সম্রাট মুখোপাধ্যায়: শঙ্কর মুদি। পরিচালনা:‌ অনিকেত চট্টোপাধ্যায়। অভিনয়ে:‌ কৌশিক গাঙ্গুলি, শ্রীলা মজুমদার, অঞ্জন দত্ত, যিশু সেনগুপ্ত, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, অঙ্কিতা চক্রবর্তী, কাঞ্চন মল্লিক, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়, বিশ্বনাথ বসু
নস্টালজিয়া। বাঙালির পাড়া কালচার নিয়ে। পাড়ার ছোট্ট ছোট্ট দোকান আর সেখান থেকে আনা রোজকার চাল,‌ তেল, নুন, লকড়িতে ভর করে বাঁচায়।
রাজনীতি। লড়াই। এক দৈত্যের বিরুদ্ধে। বহুজাতিক পুঁজির ভোগ্যপণ্যে বাজার ছেয়ে যাওয়া, মধ্যবিত্তের হেঁশেল থেকে ড্রেসিং টেবিলে বদল চলে আসা, আর শপিং মলের বাজারি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে।
শঙ্কর নামের সাধারণের থেকেও সাধারণ এক মুদিকে কেন্দ্রে রেখে বাঙালি জীবনের এই ভোলবদলের গল্পটাই বলতে চেষ্টা করেছেন অনিকেত চট্টোপাধ্যায়। হালফিলের বাংলা ছবি নিয়ে একটা অভিযোগ বহুশ্রুত। যে এই সময়ের অধিকাংশ ছবিতেই এই–সময়টা ধরা পড়ছে না। ধরা থাকছে না। অনিকেতের এ ছবি নিয়ে সে অভিযোগ করার সুযোগ কেউই পাবেন না। যে সময়ের ভেতর দিয়ে আমরা চলেছি, তার ভেতরের বিপন্নতাগুলোকে ছোট ছোট আঁচড়ে বেআব্রু করে দেখিয়েছেন অনিকেত। তাঁর সাহস ও সততা উভয়ই অভিনন্দনযোগ্য।
একসময় অনিকেত চট্টোপাধ্যায় মানেই ছিল ‘‌স্ল্যাপস্টিক কমেডি’‌ এবং বক্স অফিসে অব্যর্থ সাফল্য। অনিকেত যে সেটাকেই ‘‌ফর্মুলা’‌ বানিয়ে নিশ্চিন্ত স্টেশনে আটকে থাকেননি, এটার জন্যও খানিকটা তারিফ তাঁর প্রাপ্য। বরং ধারাবাহিকভাবে তাঁর ছবি যাঁরা দেখেন, তাঁরা জানেন যে গত কয়েক বছর ধরে যে ছবিই অনিকেত করুন না কেন, তা সে কমেডি–‌রোমান্স–অ্যাকশন যাই হোক না কেন, তাতে রাজনৈতিক অভিঘাত খানিকটা থেকেই যাচ্ছে। আর সেটাই চূড়ান্তে পৌঁছেছে ‘‌শঙ্কর মুদি’‌তে এসে। পরিচালক–‌কেরিয়ারে যে ‘‌আইডেন্টিটি’‌–‌তে অনিকেত পৌঁছোতে চাইছিলেন। এ ছবি আর রূপকে রাজনৈতিক নয়। সরাসরি রাজনৈতিকই। যার গড়ন অনেকটাই ‘‌পোস্টার প্লে’‌র মতো সরাসরি। আর পোস্টার প্লে–‌র অবশ্যম্ভাবী মেজাজটি গড়ে দিয়েছে কবীর সুমনের কণ্ঠ ও সুর। এ ছবি তাঁরও মূর্ত স্বাক্ষর। এই দেশের এক রাজ্যে শঙ্কর (‌কৌশিক গাঙ্গুলি)‌ নামে এক মুদি বাস করত। সুখে–‌অসুখে সর্বদাই শান্তিপ্রিয় ছিল এই মুদি আর তাকে ঘিরে থাকা মানুষজনও ছিল মোটের ওপর ভালই। কেউ কেউ পুরো সাদা। আর যারা কালো, তাদের ভেতরও খানিকটা করে সাদা আছে। এমনটাই প্রায় রূপকথা ঢঙে এ ছবির শুরু থেকে মধ্যভাগ। খানিকটা ইচ্ছাপূরণের সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে। কিন্তু তারপর ‘‌কালো’‌ এল। কালো মেঘ। আর সেটা ঘনিয়ে আনল সময় আর বড় পুঁজির ঢুকে পড়া। যা একরোখা দৈত্যের মতো তছনছ করে দিয়ে গেল ছোট ছোট শান্তির নীড়গুলোকে।
অনিকেতের কমেডি–‌পর্বের ছবিগুলোর জোর ছিল তাঁর ‘‌অনসঁম্বল–‌কাস্টিং’‌। একাধিক ভাল চরিত্রাভিনেতা নানা দৃশ্যে ছড়িয়ে থেকে সবকটা ‘‌সিকোয়েন্স’‌কেই থিয়েটারের ভাষায় যাকে বলে ‘‌তুলে’‌ রাখত। এ ছবিতেও একই কৌশল একটু অন্যভাবে নিয়েছেন অনিকেত। কৌশিক গাঙ্গুলির মতো এই সময়ের একজন নির্ভরযোগ্য আর প্রধান অভিনেতাকে কেন্দ্রে রেখে, তাঁর সবলতা এবং ‘‌ম্যানারিজম’‌ উভয়কে মাথায় রেখে অনিকেত চিত্রনাট্য সাজিয়েছেন তো বটেই। পাশাপাশি আর একটা কাজ করেছেন। অসংখ্য ভাল অভিনেতা–‌অভিনেত্রীকে যাতে কাজে লাগানো যায়, তাই ছবি জুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন অসংখ্য চরিত্রকে। বৈচিত্র‌্যে, জীবনের রঙে যারা বহুমুখী। একজন সমাজসচেতন অধ্যাপক, যিনি দোকান করতে এসে ভারী গলায় অর্থনীতির রাজনীতি আলোচনা করেন (‌অঞ্জন দত্ত)‌, একজন মস্তান যে ‘‌লোকাল’‌ রাজনীতি সামলায় আর অটোর ‘‌লাইন’‌ বুঝে নেয় (‌শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়)‌ এমন সব মানুষের পাশেই থাকে দর্জির দোকান চালানো সম্ভ্রমহারা এক মানবী (‌অঙ্কিতা চক্রবর্তী)‌ কিংবা নাপিতের কাজ করা এক রগুড়ে মানুষ (‌কাঞ্চন মল্লিক)‌। সব মিলিয়ে যেন গোর্কির ‘‌নীচের মহল’‌। তবে অনিকেতের এইসব আঁচড়ের মধ্যে সবচেয়ে জোরালো বোধহয় দুপুর রোদের বহুরূপী (‌রুদ্রনীল ঘোষ)‌ আর মধ্যরাতের মাতাল (‌যিশু সেনগুপ্ত)‌। সামান্য স্থানসঙ্কুলানেই যেভাবে এই দুই অভিনেতা দুই চরিত্রকে যথাক্রমে প্রয়োজনমতো অ–‌নাটকীয়তা এবং নাটকীয়তায় ধরে দিয়েছেন, তা মুগ্ধ করার মতোই। কৌশিক গাঙ্গুলি তো আরেকবার দ্বিধায় ফেলে দিয়েছেন, কোন ভূমিকায় তাঁকে পেলে বাংলা ছবি উপকৃততর হবে, পরিচালক না অভিনেতা?‌ শঙ্করের স্ত্রীর চরিত্রে শ্রীলা মজুমদারও জায়গায়– জায়গায় তাঁর সোনালি দিনগুলো মনে করিয়ে দিয়েছেন।
এ ছবির দুর্বলতা নেই?‌ আছে। যেমনটা যে কোনও পোস্টার নাটকে থাকে। তবু তা জেনেও যে ছবির পরিণতি বদলাননি অনিকেত, সত্যবদ্ধ থেকেছেন, তার জন্যও তারিফ প্রাপ্য তাঁর।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top