অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: কী ভুলে যাই আমরা, জীবনে?‌ যা ভুলতে চাই, সেটা হয়তো সারাক্ষণই জেগে থাকে মনে। কিছুতেই যা ভুলতে চাই না, সময়ের স্রোতে, কখনও সেটা হয়ত মনেই পড়ে না। জীবনের এ এক আশ্চর্য খেলা।
কিন্তু যখন কোনও মানুষ অ্যালজাইমার্স-‌এ আক্রান্ত, তাঁর কী মনে পড়বে কখন, তিনি কী কী ভুলে যাবেন, সঠিকভাবে কেউ-‌ই জানেন না। না তাঁর পাশের মানুষ, না তাঁর ডাক্তার।
এমনই এক প্রবীণ মানুষ অধ্যাপক অমিতাভ সরকার (‌সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়)‌ আছেন ‘‌শ্রাবণের ধারা’‌র কেন্দ্রে। তাঁর পাশের মানুষ, তাঁর থেকে বয়সে অনেক ছোট, তাঁর স্ত্রী শুভা (‌গার্গী রায়চৌধুরি)‌। তাঁর ডাক্তার হলেন নীলাভ রায় (‌পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়)‌। আর, অমিতাভর পছন্দ বলে সারাক্ষণ নীল শাড়ি পরেন শুভা, ব্যবহার করেন পুরনো দিনের চশমার ফ্রেম। ভেতরে ভেতরে পুষে রাখা ভয়, ‘‌যদি হঠাৎ করে আমায় চিনতে না পারেন?‌’‌ তাই নীল শাড়ি। তাই পুরনো চশমার ফ্রেম।
এই কথা যখন ডাক্তার নীলাভ রায়কে বলেন শুভা, তখন ভালবাসার ভেতরে থাকা এক গভীর দুঃখ যেন স্পর্শ করে দর্শকদের। ভালবাসার তো ফর্মুলা নেই। কিন্তু জড়িয়ে থাকা আছে। দুঃখ পাওয়া আছে। সেই দুঃখের ভেতরে আছে আনন্দের আলো। সেই আলোর সন্ধান করেছে ‘‌শ্রাবণের ধারা’‌।
ডাক্তারের কাছে
ডাক্তার নীলাভ রায়ের কাছে অধ্যাপক অমিতাভ সরকারকে অ্যালজাইমার্সের চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসেন তাঁর স্ত্রী শুভা। শুরু হয় ‘‌শ্রাবণের ধারা’‌। সুদেষ্ণা রায় ও অভিজিৎ গুহর নতুন ছবি। ছবির বিষয়বস্তু, ছবির নির্মাণ, অভিনয়—সব মিলিয়ে সুদেষ্ণা-‌অভিজিৎ পরিচালক জুটির সেরা সিনেমা ‘‌শ্রাবণের ধারা’‌। এই ছবিতে জীবনের রহস্য আছে কিন্তু অতি নাটকীয়তা নেই। এমন কি এ ছবির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েই আছে থ্রিলারের আঁচও, কিন্তু গিমিক নেই।
অ্যালজাইমার্সের সেই অর্থে কোনও চিকিৎসা নেই, একথা জানিয়ে দিয়েও চিকিৎসা শুরু করেন নীলাভ রায়। কী ভুলে গেছেন অমিতাভ সরকার?‌ কেন এত বয়সের তফাৎ তাঁর সঙ্গে তাঁর স্ত্রী শুভার?‌ কী মনে আছে অমিতাভবাবুর?‌ নানান প্রশ্ন। উত্তর খুঁজতে চান ডাক্তার।
এবং, ঘটনাচক্রে আমরাও জানতে পারি, ডাক্তারেরও বোধহয় চিকিৎসা দরকার। তাদের দাম্পত্য ভাঙনের মুখে। উত্তর কলকাতার টালা পার্ক থেকে দক্ষিণের বহুতলের বাসিন্দা নীলাভ রায়। যশ, খ্যাতি, অর্থ তাঁর আয়ত্বে। কিন্তু ভেঙে যাচ্ছে তাঁর সংসারের চালচিত্র। ভেঙে যাচ্ছে দাম্পত্য। স্ত্রী পৃথার (‌বাসবদত্তা)‌ অভিযোগের সামনে নীলাভ বলে ওঠেন, মধ্যবিত্তপনার আঁশটে গন্ধ নিয়েই বাঁচতে হবে কেন?‌
বড়লোকের নার্সিংহোমে পিসিকে চিকিৎসার জন্যে নিয়ে আসে সুব্রত (‌পদ্মনাভ দাশগুপ্ত)‌, যে কিনা নীলাভ-‌র একদা ‘‌সুবুদা’‌, যার সঙ্গে টালাপার্কের মাঠে ফুটবল খেলতেন নীলাভ এবং যাকে নার্সিংহোমের ‘‌অভিজাত’‌ পরিবেশে ‘‌নীলুয়া’‌ বলে ডেকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে দেয় ‘‌অটো-‌ওলা’‌ সুব্রত।
তিন জীবনের গল্পকে সুন্দর মিলিয়েছেন দুই পরিচালক। শুভেন্দু সেনের কাহিনী জীবনের গভীর কিছু সত্যকে ছুঁতে চেয়েছে, ফর্মুলার বাইরে গিয়েই। এবং এই কাহিনীকে বাস্তব-‌ছোঁয়া চিত্রনাট্যে রূপ দিয়েছেন পদ্মনাভ দাশগুপ্ত। ধরেছেন জীবনের বহুমাত্রিকতাকে। সুখ এবং অ-‌সুখের মাঝখানে থাকা জীবন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সুদেষ্ণা-‌অভিজিতের ‘‌শ্রাবণের ধারা’‌য়।
প্রথমেই সৌমিত্র
অভিনয় এছবির সম্পদ। প্রথমেই বলতে হয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কথা। এক এবং অদ্বিতীয় সৌমিত্র। কতটা  দক্ষতা হাতের মুঠোয় থাকলে স্মৃতি-‌বিস্মৃতির মধ্যে থাকা এমন একটা চরিত্র অনায়াসে (‌যা আসলে মোটেই অনায়াস নয়)‌ স্পষ্ট করা যায়, এছবির অমিতাভ সরকার তার একটা বড় দৃষ্টান্ত। তাঁর সঙ্গে শুরু থেকে শেষ সমানতালে অভিনয় করার চ্যালেঞ্জটা নিয়েছেন শুভা সরকার হয়ে গার্গী রায়চৌধুরি। এবং তিনি সফল। এছবির মূল রহস্য তো শুভাকে ঘিরে। নানান বাঁকে তাঁর পাল্টে পাল্টে যাওয়াকে দক্ষতার সঙ্গে স্পষ্ট করেছেন গার্গী। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো পিতৃতুল্য মানুষটির সঙ্গে তাঁর নিবিড় দাম্পত্য ও মমতাকে বড় যত্নে পর্দায় এনেছেন তিনি। ডাক্তার নীলাভ রায়ের চরিত্রে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় তাঁর ব্যক্তিত্বে এবং অভিনয়ের স্বাভাবিকতায় মুগ্ধ করেন। দক্ষিণভারতীয় নার্সের চরিত্রে দামিনী বেণী বসু খুব ভাল। ভাল অভিনয় করেছেন বাসবদত্তা। ছোট্ট মেখলার চরিত্রে রোজ ভারি মিষ্টি। ছোট ছোট চরিত্রে বিমল চক্রবর্তী, সুচন্দ্রা চৌধুরি, রায়তি, পিংকি চট্টোপাধ্যায়, ছন্দা চট্টোপাধ্যায়কে ভাল লাগে। আর, মন ছুঁয়ে গেছে সুব্রত তথা নীলাভর ‘‌সুবুদার’‌ চরিত্রে পদ্মনাভ দাশগুপ্তর অভিনয়।
ছবিতে ‘‌শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে’‌ রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্যাবহার খুব সুন্দর। ভাল গান লিখেছেন দুর্বা সেন। ক্যামেরায় প্রভাতেন্দু মণ্ডল প্রশংসনীয়। সুজয় দত্তরায়ের সম্পাদনা উল্লেখযোগ্য।
আশু-‌অভিষেকের সঙ্গীতও ভাল। তবে, এছবিতে সব গানের ব্যবহারই খুব প্রয়োজনীয় কি না, প্রশ্ন উঠতে পারে। ডাক্তার নীলাভর ওপর বাড়িসুদ্ধ লোকের এত রাগ কেন, এই প্রশ্নও হয়ত স্বাভাবিক। কিন্তু এমন দু-‌একটা প্রশ্ন বাদ দিলে, ‘‌শ্রাবণের ধারা’‌ এক অন্য স্বাদ বাংলা ছবিতে, সন্দেহ নেই। ‌
সব নদী?‌
‘‌সব পাখি ঘরে আসে’‌। কবিতা-‌ভালবাসা স্মৃতি-‌ভ্রষ্ট অমিতাভ সরকার বারবার এই লাইনটাই উচ্চারণ করেন। শুভা চেষ্টা করেন পরের লাইনগুলো মনে পড়ানোর। জিজ্ঞেস করেন, ‘‌সব নদী‌?‌ বলো, সব নদী?‌’ মনে পড়ে না অমিতাভর। অনুরণিত হতে থাকে ‘‌সব পাখি ঘরে আসে। সব নদী?‌’‌ 
সব নদী?‌ এটা জীবনেরই প্রশ্ন হয়ে ওঠে। কী উত্তর দেবে জীবন?‌ উত্তর কি হয়?‌ এমন এক অনিশ্চিত, গভীর প্রশ্নই শেষ পর্যন্ত জাগিয়ে রাখে শ্রাবণের ধারাকে। এবং, মনে হয়, এই প্রশ্নের মধ্যেই নিহিত আছে এর উত্তর। এই উত্তরটাই খুঁজে যেতে হয়। সারা জীবন। ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top