সম্রাট মুখোপাধ্যায়: সোয়েটার। পরিচালনা:‌ শিলাদিত্য মৌলিক। অভিনয়ে:‌ ঈশা সাহা, খরাজ মুখোপাধ্যায়, শ্রীলেখা মিত্র, জুন মালিয়া, ফারহান ইমরোজ, অনুরাধা মুখোপাধ্যায়, সৌরভ দাশ, সিধু, অরিন্দোল বাগচী।
‘‌সোয়েটার’‌ এমন এক গল্প, সুখ–অসুখের মাঝখানে যে উল–কাঁটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
এ সিনেমা মূলত গল্পই। বাংলা ছবির জনপ্রিয় ইতিহাসে আদি–মধ্য–অন্ত যুগে যাকে ‘‌বই’‌ বলেই ডাকা হয়। ‘‌সোয়েটার’‌–এরও মূল জোর তার গল্প বলায়। ঝোঁক ‘‌বই’‌ হয়ে ওঠায়। তার সিনেমা–শর্তে অনেক ফাঁকফোকর আছে। অনেক না–পাওয়া, অনেক সমঝোতা আছে। কিন্তু তরুণ পরিচালক শিলাদিত্য মৌলিক গল্পটি বলেছেন ভারী মনোযোগ দিয়ে।
নবীন গল্পকার জয়িতা সেনগুপ্তর গল্প ‘‌উলকাঁটা’‌ থেকে এ ছবি বানানো। সিনেমার পোস্টার থেকে ক্রেডিট লাইন, সর্বত্রই তরুণ লেখিকার নাম ও গল্পের নাম যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে তাই প্রচারিত হয়েছে। এটা প্রশংসনীয়। বাংলা ছবিকে বাঁচাতে গেলে গুরুত্ব দিয়ে এভাবেই সাহিত্যের হাত ধরতে হবে।
আর সেই ধরার সুফলটা নিঃসন্দেহে শিলাদিত্য পেয়েছেন। ছোট ছোট সিকোয়েন্সে এসেছে হঠাৎ হঠাৎ অপ্রত্যাশিত বাঁক। চরিত্রগুলোর মধ্যে তৈরি হয়েছে অনেকটা করে অচেনা আবছায়া। রাগী বাবা যেখানে স্নেহাতুর হয়ে ওঠে মেয়ের প্রেমিকের কাছ থেকে বঞ্চনা পাওয়ার পর। লাজুক মেয়ে মুখচোরা থেকেও এক জোড়া প্রতিশোধ নিতে পারে মাত্রই একটি–একটি দু‌টি সংলাপের ওপর ভর করে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মনে হয়েছে গল্পের জিত। উল–কাঁটার বোনায় সোজা–উল্টো ধাঁচেই যেন এগিয়ে চলেছে চিত্রনাট্য।
ছবিতে মহাদেববাবুর (‌খরাজ মুখোপাধ্যায়)‌ দুই মেয়ে। তুলিকা (‌ঈশা সাহা)‌ আর শ্রী (‌অনুরাধা মুখোপাধ্যায়)‌। শ্রী চটপটে। কাজেকর্মে দড়। পড়াশোনায়ও কৃতী। তুলিকা কিন্তু ঠিক উল্টো। ঘরকন্নার কাজ থেকে পড়াশোনা বা ‘‌এক্সট্রা ক্যারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ’‌, সর্বত্রই সে শেষ সারিতে। ফলে তাকে ঘিরে ছবির শুরু থেকেই বিষণ্ণতার এক মেঘ ঘনিয়ে থাকে। এই বিষণ্ণতার মাত্রাগুলো খুব ভালভাবে ধরেওছেন ঈশা। ‘‌প্রজাপতি বিস্কুট’‌–এর পরে তার এ‌রকম চরিত্র আরও একবার। তার প্রেমটাও ঘেঁটে থাকা। বাউন্ডুলে ব্যান্ডগায়ক প্রেমিকের (‌সৌরভ দাশ)‌ নিষ্ঠুর আচরণের শিকার সে। বরং তার বোন জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো এক্ষেত্রেও ‘‌সফল’‌। সে জানে কেমনভাবে একাধিক প্রেমিককে ব্যবহার করে চলা যায় জীবনে। গল্পের পরিণতিতে দু’‌বোনের জীবনেই চমক আসে। তুলিকাকে ঘিরে গল্পে আসে তিন পুরুষ।
এরই মাঝে তুলিকার এক আজব সম্বন্ধ আসে বিয়ের। হবু শাশুড়ি মালিনীদেবী (‌জুন মালিয়াকে নতুনরকম চরিত্রে দাপুটে লেগেছে)‌ শর্ত দেন তাঁর বোনা বহু–প্রশংসিত সোয়েটারের মতো একটা সোয়েটার যদি তুলিকা বানিয়ে দিতে পারে, তাহলে তাকে পুত্রবধূ করে নিয়ে যাবেন তিনি। সময় এক মাস। সোয়েটার বোনা শিখতে পিসি গৌরীর (‌শ্রীলেখা মিত্র)‌ কাছে যায় তুলিকা। এ ‌ছবির দুটো অর্ধসত্যি বলতে দু’‌রকম। প্রথমার্ধে নানা টুকরোটাকরা ঘটনার ফাঁকেও ছবিটা যেন উড়ি–উড়ি করেও উড়ানটা পাচ্ছিল না। একঘেয়ে ঠেকছিল।
ছবির ঠিকঠাক শুরু হল যেন দ্বিতীয়ার্ধে। সোয়েটার–বোনা শেখার পর্বে। সোয়েটার নয় পিসির কাছে তুলিকা যেন শিখল জীবনের সোজা–উল্টো ঘরগুলোকে বুনে তুলবার নকশা। আর সেটা হল পিসির কাছে আসা ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে জীবন মিলিয়ে। এই শেখা বা শেখানোর কায়দাগুলো বেশ নতুনত্ববাহী। কিন্তু টিমটাকে ঘিরে সাবপ্লটগুলো তেমন জমেনি। আসলে সর্বত্রই এ ‌ছবি সিনেমা কম গল্প বেশি। ফলে সেগুলোও মুখের কথা হয়ে রয়ে গেছে। শ্রীলেখার চরিত্রটিতে রক্তমাংস কম। ফলে নিজস্ব দাপট দিয়ে তিনি সামলেছেন। নতুন নায়ক ফারহানও চেষ্টা করেছেন চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে, যা প্রশংসনীয়।
এ ‌ছবির গল্পকে ‘‌সাপোর্ট’‌ দিয়েছে রণজয় ভট্টাচার্যের সুরে ও অ্যারেঞ্জমেন্টে কয়েকটি গান। ছবি জুড়ে পাহাড়ি কুয়াশা, অনেক জায়গায়ই মনোযোগ টেনে রেখে ছবির ‘‌কনফিউশন’‌–এর জায়গাগুলোকে ঢেকে দেবে। বাঙালির দার্জিলিং–প্রীতি তো যাওয়ার নয়।
‘‌আহা রে’‌, ‘মুখার্জিদার বউ’‌ .‌.‌.‌ তারপরে এই ‘সোয়েটার’‌। বাংলা ছবি আবার ক্রমশ ‘পাশের বাড়ির গল্প’‌ হয়ে উঠছে। এই উদ্যোগকে স্বাগত।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top