উদ্দালক ভট্টাচার্য
প্রায় দেড় দিন আমায় ভাবতে হয়েছে, এই ওয়েব সিরিজ নিয়ে ঠিক কী উপমা দিয়ে লেখা শুরু করা যায়‌। খুঁজতে খুঁজতে একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। 
সেদিন ছুটি ছিল। বৃষ্টিও পড়ছিল হালকা। নিজের ঘরে বসে ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে গাই রিচির একটা ছবি দেখতে শুরু করলাম, তখন দুপুর দুটো। দি ম্যান ফ্রম অ্যাঙ্কেল। মনে আছে, বৃষ্টির স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশের সোঁদা গন্ধ চুইঁয়ে চুঁইয়ে ঢুকছিল ঘরে। প্রথম ১০ মিনিট দেখার পর আস আধশোয়া অবস্থায় থাকতে পারিনি। উঠে বসেছিলাম। কারণ, ততক্ষণে হরমোনাল অর্ডারটা মাথায় তাল পাকিয়ে যেতে শুরু করেছে। 
কাট টু, ফেব্রুয়ারি, ২০১৮। রবিবার, হালকা ঠাণ্ডা, হালকা গরম। দুপুরের পেট পুরে ভাত খেয়ে দেখতে বসেছিলাম ‘‌দি ম্যাশআপ মাঙ্কিস’‌। উত্তরবঙ্গের বাঙালি নির্ঝর মিত্রের তৈরি ওয়েব সিরিজ। এবারেও আধশোয়া হয়ে শুরু করেছি, পরে শুয়ে থাকতে পারিনি। উঠে বসতে বাধ্য হয়েছি। গাই রিচির সঙ্গে নির্ঝরের তুলনা করছি না। কিন্তু আমাকে অবাক করছে সিনেমা নামক এক আশ্চর্য ম্যাজিক শোয়ের প্রসঙ্গ। কীভাবে এমন ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়ে দিতে পারে এই মাধ্যম। তা ভেবে রোজই অবাক হতে হয়। আজীবন সেই অবাক হওয়া হয়ত চলবে। 
গোয়েন্দা গল্প বা অপরাধ বিষয়ে বাঙালি সমাজের দৌড় নিয়ে আশ্চর্য এক উপমা টেনেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ইউরোপ বা আমেরিকায় অপরাধ প্রবণতা যেমন, বাঙালিদের মধ্যে তেমন সাহস খুঁজে পাওয়া খুব মুশকিল। বাঙালি অপরাধ অনুশীলনও কিন্তু ততটা বুদ্ধিদীপ্ত নয়। স্বাভাবিক ভাবেই বাঙালি মানসে ডার্ক হিউমারের তেমন চর্চা দেখার সুযোগ হয়নি। না উপন্যাসে না সিনেমায়। কমেডির আদলে যে ডিস্টার্বিং এলিমেন্ট গুলি নিয়ে সারা পৃথিবীর অসংখ্য নির্দেশক ছবিতে ফাটিয়ে কাজ করেছেন, সেগুলি ভারতের নির্দেশকদের হাতছানি দিয়ে ডাকলেও শেষ পর্যন্ত আপন করে নিতে পারেনি। কিছুটা ভয়েই পরিচালকরাও তেমন এগিয়ে আসেননি। কিন্তু নির্ঝর সেই ধারণা ভাঙতে শুরু করেছেন। তাঁর প্রথম কাজেই সে ভাষা স্পষ্ট। 
ছবির গল্প নিয়ে একটাও বাক্য আমি খরচ করতে চাই না। কারণ, তাহলে দর্শককে প্রতারণা করা হয়। আমার মনে হয়, সিনেমা নিয়ে যে কোনও আলোচনার কাজ আসলে দর্শককে উস্কে দেওয়া। তাই ম্যাশআপ মাঙ্কিসের গল্প আমি বলব না। শুধু বলব, ছবিতে তেমন ভিএফএক্স নেই, তেমন চাকচিক্য নেই, তেমন গ্ল্যামার নেই। এত নেইয়ের মধ্যেও যেগুলো আছে, সেগুলোই শিল্প তৈরির একমাত্র প্রয়োজনীয় উপাদান। কঠিন পরিশ্রম, মেধা, নির্মাতার স্পষ্ট ভাবনার ছাপ, আর সিনেমায় নিজের মতো ভাষা তৈরির ক্ষমতা। নির্ঝর সেটা করেছেন। এবং অভিনেতাদের দিয়েও সেটা করিয়ে নিয়েছেন।   
তিনবন্ধুর আজব সমস্যা, তার সমাধান, এবং জাদুবাস্তবতার আশ্চর্য ফাইন টিউন এমনিতেই গল্পটিকে কেমন যেন মায়াবী করে তোলে একটা সময়ের পর। আর সেই তিন বন্ধুর মাঝেই কখনও উঠে আসেন মানি, ডাক্তার বা নিষিদ্ধ ড্রাগের পার্টিতে এক ছোট্ট সাজেস্টিভ চরিত্র হয়ে আসা এক সঙ্গী, যে নিজের ক্ষমতা দেখানোর তাগিদে ফ্রিজ থেকে দুটো বিয়ারের বোতল নিয়ে বসে পড়ে অচেনা নেশাখোরদের আড্ডায়। আর সেই মেয়েটি, যাঁকে একমাত্র প্রথম এপিসোডেই দেখা গিয়েছিল, তাঁর প্রেমের অসাংবিধানিক লাফালাফি, আগাগোড়া আপনাকে জ্বালাতন করতেও বাধ্য। 
না, আমি এখনও গল্পটা বলিনি। কথা রেখেছি। প্রথমেই বলেছিলাম গল্প বলব না। ছবি আঁকাকে যদি কেই গদ্যে অনুবাদ করতে বলে, আপনি পারবেন?‌ মল্লার কিম্বা সাহানা রাগের বিস্তারকে যদি বানান করে লিখতে বলে পারবেন?‌ পারবেন না তো?‌ তেমনই সিনেমার গল্প কখনই লেখা যায় না। কারণ ওটি সম্পূর্ণ একটি আলাদা মাধ্যম। শুধু আভাস দেওয়া যায়। আমি সেটাই দিলাম। এবার দেখার কাজ আপনাদের। 
ও হ্যাঁ, আরেকটা কথা আলাদা করে বলতেই হচ্ছে। এই কথাটা ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিষ্ঠিত, যে নতুন  শিল্পীরা গতে বাঁধা কাজ না করলে তেমন কলকে পান না। নির্ঝর সেই সুযোগ পেয়েছেন। আড্ডাটাইমসে প্রযোজকদেরও তাই সাধুবাদ প্রাপ্য। তাঁরা কিন্তু সাহসটা দেখিয়েছেন। আর একটা লাইন, অবশ্যই অভিনেতাদের কথা আলাদা করে বলতে হয়। কারণ, দেখে মনে হয়, তাঁরা কেউই পেশাদার অভিনেতা নন। তবে তাঁদের দক্ষতা দেখে একটুও সন্দেহ হয় না। বরং সখের অভিনেতা হিসাবে হালকা হিংসা হয়।   

জনপ্রিয়

Back To Top