সম্রাট মুখোপাধ্যায়: এক যে ছিল দর্জি। গরিব, দুঃখী। দর্জির ছিল এক বউ। দর্জির নাম মৌজি।
বউ মমতা সারাদিন খাটে। মৌজিও। তবু তাদের দুঃখের দিন কাটে না। মৌজির বাবুজি মানে বাবা মৌজিকে অকর্মণ্য মনে করে। মৌজির ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি বড়লোক। সেই ডাঁটে সে আর তার বউ ছুতোয়–‌নাতায় খাটিয়ে নেয়, অপমান করে মৌজি আর মমতাকে।
মৌজি যে সেলাই মেশিনের দোকানে কাজ করে, সেখানে তো কথাই নেই। মালিক আর তার ছেলের মনোরঞ্জনের জন্য কথায় কথায় কুকুর সেজে ভাঁড়ামি পর্যন্ত করতে হয় মৌজিকে।
মৌজির দুরবস্থা চরমে ওঠে একদিন, যখন তার জীবনে একইসঙ্গে তিন–‌তিনটে অঘটন ঘটে। এক, বাবুজি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করে। দুই, ভাল মানুষ কিন্তু একটু অবুঝ মা হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়লে অপারেশনের জন্য একগাদা টাকার দরকার হয়।
এবং তিন, এটাই চরমতম বিপদ, মৌজিও দোকানের চাকরি ছেড়ে দেয়। কারণ, তার আগের রাতে মালিকের ছেলের বিয়ে ছিল। সেখানে মালিকের আদেশে সর্বসমক্ষে তাকে কুকুর সেজে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে হয়। বাবা–‌মা–‌মমতার উপস্থিতিতেই। স্বামীর এ অপমান মেনে নিতে না পেরে মমতা রাতে তাকে বলে অসম্মানের এ চাকরি ছেড়ে দিতে। পরামর্শ দেয় সেলাই মেশিন নিয়ে বাজারে পথের ধারে বসতে। বসা শুরুও করে মৌজি। এরই মধ্যে মা–‌র অসুস্থতা ওলট–‌পালট করে দেয় সব।
এই যে গল্প, এ তো রূপকথা কিংবা আরব্য রজনীর কিস্‌সার মতো। সেইমতোই ‌‘‌এক যে ছিল গরিব দর্জি’‌ দিয়ে শুরু। অতএব, রূপকথার ফর্মুলা মতোই জানা যে এবার দিন ঘুরবে। কিন্তু কী করে?‌ আর কী হবে সেই ‘‌ম্যাজিক কার্পেট’‌, যা গল্পে ঢুকে পড়ে দিন বদলাবে?‌
সেখানেই ‘‌সুই–ধাগা’‌ মানে সুচ–‌সুতোর গল্প, প্রথমে মনে হয়েছিল ওই পথের ধারে দোকান জমানো নিয়ে বোধহয় ছবি, তারপর দেখা গেল চিত্রনাট্য সেখান থেকে সরে এসেছে। কারণ, মৌজির (‌বরুণ ধাওয়ান)‌ হাত থেকে বেহাত হয়ে গেছে যে সেলাই মেশিনটাই। কারণ ওই মেশিন সে ধার করে এনেছিল এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে।
এরপর শুরু হয় নতুন গল্প। বহুদূর এক ক্যাম্পে গিয়ে সরকারি ভর্তুকিতে বিতরণরত সেলাই মেশিন জোগাড় করা। এই অংশটা অনেকটা ইরানি ছবির ঘরানায় বানানো। কিন্তু এর ক্লাইম্যাক্সেও ছবির চূড়ান্ত পরিণতি নয়। দ্বিতীয়, অর্ধ শুরু হয় আরও পৃথক এক গল্পাংশ নিয়ে।
সেখানে এক লোভী ফ্যাশন ডিজাইনারের খপ্পরে পড়ে মৌজি আর মমতা (‌অনুষ্কা শর্মা)‌। নামমাত্র মাইনের বিনিময়ে নিজের কোম্পানিতে সে টেনে নেয় ওই দুজনকে। আর তারপর চেষ্টা করে মৌজির নিজস্ব নকশাগুলোকে হাতানোর। তার খপ্পর থেকে নিজের ‘‌সুইধাগা’‌কে কেমন ভাবে বাঁচায় মৌজি আর তারপর কেমনভাবে উচিত জবাব দেয় ওই কোম্পানিকে তা নিয়েই এ ছবির ক্লাইম্যাক্স। অবশ্যই যেটা রূপকথার নিয়ম মেনে। সব মিলিয়ে এক ছবির ভেতর তিন– তিনটে পর্ব। আর এটাই হয়তো দুর্বলতা এ ছবির। বারবার গল্পের ‘‌ফোকাস’‌–টা সরে সরে গেছে মনে হয়েছে। শুধু তাই নয় শেষে কিছু কিছু চরিত্রের হৃদয় পরিবর্তনও বড্ড তাড়াতাড়ি হয়ে গেছে। ছবির শেষদিকে মৌজিকে সাহায্য করবার জন্য প্রাক্তন তাঁতিদের যে দলটি এগিয়ে এসেছে, তার সদস্যদের ব্যক্তিগত পরিচিতি আর ছোট ছোট গল্পগুলোও একটু দরকার ছিল চিত্রনাট্যে। তবে এই ‘‌টিম মৌজি’‌–র সঙ্গে দর্শকরা একাত্মবোধ করতেন। কিন্তু ছবির প্রথমার্ধে ওই বাজারে জায়গা পাওয়া বা সেলাই মেশিন জোগাড় করাতেই এতটা ‘‌স্পেস’‌ এবং উদ্যম খরচ হয়ে গেছে যে এই ‘‌টিম’‌–‌এর গল্পের স্থান অকুলান হয়েছে চিত্রনাট্যে।
তবু সব মিলিয়ে এ ছবি অন্যরকম। রূপকথা ঠিকই কিন্তু একটি শ্রমজীবী পরিবারের ঘাম–‌রক্ত–অশ্রুকে চেনা গেছে ঠিকই। যথাযথ বেদনায়। বড় পুঁজিপতিরা কেমনভাবে শ্রমিকদের শ্রম আর মেধাকে আত্মসাৎ করছে, তাও উঠে এসেছে যথাযথ। এই ধরনের চরিত্রে যে ‘‌চ্যাপলেনিস্ক’‌ ঘরানার অভিনয়টা দরকার, তা একেবারে ঠিকঠাক করেছেন বরুণ ধাওয়ান। ‘‌অক্টোবর’‌–এর পরে আরেকবার বোঝা গেল বরুণ ‘‌আন্ডার অ্যাক্টিং’‌–এ কতটা সিদ্ধহস্ত। অনুষ্কা কখনও দারুণ, কখনও বেশ সাধারণ। ঝড়–‌ঝাপটার দৃশ্যগুলোয় তাঁর নিজেকে আরও ভাঙা উচিত ছিল। সবটাই শুধু মুখের অভিব্যক্তিতে হয় না। তবে এ ছবির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ খিটখিটে বাবার চরিত্রে রঘুবীর যাদব। ব্ল্যাক কমেডিতে এখনও তিনি বিকল্পহীন। আর মার চরিত্রে যামিনী দাসও এ ছবির এক বড় পাওনা।‌

জনপ্রিয়

Back To Top