‘‌দুর্গেশনন্দিনী’‌ লেখকের জীবৎকালে ছাপা হয়েছিল তেরোবার। ‘‌মৃণালিনী’‌র এডিশন হয়েছিল দশ।‌ দু’‌বছর আগে বেরিয়ে ‘‌কপালকুণ্ডলা’‌ ছাপা হয় আটবার।
বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মদিন ২৭ জুন। সেই উপলক্ষে তঁার বইয়ের জনপ্রিয়তা নিয়ে আলোচনা করলেন বঙ্কিম–‌বিশেষজ্ঞ অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য  

 

বঙ্কিমচন্দ্র বরাবরই তাঁর বইয়ের ভাল বাজার পেয়েছিলেন। তবে সত্যি কথা বলতে কী, রবীন্দ্রনাথ তাঁর কালে তাঁর বইয়ের তেমন ভাল বাজার কিন্তু পাননি। আর তাঁদের প্রথম প্রকাশিত বইয়ের ক্ষেত্রে বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ উভয়কেই রীতিমতো হতাশ হতে হয়েছিল। বলতে গেলে তাঁদের প্রথম বইয়ের দুটি–‌একটি কপিও বাজারে বিক্রি হয়েছিল কি না সন্দেহ। ভাগ্যিস প্রথম বইয়ের ব্যর্থতায় হতাশ্বাস হয়ে তাঁরা লেখালেখিতে হাত গুটিয়ে ফেলেননি!‌ সে আমাদের পরম সৌভাগ্য।
না না;‌ দুর্গেশনন্দিনী তাঁর প্রথম বই নয়। ‘‌দুর্গেশনন্দিনী’‌ প্রকাশকালে তাঁর বয়স ছিল সাতাশ। কিন্তু তাঁর প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর মাত্র আঠারো বছর বয়সে। তাঁর কালে এবং পরেও গদ্যের সাম্রাজ্যে যিনি ছিলেন সম্রাট, তাঁর প্রকাশিত প্রথম পুস্তক পদ্যে রচিত!‌ বঙ্কিম সেই–সময় তাঁর কৈশোর–‌উত্তীর্ণ বয়সে নিজেকে রীতিমতো একজন বড় মাপের কবি বলেই মনে করেছিলেন। তাঁর কাব্যগুরু সংবাদ প্রভাকরের ঈশ্বর গুপ্ত। তিনি ঈশ্বর গুপ্তের শিষ্য!‌ গুরুর চেয়ে শিষ্য কম কিসে— এমনই সেই দর্পিত সদ্য–‌তরুণের মনোভাব ছিল। 
১৮৫৬ সালে প্রথম বই বের করার সময় লেখক বলেন, এ–‌বইয়ের রচনা তাঁর আরও তিন বছর কম বয়সের লেখা।  বইয়ের ভূমিকায় কিন্তু কবির মেজাজটি ছিল চড়া সুরে বাঁধা। “‌তিন বৎসর পূর্বে এই গ্রন্থ রচনাকালে গ্রন্থকার জানিতে পারেন নাই যে তিনি নূতন পদ্ধতির পরীক্ষা পদবীরূঢ় হইয়াছেন।”‌
বইটির নামই এখনও বলা হয়নি, দুঃখিত। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রথম বই তথা কাব্যগ্রন্থের নাম দিয়েছিলেন ‘‌ললিতা। পুরাকালিক গল্প। তথা মানস’‌।
যে বছর বই বেরোয় সে বছরেই সংবাদ প্রভাকর কাগজে বঙ্কিম বইয়ের বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। “‌‌বিজ্ঞাপন/‌ললিতা ও মানস/‌ উক্ত উভয় পুস্তক পয়ারাদি বিবিধ ছন্দে মতকর্তৃক বিরচিত সংপ্রতি প্রকাশ হইয়াছে। যাঁহার প্রয়োজন হয় প্রভাকর যন্ত্রালয়ে অথবা পটলডাঙ্গার ৮৬ নং নিউ ইণ্ডিয়ান লাইব্রেরিতে তত্ত্ব করিলে পাইতে পারিবেন। ঐ পুস্তক একত্রে বন্ধন হইয়াছে। মূল্য ছয় আনা। শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।”‌
এই বই প্রকাশের পঁয়ত্রিশ বছর পর বঙ্কিমচন্দ্র লিখিতভাবে স্বীকার করে গিয়েছিলেন যে তাঁর প্রথম পুস্তক, কাব্যগ্রন্থ, ‘‌ললিতা। পুরাকালিক গল্প। তথা মানস’‌ ‘‌প্রকাশিত হইয়া বিক্রেতার আলমারিতেই পচে— বিক্রয় হয় নাই।’‌
প্রথম বইয়ের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের ভাগ্যেও সেই একই দশা ঘটে। ‘‌কবি–‌কাহিনী’‌ বই–‌আকারে ছাপা হয়েছিল কবির সতেরো বছর বয়সে— তাঁর এক বন্ধুর সাগ্রহ উদ্‌যোগ ও তৎপরতায়। রবীন্দ্রনাথ সেই বন্ধুকে স্মরণ করে পরে বলেছেন, ‘‌তিনি যে কাজটা ভালো করিয়াছিলেন তাহা আমি মনে করি না.‌.‌.‌। দণ্ড তিনি পাইয়াছিলেন, কিন্তু সেই বই–লেখকের কাছে নহে, বই কিনিবার মালিক যাহারা তাহাদের কাছ হইতে। শুনা যায়, সেই বইয়ের বোঝা সুদীর্ঘকাল দোকানের শেল্‌ফ এবং তাঁহার চিত্তকে ভারাতুর করিয়া অক্ষয় হইয়া বিরাজ করিতেছিল।’‌
কবি সারা জীবনে কখনও দ্বিতীয়বার আর এ–‌বই ছাপতে দেননি। 
বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম উপন্যাস ‘‌দুর্গেশনন্দিনী’‌। প্রকাশের চার বছরের মধ্যে তিনটে এডিশন বেরিয়ে যায়। সহজ কথা নয়। প্রকাশের দশ বছরের মধ্যে ছ’‌টা এডিশন। আর তাঁর সমগ্র জীবৎকালে ‘‌দুর্গেশনন্দিনী’‌ ছাপা হয়েছিল মোট তেরোবার।
আমরা তাঁর যে–কপালকুণ্ডলা নিয়ে একালে বিস্মিত, সেই ‘‌পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?‌’‌ অসামান্য উপন্যাস বঙ্কিমের কালে কিন্তু তেমন জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারেনি। আরও আশ্চর্যের, ‘‌কপালকুণ্ডলা’‌র চেয়ে ‘‌মৃণালিনী’‌র বিক্রি ছিল বেশি। ‘‌দুর্গেশনন্দিনী’‌র পরের বছর ‘‌কপালকুণ্ডলা’‌, আর ‘‌কপালকুণ্ডলা’‌র দু’‌বছর পরে ছাপা হয় ‘‌মৃণালিনী’‌। বঙ্কিমের জীবৎকালে ‘‌মৃণালিনী’‌র এডিশন দশ;‌ এদিকে দু’‌বছর আগে বেরিয়ে ‘‌কপালকুণ্ডলা’‌ ছাপা হয় আটবার।
বঙ্কিম ১৮‌৭২–‌এ যখন বঙ্গদর্শন বের করলেন তখন তিনি সেই অবিক্রিত কাব্যটি বাদে তিনটি উপন্যাসের স্রষ্টা।
বঙ্গদর্শন প্রকাশের সঙ্গে–সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের খ্যাতি এবং পসার দুই–‌ই বেড়ে যায়। বঙ্গদর্শনের সূচনাতেই তাঁর হাজার–‌ছোঁয়া গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়ায়।
তখন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্রের পোস্টিং বহরমপুরে। কলকাতার ভবানীপুর থেকে ছাপার কাজ হলেও লেখা সংগ্রহ, বাছা ও সম্পাদনার সব কাজ বঙ্কিম বহরমপুরে বসেই করেন। পত্রিকার প্রথম সংখ্যা থেকেই শুরু হয়েছিল বঙ্কিমের ধারাবাহিক উপন্যাস ‘‌বিষবৃক্ষ’‌। তা ছাড়া বঙ্কিম ও অন্যদের প্রবন্ধ–নিবন্ধ, হেমচন্দ্রের কবিতা এবং আরও অনেক।
পাঠকের এতই ডিমান্ড যে, সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতে প্রথম সংখ্যা নিঃশেষিত। চাহিদা বিপুল, কিন্তু বাজারে কাগজের কপি আর নেই। এই পরিস্থিতিতে বঙ্কিমকে বঙ্গদর্শনের প্রথম সংখ্যাটি আগাগোড়া আবার পুনর্মুদ্রিত করতে হয়েছিল ক’‌দিনের মধ্যেই। পুনর্মুদ্রিত বঙ্গদর্শনে বঙ্কিম কিছু মুদ্রণপ্রমাদ সংশোধনও করে নিয়েছিলেন।
বলেছি, ধারাবাহিক ‘‌বিষবৃক্ষ’‌ উপন্যাস দিয়ে বঙ্গদর্শনের পথচলা শুরু হয়েছিল। এই পত্রিকা প্রকাশের সঙ্গে ‌সঙ্গে বঙ্কিম যেমন তাঁর লেখার হাজারো অনুকূল পাঠক পান, তেমনি কিছু মন্দমতি নিন্দুক পাঠকও মাথা–‌চাড়া দিয়ে উঠেছিল। 
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে দ্বিজেন্দ্রনাথের বন্ধু বঙ্কিমবাবুর বঙ্গদর্শন আসত মাসে ‌মাসে!‌ বাবা–দাদাদের আগে বৌদিদের অধিকারেই প্রথম সে ‌পত্রিকা এসে পৌঁছত।
শৈশবে বঙ্গদর্শনে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস–‌পাঠের স্মৃতি রবীন্দ্রনাথ তাঁর শেষ বয়সেও মনে রেখেছেন। সূর্যমুখী কুন্দনন্দিনীদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পরিচয় নতুন মাসিকপত্রেই। কবির বয়স তখন এগারো। ‘‌তখন বঙ্গদর্শনের ধুম লেগেছে— সূর্যমুখী আর কুন্দনন্দিনী আপন লোকের মতো আনাগোনা করছে ঘরে ঘরে। কী হল, কী হবে, দেশসুদ্ধ সবার এই ভাবনা। বঙ্গদর্শন এলে পাড়ায় দুপুরবেলায় কারও ঘুম থাকত না। আমার সুবিধে ছিল, কাড়াকড়ি করবার দরকার হত না— কেন না, আমার একটা গুণ ছিল— আমি ভালো পড়ে শোনাতে পারতুম, আপন মনে পড়ার চেয়ে আমার পড়া শুনতে বউঠাকরুণ ভালোবাসতেন।’‌
আবার বঙ্কিমের কালে তাঁর লেখার যে বেশ কিছু বিদ্বেষী বিরূপ পাঠকও ছিল, রবীন্দ্রনাথ তা–ও লক্ষ করেছিলেন। বঙ্কিমের মৃত্যুর পর ভিড়ে–‌ঠাসা কলকাতার সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘‌মনে আছে, বঙ্গদর্শনে  যখন তিনি সমালোচক–‌পদে আসীন ছিলেন, তখন তাঁহার ক্ষুদ্র শত্রুর সংখ্যা অল্প ছিল না। শত শত অযোগ্য লোক তাঁহাকে ঈর্ষা করিত এবং তাঁহার শ্রেষ্ঠত্ব অপ্রমাণ করিবার চেষ্টা করিতে ছাড়িত না।’‌
রবীন্দ্রনাথের কথাটা যে কতটা সত্য, তারই দুটি–‌একটি নমুনাস্বরূপ দেওয়া গেল। ১৮৭৬–‌এ প্রকাশিত একটি ছড়ার বই থেকে—
বঙ্গদর্শনের দর্শনশক্তি চমৎকার,
এ দোষ দর্শনে রোষ হয় না কার?‌
অন্ধ যে জন, নাইকো লোচন,
সমালোচন কেন তার?‌
কিংবা
এখন গ্রন্থকর্তা ঘরে ঘরে,
Editor বহু নরে,
কিন্তু কলম যে কিরূপে ধরে
তা অনেকে জানে না।
ভূষিমাল গর্দাভরা
ভেতরেতে ময়লা পোরা,
কাগজগুলা কেবল ভালো
Binding পরিপাটি;‌
একখানা বেকোয় না দেশে,
মসলা বান্ধে অবশেষে,
তবু কত সর্বনেশে,
কলম ধরতে ছাড়ে না। 
এর কিছু পরে আঠারো পৃষ্ঠায় সম্পূর্ণ আর ‌একখানি ক্ষুদ্র ‘‌কাব্য’‌ ‘‌বঙ্গীয় সমালোচক’‌ শিরোনামে ছাপা হল। কদর্য, নিম্নমানের রঙ্গ ব্যঙ্গ কটূক্তি। ত্রিপদীতে রচিত ‘‌কাব্য’‌। 
কাঁঠাল গাছের কাছে    বানর বসিয়া আছে
[‌বসে কি দাঁড়ায়ে কেবা করিবে নির্ণয়?‌]‌
কি বাহার মরে যাই!‌    চরণে পাদুকা নাই
চাপকানে অঙ্গ ঢাকা দেখে দু্ঃখ হয়।
মরি কি রূপের ছটা    কোমর বন্ধক আঁটা
বিলোলিত লাঙ্গুলের কি সুষমা হায়!‌
শোভিয়া হৃদয় রাকা    ও চাঁদ বদন বাঁকা
কলঙ্ক বিষম গোঁফ আঁকা আছে তায়।

এই উদ্ধার–‌অযোগ্য কালিমাময় ছড়া–‌প্রহসন থেকে বঙ্কিম–‌বিষয়ে আবার মস্ত তথ্যও সংগ্রহ করা যাচ্ছে— তা হল, ১৮৮০ সালেও বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর মুখমণ্ডলে সুবৃহৎ গুম্ফের দ্বারা সুপরিচিত ছিলেন। ১৮৭৬–‌এ রবীন্দ্রনাথ পনেরো বছর বয়সে আটত্রিশ বৎসর বয়স্ক বঙ্কিমচন্দ্রকে যখন শৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুরের এমারেল্ড বাওয়ারে প্রথম দেখেন তখনও বঙ্কিমচন্দ্র গুম্ফধারী ছিলেন। তরুণ রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন ‘‌সেই বুধমণ্ডলীর মধ্যে একটি ঋজু দীর্ঘকায় উজ্জ্বলকৌতুক প্রফুল্লমুখ গুম্ফধারী প্রৌঢ়পুরুষ চাপকানপরিহিত বক্ষের উপর দুই হস্ত আবদ্ধ করিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন।’ নবীনচন্দ্র সেনের লেখাতেও বঙ্কিমচন্দ্রের বিশাল গোঁফের উল্লেখ আছে।
ছড়ার ওই লাইনটি (‌‘‌কলঙ্ক বিষম গোঁফ’‌)‌ পড়ার পরেই কি সাহিত্যসম্রাট তাঁর প্রৌঢ় ব্যক্তিত্বের চিহ্নধারী সাধের গোঁফটি পরিহার করেছিলেন?‌ অর্থাৎ আমরা আজ পাগড়িধারী গুম্ফহীন সাহিত্যসম্রাটের যে–‌সকল ফটোচিত্রগুলির সঙ্গে পরিচিত, তা তাঁর ছাপান্ন বছরের জীবনের শেষ মাত্র বারো বছরের মধ্যে তোলা। এদিকে গুম্ফধারী বঙ্কিমের ছবি দুর্লভ। একটি–‌আধটি মাত্র পাওয়া গেছে। কেবল তাঁর অনুরাগী–‌ভক্ত ও বিরাগী–‌নিন্দুক পাঠকদের লেখার মধ্যেই তাঁর দুর্লভ সগুম্ফমূর্তিটি অঙ্কিত হয়ে রইল।
বঙ্কিমচন্দ্র বরাবরই নির্ভুল বই প্রকাশে আগ্রহী ছিলেন। বই প্রকাশের পর তাতে ছাপার ভুল থাকলে তিনি কষ্ট পেতেন। এ ব্যাপারে বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ— এঁরা সবাই এক মানসিকতার মানুষ। বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৮৬ সালের ২৪ মে এক বিশিষ্ট সাহিত্যসমালোচককে পত্রোত্তরে লিখছেন:‌
“‌কৃষ্ণকান্তের উইল সম্বন্ধে একটা কথা বলিয়া রাখা ভাল। প্রথম সংস্করণে কয়েকটা গুরুতর দোষ ছিল। দ্বিতীয় সংস্করণে তাহা কতক কতক সংশোধন করা হইয়াছে। পুস্তকের অর্ধেক মাত্র সংশোধিত হইয়া মুদ্রিত হইলে, আমাকে কিছুদিনের জন্য কলিকাতা হইতে অনতিদূরে যাইতে হইয়াছিল। অতএব অবশিষ্ট অংশ সংশোধিত না হইয়াই ছাপা হইয়াছিল। তাহাতে প্রথমাংশে ও শেষাংশে কোথাও কিছু অসঙ্গতি থাকিতে পারে।”‌
১৮৯২–‌এ আনন্দমঠের ‘‌পঞ্চমবারের বিজ্ঞাপনে’‌ বঙ্কিম বলছেন, ‘‌এই সংস্করণে আবশ্যকীয় পরিবর্তন করা গেল।.‌.‌.‌ শান্তিকে অপেক্ষাকৃত শান্ত করা গিয়াছে।.‌.‌.‌ মুদ্রাঙ্কন কার্যও পূর্বাপেক্ষা সুসম্পাদিত করা গেল।’‌
এঁরা উপন্যাস একবার লিখেই হাত ঝেড়ে ফেলতেন না। প্রতিটি নতুন সংস্করণ ছাপার সময় নিজে প্রুফ দেখতেন;‌ এবং সংশোধন সংযোজনের যাবতীয় কাজ নিজে করতেন।
বইয়ের পৃষ্ঠা বাড়লে বইয়ের দাম বাড়ত। আবার কাট–‌ছাঁটের পর বইয়ের পৃষ্ঠা কমে গেলে বইয়ের দামও কমিয়ে দেওয়া হত।
মৃত্যুর এক বছর আগে ‘‌রাধারানী’‌র চতুর্থ সংস্করণের ছোট্ট ভূমিকায় বঙ্কিম বলেছেন, “‌এই ক্ষুদ্র উপন্যাসের দোষ সংশোধন করিতে গিয়া, ইহার কলেবর বাড়াইতে হইয়াছে। কাজেই মূল্যও বাড়াইতে হইয়াছে।”‌
আবার তাঁর শেষ উপন্যাস ‘‌সীতারাম’‌–এর দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় বঙ্কিমের নিবেদন, “‌সীতারামের কিয়দংশ পরিত্যক্ত এবং কিয়দংশ পরিবর্তিত হইল। গ্রন্থের আকার অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র হইল, এজন্য ইহার দামও কমানো গেল।”‌
এমন অনেক পাঠক আছেন, যাঁরা কাজের ব্যস্ততায় বই পড়ার সময় পান না, কিন্তু সাময়িকপত্রে বইয়ের যত বিজ্ঞাপন বেরোক না কেন— খুঁটিয়ে পড়েন।
বঙ্গদর্শনের লাল পাতলা কাগজের মলাটেও বইয়ের বিজ্ঞাপন বেরোত। সেই দুর্লভ মলাটের একটি আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে। ১২৯০ মাঘ সংখ্যায় (‌১৮৮৪ খ্রিঃ)‌ প্রকাশিত বঙ্কিমচন্দ্রের বইপত্রের বিজ্ঞাপন।

        বিজ্ঞাপন।
বঙ্কিমবাবুর প্রণীত পুস্তকসকল নিম্নলিখিত স্থানে বিক্রয় হয়— সংস্কৃত প্রেস ডিপজিটরি, বারাণসী ঘোষের ষ্ট্রীট্‌ কলিকাতা। ক্যানিং লাইব্রেরী, পটলডাঙ্গা, ঐ। পদ্মচন্দ্র নাথের দোকান— চিনাবাজার, ঐ। গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়ের মেডিক্যাল লাইব্রেরী ৯৭ নং কলেজ ষ্ট্রীট্‌, ঐ। রাজেন্দ্রলাল রায় ৯২ নং বহুবাজার, ঐ।
    মূল্য নিম্নলিখিত মত
দুর্গেশনন্দিনী — এক টাকা দুই আনা;‌ কপালকুণ্ডলা —‌ এক টাকা দুই আনা;‌ চন্দ্রশেখর — এক টাকা দুই আনা;‌ রজনী — দশ আনা;‌ কৃষ্ণকান্তের উইল — চোদ্দ আনা;‌ উপকথা (‌ইন্দিরা যুগলাঙ্গুরীয় ও রাধারাণী একত্রে)‌ — আট আনা;‌ কমলাকান্তের দপ্তর — ছয় আনা;‌ বিবিধ সমালোচন — বারো আনা;‌ লোকরহস্য — চার আনা;‌ বিজ্ঞানরহস্য — ছয় আনা;‌ কবিতা পুস্তক — দশ আনা;‌ প্রবন্ধ পুস্তক — চোদ্দ আনা;‌ রাজসিংহ — আট আনা;‌ আনন্দমঠ — এক টাকা দুই আনা।
    সতর্ক করা যাইতেছে
যে বঙ্কিমবাবুর পুস্তকের উপর তাঁহার স্বাক্ষর থাকে। যাহাতে তাঁহার স্বাক্ষর নাই, কিংবা সঞ্জীববাবুর স্বাক্ষর নাই তাহা বিনানুমতিতে মুদ্রিত;‌ এরূপ কোন পুস্তক, কোন দোকানে পাইলে, তাহা আমরা ধৃত করিব। এরূপ পুস্তকের যে সন্ধান দিবে, বহি ধরা পড়িলে, তাহাকে ধৃত পুস্তকের মূল্যের উপর শতকরা দশ টাকা পুরস্কার দেওয়া যাইবে। বঙ্কিমবাবুর স্বাক্ষরের একটি মোহর চুরি গিয়াছে। কোন পুস্তকের উপর যদি মোহর থাকে, তবে সে পুস্তক চোরাই, ক্রেতাদিগকে সতর্ক করা গেল।
বঙ্কিম সারাজীবনে বই বিক্রির ভাল বাজার পেয়েছিলেন ১৮৮৪, ১৮৮৬ থেকে ১৮৮৮ এবং ১৮৯২–‌এ। ১৮৮৪–‌তে তাঁর দুটি নতুন বই বেরোয় ও পাঁচটি বইয়ের এডিশন হয়। ১৮৮৬–তে একটি নতুন ও ছ’‌টি পুরনো বইয়ের এডিশন হয়। ১৮৮৭–‌তে দুটি নতুন ও চারটি পুরনো বইয়ের এডিশন। ১৮৮৮–‌তে একটি নতুন ও একটি পাঁচটি পুরনো বইয়ের এডিশন। এবং ১৮৯২–এ নতুন বই একটি ও পুরনো পাঁচটি বইয়ের সংস্করণ হয়। তাঁর বইয়ের বাজার একেবারেই অনুজ্জ্বল নিষ্প্রভ ছিল ১৮৭৬ ও ১৮৮৯–‌এ। ১৮৭৬–এ একটি মাত্র বই বাজারে বেরোয়, কোনও পুরনো বইয়ের নতুন সংস্করণ হয়নি। আর ১৮৮৯–‌এ একটি মাত্র বইয়ের সংস্করণ হয়েছে, নতুন কোনও বই ছাপা হয়নি।
তাঁর কালে বঙ্কিমচন্দ্রের পাঠক তাঁর উপন্যাসকে যেভাবে সহর্ষে সমাদর সহকারে গ্রহণ করেছিল, তাঁর প্রবন্ধ–সাহিত্যকে কিন্তু সেভাবে করেনি। তিনি তো প্রবন্ধের বই কিছু কম লেখেননি। কিন্তু লক্ষ করলে দেখি, তাঁর কোনও প্রবন্ধ–‌পুস্তকই তাঁর কালে দ্বিতীয় সংস্করণের বেশি আর এগোতে পারেনি।
বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের ব্যাপক পাঠক–‌সমাদরের আর এক বড় কারণ তাঁর সমকালে তাঁর অধিকাংশ উপন্যাসের কাহিনীর মঞ্চায়ন। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস সে যুগের রঙ্গমঞ্চেও দারুণ সাড়া ফেলেছিল। তিনি নিজে কখনও নাটক লেখেননি, কিন্তু বাংলার রঙ্গমঞ্চ রজনীর পর রজনী অতিবাহিত হয়েছে তাঁর বইয়ের অভিনয়েই। ১৮৭৩–‌এই বেঙ্গল থিয়েটারের মঞ্চে অশ্বারোহণে জগৎ সিংহ স্বয়ং উপস্থিত। বঙ্কিমকে ঘিরে তখন হইহই ব্যাপার। উপন্যাসে বঙ্কিম, প্রবন্ধে বঙ্কিম, বঙ্গদর্শনে বঙ্কিম, রঙ্গমঞ্চে বঙ্কিম, লোকের নিন্দায় বঙ্কিম, লোকের প্রশংসায় বঙ্কিম। এক বঙ্কিমচন্দ্রেই দেশ তখন আলোকময়।
কখনও এ–‌মঞ্চ, কখনও ও–‌মঞ্চ, কখনও সে–‌মঞ্চ। কখনও দুর্গেশনন্দিনী, কখনও কপালকুণ্ডলা, কখনও মৃণালিনী, কখনও বা বিষবৃক্ষ।
তার পর তো বন্দে মাতরম্‌ লিখে রাতারাতি খ্যাতির শীর্ষদেশে পৌঁছে গেলেন। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং সে–‌গানে সুর দিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রকে এসে শোনালেন। ঠাকুরবাড়ির ‘‌বালক’‌ পত্রিকায় বন্দে মাতরম্‌ গানের স্বরলিপি ছাপিয়ে দিলেন রবীন্দ্রনাথ। ক’‌দিনের মধ্যে হাজার কণ্ঠে লক্ষ কণ্ঠে ধ্বনিত হল— সুজলাং সুফলাং মাতরম্‌ বন্দে মাতরম্‌—।
বঙ্কিম তাঁর বইপত্রে ‘‌পাঠক মহাশয়’‌দের সম্মান–সমাদর করলেও ব্যক্তিগতভাবে পাঠকদের নাগাল থেকে নিজেকে তিনি অনেকটা দূরেই সরিয়ে রাখতেন।
আসলে বাধ্য হতেন। তখন বহরমপুরে। সবে বঙ্গদর্শন বেরিয়েছে। সম্পাদকের দরজা পাঠকদের জন্য লেখকদের জন্য উন্মুক্ত। বঙ্কিম বলছেন, ‘‌দর্শকের জ্বালায় অস্থির হইলাম। যে আসে, সে যে হুঁকা লইয়া বসে, আর উঠে না। আমি দেখিলাম আমার লেখাপড়া বন্ধ হইল। তখন আমার গৃহদ্বারে এক নোটিশ দিলাম যে, কেহ আমার সাক্ষাৎ পাইবেন না। তার পর দিন হইতে সমস্ত বহরমপুরে রাষ্ট্র হইল— বটে!‌ বেটার এমন দেমাক। থাক্‌, তার বাড়ির আশেপাশে কেহ যাইব না। আমিও নিশ্চিন্ত হইলাম।’‌
নবীন সেন একবার বঙ্কিমচন্দ্রকে বলেছিলেন— আপনাদের চাটুজ্যেদের বড় গর্বিত স্বভাব, বড় অহঙ্কার। উত্তরে বঙ্কিম বলেছিলেন— জেনে রেখো ওই অহঙ্কারের জোরেই বেঁচে আছি।
সাহিত্য ও সমাজের প্রধান ব্যক্তিত্ব এবং বিশিষ্ট বন্ধুজনকে গ্রন্থপ্রকাশের পর বই উপহার দেওয়ার একটা রীতি ছিল। বঙ্কিমচন্দ্রও তাঁর নতুন বই প্রকাশের পর মান্য সুহৃদ্বর্গকে উপহার স্বরূপ ডাকযোগে পাঠাতেন। অন্যেরাও বঙ্কিমচন্দ্রকে দিতেন। দ্বিজেন্দ্রনাথকে, জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে, রবীন্দ্রনাথকে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর কৃষ্ণচরিত্র বই উপহারস্বরূপ পাঠিয়েছিলেন। ভূদেব মুখোপাধ্যায়কে বঙ্কিমচন্দ্র খুব মান্য করতেন। বঙ্কিম তাঁর গদ্যের বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। ভূদেব তাঁর ‘‌পারিবারিক প্রবন্ধ’‌ বইটি প্রকাশের পরেই বঙ্কিমচন্দ্রকে পাঠিয়েছিলেন। বঙ্কিম বই পেয়ে ও পড়ে দীর্ঘ উত্তর দিয়েছিলেন। ভূদেব মুখোপাধ্যায় এক সময় ছিলেন বিখ্যাত এডুকেশন গেজেটের সম্পাদক। একবার এই কাগজে বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা নিয়ে একটা বাজে চিঠি ছাপা হয়েছিল। পরের সংখ্যায় সম্পাদক সেজন্য গভীর দুঃখপ্রকাশ করেন। সম্পাদকের মন্তব্য:‌ ‘‌এরূপ পত্র আমাদের কাগজে প্রচারিত হইয়াছে, আমরা অতিশয় ক্ষুব্ধ হইয়াছি। আমাদের অনিচ্ছাক্রমে পাঠকবর্গের এই যে রুচিপীড়া হইয়াছে, তন্নিমিত্ত পাঠকবর্গ আমাদিগকে ক্ষমা করিবেন। পত্র প্রচারিত হইয়া গিয়াছে, এখন ক্ষমা প্রার্থনা ভিন্ন উপায়ান্তর নাই।’‌
বঙ্কিমচন্দ্রের ধর্মতত্ত্ব গ্রন্থের প্রথম ভাগ ১৮৮৮–তে বেরোয়। ‘‌শ্রদ্ধাষ্পদ’‌ ভূদেব মুখোপাধ্যায়কে বঙ্কিম বই পাঠালেন। চিঠিতে তাঁকে লিখলেন, ‘‌তিনকড়িবাবুর নিকট একসেট্‌ পুস্তক দিয়াছি। তন্মধ্যে আর একটি নূতন পুস্তক ধর্মতত্ত্ব আছে। ওই গ্রন্থ পাঠকালে আপনার যাহা কিছু মনে উদয় হয় অথবা গ্রন্থকারকে বলিবার প্রয়োজন হয়, তাহা যদি অনুগ্রহ করিয়া মার্জিনে নোট করিয়া রাখেন, তবে ভবিষ্যতে উপকৃত হইতে পারিব।’‌
ভূদেবের পত্রোত্তর পেয়েই বঙ্কিম সঙ্গে সঙ্গে লিখলেন, ‘‌আপনার অনুগ্রহপত্র পাইয়াছি। আমার পুস্তকগুলি আপনি নিজে স্টেশনে আসিয়া লইয়া গিয়াছেন এবং অনুরুদ্ধ না হইয়াও পড়িয়া থাকেন, ইহার অপেক্ষা পুস্তকের আদর আর কী বেশি হইতে পারে?‌ ইহাই আমার আসার অতীত ফল।’‌
এই পর্বে বঙ্কিমের গ্রন্থসমূহ বঙ্কিম ‘‌সোনার জলে এবং কাপড়ে বাঁধাইয়া বিক্রয়’‌ করতেন।
শুধু বই লিখলে বা বই ছাপলেই হয় না;‌ বইটি যাতে দেখতেও সুন্দর হয়— পাঠক যাতে আগ্রহের সঙ্গে সেটি হাতে তুলে নেন, বঙ্কিমচন্দ্রের সে–‌দিকেও সবিশেষ নজর ছিল। তাই তিনি ভূদেব মুখোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, ‘‌ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাঙ্গালা গ্রন্থেরও একটু বাহ্য সৌষ্ঠব চাই।’‌
বঙ্কিম কি সাধে সাহিত্যসম্রাট?‌
সাহিত্যসম্রাটের লেখা সেরা বই কোন্‌টি?‌
জিজ্ঞাসার উত্তরে বঙ্কিম কখনও বলেছেন তাঁর সেরা বই কপালকুণ্ডলা, কখনও বিষবৃক্ষ, কখনও কৃষ্ণকান্তের উইল। বঙ্কিম যা–‌ই বলুন, পাঠকের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তম উপন্যাস ছিল ‘‌দুর্গেশনন্দিনী’‌ এবং তার পর ‘‌মৃণালিনী’‌।
১৮৮৮ সালে দুর্গেশনন্দিনীর একাদশ সংস্করণ প্রকাশকালে বঙ্কিম বলেছিলেন, “এই পুস্তকখানির লোকে যত নিন্দা করিয়াছে তত আর কোনও পুস্তকের করে নাই;‌ তাই এ পুস্তকের বিক্রি বেশি।”‌ একালে বঙ্কিমের যে যত ‘‌নিন্দা’‌ করুক, রচনাবলী বিক্রির বিচারে সেই বন্দেমাতরমের বঙ্কিমই রয়েছেন সর্বাগ্রে।‌‌‌

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ছবি এবং বইয়ের বিজ্ঞাপনটি লেখকের সৌজন্যে প্রাপ্ত।

 

 

জনপ্রিয়

Back To Top