অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: ছবির শুরুর দিকেই এক বউ পালানোর দৃশ্য আছে। বিয়ের সাজে ছুটে পালিয়ে যাচ্ছে সেই মেয়েটি। কিন্তু এ ছবির আসল যাত্রা শুরু হয়েছে তার আগেই। যে যাত্রার নায়ক এক লরি। সেই লরিতে আছে দুই চরিত্র। এক যুবক—ছোটু (‌অমর্ত্য রায়)‌। সেই লরির চালক। অন্য একজন বিন্দি (‌সুদীপ্তা চক্রবর্তী)‌। এই লরির মালিক তার বর। কিন্তু বরের অত্যাচার যখন চরমে, তখন ভাইয়ের মতো ছোটুকে নিয়ে সে ঘর ছেড়ে পালায় লরি নিয়ে। ছোটু আসলে এই লরির হেল্পার। কিন্তু এই পালিয়ে বাঁচার যাত্রায় ছোটুই এখন লরির ড্রাইভার।
এই পালিয়ে বাঁচার যাত্রায় বিয়ের আসর ছেড়ে পালিয়ে আসা মিনুকে (‌রাজনন্দিনী পাল)‌ সঙ্গী করে নেয় বিন্দি। জবরদস্তি বিয়ে থেকে পালিয়ে মেয়েটি আসলে যেতে চায় তার ভালবাসার মানুষের কাছে। ‘‌ভালবাসার মানুষের’‌ কাছ থেকে অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে পালিয়ে যাওয়া বিন্দি-‌ই পাশে দাঁড়ায় ভালবাসার কাছে যেতে চাওয়া মিনুর। সত্যিই কি ভালবাসার সেই মানুষটার কাছে মিনুকে পৌঁছে দিতে পারবে বিন্দি আর ছোটু?‌ লরি পথ পাল্টে চলতে থাকে। মাঝপথে পুলিসের তাড়া আছে।  এবং আর এক নারীর সঙ্গে দুর্ঘটনাচক্রে দেখা হওয়ার দৃশ্য আছে। ওই নারী এক বৃদ্ধা। সাবিত্রী (‌চিত্রা সেন)‌। ঘটনাচক্রে সাবিত্রীও এই লরির যাত্রী হয়ে ওঠেন।
এই যাত্রায় যুক্ত হয় নানান অনুষঙ্গ। পুরুষের আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা। পুরুলিয়াকে অন্যরকমভাবে উপস্থাপন করেছেন পরিচালক। এক ঝলমলে, উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত পুরুলিয়া। ছৌ নাচকে ছবির কাহিনীর সঙ্গেও সুন্দর মিশিয়েছেন তিনি। দোলের দিনে রঙ খেলার দৃশ্যটিও খুব সুন্দরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে ছবির সঙ্গে যেখানে উৎসব আর সাসপেন্স মিলেমিশে যায়।
এই ছবির একজন নায়ক অবশ্যই লরি। কিন্তু সেই লরিকে কেন্দ্রে রেখে তিন নারীর নতুন জীবনের সন্ধানকেই স্পষ্ট করে তুলেছেন নবীন পরিচালক অভিষেক সাহা। কিন্তু তথাকথিত নারীবাদী ছবি নয় ‘‌উড়ণচন্ডী’‌। ছোটু তো নারী নয়, পুরুষ। আর, ওই কালী সেজে যে দাঁড়ায় নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পাশে, সেও তো পুরুষ-‌ই।
সৌমিক হালদারের ক্যামেরা এই ছবির বড় সম্পদ। সঙ্গীত পরিচালনায় নতুন দেবজ্যোতি মিশ্রকে আবিষ্কার করা যাবে। তন্ময় চক্রবর্তীর শিল্প নির্দেশনা এবং সুজয় দত্তরায়ের সম্পাদনা প্রশংসনীয়।
এ ছবির নায়িকা বিন্দি তথা সুদীপ্তা চক্রবর্তী। সুখে, দুঃখে, রাগে, অপমানে সুদীপ্তার অভিনয় অনবদ্য। মুগ্ধ করেছেন নবীন অভিনেতা অমর্ত্য রায়। আবাঙালি ছোটুর চরিত্রে অমর্ত্যর অভিনয় এতটাই স্বাভাবিক যে প্রশংসা না করে পারা যায় না। মিনুর চরিত্রে নবীনা রাজনন্দিনী ভাল অভিনয় করেছেন। বহুদিন পরে সিনেমায় চিত্রা সেনকে পাওয়াটা একটা বড় প্রাপ্তি। কিছুটা মঞ্চ-‌ঘেঁষা অভিনয় হলেও, উড়ণচন্ডীদের দলে তাঁর ঢুকে পড়ার ধরণ ও ভঙ্গী মন ছুঁয়ে যায়।
স্বাগত অভিষেক
নবীন পরিচালক অভিষেক সাহা। ফর্মুলার বাইরে গিয়ে নতুন ভাবনা নিয়ে ছবি করার সাহস দেখিয়েছেন তিনি প্রথম ছবিতেই। সুদীপ দাসের চিত্রনাট্য তাঁকে সাহায্য করেছে। ফর্মুলা নয়, ড্রয়িংরুমে ডিজাইনার পোশাক নয়, ঘরে আটকে পড়া নয়, রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছেন অভিষেক সুন্দর একটা গল্পকে সঙ্গী করে। ছবিতে কোথাও কোথাও হয়ত মুখে ঘটনা বলার চেয়ে ফ্ল্যাশব্যাক ব্যবহার আরও অর্থপূর্ণ হতে পারত। কিন্তু অভিষেক হয়ত ইচ্ছে করেই পুরনো গল্প নয়, নতুন পথের কথাই বলতে চেয়েছেন বেশি করে। প্রথম ছবিতে যথেষ্ট ভরসা দিলেন অভিষেক সাহা। তাঁকে স্বাগত।
অভিনন্দন প্রসেনজিৎ
নতুন পরিচালকদের নতুন ভাবনার ছবির পাশে দাঁড়ানোর মতো প্রযোজকের অভাব আছে এখানে। অভিষেকের মতো নতুন পরিচালকের পাশে দাঁড়িয়ে আর একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, প্রযোজক হিসেবে। ফর্মুলার বাইরে হাঁটা এক নতুন ছবির পাশে প্রযোজক হিসেবে সর্বতোভাবে দাঁড়িয়ে তিনি। ‘‌উড়ণচন্ডী’‌র জন্যে তাঁকে অভিনন্দন।
এবং কালী
এ ছবিতে বহুরূপী কালীরও একটা ছোট্ট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। এই কালীর চরিত্রে অল্প অবকাশেই দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন সতীশ সাউ। বাংলা মঞ্চের এই দক্ষ অভিনেতাকে মাঝে মাঝেই সিনেমায় দেখা যায় ছোট-‌খাটো চরিত্রে। সেখানেও সতীশের দক্ষতা চিনে নেওয়া যায়। এই মুহূর্তে ক্যানসারের সঙ্গে লড়ছেন সতীশ। সেই যুদ্ধে জয়ী হোন সতীশ। আমাদের শুভেচ্ছা ও প্রার্থনা। ‘‌উড়ণচন্ডী’‌ টিমের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য তো সতীশের ‘‌মা কালী’‌, যিনি এই যাত্রাপথের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে উড়ণচন্ডীদের সহায় এবং সঙ্গী।‌

জনপ্রিয়

Back To Top