শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়:

দিল্লি–লন্ডন যাতায়াত। ৩০ মার্চ যাওয়া, ৭ এপ্রিল ফেরা। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ। টিকিটটা কেটে ফেলে উত্তেজনায় টেবিলের ওপর আঙুল ঠুকে টকাটক তবলা বাজিয়ে নিল সূর্য। ওর অসম্ভব ফুর্তি হচ্ছে। এ যেন ছোটবেলার সেই ট্রেজার হান্ট!‌‌
ব্যাপারটা শুরু হয়েছে খুব অদ্ভুতভাবে। সূর্য তখন সুপার মার্কেটে। প্লেন টম্যাটো সস, না চিলি–টম্যাটো, দুটোর মধ্যে কোনটা নেবে, সেই নিয়ে যখন গভীর চিন্তায় মগ্ন, মা ফোন করে বলল, এক প্যাকেট সর্ষেগুঁড়ো কিনে আনতে। ফোনটা ছেড়ে তাকাতেই সূর্যর চোখে পড়ল হলুদ রঙের কৌটোটা। ‘‌কোলম্যানস্‌ অফ নরউইচ। মাস্টার্ড পাউডার’‌। কিন্তু মা জিনিসটা দেখেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল, ‘তোকে বলাটাই আমার ভুল হয়েছে। রাঁধব ট্যাংরা মাছের ঝোল, তুই নিয়ে এলি এই সাহেবি সর্ষেগুঁড়ো!‌ তোর কি কখনও বুদ্ধিশুদ্ধি হবে না রে!‌’
রান্নার মাসি গজগজ করতে করতে গেল সর্ষেগুঁড়ো কিনতে।‌ আর সূর্য কৌটোটা হাতে করে এসে বসল নিজের ঘরে। ওর রাগ হচ্ছিল। সর্ষেগুঁড়োর আবার দিশি–বিলিতি কী!‌ ভাবতে ভাবতে আনমনে কৌটোর ঢাকাটা খুলে ফেলেছিল সূর্য। ভেতরে সর্ষেগুঁড়োর সিল করা প্যাকেট। আর সেটা ঘিরে চমৎকার হালকা বেগুনি রঙের একফালি ভাঁজ করা কাগজ। বোধহয় কোনও রান্নার রেসিপি ভেবে কাগজটা টেনে নিয়ে ভাঁজ খুলতেই সূর্য হকচকিয়ে গেল। পাতলা ফিনফিনে কাগজে ঘন নীল কালিতে টানা হাতে লেখা:— ‘‌মিট মি অ্যাট দ্য কোলম্যান’‌স। আই উইল টেল ইউ এ সিক্রেট!‌’‌ তার নিচে লেখা— ‘‌লুক ইনসাইড দ্য বিগ ফ্রুট!‌’‌
খুব মজা পেয়েছিল সূর্য। কিন্তু কোলম্যান’‌স মানে? গুগ্‌ল করতে প্রথম লিংকটাই ‘‌কোলম্যান’‌স অফ নরউইচ’‌। সর্ষেগুঁড়োর কৌটোর গায়ে ঠিক যেমন লেখা আছে। তা হলে সিক্রেট জানতে হলে ওকে এখন নরউইচ যেতে হবে!‌ ভেবেই খুব মজা পেল সূর্য। তার পরেই মনে হল, না যাওয়ার কী আছে!‌ গেলেই হয়!‌ উফ, কী থ্রিলিং হবে!‌ বলা নেই কওয়া নেই, হুট করে একটা অচেনা–অজানা শহরে গিয়ে হাজির হওয়া!‌
সূর্যর মাথায় একবার কিছু একটা ঢুকলে যা হয়। একটু আগে অনলাইনে ফটাস করে কেটে ফেলেছে দিল্লি–লন্ডন যাতায়াতের টিকিট। এবার কলকাতা–দিল্লির টিকিট কাটবে। তার পর দেখবে, লন্ডন থেকে নরউইচ যাওয়ার কী ট্রেন আছে।‌
সূর্যকে যারা চেনে, তারা সবাই জানে, এটাই ওর ধরন। একবার রাতে পান খেতে বেরিয়ে পাড়ার ট্রেকার্স ক্লাবের ছেলেদের সঙ্গে দার্জিলিং পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। ‌পরনে পাজামা–পাঞ্জাবি আর কোলাপুরি চটি, মুখে একখিলি মিঠে পান। শীতের জামা–জুতো কিনেছিল দার্জিলিঙে গিয়ে। লোকে আড়ালে ওকে বলে ‘‌ছিটেল’‌। বলে, বড়লোকের অকালকুষ্মাণ্ড ছেলে। বাবা বিখ্যাত ডাক্তার ছিলেন। অনেক টাকা রেখে অকালে মারা গেছেন। ঠাকুর্দারও প্রচুর বিষয়সম্পত্তি, অথচ খাওয়ার লোক নেই। একমাত্র উত্তরাধিকারী সূর্য। ৩২ বছর বয়স হতে চলল, এখনও বিয়ে করেনি। থাকার মধ্যে এক ওই মা। কাজেই ছেলে নির্ভাবনায় দু’‌হাতে পয়সা ওড়ায়।
যদিও কথাটা পুরো ঠিক নয়। সূর্য প্রচুর বেহিসেবি খরচ করে ঠিকই, মাঝেমধ্যে এরকম পাগলামিও একটু–আধটু করে ফেলে, কিন্তু ও ছেলে খারাপ নয়। বরং একটু ছেলেমানুষ। এই বয়েসেও হুজুগে মাতে। এখন যেমন মাথায় চেপেছে, রহস্যের খেঁাজে নরউইচ যাবে। ব্রিটিশ রেল–এর ওয়েবসাইট দেখতে দেখতে উত্তেজনায় হাতে হাত ঘষল সূর্য। লন্ডন থেকে অনেক ট্রেন। একেবারে হিথরো এয়ারপোর্ট থেকে লন্ডনের লিভারপুল স্ট্রিট স্টেশনে স্রেফ একবার ট্রেন বদলে নরউইচ পৌঁছে যাওয়া যাবে। ‘‌ট্রেনলাইন’‌ বলে একটা মোবাইল অ্যাপও খুঁজে পেল সূর্য। চমৎকার। তা হলে সব টিকিট ফোনেই ডাউনলোড করে নেওয়া যাবে। আর কীসের চিন্তা! 

নরউইচ স্টেশনে নেমে চারপাশে দেখল সূর্য। ছোট স্টেশন, কিন্তু সাজানো–গোছানো। আর ঝকঝকে পরিষ্কার‌। এ–‌সব দেশে যেমন হয়। কিন্তু কোনও ফলের দোকান তো চোখে পড়ছে না!‌ চিরকুটে প্রথম ক্লু দেওয়া আছে ‘‌লুক ইনসাইড দ্য বিগ ফ্রুট’‌। সেটা নিশ্চই লন্ডনে নেমে দেখার কথা ছিল না। না কি ছিল?‌ সূর্য ভুরু কুঁচকে ভাবার চেষ্টা করল। লিভারপুল স্ট্রিটে ও যখন ট্রেন বদলাবার জন্যে যাচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছে স্টেশন চত্বরেই একটা ফলের দোকান দেখেছিল!‌ নাকি ওটা ফুলের দোকান ছিল?‌ এই রে, গুলিয়ে গেল সব!‌ মালপত্র নিয়ে সূর্য কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল প্ল্যাটফর্মে। মনে হচ্ছে বোকামি হয়ে গেল!‌ সর্ষেগুঁড়োর কৌটোয় পাওয়া হাতে লেখা একটা চিরকুট পড়ে নাচতে নাচতে কলকাতা থেকে ইংল্যান্ড চলে আসাটা, এখন মনে হচ্ছে উচিত হয়নি!‌
কিন্তু এবার?‌ সূর্য কী করবে এখন?‌ ফিরে যাবে?‌ নাকি অ্যাদ্দুর যখন চলেই এল, একবার ঘুরেই যাবে নরউইচ?‌ খুঁজে দেখবে, কী এমন রহস্য লুকোনো আছে এখানে?‌
একটু চা বা কফি খেতে পারলে ভাল হত। তাতে একটু মাথাটা খুলত বোধহয়। সূর্য বাইরের দরজার দিকে এগোল। খোলা দরজা দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া আসছে শনশনিয়ে। মার্চের শেষের এই সময়টা এত ঠান্ডা বোধহয় থাকে না। কিন্তু এ ‌বছর আছে। ট্রেনে আসতে আসতে দেখছিল সূর্য, ফাঁকা মাঠে, ঘাসের মাথায় যেন পাতলা সাদা চাদর বিছিয়ে রাখা। ফ্রস্ট যাকে বলে। গাছপালার দুলুনি দেখে বুঝতে পারছিল ঝোড়ো হাওয়া চলছে। সত্যি, কোনও মানে হয়, কলকাতার ওই চমৎকার বসন্তের হাওয়া ছেড়ে এই ঠান্ডার মধ্যে এসে পড়ার!‌
দরজা দিয়ে বেরিয়েই একটা কাফে। ঢুকে পড়ল সূর্য। ব্যাগপত্তর নিয়ে কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়াতেই একটা মেয়ে হাসিমুখে হাজির সামনে। সূর্য একটা কফি আর একটা স্যান্ডউইচ অর্ডার দিল। মেয়েটা পিছনে ঘুরে কফিটা বানাচ্ছে। ওর সামনে তাকের ওপর সার সার কাচের গেলাস নানা মাপের। তার মাঝখানে একটা বড়সড় কুমড়ো রাখা।
কেন, কুমড়ো কেন?‌ এখন তো হ্যালোউইনের সময় নয়! সে তো অক্টোবরে। ভাবতে ভাবতে আরেকটু ওপরে চোখ যেতেই সূর্য স্থির হয়ে গেল।‌ ঢোকার সময় ও খেয়ালই করেনি, এই ক্যাফেটার নাম ‘‌পাম্পকিন’‌!‌ ফুর্তিতে সূর্যর হৃৎপিণ্ডটা আধ হাত লাফিয়ে উঠল ভেতরে। অবশ্যই। পাম্পকিন। বিগ ফ্রুট। ‘‌লুক ইনসাইড দ্য বিগ ফ্রুট’‌!‌
মেয়েটা কফির কাপটা ট্রে–তে সাজিয়ে ওর দিকে ফেরার আগেই সূর্য পকেট থেকে পাতলা চিরকুটটা বের করে ফেলেছে। হালকা বেগুনি রঙের কাগজটার ভাঁজ খুলতে খুলতে মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে ধরে সূর্য বলল, ‘‌পারহ্যাপস্‌ ইউ নো সামথিং অ্যাবাউট দিস। আয়্যাম লুকিং ফর দ্য নেক্সট ক্লু।’‌
মেয়েটা নিল না কাগজটা। শুধু এক ঝলক দেখেই পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে হেঁকে বলল, ‘‌স্যাম, সামওয়ান ইজ হিয়ার ফর দ্য ট্রেজার হান্ট।’‌
এর পর যে দশাসই চেহারার বদরাগী দেখতে লোকটা পেছনের ঘর থেকে বেরিয়ে এল, তাকে দেখবে বলে ঠিক আশা করেনি সূর্য। লোকটা কেমন একটা সন্দেহের চোখে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। তাও সূর্য যতটা সম্ভব হাসিহাসি মুখে কাগজটা বাড়িয়ে দিল লোকটার দিকে। বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখাল না লোকটা। ঝুঁপো গোঁফের আড়ালে ঠোঁটটা সামান্য ফাঁক হল। চেহারার সঙ্গে মানানসই একটা কর্কশ গলায় বলল, ‘‌বাট হি ইজ নট দ্য রাইট ওয়ান! হি ইজ এ ট্যুরিস্ট।‌’‌
বলে ফের ভেতরে ঢুকেই যাচ্ছিল লোকটা, এই মেয়েটা তর্ক করার সুরে বলল, ‘‌বাট হি হ্যাজ গট এমা’‌জ নোট!‌’‌
সূর্য বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে। ও ঠিক লোক নয়, এ কথাটার মানে কী?‌ আর ট্যুরিস্ট তো কী হয়েছে!‌ তা হলে কি অন্য কারও আসার কথা ছিল?‌ কে সে?‌ তা হলে এই চিরকুট সূর্যর কাছে গিয়ে পৌঁছল কেন!‌ আর এই এমা–ই বা কে?‌ যার কথা মেয়েটা এক্ষুনি বলল?‌ 
লোকটা তীব্র চোখে তাকিয়ে আছে সূর্যর দিকে। আপাদমস্তক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। রীতিমতো অস্বস্তি হচ্ছে সূর্যর। ওদিকে মেয়েটাও তেরিয়া ভঙ্গিতে তাকিয়ে স্যাম নামে ওই লোকটার দিকে। লোকটা শেষে কাঁধ ঝাঁকাল। যেন, যা হবে হোক, আমার কী!‌ কাউন্টারের পেছনে একটা ড্রয়ার খুলে একটা ছোট ওয়াইনের বোতল বের করে বাড়িয়ে দিল সূর্যর দিকে। সূর্য হাত বাড়িয়ে বোতলটা নিতে আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না স্যাম। ঢুকে গেল ভেতরে। সূর্য নেড়েচেড়ে দেখছে বোতলটা। প্লেনে যে ধরনের ফ্রি ওয়াইন দেয়, সেরকম ছোট মাপের বোতল একটা। মুখে প্যাঁচ আঁটা ঢাকনা। কিন্তু ওয়াইন নয়, বোতলের ভেতরে গোল করে পাকানো একটা কাগজ। সূর্য তাড়াতাড়ি ঢাকনা খুলে কাগজটা বের করল। এবার আর হাতে লেখা নয়, সম্ভবত পুরোনো কোনও টাইপরাইটারে টাইপ করে লেখা একটা লাইন— ‘‌লুক ইনসাইড দ্য গার্লস হেড’‌।
একটু থতমত খেল সূর্য। কোন মেয়ের মাথার মধ্যে দেখতে হবে রে বাবা!‌‌ এই সামনে যে মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে, তার মাথা?‌ নাকি এমা বলে যে মেয়েটার কথা এক্ষুনি জানল, তার?‌ আর মাথার মধ্যে দেখতে হবে মানে কী!‌ কী মানে এই কথাটার?‌ ও তাকাল মেয়েটার দিকে। ‘‌অ্যান্ড হোয়্যার ডু আই ফাইন্ড দিস গার্ল?‌’‌
মুচকি হাসল মেয়েটা। ‘‌সিক অ্যান্ড ইউ উইল ফাইন্ড।’‌
সূর্যও জবাবে হাসল। বোঝাই যাচ্ছে, মেয়েটা আর কিছু বলবে না। সূর্য ধন্যবাদ জানিয়ে, দাম মিটিয়ে ধীরেসুস্থে কফি আর স্যান্ডউইচ নিয়ে নিজের টেবিলে গিয়ে বসল। ঠিক আছে। অন্তত একটা জিনিস বোঝা গেল যে ব্যাপারটা ভাঁওতা নয়। খালি ওই স্যাম লোকটার কথা একটু ভাবাচ্ছে ওকে। কী বলল ও?‌ সূর্য ঠিক লোক নয়। তা হলে ঠিক লোকটা কে?‌ কাকে টেনে আনার জন্যে এত আয়োজন?‌ এটা কোনও স্ক্যাম নয় তো?‌ কিন্তু তা হলে কাউন্টারের মেয়েটা ওরকম মুচকি মুচকি হাসবে কেন!‌ নাকি ওই বদমেজাজি স্যাম আসলে ওর উপকারই করতে চাইছিল!‌
যাক গে, যা হবে দেখা যাবে। স্যান্ডউইচটা শেষ করে কফিতে চুমুক দিয়ে ভাবল সূর্য। এবার একটা ভাল হোটেল খুঁজে নিতে হবে। এই একটাই ভুল করেছে সূর্য, কোনও হোটেল বুক করে আসেনি। অবশ্য অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। কুমড়োর পেট থেকে বাইরে বেরিয়েই সূর্য দেখল সার সার ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে। লাইনের প্রথম ট্যাক্সিটার ড্রাইভার একজন বয়স্ক মানু্ষ। সূর্য তার সামনে গিয়ে হাসল। ‘‌গুড মর্নিং। আয়্যাম লুকিং ফর আ গুড হোটেল।’‌
—‘‌হোয়াট সর্ট অফ হোটেল স্যর?‌ সামথিং মডার্ন, অর দ্য হেরিটেজ টাইপ?‌’‌
ভাবতে সময় নিল না সূর্য। আধুনিক হোটেলে থেকে কী হবে!‌ সব এক ধাঁচের। তার থেকে হেরিটেজই ভাল। 
ভদ্রলোকও যেন খুশি হলেন ওর পছন্দের কথা শুনে। গর্বিত গলায় বললেন, ‘‌হিয়ার ইন নরউইচ, উই হ্যাভ ওয়ান অফ ইওরোপস্‌ ফাইনেস্ট হেরিটেজ প্রপার্টিজ স্যর। দ্য মেইডস্‌ হেড হোটেল।’‌
সূর্য ট্যাক্সিতে উঠতে গিয়ে থমকে গেল। হোটেলের নাম মেইডস্‌ হেড। ওর পকেটেই আছে ওয়াইনের বোতল থেকে বের করে আনা কাগজটা, যাতে লেখা— ‌লুক ইনসাইড দ্য গার্লস হেড!‌

নেহাতই বেকুবের মতো সূর্য দাঁড়িয়ে আছে ‘‌রয়্যাল আর্কেড’‌ নামে এই রঙিন কাচের ছাদ, আর বাহারি নকশা করা মেঝের ছোট্ট শপিং সেন্টারটার বাইরে। ওর ট্রেজার হান্ট হঠাৎই শেষ হয়ে গেল!‌ 
অথচ এ পর্যন্ত সবই নিখুঁত ছিল। মেইডস্‌ হেড হোটেলে চেক ইন করার সময়ই ও দেখিয়েছিল তিন নম্বর ক্লু লেখা কাগজটা। রিসেপশনের ভদ্রলোক মনে হল প্রথমে একটু বিরক্ত হলেন!‌‌ তার পরই এক চিলতে সৌজন্যের হাসি ঝুলিয়ে একটা মুখবন্ধ খাম তুলে দিলেন ওর হাতে। তার ভেতরে চমৎকার সোনালি নকশা করা একটা কার্ডে লেখা— ‘‌গো শপিং!‌ লাইক দ্য কিং ডাজ!‌’‌
কথাটার মানে কী ভাবতে ভাবতে মুখ তুলতেই সূর্য দেখতে পেয়েছিল কাউন্টারের একধারে গোছা করে রাখা ব্রোশিওরগুলো। ‘‌রয়্যাল আর্কেড, নরউইচ’‌। এখানে ঢুকেই দোকানটা দেখতে পেয়েছে সূর্য। দোকানের মাথায় সর্ষেরঙা সাইনবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে— ‘‌কোলম্যানস্‌ মাস্টার্ড’‌। কিন্তু দোকানটা বন্ধ!‌
পেঁয়াজ–খোসা রঙের ফিনফিনে কাগজে নীল কালিতে লেখা চিরকুটটা বের করে আরেকবার দেখছে, উল্টোদিকের খেলনার দোকান থেকে বেরিয়ে এসেছিল মেয়েটা। ‘‌মে আই হেল্প ইউ স্যর?‌’‌
দু’‌আঙুলে চিরকুটটা তুলে ধরে সূর্য খুব উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘‌আর ইউ এমা?‌’‌
না, ওই মেয়েটা এমা নয়। মেয়েটা বলল, এমা ওই কোলম্যানসের দোকানে কাজ করত। এই মেয়েটা চিনত এমাকে। ওই পাতলা বেগুনি কাগজে নীল কালিতে লেখা চিরকুটটা আরও বেশি চেনে ওরা। ওটা ছিল এমার ছেলেমানুষি। মাঝেমধ্যেই কোনও একটা কৌটোর মধ্যে লুকিয়ে এরকম চিরকুট ভরে দিত ও। তবে সেটা স্থানীয় খদ্দেরদের জন্যে। নিছক মজা করে। স্টেশনের ওই ‘‌পাম্পকিন’‌ কাফে, বা ‘‌মেইডস্‌ হেড হোটেল’‌, সবাই চেনে এমাকে। তারাও ওর এই মজার পাগলামিতে তাল দিত। কিন্তু একটা কৌটো যে কী করে সমুদ্র পেরিয়ে কলকাতায় পৌঁছে গেল, সেটাই অবাক করা! আর মেয়েটা আরও অবাক হয়েছে, ওই চিরকুট পেয়ে কেউ ইন্ডিয়া থেকে ইংল্যান্ড চলে আসতে পেরে ভেবে!‌‌
কিন্তু এখন ব্যাপারটা বেশ খারাপ। ওই এমা–র চাকরি গেছে। অবশ্য ও একা নয়, আরও অনেকে চাকরি হারিয়েছে। এই দোকান বন্ধ হয়ে গেছে, এরপর গোটা কোলম্যানস্‌ কারখানাটাই নরউইচ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এখন এই ব্র্যান্ডের যারা মালিক, সেই বহুজাতিক সংস্থা। মেয়েটা খুব বিষণ্ণ মুখে বলল, আসলে ইতিহাস, ঐতিহ্য— সবার কাছে এসবের কদর থাকে না!‌
সূর্য একটু মনখারাপ নিয়েই বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। হঠাৎ একটা কথা মনে পড়তে ওর খুব হাসি পেল। আপনমনে মুচকি মুচকি হাসতে শুরু করল ও। 
—‘‌হোয়াটস্‌ সো অ্যামিউজিং?‌’‌
সূর্য খেয়াল করেনি, কখন ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে খেলনার দোকানের মেয়েটা। হাসিমুখে তাকিয়ে আছে। 
সূর্য বলল, আজকের তারিখটা খেয়াল করো!‌‌ পয়লা এপ্রিল। ‘‌এপ্রিল ফুলস্‌ ডে’‌। আজকের দিনটা তো বোকা বনারই দিন। আমার জন্যে অবশ্য ব্যাপারটা একটু বেশিই দামি হয়ে গেল!‌
মুচকি হাসল মেয়েটা। তার পর বলল, ‌কিন্তু আমি কী ভাবি জানো?‌ এপ্রিলের শুরুটা আসলে বসন্তেরও শুরু। আস্তে আস্তে এই বরফের চাদর সরে যাবে। তার নিচে যে ঘাসফুলেরা ফুটবে বলে মুখিয়ে আছে, তারা রোদ পাবে। পাপড়ি মেলতে শুরু করবে একে একে.‌.‌.‌!‌
হাসিমুখে মাথা নাড়ল সূর্য। হুঁ, আমার দেশেও ফুল ফোটে। এপ্রিলে। ■
 

 

জনপ্রিয়

Back To Top