সোমনাথ গুপ্ত: এখন দিনকাল বড় ফেসবুক-‌ময়। সেই ফেসবুকে কত কিছু আপলোড করা হয়। খাওয়া–দাওয়ার ছবি থেকে দাম্পত্যের সহাস্য উদযাপন। এবং তারপর দেখে নেওয়া কতটা লাইক, কতগুলো কমেন্ট, কতগুলো শেয়ার। এইসব ব্যক্তিগত জিনিসকে হাটুরে করে তোলায়, অনেকেই বিরক্ত। এই বিরক্তির কোনও কারণ নেই, এমনও নয়।
কিন্তু এই ফেসবুক যেমন একদিকে হয়ে উঠেছে কোনও মানুষের জীবনযাপনের দিনলিপি। তেমনি এই ফেসবুকেই আজ অনেকে পাবেন নিজের মনের কথা খুলে বলতে। ফেসবুক এই দ্বিতীয় পক্ষের কাছে খোলা জানলা। নিজস্ব সুখ, দুঃখ, সমাজ, সংসার, অনুভব, প্রতিবাদ — সব কিছু মিলিয়ে একটা মানুষকে চিনে নেওয়ারও উপায় এই ফেসবুক।
এই ফেসবুক-‌অধ্যুযিত সমাজ সংসারকে বেশ দক্ষতার সঙ্গে, মায়ার সঙ্গে এবং সিনেম্যাটিক ভাষার প্রয়োগে তুলে ধরেছেন চূণী গঙ্গোপাধ্যায়, তাঁর তারিখ ছবিতে।
সোজাসাপটা ভাবে গল্প বলায় বিশ্বাসী নয় চূণীর ‘‌তারিখ’‌। এখানে মাঝে মাঝেই ভেসে ওঠে একটা করে তারিখ, আর ছবির কাহিনী বা চরিত্ররা সেই তারিখ থেকেই কখনও চলে যায় ফ্ল্যাশব্যাক–এ, কখনও চলে আসে বর্তমানে। এই তারিখ বদলের খেলাটা নিপুনভাবেই খেলেছেন পরিচালক।
এ ছবির প্রধান তিন চরিত্র অনির্বান (‌শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়)‌, তার স্ত্রী ইরা (‌রাইমা সেন)‌ এবং তাদের বন্ধু রুদ্র (‌ঋত্বিক চক্রবর্তী)‌। হ্যাঁ, একটা অন্তনিহিত ত্রিকোণ আছে। ইরাকে মনে মনে ভালবাসে ঋত্বিক। কিন্তু এই ভালবাসায় বন্ধুর সংসার ভাঙার খেলা নেই।
অনির্বাণ স্বপ্ন দেখে সমাজ বদলের। সেই স্বপ্নকে ছড়িয়ে দিতে চায় ছাত্রদের মধ্যে। সেই সব ছাত্ররাও স্বপ্নের মধ্যে ঢুকতে চায়। একসঙ্গে থাকে। গিটার বাজায় গান বাঁধে।
একজন মানুষ যদি এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়, মৃত্যুর পরেও তার ভাবনা–চিন্তা–আদর্শ কি থেকে যায় না ফেসবুকের ‘‌টাইম লাইন’‌–এ। কোথাও কি একটা অমরত্বের ছোঁওয়া থেকে যায় ফেসবুকে প্রকাশ করা চিন্তায়?‌ সেগুলো তো মোছে না?‌ সেই সব ভাবনা কি অন্যদেরও ভাবায়?‌
সাদামাঠা গল্প না বলে, গল্পের অনেক মুহূর্ত তৈরি করে, এই প্রশ্নটাই তুলেছেন চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়।
অভিনয়ে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় আর ঋত্বিক চক্রবর্তী আর একবার মুগ্ধ করলেন। ভাল লাগে রাইমার অভিনয়ও। কিন্তু মাঝে মাঝেই রাইমার ‘‌ডিজাইনার লুক’‌ বেশ অস্বস্তিকর। অন্তত বিষাদের দিনে। ছোট চরিত্রে যথারীতি মন ভোলালেন কৌশিক গাঙ্গুলি। অনসূয়া মজুমদার, অলকনন্দা রায়কেও ভাল লাগে। গোপী ভগতের ক্যামেরা আর রাজা নারায়ণ দেবের সঙ্গীত যথাযথ সাহায্য করেছে পরিচালককে। 
‘‌নির্বাসিত’‌র পর দ্বিতীয় ছবিতে চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় আরও বেশি ভরাসা দিলেন দর্শকদের। এবং সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে যখন নানা ব্যঙ্গ বিদ্রুপও শোনা যায় চারদিকে, তখন এই সোশ্যাল মিডিয়াতেই যে অমরত্বের একটা হাতছানিও আছে, সেটাও স্পষ্ট করেছেন তিনি। এই স্বপ্নটাই ‘‌তারিখ’–এর‌ মর্মকথা। ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top