাত্র ‘‌কড়ি দিয়ে কিনলাম’‌ ছাড়া আমার লেখা প্রত্যেকটি গ্রন্থের প্রথম পৃষ্ঠায় আমার স্বাক্ষর মুদ্রিত আছে।
বিমল মিত্র
আগে বলেছি, এই ডামি বিমল মিত্রের বইয়ের জন্য বিমলবাবুকে অনেকে ভুল বুঝেছেন। এই বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পর থেকে সে উপদ্রব কমে গেল।
শেষ দিকে বিমলবাবুর বড় উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল— এই নরদেহ। বিমলবাবু মানুষের জীবনের দুঃখ–কষ্ট–আনন্দের কথাই বার বার বলার চেষ্টা করেছেন। তাঁর এই চেষ্টা সেইসঙ্গে তাঁর সৃষ্টির নান্দনিকতা— সব কিছু মিলিয়েই তাঁকে সর্বভারতীয় লেখক করে তুলেছে। সেখানে বাঙালি, তামিলভাষী, হিন্দিভাষী, গুজরাটি, মালয়ালমভাষী সব সমান। এই জন্যই মরিশাসে বিশ্ব হিন্দি সম্মেলনে তাঁকে নির্দ্বিধায় ভারতের প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হয়।
বিমলবাবুর সঙ্গে কথা বলে মনে হত, দেশে কত কী ঘটনা ঘটছে। খেলা‌ধুলো থেকে রাজনীতি, সিনেমা থেকে সরকারের গদি পরিবর্তন, বিমলবাবুর কিন্তু বিশেষ কোনও ভাবান্তর নেই। সর্বদাই তাঁর চিন্তা–‌জগৎকে আচ্ছন্ন করে থাকত সাহিত্যের ভাবনা–‌চিন্তা।
একদিন বললেন, আমি একটা নতুন ধরনের ধারাবাহিক ধরব ভানুবাবু, উত্তম পুরুষে, উপন্যাসের নায়ক ‘‌আমি’‌। বইয়ের নামও হবে ‘‌আমি’‌।
বিমলবাবুর আশ্চর্য লেখনীর গুণে সে বইও পাঠক সাদরে গ্রহণ করল। বিক্রির পর বিক্রি, সংস্করণের সংস্করণই তো পাঠক জনপ্রিয়তার বড় প্রমাণ। উত্তমপুরুষে কাহিনি বর্ণিত, এমন উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে কটি আছে গবেষকেরা বলতে পারবেন। তবে খুব কম লেখকই এই ক্ষমতা ধরেন সে উপন্যাস পাঠককে পড়াতে। বিমল মিত্র সেই ক্লাসিক ও সার্থক লেখকদের অন্যতম।
বিমলবাবুর পাঠক–‌জগৎও ছিল বিচিত্র। ‘‌কড়ি দিয়ে কিনলাম’‌ উপন্যাসে প্রচ্ছন্নভাবে কংগ্রেসের সমালোচনা আছে। তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন আমাদের বন্ধু গান্ধী–‌বাদী শৈলেশবাবুকে অনুরোধ করেন, এক সেট ‘‌কড়ি দিয়ে কিনলাম’‌ তাঁকে কিনে দিতে, যখন আসবেন যেন নিয়ে আসেন, দাম তখন দেবেন। কংগ্রেস থেকে বামপন্থী, সব ধরনের লোক, অতুল্য ঘোষ থেকে জ্যোতি বসু সবাই ‌তাঁর পাঠক ছিলেন। সবাই তাঁর গল্প লেখার অসাধারণ ক্ষমতা স্বীকার করে নিয়েছেন।
আমাকে বলতেন, ভানুবাবু, দরিদ্র হতাশাভরা মানুষের জীবন আমাকে কী এক আশ্চর্য মমতায় টানে। ডেভিড কপারফিল্ডে মিঃ মিকবারের চরিত্র মনে আছে?‌ কোনও একদিন ভাল আসবে এই আশায় জীবনটা কেটে গেল।‌ ‘‌কড়ি দিয়ে কিনলাম’‌ সন্তোষবাবুর চরিত্র আমার এই প্রেরণায় আঁকা।
গল্প বা উপন্যাসের প্লট নিয়ে নানারকম ভাবনা–‌চিন্তায় মগ্ন থাকতেন বলেই তাঁর ভক্ত পাঠকেরা তাঁর নামের আগে ‘‌সাহিত্য–‌তপস্বী’‌ অভিধাটি জুড়ে দিয়েছিলেন। আমাদের মনে রাখতে হবে তাঁর অসংখ্য গুণমুগ্ধ পাঠকদের মধ্যে ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর মতো মানুষও আছেন।
‘‌সাহেব বিবি গোলাম’‌ বাংলায় সফল চলচ্চিত্র হয়েছিল। তারপর এটি হিন্দিতেও করার জন্য প্রস্তাব এল গুরু দত্তের কাছ থেকে। গুরু দত্তর সনির্বন্ধ অনুরোধ, এয়ার টিকিট পাঠাচ্ছি— আসা–‌যাওয়ার, এখানেই চুক্তি হবে।
বাংলায় একাধিক বিয়োগান্তক চলচ্চিত্র বাণিজ্যিক ভাবে সাফল্য পেয়েছে। ‘‌সাহেব বিবি গোলাম’‌ও তার মধ্যে অন্যতম। কিন্তু হিন্দিতে বিয়োগান্তক ছবি করতে হিন্দি প্রযোজক বা হিন্দি পরিচালকরা তেমন ভরসা পান না। সেজন্য শেষ দৃশ্যে একটা মিলনান্তক চিত্র তাঁরা জুড়ে দেবেনই। এইখানেই ছিল গুরু দত্তের সমস্যা। সেইজন্যই বিমলবাবুকে গুরু দত্তের মুম্বই ডেকে আনা। ছবিটিকে কীভাবে মিলনান্তক করা যায়!‌
বিমলবাবু আমাকে পরে বলেছিলেন, বুঝলেন ভানুবাবু, একটা বই না চললে আপনাদের মানে প্রকাশকদের, কয়েক হাজার টাকা লোকসান হয়। সিনেমা না চললে, এখানে বাংলার কথা বলছি, কয়েক লক্ষ টাকা লোকসান হয়। কিন্তু হিন্দি ছবি না চললে, লোকসানটা কোটিতে পৌঁছয়। লোকে ভিটে–‌মাটি হারিয়ে পথে বসে। গুরু দত্তের সমস্যাটা বুঝতে আমার অসুবিধে হয়নি।
সাহেব–‌বিবি–‌গোলাম চিত্রস্বত্বর চুক্তিপত্রে সই–‌সাবুদ হয়ে গেল। কিন্তু আলোচনা ফুরোয় না। চলচ্চিত্রে গল্প কীভাবে শেষ হবে, দিন–‌রাত সেই আলোচনা। শেষকালে গুরু দত্ত বললেন, চিত্রনাট্য আপনি করুন, নাম যারই থাক। ভেবে দেখুন, কীভাবে শেষ করবেন।
যতই ভাবনা–‌চিন্তা করুন, ‘‌সাহেব বিবি ঔর গোলাম’‌–‌এর শেষ আর কিছুতেই মিলনান্তক হল না। বিমলবাবু আমাকে বলেছিলেন, বলুন ভানুবাবু, এ কি ব্যাঁকা লাঠিকে সোজা করা যায়?‌ আমি গুরু দত্তকে বলে দিলাম, আপনি এ বই ছেড়ে দিন, অন্য কোনও, অন্য কারও বই করুন।
গুরু দত্তর তখন অন্য রূপ। ‘‌না দাদা, এই বই যখন করব বলেছি, তখন করবই। হোক ট্রাজেডি। জানেন, যখন গীতা (‌গীতা দত্ত)‌ আমাকে ভালবাসল, আমি ওর প্রেমে মুগ্ধ, তখন আমার আয় মাসে পাঁচশো টাকা। কী আর হবে, বই না চললে তখন আবার ফকির।’‌
সেই বিয়োগান্তক ছবিই হল— ‘‌সাহেব বিবি ঔর গোলাম’‌, ট্রেড শোতে অনেকেই গুরু দত্তকে বললেন, এত খরচ করে তুমি ট্রাজিক ছবি বানালে!‌ এ ছবি দর্শক নেবে না।
ছবি রিলিজ হতে চলেছে, গুরু দত্তর রাতে ঘুম নেই। আবার ফকিরি!‌ তত দিনে বিমলবাবু কলকাতা ফিরে এসেছেন।
কিন্তু দেখা গেল হিন্দিভাষী দর্শকদের চিনতে গুরু দত্ত বা বিমলবাবু কেউ ভুল করেননি। হিন্দি চলচ্চিত্রটির বিপুল সাফল্য তাবৎ হিন্দি–‌ফিল্ম জগৎকে বোকা বানিয়ে লক্ষ লক্ষ দর্শকদের চিত্ত জয় করে নিল। আর গুরু দত্তকে সিনেমা–‌লক্ষ্মী তাঁর কলসি উপুড় করে ধন–‌রত্ন ঢেলে দিলেন।
সেই থেকে যারই ছবি গুরু দত্ত করুন না কেন, চিত্রনাট্য যেই করুক না কেন, শেষটা বিমলবাবুকে চোখ বোলাতেই হবে। ‘‌মহাবলীপুরম’‌–‌এ জায়গা ঠিক করে রাখেন গুরু দত্ত। সেখানে বসে বিমলবাবু গুরু দত্তের ফিল্ম স্ক্রিপ্টে চোখ বোলান। তবে গুরু দত্তের শান্তি। শেষ নিয়ে গুরু দত্তের রাত্রের ঘুম চলে যায়। স্লিপিং পিল ভরসা। বিমলবাবু ভার নিলে ভরসা।
এই ভাবে বিমলবাবু গুরু দত্তের অচ্ছেদ্য ভরসা ও বন্ধু হয়ে ওঠেন। তফাত থাকলেও একান্ত পারিবারিক বন্ধু। গীতা দত্তের সঙ্গে যখন গুরু দত্তের বিবাহ হয়, গীতা দত্ত তখন খ্যাতনাম্নী প্লে–‌ব্যাক সিঙ্গার। হাজার হাজার টাকা আয়। গুরু দত্তের মাসে পাঁচ–‌শো, সাতশো। এখন গুরু দত্তর আয় লক্ষ লক্ষ টাকা। গুরু দত্ত চান গীতা অন্যের বইয়ের কাজ ছেড়ে দিন। বিদেশের অনুষ্ঠানে গাওয়া ছেড়ে দিন। কিন্তু কোন শিল্পী তাঁর খ্যাতির জগৎ ছেড়ে দিতে চান স্বেচ্ছায়। এই নিয়ে পারিবারিক বিবাদ। সেখানেও বিমলবাবু পারিবারিক হিতৈষী, এই দ্বন্দ্ব মেটাতে সাহায্য করেন।
কিন্তু বিমলবাবুরও তো একটা নিজস্ব সাহিত্যজগৎ আছে। এতগুলি ধারাবাহিক সামলাতে হয়। পুজোর লেখা আছে। সবসময় কলকাতা ছাড়া সম্ভব হয় না।
সাফল্যেরও একটা বিড়ম্বনা আছে। নিপীড়নও আছে। প্লট সামলাতে, ব্যক্তিগত সমস্যা সামলাতে তখন গুরু দত্তের ভরসা হয়ে ওঠে স্লিপিং পিল, কতদিন না ঘুমিয়ে কাটাবেন। এই অতিরিক্ত স্লিপিং পিল সেবনই তাঁকে একদিন চিরনিদ্রায় ঘুম পাড়িয়ে দিল।
গুরু দত্তের মৃত্যু বিমলবাবুকে বড়ই আঘাত দিয়েছিল। ছোট ভাইযের মতো ছিলেন গুরু দত্ত। গুরু দত্তও নিজের বড় ভাইয়ের মতো দেখতেন বিমলবাবুকে। এই ভালবাসাই তাঁকে প্রবুদ্ধ করল গুরু দত্তের জীবনী লিখতে। এক সফল পরিচালকের ব্যথা–‌বেদনা–‌ভালবাসা ভরা জীবন কথা ‘‌বিনিদ্র’‌। ‘‌ঘরোয়া’‌ পত্রিকায় ধারাবাহিক বেরোয়।
বিমলবাবুর সাহিত্যকর্ম চলছে। কোনও সভায় বা আড্ডায় যান না। ওঁর যা আড্ডা বাড়িতে বা নিভৃতে। আমার মতো দু–‌চারজন প্রকাশক বা ভক্ত পাঠকদের সামনে। নিকটবর্তী পাড়ার লেখক শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও অধ্যাপক সুনীল দাশ যা এইরকম কোনও মানুষ আসতেন। নিতাই ছিল তাঁর নিত্য গৃহকর্মের সাথি, গাড়িচালক সব। স্ত্রীকে বড় ভালবাসতেন, তাঁর ওপর নির্ভর করতেন সাংসারিক সব বিষয়ে। কিন্তু সাহিত্যিক ভাবনা–‌চিন্তায় প্লট নির্বাচনে সেখানে তিনি একক, স্বরাজ্যে স্বরাট। বিকেলে মাঝে মধ্যে গাড়ি নিয়ে স্ত্রী–সহ বেরোতেন। আর কোনও শখ নেই। নেশার মধ্যে একমাত্র নস্যি নেওয়া দেখেছি।
তবে এড়াতে পারতেন না পাঠকের ভালবাসা। এঁদের পীড়াপীড়িতেই যেতে হয়েছে মরিশাসে, বিশ্ব হিন্দি সম্মেলনে। হিন্দি–‌ভাষী জগতের পাঠকরা তাঁকে জানেন, হিন্দি ভাষারই মূল লেখকরূপে (‌সে–‌কথা আগে বলেছি)‌।
পাঠককে নতুন নতুন বিচিত্র কাহিনি উপহার দিতে তিনি কার্পণ্য করতেন না। বাইরের ঘরের একটি সোফার চেয়ারে পেপার ক্লিপ বোর্ডের ওপর রেখে লিখে চলতেন। কেউ গিয়ে পড়লে বলতেন, একটু বসুন, এই পাতাটা শেষ করি।
পিছনে র‌্যাক ভর্তি বই। ডিকেন্স, শেক্সপিয়র থেকে ও–‌হেনরি, কাফ্‌কা থেকে কামু। সামনের টেবিলে দুই খণ্ড শান্তিনিকেতন, ওপরে রবীন্দ্রনাথের একটি স্বল্প পরিচিত ছবি।
এক ভক্ত পাঠক এসে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি রবীন্দ্রনাথের ছবি চিনতে পারেননি, আপনার গুরুদেব বুঝি?‌
বিমলবাবু অম্লানবদনে বললেন, হ্যাঁ, বটেই তো।
পরে সে পাঠক চলে গেলে বললেন, কি বলেন ভনুবাবু, ঠিক বলিনি?‌ রবীন্দ্রনাথ তো আমাদের সকলের গুরু।
অন্য লেখকদের লেখা কি পড়েছেন প্রসঙ্গ উঠলে বলতেন আমার ডিকেন্স আর শেক্সপিয়র সব থেকে বেশি ভাল লাগে। তারপর ও’‌হেনরি। ও’‌হেনরির ছোটগল্পের তুলনা নেই। সেই জন্যই তো ও’‌হেনরির ছোটগল্পের অনুবাদ করলাম। আর ‌মন খারাপ কোনও কারণে হলে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন পড়ি। তবে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে কোনও বই আমাকে বড় আনন্দ দেয়। কী সরল সহজ বর্ণনা। হাজারি ঠাকুর অতসীদের বাড়ি থেকে একপেট খেয়ে এসে আবার এক বাটি মুড়ি নিয়ে বসেছে। এমন সময়ে অতসী এসে পড়তে মুড়ির বাটি লুকোবার পথ পায় না। কী নিটোল অনাড়ম্বর বর্ণনা। কিংবা সেই ‘‌ইছামতী’‌ উপন্যাসের আপাত, অল্পশিক্ষিত রামকানাই কবিরাজের ভবানী পণ্ডিতকে সরল এক জিজ্ঞাসা— পণ্ডিতমশাই, ব্রহ্মা–বিষ্ণু– মহেশ্বর তো বুঝলাম, কিন্তু এইসব সৃষ্টির আদি সংবাদটা কী?‌ এক গ্রাম্য আপাত স্বল্পশিক্ষিত কবিরাজের মুখে এমন একটা গূঢ় প্রশ্ন ভবানী পণ্ডিতকে অবাক করে দেয়।
বিমলবাবু অনর্গল বলে যাচ্ছেন— সামান্য দু–‌একটি কলমের আঁচড়ে অসামান্য সৃষ্টি করে গেছেন বিভূতিবাবু, তার তুলনা নেই। আর একটা বড় কথা শিখিয়ে গেছেন— দারিদ্র‌্য জীবনের বড় সম্পদ। যে তা না বুঝতে পারে তার পক্ষে বড় কিছু করা সম্ভব নয়। বুঝলেন ভানুবাবু, আমি সেজন্যই কড়ি দিয়ে কিনলাম–‌এ অভাবী কিরণের ফেলে দেওয়া ডাবের শাঁস খেয়ে পেট ভরানোর কথা লিখতে পেরেছি।
কিন্তু যে স্নেহভাজন গুরু দত্তকে তিনি চিত্রনাট্যের শেষ কোথায় হবে ভাবতে ভাবতে জীবন–‌যন্ত্রণা ভুগতে দেখেছিলেন, শেষের দিকে সেই ভাবনা তাঁকেও পেয়ে বসেছিল।
আমার মতো আরও কয়েকজন তাঁর সাহিত্যের গুণগ্রাহী ছিলেন। এইরকম দু–‌চারজন মানুষের সামনে বিমলবাবু বলছিলেন, আমার একটা উপন্যাসের নায়ক সকালবেলায় মায়ের আগের দিনের করা দুটি বাসি রুটি বাসি কুমড়োর তরকারি দিয়ে জলখাবার সারছিল, এমন সময়ে তার বান্ধবী এসে পড়ল। এই বান্ধবী তার হবু প্রেমিকা। এ যদি পাঠককে গ্রহণ করাতে না পারি, তা হলে তো আমার কলম ধরাই বৃথা।
এই গল্প নিয়ে, গল্পের প্লট নিয়ে বিমলবাবুর ভাবনা–‌চিন্তার সাক্ষী হলেন তাঁর প্রতিবেশী অধ্যাপক সুনীল দাশ। বিমলবাবুর সাহিত্যের ওপর বিস্তৃত গবেষণা করেছেন সুনীল দাশ।
‘‌বিনিদ্র’‌ নামে গুরু দত্তের জীবনীতে গুরু দত্তের যে যন্ত্রণার কথা লিখেছেন, সেই যন্ত্রণাতে বিমলবাবুও আক্রান্ত হলেন। গুরু দত্তের পারিবারিক জীবনে অশান্তি ছিল। কিন্তু বিমলবাবুর পারিবারিক জীবনে নিবিড় শান্তি ছিল। অশান্তি ছিল তাঁর শিল্পী–‌মনে। কীভাবে নতুন কাহিনি শুরু করবেন। কীভাবে শেষ করবেন। এই নিবন্ধের গোড়ায় বলেছি, আমায় একবার বলেছিলেন, শেষটা পাঠকদের আগে বলে দেব, তারপরও গোটা বইটা পড়িয়ে নেব।
নিরন্তর এই চেষ্টায় তাঁর রাতের ঘুম চলে যেত। বাড়ির সামনের দোতলায় পায়চারি করছেন, গল্পের ভাবনা, প্লটের ভাবনা তাঁকে যেন তাড়া করে বেড়াচ্ছে। শেষকালে, ক্লান্ত হয়ে পড়লে, অগতির গতি, নিদ্রার ট্যাবলেট খেয়ে শুয়ে পড়া। তাতেও কি নিদ্রা আসে, আসত না। মাঝে মাঝে আবার খেতে হত ট্যাবলেট।
এরই মধ্যে দেশের ভাবনা, সমাজের ভাবনা তাঁকে কুরে কুরে ছিন্নভিন্ন করত। ‘‌আমেরিকা’‌ নামে গল্পটিতে আমাদের কলকাতার হতশ্রী চিত্র ফুটে উঠেছে। ‘‌শয়তান’‌ নামে একটি গল্পে শয়তান ঈশ্বরকে বড়াই করে বলছে— দ্যাখো তোমার সব মানুষকে আমি কিনে নিয়েছি। কেমন সবাই পয়সা নিয়ে একবার দক্ষিণপন্থীদের মিছিলে যাচ্ছে, আবার বামপন্থীদের মিছিলে যাচ্ছে। পয়সার কাছে সততা, আদর্শ সব বিকিয়ে গেছে।
মনুষ্যত্বের এই অপমান ও লাঞ্ছনা বারংবার বিমলবাবুর মনকে পীড়িত করেছে। সেই মনোবেদনাই জমতে জমতে লেখনী দিয়ে পাঠকের কাছে মূর্ত হয়েছে। আমেরিকান সাহেব বাঙালির কাছে প্রশ্ন তুলেছেন— তা হলে আমরা যে এত সাহায্য করছি, গম পাঠাচ্ছি তা যাচ্ছে কোথায়?‌ PL-480 ‌চুক্তির টাকা‌‌ কী হচ্ছে!‌
একদিকে মনুষ্যত্বের এই নিদারুণ লাঞ্ছনা আর যন্ত্রণার জন্য মনোবেদনার কথা ভাবা, সেই ভাবনাকে সাহিত্যে রূপ দেওয়া, সেই সঙ্গে পাঠকের মনকে নিবিষ্ট করে ধরে রাখার প্রয়াস— বিমলবাবুর অনিদ্রা শুরু হল। নিয়মিত ঘুমের ওষুধ খেতে বাধ্য হলেন।
খালি লেখার কথা ভাবতেন, দক্ষিণের লম্বা বারান্দায় পায়চারি করতেন, মাঝে মাঝে নস্যি নিতেন, ‌আর প্লট কীভাবে গাঁথবেন, কীভাবে শেষ করবেন তারই ভাবনা–‌চিন্তা করে যেতেন।
এইভাবেই হয়তো খেয়াল নেই, ঘুমের ট্যাবলেট কটা খেলেন মনে ছিল না, একদিন রাতের ঘুম থেকে উঠছেন না দেখে বাড়ির লোকে নার্সিংহোমে পাঠান। খবর শুনে আমরা ছুটে গেলাম। আমাদের সঙ্গে বাদলবাবুও (প্রয়াত ‌বাদল বসু –‌ তখন আনন্দ পাবলিশার্সের জেনারেল ম্যানেজার)‌ ছিলেন। কিন্তু বিমলবাবুর জ্ঞান আর ফিরল না। সেই স্লিপিং ট্যাবলেটের নিদ্রা চিরনিদ্রায় পরিণত হল। স্রষ্টার চরিত্র তাঁর ‘‌বিনিদ্র’‌ গ্রন্থের নায়ক গুরু দত্তের সঙ্গে অবিকল মিলে গেল। ১৯৯১ সালের ২ ডিসেম্বর ছিল সেদিন।
এ যেন এক যোদ্ধার চিরবিদায়। যুদ্ধক্ষেত্রেই শেষশয্যা সাজানো হল। নিরন্তর সাহিত্যভাবনা বিমল মিত্রের রণক্ষেত্র রূপে চিহ্নিত হল।‌‌‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top