দেশে বিদেশে কতরকমই না জলভ্রমণ আছে। নৌকো থেকে বিলাসবহুল ক্রুজ। ঢাকা–‌বরিশাল জলযাত্রাটিও অতি বিখ্যাত। অনেকে বলেন, ‌কবিতার মতো সুন্দর‌। বিদেশি পর্যটকেরা বাংলাদেশে বেড়াতে গেলে এই আশ্চর্যভ্রমণের স্বাদ না পেয়ে ফিরতে চান না। জ্যোৎস্নালোকিত এক রাতে এই জলযাত্রার 
অসাধারণ অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন নন্দিতা আচার্য। ছবি তুলেছেন‌ রঞ্জয় রায়চৌধুরি।   
 

ঢাকার সদরঘাট এক অদ্ভুত সুন্দর জায়গা। বুড়িগঙ্গার ওপর সারি সারি স্টিমার। দোতলা, তিনতলা, চারতলা...। এদেরকে স্টিমার নয়, ‘‌জাহাজ’–‌ই বলা যায়। বরিশাল, পটুয়াখালি, সুন্দরবন, নাটোর... কী সব মোহময় নাম!‌ 
আমি দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা। থাকি হাইরাইজ বিল্ডিং–‌এর ফ্ল্যাটে। জানলায় বসে এক ফালি আকাশ দেখি। নদী দেখতে  হলে ট্যাক্সি নিয়ে দৌড়োতে হয়। আর এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি বিস্তৃত এক নদীর মুখোমুখি। স্বপ্নের মতো লাগছে। টুকরো টুকরো দ্বীপের মতো আলোয় ভরা জাহাজের সারি। মুগ্ধ বিস্ময়ে নিশ্চুপ হয়ে থাকি। এত জাহাজ!‌ এত  মানু্ষ!‌ কোথায় চলেছে সবাই ?‌ 
জাহাজ‌ (‌ স্টিমার‌)‌ আসা যাওয়ার সময় এ অঞ্চলে থিকথিকে ভিড় হয়। চলাফেরাই দায়। ঘাটের ওপর যাত্রী আর জাহাজ কর্মীদের হাঁকডাকে সরগরম। এ যেন সত্তর দশকের বিখ্যাত কোন হলিউডি সিনেমা দেখছি। প্রাণোচ্ছল এক বন্দর।  সওয়ারিরা ব্যাগ ব্যাগেজ নিয়ে ব্যস্ত। দূরে যাওয়ার উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে। আসা যাওয়ার মাঝে বিশ্ব জগতের যে চলমান প্রাণস্রোত, এ ঘাট যেন তারই এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। 
মাঝেমধ্যে ভোঁ করে ঘণ্টা বাজিয়ে একটা একটা করে স্টিমার ছাড়ছে। আর আমার বুকের ভিতরটা তোলপাড় করে উঠছে। কেন? কেন এমন হচ্ছে! আমি আসলে দেখতে পাচ্ছিলাম, বরিশাল কীর্তনখোলার পাড়ে দাঁড়ানো আমার দাদুকে। নিঃস্ব–রিক্ত একটি মানুষ। সঙ্গে সাতটি নাবালক পুত্রকন্যা। পরে রইল বাড়ি, ঘর...তার প্রিয় কলেজ, ছাত্র, বন্ধু; আর ‘রঞ্জন স্টোর্স’! বরিশাল টাউনের সব থেকে বড় বইয়ের দোকানটি। অনেক খেটে দাঁড় করিয়েছেন... সেখানে সন্ধে হলেই গুণিজনের সমাবেশ আর আড্ডা জমে উঠত...সর্বস্ব ছেড়ে তিনি চলেছেন! এ যাওয়াই কি শেষ যাওয়া? এক কাপড়ে চলে এসেছেন, তাঁর প্রিয় ছাত্ররা তাঁকে স্টিমারে তুলে দিতে এসেছে। হিন্দু–‌মুসলমান কোনও ভেদাভেদ ছিল না। সবার চোখে জল। দাদু প্রিয় ছাত্র, কাদেরকে দিয়ে এসেছেন বইয়ের দোকানের দায়িত্ব। চৌষট্টি বছর পেরিয়ে গেছে। 
ঢাকার সদরঘাটে জাহাজের (‌‌স্টিমারের)‌ তীব্র হুইসেলের আওয়াজে চমকে উঠি।      
বরিশাল যাওয়ার স্টিমার ছাড়বে রাত সাড়ে আটটায়। আমি তল্পিতল্পা নিয়ে সাতটার আগেই হাজির। আমার টিকিট তিনতলার এক এসি সিঙ্গল কেবিনে। যাওয়া এবং ফিরে আসা, দুহাজার টাকা দিয়ে দুটো টিকিট কাটা। সেখানে লাগেজ ঢুকিয়ে দরজা লক করে নিচে নেমে এলাম। যাচ্ছি টোটাল সদরঘাট। ঘাটের কাছে পুরনো এক জমিদারবাড়ি রয়েছে। আমার এক মামিমার বাপেরবাড়ি। একাত্তরের যুদ্ধের সময় বালিকা বয়সে এপারে আসা তাঁর। গায়ের টকটকে রংটুকু ছাড়া জমিদারির আর কিছুই আনতে পারেনি। ঢাকা আসছি শুনে আমার হাত ধরে তিনি কেঁদেই ফেললেন। আমার সঙ্গীরা কাল সকালে যাবে কক্সবাজার। কিন্তু আমাকে তো বরিশাল যেতেই হবে। শরীরটা ভাল ছিল না। একা কী করে যাব?‌ জাহাজের কর্মীদের অনুরোধ করে, আমায় একটু দেখে রাখতে। 
সব দুশ্চিন্তা তুড়ি মেরে আমি সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজে উঠছি আর নামছি। সুন্দরবন, ভোলা, পটুয়াখালী ... একেকটায় উঠছি আর  গুপিগাইন–‌ বাঘাবাইনের গল্পের মতো সেসব অঞ্চলে পৌঁছে যাচ্ছি!‌ থুড়ি, আমার মন পৌঁছে যাচ্ছে। দেখতে ফুটবল মাঠের মতো বিশাল ডেকে কম দামি টিকিটের যাত্রীরা। তারা কেউ নমাজ পড়ছে, কেউ গল্প করছে, কেউ আবার টিফিন কৌটো খুলে খেতে বসে গেছে। ঘুরতে ঘুরতে এমন উত্তেজিত হয়ে পড়লাম যে শেষকালে ডেকের রেলিং টপকে লাফিয়ে লাফিয়ে এক স্টিমার থেকে আর এক স্টিমারে যাতায়াত শুরু করলাম। ব্যালান্স একটু হারালেই যে বুড়িগঙ্গার কালো জলে গিয়ে পড়ব, সেকথা আর মাথায় ছিল না। ধেড়ে মেয়ে যেন ছোট্ট খুকি হয়ে গিয়েছি।  
আলোয় ভরা বিশাল জাহাজগুলো যেন কলকাতার এক একটা উৎসব মণ্ডপ। সেখানে এলিট থেকে খেটে খাওয়া শ্রেণি ... সব ধরনের মানুষের ভিড়। দেখে মনে হচ্ছে, আমি যেন কোনও মহা–উৎসবের শরিক হতে চলেছি।  
হ্যাঁ, ঘাটের কাছে জলের রং কালো-ই। এতগুলো জাহাজ চলাচল করছে, হবে না? সেই জলেই টেমি জ্বালিয়ে হকারদের ভেসে বেড়ানো ডিঙি নৌকো। ফল-মিষ্টি, ঝালমুড়ি-ডিমসেদ্ধ-ঘুগনি...‌ কী নেই?‌ 
বাবার কথা মনে পড়ল। বাবা বলতেন, বাংলাদেশে বরিশাল হল সবথেকে সুন্দর। অনেকটা ভেনিসের মতো। যাহঃ, কী যে বলে না বাবা! এটা একটু বেশি হল না?‌ তবে সুন্দর নিশ্চই... বাবা যখন বলেছে। তা সেই ভেনিস–দর্শনের প্রোমো আমার ঢাকার সদরঘাটেই হয়ে গেল। নৌকো থেকে সওদা করব বলে আমি মরিয়া হয়ে উঠি।
৮টা  বেজে ৪০ মিনিটে জাহাজ ছাড়ল। আবার সেই মহাকালের ধ্বনির মতো বুক কাঁপানো  হুইসেল। আমি চারতলার ডেকে। চারিদিকে মারাত্মক জ্যোৎস্না। নদীর বুকে কি চাঁদের আলো আরও বেশি উজ্জ্বল হয়? এমন হাওয়া দিচ্ছে যে রীতিমতো শীত লাগছে। তলার ডেকে বহুজনকেই দেখছিলাম, কাঁথা আর পাতলা কম্বল গোছগাছ করে নিয়ে বসেছে। মার্চ মাসের গরমে এ সব দেখে আমি তো হেসে অস্থির। ততক্ষণে জাহাজের কর্মীদের সঙ্গে বেশ দোস্তি হয়ে গেছে। হাসি দেখে তারা হালকা ধমক দেয়। 
‘হাসো কী আপু? সাগরের ওপর দিয়া যাবা। দ্যাখো কেমন শীত লাগে!’  
সাগর কোথায়? যাব তো নদীর ওপর দিয়ে। কী যে সব বলে! কিন্তু অচিরেই সেই কথা সত্যি হল। আমারও ঠান্ডা লাগতে শুরু করল। কেবিনে এসে চাদর বের করলাম। ভাগ্যিস মা জোর করে কটকি চাদরটা দিয়েছিল। আমার আশপাশের কেবিনের মানুষগুলোও দেখলাম গায়ে শাল চাপিয়ে, কেবিনের পাশে টানা করিডরে বসে জল দেখছে। 
বরিশালে আমার বাড়িটা ঠিক কোথায়, বুঝতে পারছিলাম না। বাবার দিদিরাও সে সময় শিশু। তাই পিসিদের যতই জিজ্ঞেস করি না কেন, সঠিক ঠিকানা বলতে পারে না। কেবল বলে, বাড়ির ভেতর কালীমন্দির, পাঠশালা। সামনের মাঠে বিরাট মেলা আর তাদের ডাক্তার মেজকাকার চেম্বার। সেখানে দূর দূর থেকে লোক আসত পাশ করা ডাক্তারকে দেখাতে।  
প্রিয় মিহিরদা, মিহির সেনগুপ্ত, যার বিখ্যাত বই ‘বিষাদ বৃক্ষ’; তিনি সুশান্ত ঘোষ নামে এক সাংবাদিককে দায়িত্ব দিলেন, বাড়িটা যাতে আমি খুঁজে পাই। ঢাকায় জাহাজে ওঠার আগেই সুশান্তর ফোন পাই। 
‘বাসাখান পাইসি মনে হয়। উফ্‌, ব্রজমোহন কলেজ অবদি দৌড় করাইসেন। আপনের দাদা ওখানকার প্রিন্সিপাল ছিলেন না?’    
‘বাবার দাদু। আমার দাদু ছিলেন দর্শনের অধ্যাপক।’  
‘আর আপনের মামা তো এখানের বিখ্যাত বিপ্লবী! তাঁর নামে কত কী রয়েছে!’  
‘আমার নয়, বাবার মামা।’
‘ও আচ্ছা। শোনেন, বাবার সেই মামাবাড়িতে এখন যাঁরা থাকেন, তাঁরা আপনারে দাওয়াত দিসে, যাইতেই হবে।’ 
‘এক্সিলেন্ট, সেটাও আপনি খুঁজে বের করেছেন!’ 
‘আপনের মামাদাদুর শ্বশুরবাড়ির লোকজন থাকে সেখানে। তারাও বেশ বিখ্যাত মানুষ,  প্রায়ই সেখানে আড্ডা হয় আমাদের।’ 
আমি অভিভূত। একদিনের জার্নি, কাল ভোরে বরিশাল পৌঁছে রাতে এই জাহাজেই আবার ঢাকা ফিরব। তবু আমি যতটা পারব, সব দেখবই! 
চারতলার ডেকের পাশে আবার ক’টা সিঁড়ি। ওপরে সারেং অর্থাৎ ক্যাপ্টেনের ঘর। সেখানে ঢোকা মানা। আমি শুধু ঢুকলামই না, জমিয়ে বসলাম! দাদার নাম জাহাঙ্গির। তিনি ছাড়া আরও কয়েকজন কর্মী সেখানে রয়েছেন। তাঁরা সকলেই আমাকে খুব আদর–আপ্যায়ন করলেন। কত গল্প হল। টাটকা ইলিশ মাছ ভাজার সঙ্গে এল ঘন দুধের চা। কী স্বাদ সেই ইলিশের। জাহাজে ওঠা ইস্তক ইলিশের তীব্র নেশালাগা গন্ধ আমাকে অস্থির করে দিচ্ছিল। লজ্জা লজ্জা করে খেয়েই ফেললাম। আসলে নিজের কাছে এমন কিছু নেই যা আমি দাদা আর তার সহকর্মীদের খাওয়াতে পারি।  
বুড়িগঙ্গা পেরিয়ে ধলেশ্বরীতে উঠেছি, সামনে শীতলক্ষ্যা। মুক্তারপুর ব্রিজ। ফার্স্ট ক্লাস চ্যানেল, জাহাজ চলাচলের উপযোগী। দাদা আমাকে ধরে ধরে সব চেনায়। কাঠপটি পেরিয়ে মুক্তারগঞ্জ। বাঁয়ে শীতলক্ষ্যাকে রেখে এগিয়ে চলেছি। এখানেই পড়বে নারায়ণগঞ্জ।  জাহাজের কর্মীরা যে কেন বলে, ‘সাগরের ওপর দিয়া যামু’ এবার বুঝতে পারছি। নদীর কী চেহারা! চারিদিকে ধু ধু জল। দূরে দূরে আলোর নিশানায় আমাদেরই মতো কোনও জাহাজ। কখনও পাশের শহরের আলো রিনরিন করে দেখা যাচ্ছে মরীচিকার মতো। অথবা সে-ও হয়তো কোনও জাহাজের আলো। 
এরপর আসবে মেঘনা। কুমিল্লা জেলা পড়বে। আর অন্যদিকে মুক্তারগঞ্জ। এ সব নামগুলো  যে কী পরিচিত আমার! আজন্ম শুনে এসেছি, শুধু চোখের দেখাটুকু বাকি ছিল।

    
ক্যান্টিনের ছেলেটা ডাকতে আসে। ডিনারে ইলিশ মাছ আর ভাতের অর্ডার দিয়েছিলাম। কিন্তু দাদা বলে, ‘বুইন আমার সঙ্গে ডিনার করবে।’       
সারেঙের কেবিনের নিচ ডেকে নেমে এলাম। এবার ভ্রমণ একতলা থেকে চারতলা। সুযোগ যখন পেয়েছি, কোন কিছুই যেন না দেখা থাকে।  
দোতলা, তিনতলা, চারতলায় ... সারি সারি কেবিন। আমার মতো সিঙ্গল কেবিন  খুবই কম। সবই ডবল। কয়েকটা রয়েছে লাক্সারি ফোর বেডেড কেবিন। মনে মনে ভাবলাম, পরেরবার যখন বাড়ির সবাইকে নিয়ে আসব, এমন একটা কেবিনেই উঠব। বাংলাদেশের মানুষ বড় অতিথিপরায়ণ আর মিশুকে। তারা তখন অনেকেই ডিনারের আয়োজন করছে।  রুমের ভেতরেই টেবিল পেতে ডিনার লাগিয়ে দিয়েছে। চাচা-চাচি, দাদা-দিদি, ভাই-বোন ... ঘরে ঘরে সকলের সঙ্গেই আমার আলাপ পরিচয় চলতে লাগল। ‘‌ইন্ডিয়া’‌ থেকে একা এসেছি শুনে, সকলেই ডাকাডাকি করতে থাকে। 
‘আমাগো লগে এট্টু কিসু মুখে দিয়া যাও!’ 
একতলার ডেকে আমজনতা। যে যেখানে জায়গা পায়, পোঁটলাপুটলি নিয়ে সেখানেই বসে পড়ে। ওপরতলার মত আলোর জৌলুস নেই সেখানে। তবু মায়া রয়েছে। যে যার মতো গল্প করছে, খাচ্ছে, শুয়ে আছে। কোন কারণ ছাড়াই আমার বেজায় আকর্ষণীয়ও লাগে।  এ যেন পারস্পরিক ভালবাসায় বাঁধা বিরাট এক যৌথ পরিবার। ‘ইন্ডিয়া থিকা আসা মেহেমানের’ জন্য সেখানেও আদর আপ্যায়নের শেষ নেই। ফল, বিস্কুট, সিমাই পেরিয়ে নারকোলের চিড়ের কাছে হার মানলাম। চিঁড়ের আকারে নারকোল কুড়িয়ে চিনির রসে ফেলা। দুহাত পেতে নিই সেই আদর। তার স্বাদ ছড়িয়ে যায় জিব থেকে মনে। রেলিঙের ওপারে বয়ে যাওয়া নদী। হাত বাড়ালেই দুরন্ত জলস্রোত! 
চারতলার ডেকে একটু আগেই দলবেঁধে সবাই নামাজ পড়ছিল। এখন চলছে আড্ডা। কেউ রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে, কেউ চেয়ার নিয়ে বসেছে। শুধু চার–পাঁচজনের একটি দলকে দেখলাম, চাদর বিছিয়ে গা এলিয়ে দিয়েছে। আমি কিছুক্ষণ রেলিং ধরে দাঁড়ালাম। মন ছিল চাদরে এবং অচিরেই আলাপ জমিয়ে ফেললাম। তারা বহুদিন লন্ডন প্রবাসী। ছেলেটি সিলেটের, আর মেয়েটি বরিশালের। দেওরদের নিয়ে সে বরিশাল দেখাতে যাচ্ছে। ওদের সঙ্গে ভাব জমে গেল। 
একটু লেট ডিনার, কিন্তু সে এক রাজসিক আয়োজন। থালার ওপর কলাপাতা বিছিয়ে সাদা ছোট্ট ছোট্ট বালাম চালের সুস্বাদু গরম ভাত আর ইলিশের রকমারি পদ। ইলিশের মাথা দিয়ে কচুর লতি, ইলিশের ডিম ভাজা, ভাপা ইলিশ, কালো জিরে ইলিশ। স্বয়ং সারেং সাহেবের দাওয়াত বলে কথা। আমার চোখ কপালে ওঠে। এত! সকলে বলল, ‘সবগুলা থেকে এট্টু এট্টু চাইখ্যা দ্যাখেন।’
সময় গড়িয়ে গেছে মধ্যরাতে। জাহাজ এখন মেঘনার ওপর। জাহাঙ্গির দাদার ঘর থেকে দেখলাম, কেমন ভাবে তিনি জলের ওপর তীব্র সার্চ লাইটের আলো ফেলে নির্দিষ্ট যাত্রাপথ খুঁজছেন। আমার কেমন গা শির শির করে। মহাজগতের গভীর রহস্য যেন, পলকের জন্য আমাকে ছুঁয়ে দিয়ে যায়।        
সারেং যার দাদা, তার আর চিন্তা কী?‌ তিনি আমায় আশ্বাস দিয়েছেন, সারারাত ডেকে একলা থাকলেও কোনও চিন্তা নেই। বাড়ির লোক বৃথাই আমার জন্য ভেবে অস্থির হয়েছিল। লন্ডনের বন্ধুরা শুতে চলে গেছে। তাদের চাদর–বেডকভারের দখল নিয়ে, তেপান্তরের মাঠের মতো নিঝুম ডেকে, আমি বসে আছি একা। কী রোমাঞ্চকর!‌ এবার যেখানে শয্যা পাতলাম, দাদার কেবিন থেকে তা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। এমনকী আমরা মাঝে মাঝে, সাত–আট ফুট উচ্চতার দূরত্বে, দিব্যি ওপর– নিচে কথা চালাচালিও করছিলাম। গম্ভীর লাগেজগুলো নিয়ে সারারাত প্রায় তালা বন্ধই থাকল আমার সেই সুন্দর কেবিনটি।
 আমার খুব পা ব্যথা করছিল।  একটু চা পেলে হত। কিন্তু এই মধ্যরাতে ক্যান্টিন খোলা থাকে না কি? সংকোচের বিহ্বলতা কাটিয়ে চাদর কোলে (না হলে প্যারাসুটের মত হাওয়ায় উড়ে যাবে) আমি আবার সারেং দাদার কেবিনে। তিনি প্রশ্রয়ের হাসি হাসেন। 
‘কী হইল বইন?’ 
আমি লজ্জার মাথা খেয়ে ফ্লাস্কের দিকে ইঙ্গিত করে বলি, ‘দাদা, একটু চা হবে?’  
একসময় দেখি চরাচরজুড়ে ধবধবে জ্যোৎস্না... আর ধু ধু জল। এমন মোহময় রাত তো স্বপ্নে থাকে? শেষ রাতে চোখ জড়িয়ে এল। 
সারেংদাদার ডাকে ধড়মড় করে জেগে উঠি। 
‘বইন... উঠো, ওই দেখো কীর্তনখোলার ওপর চন্দ্রদ্বীপ, জিগাইছিলা না?’
কচি ডাবের শাঁসের মত একটা ভোর। বাতাসে জলের গন্ধ। গন্ধ সবুজ বাংলাদেশের।‌ জাহাজ‌ এসে থামল বরিশাল কীর্তনখোলার ঘাটে। নামতে থাকে যাত্রীরা। ঢাকার সদর ঘাটের মত পরিসর না হলেও, এ ঘাটও কিছু কম বড় নয়।   মুহূর্তে সকালবেলার শান্ত সেই ঘাট কোলাহলে মুখর হয়ে উঠল। কতজনকে তার আপনজনেরা নিতে এসেছে। কানের পাশ দিয়ে এক ঝাঁক পাখি উড়ে গেল। একটা আধ খ্যাপা বুলবুলি বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে কেবল  বারে বারে ডেকে চলেছে; ঠিক আমারই আশেপাশে।       
সুশান্ত ঘোষ সাতসকালেই কীর্তনখোলার ঘাটে হাজির। সারাদিন তাঁর সঙ্গেই আমি বরিশাল দেখব। আমার দেখার লিস্টও বিশাল। দেশের বাড়ি, দাদুর কলেজ, বইয়ের দোকান, বাবার মামাবাড়ি, এমনকী পারলে পঁচাত্তর বছর আগে ছেড়ে যাওয়া আমার মামার বাড়ির ভিটেটাও। 
বরিশালের দু’ধারে খাল আর মাঝখানে বাঁধানো রাস্তা। বাবা বলে, বরিশালের অপূর্ব রূপই নাকি জীবনানন্দের কবিতাকে আরও সুন্দর করেছে। এখন বুঝতে পারছি কথাটা কত সত্যি। গাড়ি চলছে সুন্দর এক শহরের ভেতর দিয়েই। কিন্তু ভেনিসের মতো সেই খাল, তারা কোথায়? সুশান্ত একের পর এক কমেন্ট্রি দিয়ে চলেছে। ‘বাতাসটা দ্যাখছেন, কী মিষ্টি... ওই দ্যাখেন, কবি জীবনানন্দের বাসা। আপনার দাদার বন্ধু ছিলেন না?’ 
আমি বলি,‘খাল কোথায়?’ 
বাবার মামাবাড়ি সব অর্থেই বড় সুন্দর। ‘ইন্ডিয়া থিকা আসা একা মাইয়ার জন্য’   সেখানে একের পর এক দাওয়াত আসতে থাকে। ওখান থেকে কোনওক্রমে পালিয়ে যাই দাদুর ব্রজমোহন কলেজ দেখতে। প্রায় চব্বিশ হাজার ছাত্রছাত্রী পড়ে এখানে। কলেজের বিশাল বিশাল মাঠগুলো দেখে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়ালাম। কলেজে অভূতপূর্ব অভ্যর্থনা পেলাম। প্রিন্সিপাল বললেন, ‘তুমি খাইয়া যাবা। দুগগা ভাত দিয়া ইলিশ মাছ। না খাইলে, তোমার সেই বড়দাদা, যিনি বহু বছর এখানের অধ্যক্ষ ছিলেন, তিনি কিন্তু আমারে ক্ষমা করবেন না।’      
পিসির বলে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সোনালি সিনেমার পাশে ‘রঞ্জন স্টোর্স’ খুঁজি।  সোনালির অস্তিত্ব আর নেই। সুশান্ত বলে, ‘প্রোফেসর কাদের তো এক বিখ্যাত মানুষ। গত হইসেন এখন। উনি চিরকাল তো বিদেশেই আছিলেন।’    
অবশেষে দোকানের হদিশ মিলল। এখন সেখানে ঝাঁ–চকচকে হোটেল। টাউন থেকে গাড়িতে দশ মিনিটের পথ। সেখানেই কাশীপুর, বাবা-পিসিদের দেশের বাড়ি। জায়গার নাম ঢেউরিয়া। কী অপূর্ব নাম! তেমনি অপূর্ব রাস্তা। গাছপালায় ঠাসা ঝকঝকে পথের দুপাশে শীর্ণ হয়ে আসা সেই খাল! টলটলে তার জল। শুনলাম, খটখটে দুপুরে ঝিঁঝির সুরেলা কনসার্ট। সারি সারি তাল-সুপারি-নারকেল-হিজল... বনস্পতির ছায়া মাখা স্বপ্নের সেই পথ। পাশে কালীমন্দির। পেছনে সেই দিঘি, বাবা-পিসিরা যেখানে বড়দের সঙ্গে নৌকো বাইত। বাড়ির বাসিন্দাদের সঙ্গে আশপাশের প্রতিবেশীরা ভিড় করে আসে।  
ঘর থেকে দালান-ঝুলবারান্দা-ছাদ হয়ে ধীর পায়ে আমি দিঘির পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। প্রপিতামহের মতো গাছেদের পাতায় ফিসফিসে আওয়াজ, ‘কী, এতদিন পর?’ 
সুশান্ত হাসিমুখে দৌড়ে আসে। পেছনে বাড়ির লোকজন, ‘আসেন, একটু নাস্তাপানি  করবেন!’ 
হাত বাড়িয়ে তাদের কাছ থেকে ডাবের জলের গ্লাস নিই। এত মিষ্টি জল!‌ 
বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধে। যেতে হবে এবার। মন্দিরের বন্ধ দরজা ঠেলে উঁকি মারি ভেতরে। দাঁড়িয়ে আছেন বিগ্রহ। হাঁটা দিই গাড়ির দিকে। দিঘির বুকের থেকে ওঠা একঝলক ঠান্ডা বাতাস, আকাশছোঁয়া গাছেদের মাথা ছুঁয়ে, কেমন করে যেন আমাকে আদর করে যায়। তীব্র ঝিঁঝির ডাক, হঠাৎ গলা মেলায় গম্ভীর এক ডাহুক। চকিতে আর একবার ফিরে তাকাই সেই বাড়ি-বাগান-দিঘির দিকে। দৃষ্টি ঝাপসা করে দেয়...!   
কীর্তনখোলার জলে ঢেউ তুলে জাহাজ ছাড়ল। ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা সুশান্ত আবছা হয়ে যায়। জাহাঙ্গির দাদা হেসে বলে, ‘ভাবলাম বইন বুঝি আমাগো ভুইল্যা গ্যাসে।’ 
আজও সেই মারকাটারি জ্যোৎস্না। যথারীতি কেবিনে লাগেজ রেখে দাদার ঘরের ঠিক নিচে, ডেকের ওপর বিছিয়ে নিই, সদ্য উপহার পাওয়া ঝালকাঠির গামছা। দাদা বলে, ‘বুইন, বরিশাল ক্যামন দ্যাখলা? শরীর ঠিক আছে? আইজ তোমার জন্য ফ্লাস্ক ভর্তি চা আনসি।’ 
আবেগে গলা ধরে আসে। এত ভালবাসাও রয়েছে পৃথিবীতে! মাথার ওপর অনন্ত আকাশ আর তীব্র মোহময় জ্যোৎস্না। পায়ের তলায় বিপুল জলরাশি। এ যেন সহস্র বছর আগে, আমারই পূর্ব জন্মের কোনও রূপকথার রাত। 
আমার চোখে ঘুম নেমে আসে। ■
‌‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top