আমির খান এবার উপহার দিলেন ‘‌সিক্রেট সুপারস্টার’‌। এক টিন-‌এজ কন্যার গান নিয়ে স্বপ্নপূরণের যাত্রা। কিন্তু এই ছবি আর একবার আমাদের মনে করিয়ে দিল, আমাদের স্বপ্নযাত্রার পেছনে আসল চালিকাশক্তি আমাদের মা। তিনিই আমাদের জীবনের নিভৃত মহাতারকা।

অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

আমাদের জীবনে, খুব সন্তর্পনে, জীবনের সিক্রেট সুপারস্টারের ভূমিকা পালন করে যান আমাদের মা। এটা বুঝতে হয়ত আমাদের অনেকটা সময় চলে যায়। অনেক সময় সেটা আমরা কিছুটা বুঝে, কিছুটা না বুঝেই এগিয়ে চলি আমাদের যাত্রাপথে। আর, আমাদের পেছনে চালিকাশক্তির মতো থেকে যান আমাদের মা। সর্বংসহা এক চালিকাশক্তি। সেই মা-‌কে আর একবার আবিষ্কার করলাম আমরা, ‘‌সিক্রেট সুপারস্টার’‌ ছবিতে, যে ছবির চালিকাশক্তি তথা প্রযোজক আমির খান।
সোজা সাপটা ভাবে দেখলে এই ছবি এক মধ্যবিত্ত পরিবারের টিন-‌এজ মেয়ে ইনসিয়ার (‌জায়রা ওয়াসিম)‌ স্বপ্নপূরণের গল্প। আদতে কিন্তু বাণিজ্যিক ভাবনাকে মাথায় রেখে এক ইচ্ছাপূরণের গল্প বলেছে এই ছবি। ভাবনাটা বাণিজ্যিক বলে অনেক কিছুর পেছনে যুক্তিটা দৃঢ়ভাবে গাঁথা হয়নি। সুর আর কথা তো কোন সুদূর থেকে এসে ঢুকে পড়ে ইনসিয়ার মাথায় এবং হৃদয়ে। সেটা বুঝতে অসুবিধে হয় না। কিন্তু এত সুন্দর গিটার বাজানো কীভাবে শিখল সে?‌ কড়া ঘেরাটোপে থাকা স্কুল থেকে ছ’‌ঘণ্টার মধ্যে ভাদোদরা থেকে প্লেনে মুম্বই গিয়ে খ্যাপাটে সঙ্গীতপরিচালক শক্তিকুমারের (‌আমির খান)‌ সঙ্গে দেখা করে ফিরে আসাটা কতখানি বাস্তবোচিত, প্রশ্ন উঠতে পারে এনিয়েও। কিন্তু এইসব প্রশ্নকে আড়াল করে দেয় এই ছবির মন ভাল-‌করে দেওয়া এক স্বপ্ন ছোঁয়ার আখ্যান, যা আমরা চাই জীবনে ঘটুক, যা সচরাচর ঘটেনা। আর, এই সব ঘটনার আড়ালে সর্বংসহ চালিকাশক্তির মতো উপস্থিতি ইনসিয়ার মায়ের (‌মেহের ভিজ)‌, যিনি আসলে পুরুষতন্ত্রের শিকার, যিনি ইনসিয়ার বাবার (‌রাজ অর্জুন)‌ হিমশীতল, নির্মম অত্যাচারের পরেও মেয়ের স্বপ্নের পাশে দাঁড়ান, অবিচলভাবে। এই মাকে নতুন করে আবিষ্কারের ছবি ‘‌সিক্রেট সুপারস্টার’‌।
স্বপ্নের কোনও সীমান্ত নেই
‘‌সিক্রেট সুপারস্টার’‌ থেকে ইনসিয়ার সত্যি-‌সত্যিই সুপারস্টার হয়ে ওঠার গল্প বলে এই ছবি। বাবা জানলে অগ্নিকাণ্ড ঘটাবে, তাই মায়ের পরামর্শে বোরখায় মুখ ঢেকে, শুধু স্বপ্ন-‌মাখা চোখ দুটো খুলে, গিটার হাতে গান গেয়ে ইউটিউবে রিলিজ করে দেয় ইনসিয়া। গায়িকার নাম সেখানে ‘‌সিক্রেট সুপারস্টার’‌। এই গানের ভিডিও খুব দ্রুত লাইকে-‌এ লাইক-‌এ ভাইরাল হয়ে যায়। ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। টিভি চ্যানেলের রিয়্যালিটি শো-‌এ আলোচনা হয় সিক্রেট সুপারস্টারের গান নিয়ে। এবং এই গান পৌঁছে যায় খ্যাপাটে সঙ্গীত পরিচালক শক্তিকুমারের কাছেও। এদিকে, ইনসিয়ার রক্ষণশীল পরিবারে মায়ের ওপর বাবার অত্যাচার কখনও কখনও মাত্রাছাড়া হয়ে দাঁড়ায়। মেয়েকে গিটার থেকে ল্যাপটপ কিনে দেওয়ার পেছনে মায়ের গয়না বিক্রির গোপন কথাও এক সময় তার বাবা টেনে বার করে। এবং নির্মম শারীরিক অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে ওঠেন মা। তবুও, মেয়ের স্বপ্নের পাশেই থেকে যান। অথচ, মেনে নিতে বাধ্য হন স্বামীর যাবতীয় হুকুম। সংসার বড় বালাই!‌ কতদিক সামলে চলতে হয় মাকে। সমাজের চোখরাঙানি আছে, আর্থিক অনিশ্চয়তা তো আছেই। মায়ের নির্যাতন দেখে ইনসিয়া চায়, মা ডিভোর্স করুক। এমন কথা তো শোনাও পাপ মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ জর্জরিত সমাজে!‌
ইনসিয়ার স্বপ্নপূরণের যাত্রা দেখে বহু ছেলেমেয়েই অনেকটা ভরসা পাবে নিজেদের পথে চলার। অনেক অভিভাবক লজ্জা পাবেন তাঁদের চাপিয়ে দেওয়া ‘‌বড়’‌ হওয়ার ফর্মুলার জন্যে। যে গায়ক হতে চায়, যে ভাল ফুটবল খেলে, যে ছবি আঁকার স্বপ্ন দেখে, তাদের সবাইকে শেকল পরিয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বানানোর এক বগ্গা জেদ থেকে একটু সরে আসার সাহস দিতে পারে এই ছবি।
আমির এছবিতে প্রধান ভূমিকা নিয়ে সারা ছবি জুড়ে থাকার চেষ্টা করেননি। এক খ্যাপাটে, নিজের কৃতিত্বে নিজেই কৃতার্থ এক সুরকার শক্তিকুমার হয়ে কিছুটা ব্যঙ্গই করেছেন আজকের অনেক হৃদয়-‌বর্জিত গানকে। ‘‌বডি ল্যাঙ্গুয়েজ’‌ দিয়ে গান গাওয়ানোর জেদ তাঁর। আর, ইনসিয়া চায় হৃদয় দিয়ে গাইতে। দাপুটে শক্তিকুমারকে হার মানতে হয় ইনসিয়ার কাছে।
এছবিতে ছোট ছোট অনেক দৃশ্য, অনেক ঘটনা আছে যা জীবনের বড় কাছাকাছি। ইনসিয়ার স্কুলের নাছোড়বান্দা সহপাঠী চিন্তন (‌তীর্থ শর্মা)‌ তো অসাধারণ। তাকে পাত্তা দেয় না ইনসিয়া। বিরক্ত হয়। এক সময় নিজের ই-‌মেলের পাসওয়ার্ড চিন্তনের হাতে লিখে দেওয়ার দৃশ্যটি অপাপবিদ্ধ প্রেমের এক মহার্ঘ্য উপহার।
এই ছবিতে দঙ্গল-‌খ্যাত কিশোরী জাইরা একেবারে অন্য রূপে। ভারি মুগ্ধ করে তার অভিনয়। চিন্তনের ভূমিকায় তীর্থ শর্মা তো দুর্দান্ত। ইনসিয়ার ছোট ভাইয়ের ভূমিকায় বিজ্ঞাপনের চেনা মুখ ছোট্ট কবির শেখও মন ভরিয়ে দেয়। ইনসিয়ার ঠাকুমা বড়ি আপা-‌র চরিত্রে ফারুক জাফরও ঠিক সময়ে জ্বলে ওঠেন। ইনসিয়ার বাবার চরিত্রে রাজ অর্জুন স্বাভাবিক হিমশীতল অভিনয়ে যতবার পর্দায় এসেছেন, ততবার আমাদের ভয়-‌ভয় করেছে, এই বুঝি ইনসিয়ার মায়ের ওপর অত্যাচার শুরু করবে তার বাবা। আর, ইনসিয়ার মা নাজমার চরিত্রে মেহের ভিজ আমাদের হৃদয় স্পর্শ করেন। দুটি ছোট চরিত্রে (‌নিজেদের ভূমিকাতেই)‌ শান আর মোনালি ঠাকুর দারুণ চমক। এবং শক্তিকুমারের চরিত্রে আমির খান নতুন ম্যানারিজমে, খ্যাপাটেপনায়, রুক্ষতায় এবং শেষ পর্যন্ত আবেগের টানাপোড়েনে অনবদ্য হয়ে উঠেছেন।
পরিচালক অদ্বৈত চন্দন প্রথম ছবিতেই তাঁর জাত চেনালেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি আমিরের ম্যানেজার। সঙ্গ-‌গুণ কাকে বলে!‌
অমিত ত্রিবেদীর সুর সুদূরপ্রসারী। নবাগতা মেঘনা মিশ্রর গান মনে থেকে যাবে দর্শক-‌শ্রোতাদের। ইনসিয়ার গান তো সারা দেশের মন জয় করল মেঘনার কণ্ঠ দিয়েই।
মহাতারকা তো মা-‌ই
এছবি যতই ইনসিয়ার সুপারস্টার হওয়ার গল্প হোক না কেন, তার মা-‌ই যে আসল মহাতারকা, সিক্রেট সুপারস্টার, একথা শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছে এই ছবি। পৃথিবীর সমস্ত মা-‌কে সেলাম জানাচ্ছে সিক্রেট সুপারস্টার। এমন কি, শেষ দৃশ্যে, যখন নিজের ছেলের সঙ্গে বিদেশ যাচ্ছেন ইনসিয়ার ঠাকুমা, যখন ইনসিয়া আর তার মা নিজের পথে চলার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে, তখন এই ঠাকুমা ছেলেকে গোপন করে তাদের এগিয়ে যেতে বলে নিজের পথেই। এই দৃশ্যটি প্রমাণ করে দেয় মায়েরও মা আছে। সেই মা-‌ও তো গোপনে সুপারস্টার হয়ে উঠলেন আমাদের সামনে। স্বপ্ন দেখা মানুষেরা প্রণাম জানায় সেই মা-‌কেও। আদতে, সিক্রেট সুপারস্টার প্রণত বিশ্বের সমস্ত মায়ের কাছে। এই প্রণাম শক্তি দেয় স্বপ্নকে।   

জনপ্রিয়

Back To Top