৮ জানুয়ারি আশাপূর্ণা দেবীর জন্মদিন। এই সাহসী, তুমুল জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিককে নিয়ে লিখলেন প্রকাশক, লেখক সবিতেন্দ্রনাথ রায়।

আশাপূর্ণা দেবীদের তখনও গড়িয়ার বাড়ি হয়নি। গোলপার্কের কাছে সরকারি কোয়ার্টারে থাকতেন। প্রশস্ত কোয়ার্টার। প্রায় চার হাজার স্কোয়্যার ফুটের মতো। আমার একটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি নিয়ে আসার কথা। সেইজন্যই যাওয়া। দরজায় বেল দিতে মেসোমশাই কালিদাসবাবু দরজা খুললেন, আরে ভানু যে, এসো, এসো।
বললাম, মাসিমা লেখার— ওই নতুন বইটার কপি— যেটা পত্রিকায় বেরিয়েছে,‌ নিয়ে যেতে বলেছিলেন।
মেসোমশাই কালিদাসবাবু বললেন— এসো দেখো, তোমার মাসিমার কী অবস্থা!‌
আমাকে ভেতরের ঘরে নিয়ে গেলেন, একটা বড় ট্রাঙ্ক খোলা, তার চারপাশে নানা শাড়ি স্তূপাকার।
আমি সবিস্ময় বললাম, কী ব্যাপার!‌
মাসিমা সেই শাড়ির স্তূপ থেকে মুখ তুলে বললেন, ও ভানু, তুমি এসে গেছো। এই দেখো না, করুণার নাতি হয়েছে, তার জন্য কাঁথা করবে, পুরনো শাড়ি চেয়েছে, তাই খুঁজছি।
মেসোমশাই বললেন, ভানু বসো, করুণা কে তুমি তো বুঝবে না, আমাদের বেলতলার বাড়িতে কাজ করত। তার নাতি হয়েছে, কাঁথা করবে, সেই নাতির জন্য। কোথায় নরম শাড়ি। সবই তাঁতের আর নতুন খরখরে।
আমি বললাম, মিলের শাড়ি যদি থাকে আপনার বউমার কাছে, বা মেসোমশাইয়ের মিলের ধুতি, তাতেও ভাল কাঁথা হয়।
মাসিমা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এই তো তুমি ভাল বুদ্ধি দিলে। আচ্ছা এই দুটো দেখো তো, এ দুটো চলবে কিনা।
হাত দিয়ে দেখলাম, নরম তবে প্রায় নতুন, বললাম, তা চলবে, তবে জলে ভিজিয়ে নিলে ভাল হবে।
মাসিমা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন, তা হলে এগুলো সরিয়ে রাখি।
আর সব শাড়ি তুলে যেন স্বস্তি পেলেন, বললেন, চলো এবার বসি, তোমার ব্যাপারটা দেখি।
এই যে সবার জন্য ভাবা, যিনি বেশ কয়েক বছর আগে বাড়িতে কাজ করে গেছেন, বাড়িবদলের জন্য এখন করতে পারেন না, তাঁর নাতির জন্য ভাবনা। কাঁথার জন্য পুরনো শাড়ি খোঁজা, নিজের গৃহস্থালি এবং অপর্যাপ্ত লেখার কাজের মধ্যে সময় বার করে নেওয়া— এর মধ্যেই আশাপূর্ণা দেবীর সর্বজনীন মাতৃরূপটি ফুটে ওঠে।
বেলতলা রোড, গোলপার্কের সরকারি কোয়ার্টার এবং গড়িয়ায় নিজেদের বাড়ি— এই তিনটি জায়গার মধ্যে আমার স্মৃতিপটে গোলপার্কের সরকারি কোয়ার্টারটি বেশি জ্বলজ্বল করে। এইখানে আমরা বেশ অনেকবার গেছি। লেখা আনার জন্য তো বটেই, নানা অ–‌দরকারেও। তবে প্রতি ৮ জানুয়ারি আশাপূর্ণা দেবীর জন্মদিনে অবশ্যই যেতাম। আমরা দুটো মালা নিয়ে যেতাম। একটা মাসিমার জন্য, একটা মেসোমশাইয়ের জন্য। একটা উপহারদ্রব্যও থাকত, কখনও শাল— জানুয়ারি মাসে তো ঠান্ডা থাকেই অথবা নালদা। মাসিমা–মেসোমশাই, পুত্র সুশান্ত, পুত্রবধূ নূপুর গুপ্ত, দুই নাতনি— ভরাভর্তি সংসার। মাসিমার সেজদা আসতেন, মাসিমার জন্য লাইন টানা কাগজের প্যাড নিয়ে। কাকাবাবু গজেন্দ্রকুমার মিত্র ছদ্ম–‌কলহ করতেন— বাঃ, নিজের বোনের জন্য প্যাড নিয়ে এলেন!‌ আমার কথা মনে পড়ল না!‌ তারপর থেকে সেজদা দুটো বান্ডিল প্যাড আনতেন, আশা এটা তোর, আর এটা গজেনবাবুর।
জন্মদিনে গাঙ্গুরামের (‌কাছেই গোলপার্কে বিরাট দোকান)‌ চমচম‌, পুরনো বেলতলা রোডের পাড়ার মৃত্যুঞ্জয়ের দরবেশ (‌এটি মাসিমাদের প্রিয় মিষ্টি)‌, সেই সঙ্গে নিজের তদারকিতে তৈরি লুচি, আলুর দম, বেগুনি— প্রতি জন্মদিনে এক সমারোহ ব্যাপার।
আমরাই প্রথম যেতাম। পরে জন্মদিনের ব্যাপারটা জানাজানি হতে অন্যরাও আসতেন। কাছেই থাকতেন পঞ্চাননতলায় নীহাররঞ্জন গুপ্ত ও নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। কবে প্রথম যাই আশাপূর্ণা দেবীর কাছে, কবে প্রথম পরিচয়, তারিখটা হারিয়ে গেছে। তবে সালটা হল ১৯৪৯। এটা মনে আছে, ‘‌বলয়গ্রাস’‌ উপন্যাস ছাপা হচ্ছে। সরাসরি পাণ্ডুলিপি থেকে। প্রকাশনার কাজে আমি তখন শিক্ষানবিশ। আমাদের প্রবীণ কর্মাধ্যক্ষের সঙ্গে যাওয়া ৭৭ বেলতলা রোডের বাড়িতে। সামনে তেকোনা পার্ক। বাড়ির কোণের দিকে রাস্তার ওপর, বাইরের ঘরে টাইপরাইটিং স্কুল, সেখানে গিয়ে বলতে, প্রবীণ শিক্ষকমশাই বললেন, আপনারা পাশের ঘরের দরজার সামনে যান, আমি খুলতে বলছি। পরে জেনেছি, ইনিই কালিদাস গুপ্ত মশাই।
পাশের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই পরিচারিকা দরজা খুলে দিলেন। ভিতরে বসতে বললেন, ‘বসুন, মা আসছেন।’
আমরা ভিতরে গিয়ে বসতেই পরিচারিকা মিষ্টির প্লেট, জলের গ্লাস রেখে গেলেন। একটু পরে এলেন আমাদের আশাপূর্ণা দেবী।
আমাদের হাতে পাণ্ডুলিপির বেশ খানিকটা দিয়ে বললেন, পুরোটা হয়নি, তোমাদের বোধহয় আরও দু–‌একবার আসতে হবে।
লাইনটানা কাগজে গোটা গোটা লেখা। পরিষ্কার ঝকঝকে।
বললেন, আর একটা কথা বলি বাবা তোমাদের, তোমরা যদি সকাল এগারোটা নাগাদ আসো ভাল হয়, এই সময়টা তো আমাকে শাশুড়ি–‌মাকে খাওয়াতে হয়, তাই দেরি হল আসতে। সকালে এলে তোমাদের আর বসতে হবে না।
আমার দাদা বললেন, তা হলে ভানু অফিস যাওয়ার পথে আপনার কাছে হয়ে যাবে। যেদিন যেদিন বলবেন, ও এসে নিয়ে যাবে।
‘‌বলয়গ্রাস’‌ বেরোল, তারপর ‘‌নির্জন পৃথিবী’,‌ তারও পরে ‘‌অগ্নিপরীক্ষা’‌, তখনও বেলতলা রোডের বাড়িতে আছেন মাসিমারা। তার পরে এসে উঠলেন গোলপার্কের সরকারি হাউজিং এস্টেটে।

আশাপূর্ণাদেবী মানুষ হয়েছেন এক রক্ষণশীল পরিবারে। উত্তর কলকাতার দর্জিপাড়া অঞ্চলে। ঠাকুমা কর্ত্রী এবং তাঁর কড়া শাসন বাড়ির সকলের ওপর। মেয়েদের বাইরে যাওয়া নিষেধ। কাজে–‌কাজেই পড়াশোনাও বারণ। আশাপূর্ণারা তিন বোন। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেল ওইভাবেই, আশাপূর্ণা এবং ছোট বোন সম্পূর্ণার লেখাপড়া করার খুব ইচ্ছে। দাদারা মাস্টারমশাইয়ের কাছে পড়ে, উল্টোদিকে বসে দুই বোন হাতের লেখা মকশো করেন। কিন্তু উল্টোদিকে বসা তো, অ আ অক্ষরগুলি উল্টো লেখা হয়। রাত্রে শোওয়ার সময়ে মা দেখে ঠিক করে দেন, কীভাবে ঠিকভাবে লিখতে হয়। আয়নার সামনে ধরে দেখান। তারপর রাত্রেই শুরু হয় মায়ের কাছে লেখা ও পড়তে শেখা। পিতা হরেন্দ্রকুমার ছিলেন চিত্রশিল্পী। সেই সুবাদে ভারতবর্ষ, প্রবাসী মাসিকপত্র আসত বাড়িতে। এইভাবে লিখতে শেখা এবং মাসিকপত্র পড়া চলত দুই বোনের।
একান্নবর্তী সংসার ক্রমশ বড় হতে হতে আর এক বাড়িতে কুলোয় না। হরেন্দ্রকুমার বাসা নিলেন মানিকতলার কাছে সার্কুলার রোডের ওপর। আলাদা বাড়ি হলেও ঠাকুমার শাসন অব্যাহত রইল। মেয়েদের বাড়ির বাইরে স্কুল, পাঠশালায় যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা জারি আছে এখানেও। যদিও বাড়িতে লেখা–‌পড়া চর্চার স্বাধীনতা অবাধ। এই চর্চার মধ্যেই আশাপূর্ণা লিখে ফেললেন একটা কবিতা— ‘‌বাইরের ডাক’‌। বাড়িতে বড়দের পত্রিকার সঙ্গে ছোটদের ‘‌শিশুসাথী’‌ পত্রিকাও আসত। আশাপূর্ণা সাহসে ভর করে ডাক–‌এ পাঠিয়ে দিলেন সেই কবিতা ‘‌শিশুসাথী’‌র অফিসে। বেশ কিছুদিন পরে পাড়ার একজন বর্ষীয়সী ভদ্রমহিলা, মায়ের বান্ধবী, এসে বললেন, হ্যাঁরে আশা, তোর নামেরই একজনের একটি লেখা বেরিয়েছে এবারের ‘‌শিশুসাথী’‌তে, কবিতা— ‌নাম ‘‌বাইরের ডাক’‌।
আশাপূর্ণার তো বুঝতে বাকি থাকে না। পাড়ার মাসিমা চলে যেতেই কাজের লোককে পাঠালেন টাকা দিয়ে, এক কপি ‘‌শিশুসাথী’‌ কিনে আনতে। আনতেই দেখা গেল— তাঁরই লেখা ‘‌বাইরের ডাক’‌। নিচে তাঁর নাম জ্বলজ্বল করছে। কতবার তার ওপর হাত বোলান।
এসব কথা আমাদের তাঁরই মুখ থেকে শোনা। কিছুদিন পর দেখা গেল, ‘‌শিশুসাথী’‌র সম্পাদক মশাই আরও লেখা চেয়েছেন। সুতরাং— সাহিত্যচর্চা চলল অব্যাহতভাবে।
তবে কালটা তো সেকালের। সাহিত্যচর্চা যতই চলুক, বিয়ে হয়ে গেল আশাপূর্ণা দেবীর পনেরো বছর বয়সেই।
আশাপূর্ণা বলেছেন, শ্বশুরবাড়ি গিয়ে দেখলাম— মাত্র চারখানি বই আছে। দুটি পঞ্জিকা, একটি ধর্মগ্রন্থ, আর একটি ভ্রমণ গাইড। কিন্তু আশাপূর্ণা দেবীর স্বামী–‌ভাগ্য ছিল অপরিসীম ভাল। উনি যখনই শুনলেন, স্ত্রী সাহিত্যচর্চা করেন, পত্নীর সাহিত্যচর্চার ব্যবস্থা করে দিলেন। একটি নতুন হ্যারিকেন এল তাঁর জন্য। তখনও তো ইলেকট্রিক লাইন আসেনি। হ্যারিকেন জ্বালিয়ে কাগজ দিয়ে এমনভাবে আড়াল করে দিতেন যাতে মায়ের ঘরে আলো না যায়, তাঁর ঘুমের না ব্যাঘাত হয়। আবার আশাপূর্ণাও যাতে স্বচ্ছন্দে লিখতে পারেন।
লেখা শেষ হলে মেসোমশাই কালিদাস গুপ্তই সে লেখা বিভিন্ন পত্র‌পত্রিকার দপ্তরে দিয়ে আসেন। এজন্য অনেকে ভাবতেন কোনও পুরুষ লেখকই আশাপূর্ণা দেবী নামে লেখেন।
১৯৪৮–৪৯–‌এর পরে কংগ্রেস থেকে একটি দৈনিক পত্রিকা বেরোয়— নাম ‘‌জনসেবক’‌। তার সাহিত্য বিভাগটি দেখতেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। তখন ‘‌বলয়গ্রাস’‌, ‘‌নির্জন পৃথিবী’‌ বেরিয়ে গেছে। তারাশঙ্করবাবু একদিন আমাদের আড্ডায় এসে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা ভানু, তোমরা যে এই আশাপূর্ণা দেবীর নামে বই ছাপছ, ইনি মহিলা না পুরুষ?‌
আমরা বললাম, না না, আমাদেরই বাড়ির মা–‌মাসিমার মতো। আমরা কতবার গিয়েছি ওঁর বাড়ি, দেখালাম— এই তো একটা পাণ্ডুলিপি।
তারাশঙ্করবাবু বললেন, বাপ রে, এক মহিলার কলম থেকে এমন নিষ্ঠুর গল্প বেরোতে পারে!‌
গল্পটি মনে আছে। নাম ‘‌বোগনো’‌। পিতলের বা কাঁসার হাঁড়ি, ভাত–‌রান্নার জন্য ব্যবহার হয়।
গল্পটি এইরকম— স্বামী–স্ত্রী, বিধবা শাশুড়ি ও একটি পুত্র এই নিয়ে সংসার। শাশুড়ি বিধবা। স্ত্রী স্বামীকে বলেছেন একটি ছোট বোগনো বাজার থেকে আসার সময়ে নিয়ে আসতে। নিরামিষ ও আমিষ রান্নার শেষে স্ত্রী উনুন নিকিয়ে শাশুড়িকে ছেড়ে দেবেন। শাশুড়ি স্নান করে নিজের জন্য ভাত ফুটিয়ে নেবেন। তা না হলে ওঁকে ঠান্ডা ভাত খেতে হয়, নতুবা স্ত্রীকে স্নান করে শাশুড়ির জন্য ভাত করতে হয়। তখন তো গ্যাস আভেন প্রভৃতি আসেনি। এটা ভেবে নিতে হবে। তা স্বামী আন্দাজ ঠিক বুঝতে পারেননি। বোগনো এনেছেন, তবে বড়। স্ত্রী বললেন— এই বড় ‘‌বোগনো’‌ কি মা নামাতে পারবেন?‌ সেই আমাকেই করতে হবে, স্নান সেরে।
স্বামী আবার গেলেন বদলাতে। দোকান তখন বন্ধ হয়ে গেছে। পরের দিন দেখা যাবে। এই দুবার যাতায়াতে হোক, বা গরমের জন্য, ভাত খাওয়ার পরেই অসুস্থ হলেন, স্ট্রোক। চিকিৎসার সময়ই পাওয়া গেল না। স্বামী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।
শ্রাদ্ধশান্তির পর বধূমাতা ও শাশুড়ির ভাত এখন একসঙ্গেই হয়। এই ভাত–‌রান্না করতে করতেই বধূটির মনে হল, ভাগ্যিস, উনি বড় বোগনো এনেছিলেন, তাই দুজনের ভাত একসঙ্গে হচ্ছে, নয়তো আবার একটা কিনতে হত, এই ভাবতে ভাবতেই বধূটি রান্নাঘরে একাকী নিঃশব্দে কান্নায় ভেঙে পড়ল— সে কি এই চিন্তায় নিজের বৈধব্যকেই ভাল ভেবে বসল!‌
তারাশঙ্করবাবু বলছিলেন, ভানু, আমি নিষ্ঠুর গল্প অনেক লিখেছি, পড়েছিও, কিন্তু মহিলার হাত দিয়ে এমন গল্প বেরোতে পারে,— এ কথা কখনও ভাবিনি। আবার সেই মহিলাকে নিয়েই।
আশাপূর্ণা দেবীর দুই পুত্র ও এক কন্যার জননী। জ্যেষ্ঠপুত্র আমার এক আত্মীয় দাদার সঙ্গে কলেজে পড়তেন। ভাল আঁকার হাত ছিল। সম্ভবত ‘‌ছোট ঠাকুর্দার কালী যাত্রা’‌র বইয়ে তিনি ছবি এঁকেছিলেন। এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে তাঁর জীবনাবসান হয়।
মাসিমা আশাপূর্ণা দেবী, মেসোমশাই কালিদাস গুপ্ত এ দুঃখ নীরবে সহ্য করেছিলেন। বাইরে শোকের কোনও প্রকাশ ছিল না। শুধু সেই পুত্রের প্রিয় খাদ্যগুলি তাঁদের খাদ্যতালিকা থেকে নির্মমভাবে বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন। আমি যতদূর জানি— কিশমিশ, আঙুর, আইসক্রিম খাওয়া নিঃশব্দে পরিত্যাগ করেছিলেন। কেউ দিলে বলতেন, ওটা সহ্য হয় না বাপু। ওঁরা দুজনেই নিরামিষাশী ছিলেন। জানি না সে ঘটনার পর থেকে কিনা।
এই দুঃখ দিনের মধ্যেই আশাপূর্ণা দেবীর সাহিত্য–সাধনা এগিয়ে চলল। পত্রিকা সম্পাদক, প্রকাশকদের অবারিত দ্বার ছিল তাঁর কাছে। আমরা তো যেতামই, অন্যরাও যেতেন।
একদিন আমায় ফোন করলেন রাত ৯টা নাগাদ। ভানু, একটা বড় ভুল হয়ে গেছে। কাল আমি আর তোমার মেসোমশাই যাচ্ছি কৃষ্ণনগর, আমার শ্বশুরবাড়ি, ঘরে কোনও বই নেই, তুমি যদি এক কপি ‘‌বলয়গ্রাস’‌ ও এক কপি ‘‌নির্জন পৃথিবী’‌ শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছে দাও, শ্বশুরবাড়িতে আমার মুখরক্ষা হয়। আমরা কৃষ্ণনগর সিটি লোকালে জানলার ধারেই বসব। তুমি সহজেই দেখতে পাবে।
বই দুটো নিয়ে ঠিক সময়ে পৌঁছতে দুজনেই খুব খুশি। আমি মাসিমাকে বললাম, কথাসাহিত্যে একটা ধারাবাহিক ধরবেন বলেছিলেন, আমাদের এই মাসিক সাহিত্যপত্রে, সেটা কবে ধরবেন মাসিমা?‌
আশাপূর্ণা বললেন, ঠিক আছে সামনের মাস থেকে, না না তার পরের মাস থেকে, একটা মাস সময় হাতে থাকা ভাল।
আমি বললাম, নাম তো একটা দিতে হবে, আগে থেকে বিজ্ঞাপনের জন্য।
মাসিমা বললেন, প্রতিশ্রুতিই দাও, তাই তো দিচ্ছি। না, তার চেয়ে এক কাজ করো— ‘‌প্রথম প্রতিশ্রুতি’‌ দাও নাম। প্রথমই দিচ্ছি এই প্রতিশ্রুতি।
এইভাবে হল বইয়ের নাম‌করণ এবং পর পর এল— প্রথম প্রতিশ্রুতি, সুবর্ণতলা ও বকুল–‌কথা। বাংলা সাহিত্যের মাইলফলক প্রোথিত হয়ে গেল।
আশাপূর্ণা দেবীর নিজের এবং কোনও বোনেরই স্কুলশিক্ষা হয়নি ঠাকুমার কড়া শাসনে। পুত্র সুশান্তর বিয়ে হল। পুত্রবধূ নূপুর এলেন ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে। কন্যাদের পড়াতে পড়াতে নিজেরও উৎসাহ হল আরও পড়তে। আশাপূর্ণা দেবীর উৎসাহে পুত্রবধূ বি এ, এম ‌এ পাশ করলেন, যোগমায়া দেবী কলেজে অধ্যাপিকা হলেন। গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি পেলেন, তার কিছুদিন আগেই ‘‌প্রথম প্রতিশ্রুতি’‌ রবীন্দ্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। আশাপূর্ণা দেবী ও কালিদাসবাবুর বিবাহবার্ষিকীর পঞ্চাশ বছরও হবে কিছুদিন পরে। গড়িয়ার নতুন বাড়িতে এই তিন উৎসবের বা আনন্দের এক সম্মিলিত অনুষ্ঠান হল। সাহিত্যিকদের এক জমাট আড্ডা বসে গিয়েছিল এই উৎসবে। কিছুদিন আগেই আশাপূর্ণা দেবীর ‘‌যোগ–‌বিয়োগ’‌ চলচ্চিত্রটি শুরু হয়েছে। দারুণ চলেছিল। তাঁর ‘‌বাজে খরচ’‌ নামে একটি ছোট গল্প থেকে এই চলচ্চিত্রটি তৈরি হয়। প্রেমেন্দ্রবাবু বললেন— তা আশা, তোমার দেওয়া নাম পাল্টে ‘‌যোগ–‌বিয়োগ’‌ নাম হল কেন?‌
কী চমৎকার উত্তর দিয়েছিলেন মাসিমা, এ তো জানা কথা দাদা, সিনেমাওলারা আমাদের গল্প বাদ দেয়, আর ওদের গল্প যোগ করে সেজন্যই ‘‌যোগ–‌বিয়োগ’‌ নাম। ওদেরটা যোগ, আমারটা বিয়োগ।
একটি সোফায় প্রেমেন্দ্র মিত্র ও সুমথনাথ ঘোষ বসেছিলেন, উল্টোদিকের সোফায় গজেন্দ্রকুমার মিত্র ও অধুনালুপ্ত ‘‌যষ্টিমধু’‌ পত্রিকার সম্পাদক কুমারেশ ঘোষ।
কুমারেশবাবুই লক্ষ্য করলেন— চেঁচিয়ে বলে উঠলেন— আশাদি, দেখুন দেখুন এখানে দুটো মিত্র–‌ঘোষ হয়ে গেছে। সামনের সোফায়— প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুমথ ঘোষ, আমাদের সোফায় গজেন্দ্র মিত্র, কুমারেশ ঘোষ।
আড্ডায়–গল্পে–খাওয়াদাওয়ায় সেদিনটি বিয়েবাড়ির মতো জমে উঠেছিল।

কালিদাসবাবু ও আশাপূর্ণা দেবীর দাম্পত্যজীবন ছিল এক আদর্শ দৃষ্টান্ত। বিয়ের পর থেকেই কালিদাসবাবু আশাপূর্ণা দেবীর লেখার জন্য সবরকম সহযোগিতা করে এসেছেন। লেখা পত্র‌পত্রিকার দপ্তরে পৌঁছনো, প্রকাশকদের সঙ্গে আলাপ–‌আলোচনা সব কালিদাসবাবু অভিভাবকের মতো দেখতেন। সভাসমিতিতে আশাপূর্ণা দেবী বড় একটা যেতেন না। কবি নরেন্দ্র দেব, পত্নী রাধারানি দেবীর যুগল উৎসাহে বেরোতে রাজি হন। কিন্তু যেখানেই যেতেন কালিদাসবাবু সঙ্গে থাকতেন। পক্ষী মাতা যেমনভাবে তার শাবকদের রক্ষা করে, তেমনভাবেই কালিদাসবাবু তাঁকে আগলাতেন।
একবার ওঁরা দুজনে বারাণসী গিয়েছিলেন। আমি কী কাজে গিয়ে পড়েছি। উঠেছি বীরেশ্বর পাঁড়ে ধর্মশালায়। কাশী পৌঁছে শুনলাম, ওঁরা রামাপুরাতেই ‘‌পূর্বোদয়’‌ বা ‘‌সূর্যোদয়’‌ এরকম নামের একটা হোটেলে উঠেছেন। গিয়ে দেখা করতেই ওঁরা দুজনে সোল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলেন, আরে ভানু, তুমি কোত্থেকে?‌
আমি বললাম, দিল্লি গিয়েছিলাম, ফেরার পথে ভাবলাম, বিশ্বনাথজি ও মা সঙ্কটার পুজো দিয়ে যাই। তা নেমেই শুনলাম, আপনারা এসেছেন। আমি তো আছি কাছেই, এই পাঁড়ে ধর্মশালায়।
মাসিমা বললেন, এ হোটেলটি বেশ ভাল বাবা, আমাদের জন্য নিরামিষ খাবার বেশ যত্ন করে তৈরি করে।
মেসোমশাই বললেন, ভানু, তুমি মাসিমার সঙ্গে গল্প করো। আমি একটু আসছি।
মাসিমার সঙ্গে গল্প করছি। একটু পরেই মেসোমশাই কালিদাসবাবু ফিরলেন, ঠোঙা হাতে। বললেন, সামনের ওই দোকানটিতে শিঙাড়া ভাজে, গরম শিঙাড়া। আমি ও মাসিমা রোজ খাই। দারুণ শিঙাড়া করে।
মাসিমা বললেন, খুব ভাল করেছ। ভানুকে একটু লাড্ডু দিই এই সঙ্গে।
কী চমৎকার কাছে টেনে নেওয়া, একেবারে বাড়ির মতন। কী করে ভাবব, কাশীতে আছি হোটেলে বসে।
মাসিমা বললেন, এখানে সন্ধের সময়ে গঙ্গায় কী সুন্দর আরতি হয়। মন্দিরে গেছি বটে তবে বড় ভিড় ও ধাক্কাধাক্কি। গঙ্গার ঘাটে বসলে মন যে কী ভাল হয়ে যায় কী বলব!‌

জনপ্রিয়

Back To Top