সোমনাথ গুপ্ত: ডায়েরির পাতায় ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর হাতের লেখা যখন রঙ পরিবর্তন করতে শুরু করল সূচনাতেই, তখনই পরিচালক সন্দীপ রায় আভাস দিয়ে দিলেন একটা রহস্য এবং কল্পবিজ্ঞানের মায়ায় তিনি জড়িয়ে ফেলবেন দর্শকদের। সত্যজিৎ রায়ের লেখার ক্ষেত্রেও শঙ্কু সিনিয়ার ফেলুদার থেকে। ১৯৬২তে সাহিত্যে আসে শঙ্কু। তারও ৩ বছর বাদে ফেলুদা। কিন্তু, ফেলুদা সেই কবে, ১৯৭৪ সালে প্রথম বড়পর্দায় এল স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে। তার ৪৫ বছর পরে সত্যজিৎ-‌পুত্র সন্দীপ রায় শঙ্কুকে বড়পর্দায় আনলেন প্রথম।
এই ভাবনাটার জন্যেই সন্দীপ রায়কে প্রথমেই অভিনন্দন। শঙ্কুকে বড়পর্দায় আনার ভাবনা সহজ নয়। যথেষ্ট সাহসের কাজ। এবং তার জন্যে দরকার যথেষ্ট প্রযুক্তিগত সাহায্য এবং পরিচালকের কল্পনা।
ডায়েরির লেখার রঙবদল তো সূচনামাত্র। তারপর বিদেশী দুই বন্ধুর সঙ্গে যেভাবে ভার্চুয়াল ভিডিও কনফারেন্স করেন প্রোফেসর শঙ্কু তাঁর গিরিডির বাড়িতে বসে, তা সত্যিই প্রশংসনীয় ভাবনা। এভাবে ক্রমশ আরও চমক ও চমৎকারিত্বের দিকে এগিয়ে যায় ‘‌প্রোফেসর শঙ্কু ও এল ডোরাডো’‌।
নকুড়বাবুর আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রোফেসর শঙ্কু হয়ে ওঠেন আদ্যপান্ত বাঙালি। আহা, কী চমৎকার শঙ্কু ও নকুড়বাবুর কথোপকথন।
সত্যজিতের শঙ্কুর ভক্ত হাজার হাজার। তাঁদের কল্পনায় শঙ্কু এতদিনে যে উচ্চতায় পৌঁছেছেন, সেখানে যাওয়াটা যে কোনও চিত্রপরিচালকের পক্ষেই কঠিন কাজ। সেই কঠিন কাজটা কিন্তু দক্ষতার সঙ্গে করেছেন সন্দীপ রায়।
নকুড়বাবুর হঠাৎ পাওয়া ‘‌দিব্যদৃষ্টি’‌কে সঙ্গে করে প্রোফেসর শঙ্কুর বিদেশ যাত্রা। ব্রাজিল। আমাজনের জঙ্গল। শঙ্কুর বিজ্ঞানের আশ্চর্য ঝলক। চূড়ান্ত কোনও মুহূর্তে তাঁর আবিষ্কৃত অ্যানাইহিলিন পিস্তলের ব্যবহার চমকপ্রদ। মিরাকিউরলের শক্তিও দেখা গেল চোখের সামনে।
শঙ্কুর চরিত্রে ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় সত্যিই মুগ্ধ করেছেন। আর ‘‌নকুড়বাবু’‌ শুভাশিস মুখোপাধ্যায় তো দুর্দান্ত। বিদেশী অভিনেতা, অভিনেত্রীরা এতটাই স্বাভাবিক যে, মনে হয় না তাঁরা অভিনয় করছেন। ছোট্ট চরিত্রে শুভ্রজিৎ দত্তকেও ভাল লাগে।
সৌমিক হালদারের ক্যামেরা প্রশংসনীয়। সন্দীপ রায় নিজে আবহ সঙ্গীত তৈরি করেছেন, যেখানে মিশেছে ব্রাজিলের লোকসঙ্গীতের সুর। প্রশংসনীয় কাজ।
ফেলুদা যেমন, শঙ্কুও তেমন পাঠকদের এবং দর্শকদের দারুণ একটা ভ্রমনে সঙ্গী করে নেয়। এখানেও নিয়েছে। এবং বাড়তি পাওনা—অবশ্যই রহস্যময় এল ডোরাডো।
আর, সবচেয়ে বড় কথা, কোনও লোভ টলাতে পারে না ফেলুদাকে যেমন, শঙ্কুকেও। আজকের ছোটদের জন্যে শুধু নয়, বড়দের জন্যেও তাই বারবার দরকার শঙ্কুকে। আশা করা যায়, পরিচালক ও প্রযোজক জুটি দর্শকদের নিরাশ করবেন না।
আর, যে ভি এফ এক্স শঙ্কু ছবিতে ব্যবহৃত, সবই এই কলকাতাতেই করা সম্ভব হয়েছে। গিরিডির প্রোফেসর নিশ্চয়ই খুশি হবেন কলকাতার সাফল্যে।

জনপ্রিয়

Back To Top