অদিতি রায়‌: টাপুর টুপুর বৃষ্টি পড়ে/‌নদেয় এল বাণ/‌শিবঠাকুরের বিয়ে হল/‌তিনকন্যে দান/‌এক কন্যে রাঁধেন বাড়েন/‌এক কন্যে খান/‌এক কন্যে গোঁসা করে/‌বাপের বাড়ি যান।
প্রাচীন বাংলার এই ছড়াতে তৎকালীন বঙ্গসমাজের ছবিটা স্পষ্ট। এবার ধরা যাক উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক। প্রত্যন্ত গ্রামের এক মধ্যবয়সী বর্ধিষ্ণু জমিদারের তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে ঘরে এল ১৪ বছরের বালিকা ‘‌মে’‌। জমিদারের প্রথম বৌ তাকে শেখাতে লাগল ঘর-‌সংসারের আদব কায়দা, দ্বিতীয় বৌয়ের কাছে মেয়েটা শিখল কীভাবে যৌনমিলনে ছদ্ম পরিতৃপ্তির ভান করে স্বামীকে দিতে হয় সুখ। বাড়ির এক প্রবীণার থেকে বুঝল পুত্রসন্তানের জন্ম দিতে না পারলে ‘‌লেডি অফ দ্য হাউস’‌ হয়ে ওঠা তার হবেনা!‌ প্রথম বৌ সর্বময়ী কর্ত্রী হতে পেরেছে এক পুত্রের মা হয়ে, দুই কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়ে খানিক অবহেলিতই রয়ে গেছে পূর্ণযৌবনা দ্বিতীয় স্ত্রী। ১৪ বছরের ‘মে‌’‌র একটাই লক্ষ্য, পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়ে হয়ে উঠতে হবে স্বামী ‘হাং‌’-‌এর চোখের মণি!‌
এই গল্পটা বেশ কয়েক বছর পিছিয়ে যে কোনও গ্রামীণ ভারতীয় পরিবারের হতেই পারত, কিন্তু এর পটভূমিকা ভিয়েতনাম। এই গল্প তাঁর দিদিমার কাছ থেকে শুনেছিলেন অ্যাশ মে ফেয়ার। দিদিমার অভিজ্ঞতায় অনুপ্রাণিত হয়েই তিনি বানিয়ে ফেললেন তাঁর প্রথম ছবি ‘‌দ্য থার্ড ওয়াইফ’‌।
বাঁশ ও মাটির বাড়ি, হোগলার ছাউনি, নাম না জানা ফুলগাছের বেড়া প্রশস্ত উঠোন ঘিরে, পায়ে চলা সরু পথ বৃষ্টিতে কর্দমাক্ত, খালি পায়ের ছপছপ আওয়াজ, বর্ষার জলে পরিপূর্ণ নদী-‌নালা, পুকুর-‌ডোবা, বাঁশির মেঠো সুরে ভিয়েতনামের প্রকৃতি যে কোনও সময় মনে করিয়েই দিতে পারে গ্রামবাংলার ছবি। ছবিই তো, একেবারে জলে ধোওয়া ওয়াশ পেইন্টিং, প্যালেটে গ্রে ও ভার্মিলিয়নের দাপট। সঙ্গে ‘মে‌’‌র অপার কৌতুহল ও ঈষৎ ভয় মেশানো দুচোখ, প্রথম বৌ ‘হা’‌‌-‌এর এতদিনের কর্তৃত্ব চলে যাওয়ার নিরাপত্তাহীনতা, কারণ ততদিনে ‘‌মে’‌ অন্তঃস্বত্তা, এবং দ্বিতীয় বৌ ‘‌জুয়ান’‌-‌এর লকলকে অগ্নিশিখার মতো অতৃপ্ত যৌবন যোগ করে আপাত সরলতায় এক অন্তর্দাহ।


জমিদার ‘হাং‌’‌ অত্যাচারী নয়, তার কাছে তার তিন বৌ পুত্রসন্তান উৎপাদনের যন্ত্র মাত্র!‌ তবে যৌনতাড়নায় সে পালা করে যায় তার তিন স্ত্রীর কাছে, কখনও ‘পাওয়ার ট্রিপ‌’‌ এনজয় করতে কিশোরী বৌকে নগ্ন অবস্থায় হামাগুড়ি দিয়ে কাছে আসতে বলে!‌ পুরষতন্ত্রে চপেটাঘাতের মতো সে দৃশ্য!‌
যেখানে অবদমন, সেখানে কেচ্ছা থাকবেই। প্রথম বৌয়ের ছেলেকে তার সৎমা জমিদারের দ্বিতীয় বৌ জুয়ানের সঙ্গে সঙ্গমরত অবস্থায় একদিন গোপনে দেখে ফেলে তৃতীয় বৌ কিশোরী মে‌‌। মে টের পায়, যৌনতায় প্রেম থাকলেই পাওয়া যায় চরম সুখ, যা সে তার স্বামীর কাছ থেকে কোনওদিনই পায়নি, তা সত্ত্বেও তাকে গর্ভে ধারণ করতে হচ্ছে সন্তান, যে তাকে এনে দিতে পারে পরিবারে তার কাঙ্খিত স্টেটাস। দ্বিতীয় বৌ জুয়ানের প্রতি মে অনুভব করে এক অপরিচিত টান, তাকেই কি প্রেম বলে?‌ জুয়ানের প্রত্যাখ্যানে আশাহত মে’র অভিব্যক্তিতে সমকামিতার ক্রাইসিস ছোট্ট আঁচড়েই বুঝিয়ে দিয়েছেন পরিচালক।
নিজের দ্বিতীয় পত্নীর সঙ্গে প্রথম পক্ষের ছেলের অবৈধ সম্পর্কের কথা কানে আসতেই জোর করে ছেলের বিয়ে দেয় জমিদার। বিয়ের রাতে আকণ্ঠ মদ পান করে সে ছেলে তার নবপরিণীতাকে ছুঁতে অস্বীকার করে। রীতি অনুযায়ী সেটা ঘরে না তোলার ইঙ্গিত। সদ্যবিবাহিতার বাপের বাড়িও তাকে ফিরিয়ে নেয়না। ‘বাতিল‌’‌ হওয়ার অপমানে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় বালিকা বধূ। শোকে পাথর হয়ে যায় মে। সে কী অবশেষে জন্ম দেয় পুত্রসন্তানের?‌ 
এ প্রশ্নের উত্তর বরং উহ্যই থাক এ লেখায়। এ যেন আমাদের সমাজেরই ছবি!‌ পরিবারের মহিলাদের একে অপরের প্রতিযোগী করে তোলা, তাদের সখ্য, একে অপরের বিপদে সহানুভূতির হাত ধরা, এক অপূর্ব সমবেদনায়, নান্দনিকতায় পর্দায় গেঁথেছেন পরিচালক অ্যাশ মে ফেয়ার। আর অত্যন্ত সূক্ষ্মতায় ধীরে ধীরে একাত্ম করেছেন দর্শকদের। নারীদের স্থান যে কোনও সমাজেই কাল ও ভৌগলিকতার সীমানা মুছে দেয়। নারী মানেই ভোগ্য, নারী মানেই উৎপাদনের মাধ্যম, যুগ যুগ ধরে প্রোথিত এই চেতনায় সজোরে এক ধাক্কা ‘দ্য থার্ড ওয়াইফ‌’‌।
টরান্টো চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার জিতে নেওয়ার পর, এবার সদ্য সমাপ্ত ২৪ তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও সেরা ছবির পুরস্কার ছিনিয়ে নিল ভিয়েতনামের এই ছবি।‌

জনপ্রিয়

Back To Top