পবিত্র সরকার: হঠাৎ আবার খবরে উঠে এসেছে অসম, তার নাগরিকত্বের তালিকার নানা অসঙ্গতি নিয়ে। আর কোনও সীমান্তবর্তী রাজ্যে নাগরিকদের তালিকা করতে হয় না, অসমে কেন হয় তার নিশ্চয় ঐতিহাসিক–‌সামাজিক নানা কারণ আছে। আমি যে সবটা বুঝি তা নয়, আবার একেবারে বুঝিও না তাও নয়। তবু ব্যাপারটা কিছুটা কিম্ভূত লাগে, যখন খেয়াল হয় যে, পুরো ব্যাপারটার মূলে আছে ধর্মবিদ্বেষ আর ভাষাবিদ্বেষ— যা অসমের সাম্প্রতিক ইতিহাসকে বারবার ক্ষতবিক্ষত করেছে। ‘‌আমরা–‌ওরা’‌ পৃথিবীর ইতিহাসে কত চেহারায় কত জায়গায় দেখা দেয়!‌
কিন্তু ব্যাপারটা যতটা রাজনীতিক বা প্রশাসনিক স্তরে, সাধারণ মানুষের স্তরে ততটা নয় বলেই মনে হয়। এই তো দু’‌সপ্তাহ আগে ঘুরে এলাম অসম, অসম সাহিত্যসভার শতবর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে। কলকাতার সাহিত্য অকাদেমি আমাকে পাঠানোর দায়িত্ব নিল, দিল্লি থেকে এলেন নাট্যকার, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, কর্ণাটকের সন্তান ড.‌ শিউপ্রসাদ। আমাকে সাহিত্য অকাদেমির নির্বাচনে আমি একটু অবাকই হয়েছিলাম, কারণ লেখক হিসেবে আমার অবস্থান কিছুটা প্রান্তিক;‌ আমি খুব একটা গল্প–‌উপন্যাস–‌কবিতা লিখি না, লিখি একটি ভাষাতত্ত্ব আর ব্যাকরণের মতো অ–‌জনপ্রিয় বিষয়ে বই আর প্রবন্ধ, ছোটদের ছড়া আর রম্যরচনা। ইদানীং লক্ষ্য করছি নানা ধরনের বইয়ের ভূমিকালেখক হিসেবে আমার একটু কদর হয়েছে। কিন্তু অসম সাহিত্যসভার মতো একটি বিশাল প্রতিষ্ঠানের শতবর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানের জন্য তা কি যথেষ্ট ওজনদার?‌ কী জানি!‌ সে যারা আমাকে আমন্ত্রণ করেছে বা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের দায়, আমার কী— এই ভেবে রাজি হয়ে গেলাম। চলচ্চিত্র সমালোচক চন্দন শর্মা যোগাযোগ রাখছিলেন, গুয়াহাটি বিমানবন্দরে এক অতি তৎপর সহকারী বিপুল শর্মাকে পাঠালেন আমাকে ধুবড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্যে— সেখানেই মূল সভা হবে। বিপুল আমাকে প্রথমে দুপুরের খাওয়া খাইয়ে নিল এক রেস্তোঁরাতে। আহা, বিপুলের চিকেনের প্রস্তাব উপেক্ষা করে কত বছর পরে যে টাটকা আর সুস্বাদু পুঁটিমাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেলাম!‌ খেতে খেতে মনে পড়ছিল কথাটা, ‘‌বাঙাল, পুঁটিমাছের কাঙাল’‌। উদ্বাস্তু হয়ে প্রথম যখন পশ্চিম বাংলায় আসি, তখন এই প্রবচনটি খুব শুনতাম। মনে প্রশ্ন জাগে, অধুনালুপ্ত আর–‌এক ধরনের ‘‌আমরা–‌ওরা’‌ বিভাজনের এই সব লোককবিতা কি কেউ সংগ্রহ করে রেখেছে?‌
গুয়াহাটি থেকে ধুবড়ি (‌অসমিয়াতে লেখা হয় ‘‌ধুবরি’‌)‌ গাড়িতে প্রায় ছ’‌‌ঘণ্টার পথ। তুলে নিতে হল ধুবড়ির প্রাক্তন ডেপুটি কমিশনার কনকচন্দ্র শর্মাকে, যিনি ঐতিহাসিক এবং সাহিত্যসমালোচক, এবং অসম সাহিত্যসভার অন্যতম সহ–‌সভাপতি। তাঁর মুখে অসমের সাহিত্য–‌সংস্কৃতি বিষয়ে নানা আলোচনা শুনতে শুনতে আমরা প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টায় ধুবড়ি সার্কিট হাউসে পৌঁছোলাম। গুয়াহাটির মতো সেই সার্কিট হাউসও ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে, কিন্তু রাত্রিবেলায় ব্রহ্মপুত্র দর্শন হল না, শুধু একটি শঙ্খনাদের মতো মোটর লঞ্চের বাঁশি, আর দু–‌একটি ভটভটির ভটভটানি জানান দিল যে সেই মহানদ খুব কাছাকাছিই রীতিমতো উপস্থিত আছে। না, ভুল বলেছি। পথেই তো বিশাল এক ব্রহ্মপুত্র সেতু পেরিয়ে এলাম, তা পেরোতে–‌পেরোতেই কী সুন্দর মাঝপথে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এল পৃথিবীতে। অর্ধেক নদী ধরা দিল দিনের বিধুর আলোয়, অর্ধেক নদী অন্ধকারের হালকা কালো ওড়না জড়িয়ে নিল।
ধুবড়ির সাহিত্যসভার বাড়িতে (‌অসমের বহু জেলায় সভার নিজস্ব দোতলা–‌তিনতলা বাড়ি আছে, তার আজীবন সদস্য হল ত্রিশ হাজারের মতো। দ্বিবার্ষিক অধিবেশনে লাখখানেক লোক হয়।)‌, ছাদের ওপরে হলঘরে খেতে গেলাম রাত্রে, সেখানে দেখি প্রচুর বাঙালির সমাগম। ধুবড়ি এমনিতেই বাঙালিপ্রধান শহর। এই বাঙালিরা সকলেই অসম সাহিত্যসভার সদস্য, এবং তাঁদেরই আমন্ত্রণে শতবর্ষপূর্তির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা ধুবড়িতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আর বাঙালি মানে বাঙালি— তাতে হিন্দু–‌মুসলমান দুইই প্রায় সমপরিমাণ, বৌদ্ধ–‌খ্রিস্টান ছিলেন কি না খোঁজ করিনি। এঁদের অনেকেই সাহিত্যসভার নানা উচ্চপদে আছেন। এবং অসমিয়াদের সঙ্গে হাতে হাত কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন। সঙ্গে আছেন এ অঞ্চলের এক বৃহৎ সম্প্রদায় রাজবংশীরা, এবারে সাহিত্যসভার প্রধান সম্পাদকই পরমানন্দ রাজবংশী— অসমিয়া ভাষার এমএ, ও ডক্টরেট, কলেজের অধ্যক্ষ।
সকালে ধুবড়ি টাউন ক্লাবের মাঠে বিশাল ছাউনির পাশে মাঝখানে বেঁটে মিনারের মতো একটি উঁচু ফ্ল্যাগপোস্ট করা হয়েছে, সেখানে উঠে কুয়াশার মধ্যে সভাপতি ডা.‌ ধ্রুবজ্যোতি বরা মূল পতাকা উত্তোলন করলেন। আর তার চারপাশে গোল করে সাজানো ছিল আরও একশোটি পতাকা, ওপরে মুড়ে–‌রাখা ফুলভর্তি অবস্থায়, আমরা তার এক–‌একটির দড়ি টানলাম, আর ঝুরঝুর করে ফুল ঝরে পড়ল আমাদের মাথার ওপর। ড্রাম বাজল, আদিবাসীদের নৃত্য হল, সাহিত্যসভার জয়ধ্বনি উঠল।
ধুবড়িরই অঙ্গ গৌরীপুর, মূলত অসমিয়া প্রমথেশ বড়ুয়া (‌অসমিয়াদের ‘‌বুরুয়া’‌)‌, প্রতিমা বড়ুয়া পান্ডে প্রমুখর স্মৃতিজড়িত ‘‌বাঙালি’‌ সংস্কৃতির এক পীঠস্থান। ফলে তাঁদের বাড়ি, এখানে যাকে রাজবাড়ি বলে, সেটা দেখার একটা লোভ ছিল। বিপুল যখন বলল সে রাজবাড়ি আর নেই, চলুন আপনাকে মহামায়া মন্দির দেখিয়ে দেব, খুব জাগ্রত দেবী, তখন আমি একটু হতাশ হলাম, বললাম, ‘‌না বিপুল, আমি মন্দিরের লাইনে নেই।’‌ স্থাপত্য–‌ভাস্কর্যের ব্যাপার হলেও একটা কথা ছিল। যাই হোক, গৌরীপুরে প্রমথেশ বড়ুয়া মহাবিদ্যালয়ে একটি আলোচনাসভা হল সাহিত্য–‌সভার সহযোগিতায়। ডা.‌ বরা এবং সকলেই বললেন, ‘‌আপনি বাংলায় বলুন, আমরা সকলেই বাংলা বুঝি।’‌ এবং তার পরে চিলা রায় (‌উচ্চারণ সিলা রায়)‌ স্মৃতি কলেজে সংস্কৃতি নিয়ে সেমিনার, সেখানেও বাংলা বক্তৃতা, পরদিন শতবর্ষের উদ্‌যাপনের সমাপ্তি অনুষ্ঠানেও বাংলা বক্তৃতা। পাঁচ হাজার লোকের হাততালির পরিমাণ দেখে যদি বোঝা আর ভাললাগার পরিমাণ অনুমান করা যায়, তা হলে তা ভালই হয়েছিল বলে মনে হয়, টেলিভিশনও এগিয়ে এসেছিল দু’‌কথা গেঁথে নেওয়ার জন্যে।
যে কথাটা বলবার, তা হল, সাহিত্যসভার এই বিশাল আয়োজনে স্থানীয় বাঙালি অসমিয়াতে কোনও দূরত্ব বা বিচ্ছেদ দেখিনি। অসম সাহিত্যসভা এমনিতে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, তা সরকারের সাহায্যও নেয় না। ফলে, বরাক উপত্যকার বেদনাময় ইতিহাস পার হয়ে, অসমে নাগরিকের স্তরে যে বোঝাপড়াটা ক্রমে গড়ে উঠছে বলে, নেহাত দু’‌দিনের আপাতদৃষ্টিতে, মনে হয়, প্রশাসনিক স্তরে হয়তো সরকার সেটা নিয়ে ভয়ে ভয়ে থাকে। সরকার বানাতে চায় একটা একরঙা একাধিপত্যের রাজ্য, যা অসমের মতো আদিবাসী–‌অনাদিবাসী, হিন্দু–‌মুসলমান, বহুভাষী রাজ্যে সম্ভব নয়। অসমিয়াদের আপেক্ষিক প্রাধান্য অবশ্যই থাকবে, কিন্তু রাজ্য হবে সমদর্শী, সমানাধিকারের। তবু সরকার ‘‌খাঁটি’‌ নাগরিকদের তালিকা তৈরিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এবং হাস্যকর অপদার্থতার পরিচয় দিয়ে সকলের ক্রোধের কারণ হয়েছে। ‘‌অখাঁটি’‌ নাগরিকদের নিয়ে কী করা হবে তা সরকার বলুক।ফেরার পথে বিপুল আমাকে গৌরীপুরে বরুয়াদের আর–‌এক বাড়ি ‘‌হাওয়া মহল’‌ দেখিয়ে দিয়েছিল।‌‌■

হাওয়া মহল

জনপ্রিয়

Back To Top