আজ, ৩০ সেপ্টেম্বর অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন। তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে বই ‘‌অজিতেশ’। ভবেশ দাশ সম্পাদক, প্রকাশক পরম্পরা। বইয়ের ‘‌সূচনাকথা’‌ লিখেছেন শঙ্খ ঘোষ। লেখাটি পুনর্মুদ্রণ করা হল।

শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় একবার (‌১৯ জানুয়ারি, ২০১১)‌ বলেছিলেন:‌ ‘‌যে অজিতেশ সব সময়ে লিখতেন, লেখাকে অত গুরুত্ব দিতেন তাঁর সে সব লেখা কোথায় গেল, কোথায় যাবে আমি জানি না। কষ্ট হয়।’‌ এরই প্রায় সমসময়ে দু–‌একটি তাঁর রচনা–‌সঙ্কলন প্রকাশিত হয়েছে অবশ্য, তবে ওই কষ্টের তাতে লাঘব হওয়ার কথা নয়। কেন না তার বাইরে অনেক লেখার যে হদিশ নেই অনেকদিন, এরকম একটা আক্ষেপ আমাদের থেকেই যায়। বিশেষত, জীবনের একেবারে শেষদিকে, শেক্সপিয়র অভিনয়ের ইচ্ছেয় যে রূপান্তর করেছিলেন The Tempest‌ নাটকটির— শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়কে অংশত যা পড়েও শুনিয়েছিলেন তিনি— কোথায় গেল তার পাণ্ডুলিপি?‌
এমন সব অভাববোধের মধ্যে কিছুদিন আগে হঠাৎ শ্রীমতী রত্না বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে অজিতেশের কিছু লেখার খোঁজ পেয়ে আমরা অনেকেই বেশ আলোড়িত হয়ে উঠি। কেননা সে সব কাগজপত্রের মধ্যে এমনও কিছু আছে যার কোনও অস্তিত্বই আমাদের জানা ছিল না। একটি যেমন:‌ একবৃত্ত নামে অল্প বয়সে লেখা তাঁর একটি মৌলিক নাটক। সম্প্রতি শূদ্রক (‌শারদীয় ২০১৬)‌ পত্রিকায় দেবাশিস মজুমদার সেটি প্রকাশ করেছেন বলে ভাল লাগছে। আর এখন, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সর্বাত্মকভাবে জানবার জন্য ভবেশ দাশ এই যে সঙ্কলনটির সম্পাদনা করছেন, তারও মধ্যে রইল এমনই আরেকটি বইয়ের পূর্ণপ্রকাশ:‌ সংরক্ত চিত্রমালা, একটি কবিতার বই।
যে অজিতেশ সওদাগরের নৌকা বা হে সময়, উত্তাল সময় লিখেছেন, যে অজিতেশ শাহি সংবাদ, তিন পয়সার পালা বা ভালোমানুষ–‌এর মতো রূপান্তরগুলিতে বিস্ময়কর ভাবানুবাদ করেছেন গানের, তিন পয়সার পালা–‌য় মহীনের শেষ দীর্ঘ গদ্য–‌সংলাপটিকে (‌‘‌দীর্ঘদিন, অতি দীর্ঘদিন.‌.‌.‌ আজ আমি সকলের ক্ষমা ভিক্ষা করি’‌)‌ যিনি নিখুঁত অক্ষরবৃত্তে সাজিয়ে রেখেছেন, আর যিনি কখনও কখনও কোনও পত্রিকায় তাঁর দু–‌চারটি কবিতার প্রকাশও করেছেন, তাঁর কিছু কবিতার এই মুদ্রণ হয়তো তেমন কিছু বড় খবর নয়। তবে বড় খবর এইটে যে, এই সঙ্কলনটির নাম থেকে শুরু করে সূচিপত্রসুদ্ধ লেখাগুলিকে সাজিয়ে রেখেছিলেন তিনি নিজেই, প্রকাশিতব্য এক পাণ্ডুলিপি হিসেবে। এতদিন পরে তার প্রকাশ সম্ভব হল।
শিল্পের অন্য নানা জগতে যাঁরা প্রতিষ্ঠা পান, নানা সময়ের খেয়ালে লেখা তাঁদের কিছু কবিতাও একত্রবদ্ধ করবার আয়োজনটা নতুন কিছু নয়, অনেকের বেলাতেই এমন ঘটেছে। কিন্তু এই সংরক্ত চিত্রমালা তার চেয়ে ভিন্ন চরিত্রের। লেখাগুলি পড়ে বোঝা যায় যে এ তাঁর অবসর বিনোদন মাত্র নয়, এ তাঁর ব্যক্তিত্বের এক অপরিহার্য প্রকাশ। ১৯৭২ সালের ২৪ জুন শিলঙের বাসে যেতে যেতে ছ’‌টি কবিতা লিখে ফেলা, কিংবা ১৯৭৩–‌এর ১৩ ফেব্রুয়ারি ‘‌রাঁচি থেকে হাটিয়ার রেল লাইনের পাশের মাঠে বসে সব পর পর একসঙ্গে’‌ আঠারোটি লেখা, এ আমাদের বুঝিয়ে দেয় এমন একটা সৃষ্টি–‌আবেগের কথা, যা খুব সুলভ নয়। সে লেখার সঙ্গে আছে এমন সব লাইন— কোনও ফুলের বর্ণনায়:‌ ‘‌ঘাসফুলের আত্মীয় বোনের মতো ছোট্ট ফুল’‌ কিংবা পর্বতের উদ্দেশে:‌ ‘‌আমি ঘর ছেড়ে/‌তোকে নিয়ে থাকতে পারি/‌সারাটা জীবন/‌তোর মোরগফুল/‌চুলের মুকুট নিয়ে/‌আমি শুয়ে থাকতে রাজি আছি/‌অন্তিম কবরে।’‌ ব্যক্তিগত তাপে ভরা এই লেখাগুলিতে আছে তাঁর মা–‌বাবার ছবি, প্রেমের আবেশ, সমকালীন দেশের চারপাশ, তাঁদের নিজস্ব নাট্যচর্চারও দৈনন্দিন সুখদুঃখ, ব্যর্থতা–‌সফলতা। ভাষা কোথাও নিবিড় হয়ে আসে, কোথাও বা বিদ্রূপে ঝলমলে, কিছু বা কখনও ব্রেখ্‌টীয় চিহ্ন নিয়ে দেখা দেয়, এমনকী সরাসরি ব্রেখ্‌ট থেকে দুটি অনুবাদও এর অন্তর্গত। সংরক্ত চিত্রমালা এর বেশ যোগ্য নাম।
অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে নানাজনের স্মৃতি আর বিচার–‌বিশ্লেষণের এই সংগ্রহটিতে এমন একখানা কবিতার বইকেও যুক্ত করে নিয়ে সম্পাদক নিশ্চয়ই তাঁর ব্যক্তিত্বের আরও একটা দিকের ইশারা দিতে চাইছেন, দিতে পারছেন। শুধু এই সংরক্ত চিত্রমালা-তেই নয়, এ সঙ্কলনে মুদ্রিত রত্না বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিস্মৃতিতেও অজিতেশের এমন একটা আত্মত্যাগশীল পরোপকার–‌ব্রতী মূর্তি জেগে ওঠে যার পরিচয় অনেকেরই অজানা।

নিতান্তই অল্প কয়েকটা দিন, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ ঘটেছিল আমারও। কিন্তু সেইটুকু সময়ের মধ্যেই তাঁর সরল প্রবল ব্যক্তিত্বের অভিঘাত, তাঁর চঞ্চল উৎসুক প্রতিমুহূর্তের সৃষ্টিশীলতার আবেগ— আরও অনেকের মতো আমাকেও একটা মুগ্ধতায় ভরে রেখেছে আজও পর্যন্ত।
১৯৬৫ সালের সূচনার দিকে একদিন মুক্তঅঙ্গনে দেখতে গিয়েছি, নান্দীকারের মঞ্জরী আমের মঞ্জরী। এর আগে এই গোষ্ঠীর নাট্যকারের সন্ধানে ছ’টি চরিত্র দেখে ভাল লেগেছিল, উপস্থাপনায় আর ভাবনায় বেশ একটা নতুন স্বাদ মিলেছিল। কিন্তু মঞ্জরী আমের মঞ্জরী, তার নাম আর রূপান্তরণ থেকে শুরু করে তার পরিচালনা আর অভিনয় পর্যন্ত একেবারে আপ্লুত করে দিল আমাদের। নাটক শেষ হয়েছে, ছোট্ট ওই নড়বড়ে প্রেক্ষাঘর থেকে (‌ঠিক ঘর যদিও বলা যায় না তাকে)‌ দর্শকেরা বেরিয়ে গেছেন সবাই। আমরা তিন–‌চারজন দাঁড়িয়ে আছি মঞ্চের ঠিক নিচে, আমাদের প্রতিক্রিয়া বুঝবার জন্য পাটাতনের ধারে এসে বসে আছেন উৎকণ্ঠিত অজিতেশ, কেন না তাঁর মাস্টারমশাই চিত্তরঞ্জন ঘোষ আছেন আমাদের সঙ্গে। সকলের কথা শুনে স্পষ্টতই যখন বেশ খুশি তিনি, অতি–আবেগের বশে আমি বলে ফেলেছিলাম:‌ ‘‌শম্ভু মিত্রও কি পারবেন এরকম?‌’‌ শুনে, সঙ্গে সঙ্গেই জিভ কেটে, দু’‌হাতে দু’‌কান চেপে ধরে বলে উঠেছিলেন অজিতেশ:‌ ‘‌ছি ছি, বলবেন না ওরকম, এ কথা শোনাও আমার পাপ।’‌
মুহূর্তের উত্তেজনায় এরকম অনেক আলটপকা মন্তব্য করে বসি ঠিকই, কিন্তু আমার দিক থেকে ও কথাটার একেবারেই যে কোনও ভিত্তি ছিল না তা নয়। কলকাতার বাইরের একটা গ্রামচরিত্র তার শ্রেণিবোধের বাস্তবে, তার ভাষাগত যাথার্থ্যে আর তার শারীরিক বিভঙ্গে এমন একটা বিপুলতা নিয়ে পৌঁছেছিল ছোট ওই মঞ্চখানিতে, অভিনয়ের দিক থেকেও যাকে একটা নতুন দিশা বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু অজিতেশের সঙ্গে মুখোমুখি হবার সেই মুহূর্তটা আমার যে এতটা মনে থেকে গেছে, তা কেবল সেই জন্যই নয়। আমার চোখে উজ্জ্বল হয়ে আছে তাৎক্ষণিক স্বতঃস্ফূর্ত সেই বিনয়মুদ্রাটুকু, তাঁর সেই আন্তরিক শ্রদ্ধারূপের প্রকাশ।
এ ঘটনার বছর দেড়েক পরে, শম্ভু মিত্র আর অজিতেশের এক ঘরোয়া সংলাপের সামনে ছিলাম ঘটনাচক্রে। আমাদের শ্যামবাজারের আস্তানা থেকে দেবতোষ আর শম্ভু মিত্রকে নিয়ে চলেছি ফড়েপুকুরের কাছে এক গলির দোতলায়, অজিতেশ সেখানে থাকেন তখন। দরজা খুলেই তাঁর শ্রদ্ধেয় সেই আগন্তুককে দেখে অজিতেশের গোটা শরীরে যে উদ্ভাস দেখেছিলাম, আজ ঠিক পঞ্চাশ বছর পরেও তা যেন প্রত্যক্ষ করতে পারি। ঘরে ঢুকিয়ে, একটা মাদুর বিছিয়ে নিয়ে তার ওপরে বসিয়ে, শুরু হল কথার স্রোত। সে কথা কেবল নাট্যস্বপ্নের। ঘরের মধ্যে, তার পরে উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতার দিকে চলন্ত ট্যাক্সিতে, বইতে লাগল সেই স্রোত। তখন নান্দীকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ যে কেবলই তাঁদের নির্ভর বিদেশি নাটকের ভাবানুবাদের ওপর। শম্ভু মিত্র সে অভিযোগ করেননি যদিও, তবু যেন অলক্ষ্য কোনও দূরবর্তী সমালোচকের উত্তর দিয়ে চলেছেন তিনি। ‘‌সবাইকেই তো বলি ভাল একখানা নাটক লিখে দিতে, আন্তরিকভাবেই বলি, কিন্তু দেয় না তো কেউ সেটা’‌:‌ এই যে–কথাটা শম্ভু মিত্রকেও বলতে শুনেছি অনেকবার, সেইটেই বলছেন (‌প্রায়ই বলতেন)‌ অজিতেশ। কিন্তু সেই সঙ্গেই বলছেন:‌ বিদেশ থেকে নেওয়া এই নাট্য–‌অভিজ্ঞতাগুলি আমাদের চলতি নাট্যজগতে নতুন কোনও বোধের দিকে নতুন কোনও পরীক্ষার দিকে এগিয়ে নিতে পারে না কি?‌ নিছক অনুবাদেই থমকে না থেকে যদি তাকে মিলিয়ে দেওয়া যায় নিজেদেরই প্রতিবেশের মধ্যে?‌ এই সূত্রেই সে–দুপুরে ওঁদের পারস্পরিক কিছু কথা চলছিল ব্রেখ্‌ট নিয়ে, সে বিষয়ে তাঁর নিজস্ব কিছু ভাবনা নিয়ে কথা বলছিলেন শম্ভু মিত্র, এর অল্প কিছুদিন আগে যে–বিষয়ে তিনি লিখেওছিলেন তাঁর অনুভবের কথা। ব্রেখ্‌ট মঞ্চস্থ করবার কথা ভাবেননি তিনি। কিন্তু তাঁকে নিয়ে চর্চা যে দরকার, সেটা বেশ প্রত্যয় নিয়েই বলছিলেন সেদিন, বলছিলেন তাঁর নাট্যতত্ত্বের চেয়েও বেশি দরকার তাঁর জীবনদৃষ্টিকে বোঝা। অজিতেশের তিন পয়সার পালা এর কয়েক বছর পরের ঘটনা।
পনেরো মিনিট বা পঁয়তাল্লিশ মিনিট নয়, এর পরে একটানা আটাশ ঘণ্টা অজিতেশের সঙ্গ পাওয়ার একটা অভিজ্ঞতা হল ১৯৭৫ সালে। এক গাড়িতে কয়েকজনে মিলে বনগাঁ যাওয়া, সেখানে নিরুপায় নির্ঘুম রাত্রিবাস, পরদিন সকালে অবিন্যস্ত এক সভায় রত্নার গান আর অজিতেশের কিছু কথা আর আবৃত্তি:‌ এর হালকা গল্পাংশ নিয়ে আগে একবার লিখেছি। গোটা পথটা জুড়ে, আর তারপর নির্ধারিত রাত্রিনিবাসে মশার হামলা থেকে বাঁচবার জন্যে অগত্যা–‌জাগরণে, অজিতেশের বিরতিহীন কথা শুনে যাওয়াটা আজ স্বপ্নের মতো মনে হয়। কেন ‘‌রঙ্গনা’‌ নিতেই হয় নিয়মিত অভিনয়ের পেশাদারি দায়ে, কেন সিনেমাতেও কাজ করতে হল একই সঙ্গে সংসার আর দল চালাবার গরজে, এ সব কথা সে সময়ে বলছিলেন যখন, তখন কিন্তু ঘুণাক্ষরেও বুঝতে দেননি যে দলের মধ্যে এ নিয়ে কত টালমাটাল চলছে, বুঝতেও পারিনি নিজের তৈরি দল থেকে তাঁর নিষ্ক্রমণ কত আসন্ন। ফুর্তিভরা মেজাজে ইছামতীর তীরে বসে শেষ রাতে তিনি বরং বোঝাচ্ছেন টলস্টয়ের মহিমা। মনে আছে এর অল্প কিছুদিন আগে উত্তেজিত কেয়াও একবার এসে বলছিল নতুন করে টলস্টয়ে মথিত থাকবার কথা, আর আমি ভাবছিলাম নিশ্চয় রেজারেকশন নিয়েই সেই আবেগ। কিন্তু না, অজিতেশ তখন বোঝাচ্ছেন, পাওয়ার অফ ডার্কনেস–‌এর কথা, কিছুদিনের মধ্যেই যা পৌঁছবে তাঁর পাপপুণ্য নাটকে। অভিনয়–মুহূর্তে পাপপুণ্য–‌র সেই ‘‌ডার্কনেস’‌–‌এর অভিঘাত কত দুঃসহ হতে পারে বলে ভাবতেন অজিতেশ, ১৯৮১ সালের ২৬ মে তারিখে আমাকে লেখা তাঁর একখানি চিঠি থেকে তা আন্দাজ করা যায়। নান্দীকার বা নান্দীমুখের কোনও নাটক দেখবার সময়ে আমাদের মেয়ে দুটিও অনেক সময় থাকত সঙ্গে। কিন্তু এ নাটক তাদের দেখাতে চান না, এই অগ্রিম সতর্কবার্তা জারি করে একটা আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছিলেন তিনি।
কথা উঠেছিল তিন পয়সার পালা নিয়েও। ‘‌ব্রেখ্‌টের নাট্যতত্ত্ব বোঝাবার জন্য তো ব্রেখ্‌ট করিনি’‌— এ কথাটা যেন বলছিলেন একটা কৈফিয়ত দেবার ধরনে। আমার কাছে সে কৈফিয়তের অবশ্য দরকার ছিল না কিছু, কেননা আমিও তিন পয়সার পালা বা ভালোমানুষ–‌এর মতো নান্দীকারের সৃষ্টিগুলিকে বিশেষ কোনও রীতি প্রকাশের বা 'A‌-effect'‌–‌এর দিক থেকে ভাবতে চাইনি। আমার বরং অনেক বেশি সফলতার বোধ জেগেছিল যখন ‘‌রঙ্গনা’‌য় দলে দলে ভালোমানুষ দেখতে যাচ্ছিল শ্যামবাজার অঞ্চলের বস্তিবাসী মেয়েরা, আর কেয়াকে নিয়ে বলতে পারছিল:‌ ‘‌উনি তো আমাদের কথাই বলেন, আমাদের জন্যেই বলেন।’‌ হয়তো ১৯৬৫ সালে লেখা শম্ভু মিত্রের এই কথাগুলিও একটা সাহস দিচ্ছিল যে ‘‌ব্রেখ্‌টকে ভালো লাগলে নিজের সহজ বুদ্ধিতেই তাঁর নাটককে করবার চেষ্টা করবেন, বা দেখবেন। তাতেই ব্রেখ্‌টকে ঠিক বোঝা যাবে। কারণ তিনি মানবিক।’‌ সেই সহজতার প্রকাশের দিক থেকে আমরা অনেকেই তখন তিন পয়সার পালা–‌কে বড় একটা মুক্তি–আভাস হিসেবেই দেখছিলাম:‌ আঁটোসাঁটো গড়ন থেকে মুক্তি, নাচে–গানে হুল্লোড়ে শারীরিক অভিনয়ের একটা মুক্তি, কোনও অবজীবনের স্তর থেকে গোটা সমাজকে নতুন চোখে দেখবার মুক্তি। তিন পয়সার পালা–‌তে পৌঁছেই মনে হয়েছিল বাংলা থিয়েটারে একটা নতুন সময়ের সূচনা হতে চলেছে। আমরা ততদিনে পেয়ে গিয়েছি শম্ভু মিত্রের ভাষায়— ‘‌আগামী যুগের অনন্য অ্যাক্টরকে’‌। অভিনয়কলার দিক থেকে, শম্ভু মিত্রের অন্তর্ভেদী নাগরিক চারুতা আর উৎপল দত্তের বিস্ফোরক সামাজিক প্রখরতার পাশাপাশি অনন্য এই অভিনেতাটি তুলে এনেছিলেন স্বতঃস্ফূর্ত এক গ্রামীণ স্বাচ্ছন্দ্যের আদল, যার প্রকাশ ঘটত যেন এক দানবিক প্রবলতার মধ্য দিয়ে, অনেকেই যাকে যথার্থভাবে বলেছেন ‘‌প্যাশন’‌।

এমন একজন শিল্পীকে নিয়ে এতদিন কোনও কথাবার্তাই যে হয়নি তা নয়। গুণী মানুষেরা অনেক সময়েই তাঁর মূল্যায়ন করেছেন তাঁদের লেখায় বা সাক্ষাৎকারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই একটা অভাববোধ আমাদের অনেকের মধ্যেই ছিল যে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা সর্বাঙ্গীণ পরিচয় নিয়ে তেমন কোনও সংগ্রহ গড়ে ওঠেনি। হয়তো সেই বোধ থেকেই, ভবেশ দাশ— এক সময়ে তাঁর স্কুলে–‌পড়া ছাত্র— প্রায় যেন গুরুদক্ষিণা হিসেবেই মেনে নিয়েছেন এই সঙ্কলনটির দায়। যত্নে–বিন্যস্ত এ বইয়ের সব লেখাই যে নতুন তা অবশ্য নয়। কয়েকটি আছে পূর্বপ্রকাশিত, কয়েকটি এমনও আছে যা তরুণ গবেষক মলয় রক্ষিত গ্রন্থন করে দিয়েছেন কারও বিভিন্ন লেখা বা সাক্ষাৎকার থেকে (‌রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত বা শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফিচার দুটি যেমন)‌।
‌পাঠকেরা এই বইটি থেকে হয়তো দেখতে পাবেন, কীভাবে কুলটি স্কুলের পড়াশোনা সাঙ্গ করে নাটকপাগল দৃপ্ত এক দীর্ঘদেহী যুবা কলকাতায় এসে পৌঁছচ্ছেন মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী কলেজের ছাত্র হয়ে, পাতিপুকুরের এক বস্তিতে থেকে কীভাবে সর্বক্ষণের কর্মী হয়ে উঠছেন কমিউনিস্ট পার্টি বা গণনাট্য সঙ্ঘের, কীভাবে পরে স্কুল-শিক্ষকতাকেও করে তুলছেন তাঁর সমাজবোধ আর শিল্পকাজেরই একটা অঙ্গ, দেশ‌বিদেশের সাহিত্য আর রাজনীতি বিষয়ে অক্লান্ত সেই পড়ুয়া মানুষটি কীভাবে মেতে উঠছেন নাটক রচনায় বা বিদেশি নাটকের রূপান্তরকাজে, কীভাবে সাতাশ বছর বয়সে গড়ে তুলছেন নতুন জোরালো এক নাট্যদল, অনুবাদক হিসেবে সংগঠক হিসেবে পরিচালক হিসেবে অভিনেতা হিসেবে কীভাবে মস্ত এক স্বাতন্ত্র‌্যে প্রতিষ্ঠিত করছেন নিজেকে আর তাঁর দলকে, আবার কীভাবে একাও হয়ে যাচ্ছেন তিনি। একটি ন–‌দশ বছরের ছেলেকেও জীবনের পাঠ দেওয়া যায় পথ চলতে চলতে, তাকে শেখানো যায় কীভাবে পড়তে হয়, লিখতে হয়, উচ্চারণ করতে হয়;‌ একটি কোনও সাধারণ কুণ্ঠিত মেয়েকে কীভাবে অসামান্য এক শিল্পী করে তোলা যায়, তেমন সব উদাহরণের পাশাপাশি আমরা এখানে দেখব এমন একজন অভিনেতাকে যিনি কেবলই পথচলতি জীবনের দিকে লক্ষ্য রেখে বুঝে নিতে চান সাধারণ মানুষজনের ঠিক ঠিক চলনবলন, কেননা তিনি দূর করতে চান তাদের সঙ্গে অভিনেতাদের মানসিক বা বাচনিক দূরবর্তিতা। এখানে এমন একজন নিতান্ত ব্যক্তিগত মানুষেরও দেখা পাব, যিনি সকলের অগোচরে নিজেরই দায় হিসেবে প্রতিপালন করতে পারেন কোনও অনাত্মীয় জেলবন্দির পরিবারকে, কিংবা যিনি আকস্মিক সাহায্যপ্রার্থিনী এক অচেনা মহিলাকে তাঁর জটিল জীবনসঙ্কট থেকে মুক্তি দেবার চেষ্টা করতে পারেন সর্বতোভাবে।
প্রগাঢ় অনেক বিচার–‌বিশ্লেষণের পাশাপাশি এ বইয়ের অন্তর্গত দু–‌একটি লেখায় এমনও বর্ণনা আছে:‌ অজিতদা তাঁর একটা অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। তিনি তাঁর আইপিটিএ–‌র হয়ে গ্রামে নাটক করতে গেছেন:‌ ‘‌আমরা তো খুব গরম গরম লেকচার দিচ্ছি। দেখি একটা লোক সমানে আমার পায়ের দিকে চেয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলাম, কী দেখছেন?‌ আমার পায়ের একটা আঙুল কেটে গিয়েছিল। লোকটা সেইদিকে দেখিয়ে বলল, ‘‌বাবু, কেটেকুটে গেলে আমরা গাবগাছের আঠা লাগাই;‌ আপনারা কী লাগান?‌’‌— অজিতেশ হাতে তালি মেরে বললেন, ‘‌ব্যস, বুঝে গেলাম, এতক্ষণ যা বলেছি, সব ফালতু। লোকটাকে আমি চিনি–‌ই না।’‌
.‌.‌.‌ একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘‌তুমি গল্প লেখো। একজন চাষি আধপেটা খেয়ে থেকে কীভাবে তার বউকে আদর করে তুমি কল্পনা করতে পারো?‌ লিখতে পারবে?‌’‌ (‌পৃ.‌ ১৩৬)‌
কিংবা অন্যত্র:‌
একদিন সকালে দেখি হাঁটু মুড়ে বসে খোঁচা খোঁচা দাড়ি রুগ্‌ণ এক বয়স্ক ফেরিওলার সঙ্গে তার ব্যবসার সুখ–‌দুঃখের কথা, সংসার এবং যা রোজগার করে সে, তাই দিয়ে তার ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার চলে যায় কিনা— এইসব জিজ্ঞাসা করছেন।.‌.‌.‌
.‌.‌.‌ বলতেন, ‘‌.‌.‌.‌ এরা সব আমার জীবনের জীবন্ত চরিত্র। এদের কাছ থেকেই তো আমি চরিত্রচিত্রণের রসদ খুঁজে পাই।’‌ (‌পৃ.‌ ৯৯)‌
পড়তে পড়তে আমার স্মৃতিতে ভেসে আসে ‘‌শ্রমিক অভিনেতাদের উদ্দেশে’‌ লেখা ব্রেখ্‌টের দীর্ঘ সেই কবিতা, যার মধ্যে শুনি:‌
তোমার শেখার শুরু হোক
বেঁচে থাকা মানুষের কাছে। তোমার প্রথম স্কুল হোক
তোমারই কাজের জায়গা, বাসস্থান, শহরের যে অঞ্চলে থাকো তুমি,
পথঘাট, দোকানপসার। দেখো সব লোকজন
লক্ষ করে দেখো, পরিচিতদের দেখো অপরিচয়ের চোখ দিয়ে
অজানাকে জেনে নাও যেন তারা খুবই জানা লোক।
কেন না,
যে শুধু নিজেকে দেখে সে কখনো মানুষ জানেনি।‌‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top