পয়লা বৈশাখে নববাবুদের বাড়িতে পুরাতনী গান, ভক্তিগীতি, ধ্রুপদী গানে আসর জাগিয়ে রাখতেন শিল্পীরা। লিখেছেন হরিপদ ভৌমিক। ছবি: লালুপ্রসাদ সাউ

বাংলা সালা সাল–‌তারিখকে বাঙালি মনে করে বা মাতামাতি করে মাত্র দুটো দিন। এক পয়লা বৈশাখ আর দ্বিতীয়টি রবি ঠাকুরের জন্মদিন, পঁচিশে বৈশাখ। সাহেবদের দৌলতেই ‘‌নিউ ইয়ার’‌ পালনে বাঙালির হামলে পড়া শুরু। তবে বাংলা নববর্ষও একেবারে ব্রাত্য ছিল না। ইংরেজি নববর্ষের শুরু ১ জানুয়ারি থেকে। প্রথম খ্রিস্টাব্দের সেই প্রথম দিনটি ছিল শনিবার। সেই হিসাবেই প্রথম বঙ্গাব্দের পয়লা বৈশাখটি পড়েছিল ইংরেজি ১২ এপ্রিল ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে।  সোমবার। 
বঙ্গবাসী বাংলা ও ‌ইংরেজি দুটো নববর্ষ উনিশ শতকে কীভাবে পালন করত তার অনবদ্য বর্ণময় বিবরণ পাওয়া যায় হুতোম–‌এর নকশায়:‌ ‘‌ইংরেজরা নিউ ইয়ারের বড় আমোদ করেন।.‌.‌.‌ বাঙ্গালিরা বছরটী ভাল রকমেই যাক আর খারাবেই শেষ হক্‌, সজ্‌নে খাড়া চিবিয়ে ঢাকের বাদ্দি আর রাস্তার ধূলো দিয়ে পুরাণকে বিদায় দ্যান। কেবল কল্‌সি উচ্ছুগ্‌গু কর্ত্তারা আর নতুন খাতাওয়ালারাই নতুন বৎসরের মান রাখেন।’‌
হুতোম বাংলা নববর্ষ উৎসব উদ্‌যাপনকে দুটি পর্বে ভাগ করেছেন, একটি পর্ব নববাবুদের উৎসব পালনের বিষয়। ধর্মীয় পূর্ণকলস উৎসর্গের মতো নববাবুরা বছর শেষকে বিদায় এবং মদের কলসী উৎসর্গ করে বাগানবাড়িতে নববর্ষকে স্বাগত জানাত। অন্য পর্ব দোকানদারদের হালখাতার মধ্য দিয়ে নববর্ষ উদ্‌যাপন করা।
চৈত্র সংক্রান্তির দিন সন্ধ্যায় বাবুরা কেউ যাবেন রক্ষিতার বাড়িতে, কেউ যাবেন বাগানবাড়ি। বাবু আমোদ করতে যাবেন, তাই বাবুর স্ত্রীকে চুনট করা উড়ুনিটা, সোনায় কাজ করা হাতির দাঁতের ছড়িটা, রুমালটা হাতের উপর তুলে দিতে হত। রুমালটা হাতে নিয়ে হয়ত বাবু দেখলেন তাতে বোকে মাখানো নেই। ব্যাস্‌!‌ বাবু রেগে লাল, বললেন, বোকেটা আবার গেল কোথায়?‌ বাড়ির ‘‌মেয়েছেলেটা’‌ এটুকুও খেয়াল রাখতে পারে না। সে কি রাজকার্য্য করে!‌ কিসের জন্য তা হলে বিয়ে করা?‌’‌
পান থেকে চুন খসলেই স্ত্রীদের এমন গালিগালাজ আর হেনস্থার মুখে পড়তে হত। তাই তাঁরা সব সময় তটস্থ হয়ে থাকতেন। তাঁরা যখন দুঃখে ভেঙে পড়তেন, তখন ঠানদিদিরা বলতেন, ‘‌রাগ করিসনে নাতবৌ। মেয়েছেলে হয়ে জন্মেছিস— সব সইতে হয়। তোর শ্বশুরের বাবা,—সেও রোজ সন্ধেবেলা এমনটি করেই বেরিয়ে যেত!‌ আমি সাজিয়ে গুজিয়ে দিতাম!‌ তিনি রামবাগানে যেতেন। আর যখন ফিরতেন তখন রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে গেছে। বছরে যে ক‌টা দিন রাত তাঁর সান্নিধ্য পেতাম তা হাতে গুনলে এক আঙুলেই শেষ হয়ে যাবে।’‌
চৈত্র সংক্রান্তি হল বাংলা বছরের শেষ দিন। সেই দিনটিরও মনোজ্ঞ বর্ণনা দিয়েছেন হুতোম। বলছেন, ‘‌এদিকে শহরে সন্ধ্যাসূচক কাঁসর ঘণ্টার শব্দ থাম্‌লো। সকল পথের সমুদায় আলো জ্বালা হয়েছে। ‘‌বেল ফুল!‌’‌ ‌‘‌বরফ’‌!‌ ‘‌মালাই’‌!‌ চিৎকার শোনা যাচ্চে। আবগারীর আইন অনুসারে মদের দোকানের সদর দরজা বন্ধ হয়েচে অথচ খদ্দের ফিচ্চে না।
.‌.‌.‌মেছোবাজারের হাঁড়ি হাটা–‌ চোরবাগানের মোড়, যোড়াসাঁকোর পোদ্দারের দোকান, নতুন বাজার, বটতলা, সোনাগাছির গলি ও আহিরিটোলার চৌমাথা লোকারণ্য— কেউ মুখে মাথায় চাদর জড়িয়ে মনে কচ্চেন কেউ তাঁরে চিনতে পার্‌বে না;‌ আবার অনেকে চেঁচিয়ে কথা কয়ে, কেশে, হেঁচে, লোককে জানান দিচ্চেন যে, ‌তিনি সন্ধ্যার পর দু‌দণ্ড আয়েস করে থাকেন।
আজ নীলের রাত্তির। তাতে আবার শনিবার;‌ শনিবারের রাত্তিরে শহর বড় গুলজার থাকে— পানের খিলীর দোকানে বেল লণ্ঠন আর দেওয়াল গীরি জ্বল্‌ছে। ফুরফুরে হাওয়ার সঙ্গে বেলফুলের গন্ধ ভুর ভুর করে বেরিয়ে যেন শহর মাতিয়ে তুলচে।.‌.‌.‌’‌
বছরের শেষ রাতটি শেষ হতে চলেছে, ‘‌এদিকে গিজ্জার ঘড়িতে টুং টাং ঢং টুং টাং ঢং, করে রাত চারটে বেজে গ্যালো— বারফ্‌টা বাবুরা ঘরমুখ হয়েছে।’‌
হুতোম ঠিকই বলেছেন, ‘‌কলকেতা শহরের আমোদ শিগ্‌গির ফুরায় না।’‌ রাজবাড়ির মতো ১লা বৈশাখেও নববাবুদের বাড়িতে পুরাতনী গান, ভক্তিগীতি, বৈঠকী বা ধ্রুপদী গানে আসর জাগিয়ে রাখতেন শিল্পীরা।
রাজবাড়িতে এইদিন পুণ্যাহ অনুষ্ঠান হত, এরই অন্য নাম হালখাতা। এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে কৃষি–‌অর্থনীতি যুক্ত ছিল। মুঘলসম্রাট আকবর জমিদারদের বকেয়া রাজস্ব আদায়ের জন্য ‘‌পুণ্যাহ’‌ নামের অনুষ্ঠান চালু করেছিলেন। ১লা বৈশাখে বাংলার নবাব মুর্সিদ কুলি খাঁর আমন্ত্রণে জমিদার বা তাঁদের উকিলেরা নৌকো বা পালকি চড়ে মুর্শিদাবাদে যেতেন খাজনার শেষ কিস্তি জমা দিতে। খাজনা দেওয়ার পর সোনার মোহর নজরানা দিলে, নবাববাহাদুর পদমর্যাদা অনুসারে খেলাৎ বা শিরোপা অর্থাৎ পাগড়ি, পোশাক ও কোমরবন্ধ দিয়ে সম্মান জানাতেন। আলিবর্দী খাঁয়ের সময় একটি পুণ্যাহ অনুষ্ঠানে বাংলার বিভিন্ন স্থান থেকে অন্তত ৪০০ জমিদার ও রাজকর্মচারী মুর্শিদাবাদে গিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
রাজা বা জমিদারবাড়িতেও আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য সন্ধ্যায় শাস্ত্রীয়সঙ্গীতের আসর বসত। এর সূত্র ধরেই কলকাতার নববাবুরা সঙ্গীতের আয়োজন করতেন। পরবর্তীকালে দোকানে খদ্দেরদের মনোরঞ্জনের জন্য দোকানে দোকানে সন্ধ্যায় গানের আসর বসত। তখনও মাইক্রোফোনের চল হয়নি, খালি গলাতেই শিল্পীরা আসর মাত করতেন। বিখ্যাত সব শিল্পীর গান শুনতে রাস্তায় ভিড় জমে যেত। পরের দিকে কলের গান বাজিয়ে নববর্ষে দোকানে অনুষ্ঠান করা হত। পথচলতি মানুষ অবাক হয়ে দেখতেন ও শুনতেন কলে মানুষ গান গাইছে!‌
১৯৩৮–‌৩৯ সাল নাগাদ আকাশবাণীতে নববর্ষের অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয়;‌ সেখানে গান, আড্ডা, গীতিআলেখ্য ইত্যাদি নানান অনুষ্ঠান প্রচারিত হত। কাজী নজরুল ইসলাম নববর্ষ উপলক্ষে গান করেছেন। এছাড়া, মহিলামহল বা গল্পদাদুর আসরেও নববর্ষের অনুষ্ঠান প্রচারিত হত। নববর্ষকে সামনে রেখে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের ডালি সাজিয়ে সুন্দরভাবে পরিবেশনের মধ্য দিয়ে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন আকাশবাণীর কর্মকর্তারা।
বাংলা নববর্ষকে সামনে রেখে শুরু হয়েছিল প্রথম সাহিত্যবাসর। ভাবনাটা ছিল এম সি সরকার অ্যান্ড সন্সের প্রাণপুরুষ সুধীরচন্দ্র সরকারের। ওঁর নববর্ষের দিন সাহিত্যিক ও সাহিত্য–‌রসিকদের নিয়ে গল্প–‌আড্ডায় মিলনবাসরের স্বপ্ন পূর্ণ হল ১৩৬২ সালে (‌ ইংরেজি ১৯৫৫)‌। এই নববর্ষে প্রথম সাহিত্যবাসরের সভাপতি হন ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকার। পরের পরের বছর, অর্থাৎ ১৩৬৪ সালে (‌ইংরেজি ১৯৫৭)‌ সাহিত্যবাসরের সভাপতি ছিলেন অতুলচন্দ্র গুপ্ত। সেই আসরে উপস্থিত ছিলেন অন্নদাশঙ্কর রায়। আর তাঁর এক বক্তব্যের জেরে শুরু হয় বাংলা সাহিত্যের এক নতুন অধ্যায়। সভায় উপস্থিত তুষারকান্তি ঘোষ জানিয়ে দিলেন, প্রতি বছর শ্রেষ্ঠ সাহিত্য ও গবেষণা কাজের জন্য এক হাজার টাকা করে দুটি পুরস্কার দেবেন। আরেক সংবাদপত্র গোষ্ঠীও প্রতি বছর উৎকৃষ্ট সাহিত্যের জন্য এক হাজার টাকার দুটি পুরস্কারের কথা ঘোষণা করে। মৌচাক পত্রিকার পক্ষে সুধীরচন্দ্র সরকার শ্রেষ্ঠ শিশুসাহিত্যের জন্য এবং উল্টোরথ পত্রিকা কর্তৃপক্ষ শ্রেষ্ঠ কবিতার জন্য ৫০০ টাকার একটি করে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। 
পরের বছর, মানে ১৩৬৫ সালে প্রথম বছর সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া শুরু হল। অমৃতবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর পুরস্কার পান হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। আরেক সংবাদপত্র গোষ্ঠীর পুরস্কার পেলেন বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় এবং সমরেশ বসু। হেমেন্দ্রকুমার রায় পেলেন মৌচাক পুরস্কার আর সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী যুগ্মভাবে পেলেন উল্টোরথ পুরস্কার। উল্লেখ্য, সেই সাহিত্য পুরস্কার প্রদানের এবার ষাট বছর পূর্ণ হল।
বাঙালি ভোজনরসিক। খাওয়া ছাড়া তার কোনও উৎসবই জমে না। তাই নববর্ষের ভোজন–‌আয়োজনেও ঘাটতি পড়েনি। একবার দেখে নেওয়া যাক, সেকালে খাবারদাবারের আয়োজন কেমন ছিল। রবিদাস চট্টোপাধ্যায় আত্মজীবনীতে নববর্ষের দিন বাহান্ন রকম পদের কথা লিখেছেন। ‘‌ভাজা মুগ ডাইল, আমড়া মিশ্রিত টকডাল, শাকভাজা, প্রচুর নিরামিষ তরকারি। মাছের মধ্যে আমোদি, পুঁটি, মৌরলা, বেলে, শোল। মাংসের আয়োজনে পাঁঠার ঝোল। এছাড়া কাঁচা আমের চাটনি, ঘরে বানানো মিষ্টি আর পান–‌সরবত। পাশে রাখা কর্পূর দেওয়া জল।’‌ ভাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখছেন, ‘‌চালের স্বর্গীয় সৌরভের লড়াই চলিতেছে ঘৃতের সহিত।’‌
উনিশ শতকে দোকানে কিন্তু এখনকার মতো ‘‌ধার চাহিয়া লজ্জা দিবেন না’‌ বোর্ড ঝুলত না। উল্টে ধার–‌বাকিতেই ক্রেতা–‌বিক্রেতার আত্মীয়তা গড়ে উঠত। হালখাতার খাতা তো আসলে ধারের খাতা। বছরভর মাল ধারে নেওয়া, সুবিধা অনুযায়ী টাকা খাতায় জমা করা। চৈত্রসংক্রান্তি পর্যন্ত ধার নেওয়া যাবে, পয়লা বৈশাখ পুরনো দেনা শোধ করে, নতুন খাতা উদ্বোধন। নতুন খাতা উদ্বোধন তো আর ধারে হবে না, তাই কিছু টাকা নতুন খাতায় জমা দিয়ে রাখা— এই হল হালখাতার অতীত–‌ভবিষ্যৎ। ১৮৭৮ সালে মহেশচন্দ্র দাস দে ‘‌প্রণয় পরীক্ষা’‌ নামে একটি প্রহসন লিখেছিলেন। এই প্রণয় প্রেমিক–‌প্রেমিকার প্রণয় নয়, ধারীবাবু এবং খরিদ্দারদের প্রণয়। ধার দিয়ে দোকানদারের দুশ্চিন্তা, ধার শোধ না হওয়া পর্যন্ত কেমনটি হয়, সেই ‘‌প্রণয়’‌–‌এর পরীক্ষাই হল প্রহসনের মূলকথা। একটু নমুনা পেশ করি—
‘‌ধারীবাবু। ধার ধার ধার!‌ ধারে দুনিয়া চলিতেছে। আপনি না ধার দিলে অপর দোকান খোলা, হাঁকিতেছে, হাতছানি দিতেছে। চলিয়া যাইবার সমস্ত পথ খোলা। দোকানীবাবু।— ধারও দিব মিষ্টান্নও খাওয়াইব!‌ আপনি প্রণয়িনী আমার। টাকা না দিলে এ বিবাহ ভাঙিয়া দিব। আগে ধার মিটান, তাহার পর জবান ফুটান।’‌
নববর্ষে দোকানে খদ্দেরকে পেট ভরে মিষ্টি খাওয়ানোর একটি বর্ণনা ১৮৮৬ সালে হরিমোহন পাল তাঁর ‘‌রসিক নাটক’‌–‌এ দিয়েছেন—
‘‌গদীবাবু।— খালি পেটে আপনি কয়টি মনোহরা খাইতে পারিবেন?‌
পেটুক।— খালি পেটে মহাশয় একটি মাত্র মনোহরা ভক্ষণ সম্ভব। তাহার পর একশতটী।
গদীবাবু।— হে–‌হে। আপনি বুদ্ধিমান বটে। আজি হালখাতার দিনে যতগুলি ইচ্ছা তথা একশতটী মনোহরা খান!‌
বুদ্ধিমান বাঙালি গদীবাবুকে সমুচিত জবাব দিয়ে খুশি মনে মনোহরা খাচ্ছে।’‌
‌মিষ্টিমুখ নববর্ষে সেকালে যেমন হত, সেই আনন্দময় সময় আজ অস্তমিত। আমাজন, ফ্লিপকার্ট আর বিগবাজারের দৌলতে দোকানে দোকানে হালখাতার খাতায় নাম–‌কাটানো, নাম–‌ওঠানোর দিন আর তেমনটি নেই!‌ তবু হালখাতা আছে, হয়ত থাকবেও। ১৪২৬ বঙ্গাব্দ আপনাদের সকলের মিষ্টিমধুর হোক— শুভ নববর্ষ।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top