সম্রাট মুখোপাধ্যায়: পলাশীর প্রান্তরে ভারতের স্বাধীনতার গৌরব রবি ডুবিয়ে দেওয়া ব্রিটিশ সেনানায়ক রবার্ট ক্লাইভ মারা যান ১৭৭৪ সালে। ইংল্যান্ডে ফিরে তিনি অজানিত কারণে আত্মহত্যা করেন।
আর বিজয়কৃষ্ণ আচার্যের তারকাখচিত ‘‌ঠগস অফ হিন্দুস্থান’‌–‌এ সেই ক্লাইভ সাহেব আবার ফিরে আসেন ১৭৯৫ সালে। উত্তর ভারতের শাসক হিসেবে। আর ১৮০৬ পর্যন্ত প্রশাসনকাল চালিয়ে তারপর নিহত হচ্ছেন ভারতীয় ঠগীদের হাতে!‌ দশেরার দিন। জ্যান্ত রাবণ হিসাবে পুড়ে।
অবশ্য এই ক্লাইভ যেমন ইতিহাস মেনে ক্লাইভ নন, এই ঠগীরাও তেমনই ফিলিপ মিডোস টেলার–‌এর বিখ্যাত বর্ণনায় পাওয়া সেই ঠগী নয়। এরা জলদস্যু আর স্বাধীনতার গোরিলা যোদ্ধাদের মাঝামাঝি অমীমাংসিত একটা কিছু!‌
ফলে ইতিহাস পড়ে–‌শুনে এ ছবি দেখতে গেলে কিন্তু দর্শকদের ঠগের হাতেই পড়তে হবে। বলিউড চিরকালই এইভাবে নিজের মতো একটা রোমাঞ্চকর কমিক্‌স কমিক্‌স গোছের ইতিহাস বানিয়ে এসেছে। ইতিহাসের গরুকে গাছেও চড়িয়েছে বহুবার। তবে এবার সে গরু আকাশেও চড়েছে।
ক্লাইভ নিয়ে এমন ‘‌কিসসা’‌ শুনে সিনে ওয়াকিবহাল দর্শকের তারান্‌তিনো সাহেব আর তাঁর বিখ্যাত ছবি ‘‌ইনগ্লোরিয়াস বাস্টার্ডস’‌–‌এর কথা মনে পড়তে পারে। সেখানে সিনেমাটিক লাইসেন্স নিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বহু পরে হিটলারকে গুলি খেয়ে মরতে দেখা গিয়েছিল এক সিনেমা হলে!‌ বিজয়কৃষ্ণ সেই যুক্তিকে নিজের উকিল খাড়া করতে পারেন। সিনেমা আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে।
কিন্তু সেখানেও সমস্যাটা অন্যত্র। তারান্‌তিনোর ওই ছবি ছিল এক উত্তর আধুনিক মেজাজের ছবি। বাস্তবতাকে নিয়ে ড্যাংগুলি খেলা যেখানে সারাক্ষণই চলতে থাকে। এ ছবি কিন্তু তেমনটা নয়। বরং ঠিক উল্টো। একটু পুরনো মদ নতুন বোতলে গোছের। একটু ভিন্টেজ ভিন্টেজ পালিশ লাগানো।
যার দৃশ্যকল্পগুলো দেখতে দেখতে বারবার স্মৃতিতে হলিউড প্রসিদ্ধ ‘‌পাইরেটস অব ক্যারাবিয়ানস’‌–‌এর কথা মনে আসবেই। আমিরের সঙ্গে জনি ডেপ–‌এর মিল তো চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো। আর চিত্রনাট্যের ভেতরে আবার অন্য জিনিস। পাঁচের কিংবা ছয়ের দশকের বলিউডি কস্টিউম ড্রামা। ‘‌আন’‌, ‘‌ধরমবীর’‌, সঙ্গে আবার মনোজকুমারের ‘‌ক্রান্তি’‌ আদলে হালকা জাতীয়তাবোধ।
শুধু গোটা ব্যাপারটার ভেতর অমিতাভ বচ্চন নামক প্যাকেজটায় একটু আলাদা টাচ। সেখানে নয়ের দশকের ‘‌খুদা গাওয়া’‌ স্মৃতি। সেই ঘোড়ায় চেপে প্রথম এন্ট্রি। প্রভূত হাততালির মধ্যে। শুধু খুচরো পয়সার দিন গিয়েছে বলে তা পড়েনি। ব্যাপারটাকে ‘‌আন্ডারলাইন’‌ করতেই বোধহয় এ ছবিতে অমিতাভের নাম খুদাবক্স। ও হ্যাঁ, কুলির ‘‌আল্লারাখা’‌–‌র মতো তারও একটা পোষা বাজ রয়েছে। গত কয়েক বছরে ‘‌পিঙ্ক’‌, ‘‌১০২ নট আউট’‌ এ সব থেকে পিছিয়ে বচ্চন আবার ফিরে গেছেন তাঁর অ্যাংরি মিডল এজ ইমেজে।
তাঁর চরিত্রে অবশ্য অনেকটাই পুরনো সেই প্রাণ–‌প্রাণ গন্ধ। মানে অভিনেতা প্রাণ এ ধরনের মশলা ছবিতে যে ধরনের চরিত্র করতেন। রাজ পরিবারের বিশ্বস্ত রক্ষক। হাফ টাইমের আগে ভিলেনের হাতে মারা যেত। কিন্তু সিনেমা শেষের রিল তিন–‌চার আগে ফের ফিরে আসত ‘‌আবার সে এসেছে ফিরিয়া’‌ কায়দায়। এ ছবির শুরুতেই খুদা বক্সের মালিক পরিবার খুন হয় ক্লাইভের হাতে। আর পরিবারের ছোট মেয়ে জাফরাকে (‌ফতিমা সানা শেখ)‌ বের করে আনে বিপদের বেড়াজাল থেকে খুদাবক্স। এরপর কীভাবে কী হইল কে জানে দু’‌জনে মিলে তৈরি করে ফেলে এক শক্তপোক্ত জলদস্যুদল। আর যারা নির্জন এক দ্বীপে থাকে প্রবল ইংলিশ ‘‌নেভি’‌–‌র নজর এড়িয়ে। আর অল্প লোকজন দিয়েই তাদের নাকে দম লাগিয়ে দেয়!‌ এ গল্পে ঠগী কোথায়। সে সঙ্গত প্রশ্ন যারা ভাবছেন তাদের আশ্বস্ত করে বলি তা আছে। আর আমির খান তা নিয়েই আছেন এ ছবিতে। মানে আমিরই এ ছবির ঠগী। ফিরঙ্গি মাল্লা। যার সঙ্গে আছে এক আইটেম প্রেমিকা তথা নর্তকী সুরাইয়া (‌ক্যাটরিনা কাইফ)‌। মিলেমিশে এই সাড়ে তিনজনের টিম।
গোটা ছবিতে ঠগীদের নিয়ে একটাই মাত্র দৃশ্য। পথ ভুলিয়ে তাদের নিয়ে এসে বিপদে ফেলছে ফিরঙ্গি মাল্লা। ‌মাত্র একবারই। তাও খুনখারাপিতে নেই সে। তবে হ্যাঁ, গোটা ছবি জুড়ে ব্রিটিশদের প্রচুর ঠকিয়েছে সে। যাকে বলে ডবল ক্রশিং গেম। এ ছবির ‘‌প্রেডিক্টেবল্‌’‌ গল্পে যেটুকু ‘‌আনপ্রেডিক্টেবিলিটি’‌ আনার চেষ্টা তা তাকে ঘিরেই। আমির অন্য জাতের অভিনেতা। তিনি এমন মজাদার আর ‘‌নট্‌খট্‌’‌ চরিত্রে তুমুল ‘‌প্রেজেন্স’‌ দিয়েছেন। কিন্তু অন্যরকম চরিত্রে যাঁরা তাকে দেখে অভ্যস্ত, তাঁরা হয়ত হতাশ হবেন। কারণ এই চরিত্রটি বলিউড সিনেমায় সম্ভবত এর আগে দশ হাজার তিনশো চুয়ান্নবার এসেছে। ফলে এমন চরিত্রে ‘‌আমিরের আমিরি’‌ অপব্যয়িত।
ফতিমা সানা শেখেরই ছবির নায়িকা হবার কথা ছিল। চিত্রনাট্যের প্রাথমিক গতি প্রকৃতি দেখলে তো বোঝা যায়। কিন্তু মাত্র আড়াই খানা অভিব্যক্তি নিয়ে বক্স অফিস পার করা খুব মুশকিল এটা বুঝেই সম্ভবত ক্যাটরিনার আইটেম চরিত্রটা বাড়ানো হয়েছে। নর্তকী হয়েছে নায়িকা। আর শেষ রিলে এসে তার চরিত্রটাই শেষ বাজি মেরেছে।
তবে এ ছবি অমিতাভ বচ্চনের। এখনও অ্যাকশনে, তুমুল এক্সপ্রেশানে তিনি কতটা অসম্ভব চরিত্রকেও বাস্তব করে তুলতে পারেন, তা এ ছবি না দেখলে বোঝা যায় না। এমন পড়ন্ত বেলাতেও মধ্য দুপুরের তেজ!‌ অমিতাভ বচ্চন বলেই বোধহয় সম্ভব। এ ছবির নাম পুনশ্চ বচ্চন হলেও ভুল হত না। তাঁর জন্যই অধিক ঠগীতে গাজন নষ্ট হয়ে জাহাজ ডুবেও, মাস্তুলটুকু জেগে আছে।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top