দ্বৈপায়ন দেব
●‌ তুমহারি সুলু। পরিচালনা:‌ সুরেশ ত্রিবেণী। অভিনয়ে:‌ বিদ্যা ব্যালন, মানব কাউল, নেহা ধুপিয়া, বিজয় মৌর্য।


বদলে যাওয়া বিনোদন দুনিয়া। আর তাতে খাপ খাইয়ে নিতে বদল গৃহকোণে। ‘‌জেন্ডার পলিটিক্স’‌গুলোর চেহারায় পরিবর্তন আসা।
এই নিয়েই সুলু মানে গৃহবধূ সুলোচনার জগতে তোলপাড়। গৃহিনীর ঘরকন্না থেকে ‘‌রেডিও জকি’‌র জীবনে প্রবেশ ক‌রে। এফ এম চ্যানেলে এক ‘‌লেট নাইট  চ্যাট শো’‌ পরিচালনা করে সে। আর সেই অনুষ্ঠানেরই নাম ‘‌তুমহারি  সুলু’‌। বেসরকারী ওষুধ ফার্মে কাজ করা স্বামী অশোকের অফিসের ডামাডোল সুলোচনাকে বাধ্য করে চাকরি খোঁজায় নামতে। চাকরি নেওয়ার ইচ্ছে তার আগেই ছিল অবশ্য। তখন ছেলে–‌আর–‌একটু–‌বড়–‌হোক–‌জাতীয় সাংসারিক বিধিনেষেধ মেনে সে চাকরি খোঁজেনি। কিন্তু এখন অশোকের (‌মানব কাউল)‌ চাকরির অনিশ্চয়তা সুলোচনাকে (‌বিদ্যা বালন)‌ পুরোনো ইচ্ছার দিকে ঠেলে দেয়। সে চাকরি পায় রেডিও জকির। অশোক আর্থিক পরিস্থিতির কথা ভেবে তা ঢোক গিলে খানিকটা মেনেও নেয়। 
সন্দেহ নেই, এই যে মধ্যবিত্ত গৃহবধূর গৃহকোণের আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে চাকরির জগতে প্রবেশ ও প্রতিষ্ঠা–‌এর ভেতরে সত্যজিৎ রায়ের ‘‌মহানগর’‌ অনেকখানি ছায়া ফেলে রেখেছে। কাহিনীতে নয়। আত্মায়। তবে এ’‌ ছবি যেহেতু আরও ৬০ বছর এগিয়ে, ফলে একে ‘‌ডিল’‌ করার স্তরগুলো আরও জটিল হয়ে গেছে। 
সেই জটিলতার কাঠামোটা ‘‌তুমহারি সুলু’–‌‌তে এনেছেন পরিচালক সুরেশ ত্রিবেণী। তবে তাকে অহেতুক প্যাঁচালো করে তোলেননি। বরং আপাত–‌সরলতা আর বিশুদ্ধ হিউমারই ‘‌তুমহারি সুলু’‌র সবচেয়ে বড় জোরের জায়গা, গম্ভীর মুখের নারীবাদি ছবি হতে চায়নি সুরেশের এ’‌ছবি। বরং সমস্যাগুলোকে ‘‌ব্যবহার’‌ করেছে জীবন নিঙড়ানো কৌতুকের উপাদান হিসাবে। 
যেমন সুলুর চাকরি খোঁজার ‘‌এপিসোড’‌টা শুরু হয় এক মজাদার প্রতিযোগিতায় (‌সওয়াল বাতাও সিটি বাজাও) প্রথম হওয়ার মধ্য দিয়ে। ওই প্রতিযোগিতার প্রথম পুরস্কার ‘‌প্রেশারকুকার’‌ আনতে গিয়ে এক মজাদার পরিস্থিত‌–‌তে সুলু ‘‌অডিশন’‌ দিয়ে আসে রেডিও জকির কাজের। তার গলার আবেদনময়তার পাশাপাশি তার সারল্যও মুগ্ধ করে রেডিও কোম্পানির মালিক মারিয়াকে (‌নেহাধুপিয়া)‌। 
চাকরিতে ঢুকতে বেগ পেতে হয় না সুলুকে, সমস্যাটা শুরু হয় এরপর। ‘‌চ্যাট শো’‌–‌য় তার আবেদনময় কণ্ঠ ব্যবহার, যৌনতা-‌গন্ধী নানা প্রশ্নের উত্তর দেওয়া—ইত্যাদি থেকে সমস্যা তৈরি হয় পারিবারিক আবহে। সমস্যা ঘণীভূত হয় সুলুর ছেলের স্কুলে নিয়ম ভেঙে মোবাইল নিয়ে যাওয়া থেকে। এ’‌সব গোলমালের জন্যে দায় এসে পড়ে সুলুর কাঁধে। যেমনটা আমাদের পরিবার–‌রাজনীতিতে আকছারই হয়। ‘‌সফট–‌টার্গেট’‌ হয়ে যায় মেয়েরা। বোঝা যায় সময়টা আদতে কিছুই এগোয়নি। পড়ে আছে সেই ছ’‌দশক আগের ‌‘‌মহানগর’‌–‌এরই কালে।
এ’‌ছবির ভার সন্দেহ নেই গোটাটাই বিদ্যা বালনের কাঁধে। যৌবনের শেষ দিকে এসে পৌঁছানো, ঈষৎভারী চেহারার, সাদা–‌মাটা পোশাকের গৃহবধূ— এমন একরঙা চরিত্রে বিদ্যার অনুপ্রবেশ চরিত্রকে রঙিন করে তুলেছে। চলাফেরা, অভিব্যক্তি, স্বরক্ষেপন সর্বত্রই শরীর, মুখ আর মেধার প্রতিটি ইঞ্চিকে ব্যবহার করেছেন বিদ্যা। ঘরোয়া প্রশান্তির সঙ্গে সপ্রতিভ দ্যুতির আশ্চর্য মিলন এ’‌ছবিতে বিদ্যা। ‘‌বিজলি কি রানী’‌ রিমিক্সের সঙ্গে তাঁর স্টেপিং আর অভিব্যক্তি দেখার মতো। স্বামীর চরিত্রে মানব কাউলও দারুণ।
বহুদিন পরে এক অন্যরকম চরিত্রে মুগ্ধ করলেন নেহা–‌ধুপিয়া। রোডিও-‌র আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ‌চরিত্রে বিজয় মৌর্যও দারুণ। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top