সম্রাট মুখোপাধ্যায়: শরৎচন্দ্রে তাঁর অনুরাগ সর্বজনবিদিত। বছর নয়েক আগে বলে–‌কয়ে ‘‌দেব ডি’‌ করেছিলেন অনুরাগ কাশ্যপ। ‘‌দেবদাস’‌ থেকে। অথচ এবার না ব‌লে সেই শরৎচন্দ্রেই ‘‌স্বামী’‌ করলেন অনুরাগ!‌ নাম দিলেন ‘মনমর্জিয়া‌’‌। বিন্দুমাত্র ঋণ স্বীকার না করে!‌
বাংলার গ্রামীণ কাহিনীকে তিনি নিয়ে গেছেন পাঞ্জাবের অমৃতসরে। তাতে দৃশ্যত:‌ গ্রামীণ শিব মন্দিরের জায়গা নিয়েছে ঝাঁ–‌চকচকে স্বর্ণমন্দির। বাঙালি সৌদামিনী –‌ নরেন্দ্র–‌ঘনশ্যামেরা হয়ে উঠেছে রুমি বাগ্গা (‌‌তাপসী পান্নু)‌‌, ভিকি সান্ধু (‌ভিকি কৌশল)‌‌, রবি (‌রবি ভাটিয়া)‌। ঘটনাক্রম ১০০ বছর পরে চলে এলে সাম্প্রতিকতার যেসব ঝকমকে পালিশগুলো লেগে যায়, তাঁর সবই অনুরাগের এই ‘‌প্যাকেজিং’‌–‌এ আছে। ব্যান্ডের গান, এন আর আই ব্যাঙ্কার, মহিলা হকি খেলোয়াড়–‌‘‌টপিং’‌–‌এ, ‘‌টপিং’‌–‌এ ঐ ছবি ছয়লাপ। সবই আছে। নেই শুধু এদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় বাঙালি ঔপন্যাসিকের নাম, যাঁর কাহিনী আজও বলিউড ‌মেইন–‌স্ট্রিম কিংবা ‌‌উত্তর আধুনিক ছবিকেও প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে!‌ 
ছবিতে ঘটনাস্থল আর ঘটনাক্রমের যতই অদল–‌বদল হোক, বা ছোট–‌খাটো যেটুকু সরে আসাই থাকুক, মূল চিত্রনাট্য দাঁড়িয়ে আছে সেই তিনটি ভিতের ওপরেই। এক, পূর্ব প্রেমিক আর স্বামীর মধ্যে নায়িকার টানাপোড়েন আর সেই টানাপোড়েনে উত্তর–‌দাম্পত্য প্রেমিকের সঙ্গে গুপ্ত সম্পর্ক রাখা।

দুই, প্রেমিকের যুগপৎ অপদার্থতা ও স্বার্থপরতা। তিন, শেষমেশ হতাশ স্ত্রীর স্বামীর কাছেই ফিরে এসে আশ্রয় পাওয়া। দাম্পত্যের নির্ভরশীলতাকে বুঝতে শেখা। আবারও বলছি, এর মধ্যে অনুরাগ আর তাঁর ছবির ‘‌ক্রেডিট লাইন’‌–‌এর ঘোষিত কাহিনীকার কণিকা ধিঁলো অনেক কিছু নিজেদের মতো ঢুকিয়েছেন, সরিয়েছেন, ফেলে দিয়েছেন, যথা–‌রুমির প্রেমিকের সঙ্গে পলায়ন পর্ব ছোট হয়েছে, ইন্টারনেটে ‘‌ম্যাচমেকার’‌ ঘটককে নিয়ে মজা ঢুকেছে, উপন্যাসের চাপা যৌনতাটাকে উস্কে দেওয়া হয়েছে, স্বামীর কাছে শেষমেশ ফিরে আসার আগে অহেতুক ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার একটা বাড়তি নাটকের চমক এসেছে, ফেসবুক–‌হোয়াটস অ্যাপের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আর ভিডিও সেসেজের বিবিধ ‘‌টপিং’‌ও চড়ানো হয়েছে, তবু মূল কাহিনীর কাঠামো আর তার দর্শনে যে সেই শরৎচন্দ্রই দাঁড়িয়ে থেকেছেন। ঐ তিনটি মূল ভিত যে এত কিছু করেও আপনি সরাতে পারেননি অনুরাগজি। বরং প্রমাণ করে দিয়েছেন, আজও এই বদলে যাওয়া বলিউড–‌বাণিজ্যেও বাঙালির শরৎ চাটুজ্যে কতটা অমোঘ!‌ ঘুরিয়ে এই প্রমাণটুকু করার জন্য অবশ্যই আপনাকে ধন্যবাদ। শুধু শরৎবাবুর নামটুকু স্বীকার করতে কেন যে কার্পণ্য করলেন!‌ আশ্চর্য!‌ কেন যে শরৎবাবুর নামটা দিলেন না অনুরাগ?‌ ‘‌দেব ডি’‌–‌র সময় তো দিয়েছিলেন। সেটা কি এই ভাবনা থেকে যে ‘‌দেবদাস’‌ সর্ব ভারতীয় দর্শকের কাছে অতিপরিচিত, তার অন্তত:‌ ডজন খানেক অতীত ও সাম্প্রতিক ফিল্মি–‌ভার্সানের জোরে!‌
বাংলায় ‘‌স্বামী’‌ প্রথম পর্দায় আসে নির্বাক যুগে। ১৯৩১ সালে চারু রায়ের পরিচালনায়। দ্বিতীয়বার ঐ ছবি তৈরি হয় ১৯৪৯–‌এ।

পশুপতি চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায়। স্বামী ঘনশ্যাম হন পাহাড়ি সান্যাল, স্ত্রী সৌদামিনী সুমিত্রা দেবী আর প্রেমিক নরেন্দ্র প্রদীপকুমার। বলাই বাহুল্য, ঐ দুটি ছবিই এখন দর্শকদের চোখের আড়ালে। এরপর ‘‌স্বামী’‌ হিন্দিতে বানান বাসু চট্টোপাধ্যায়। সেও ৪০ বছর আগে। ১৯৭৭–‌এ। ঐ তিন চরিত্র করেছিলেন যথাক্রমে গিরীশ কারনাড, শাবানা আজমি, বিক্রম। এই ছবির জন্য ঐ বছর ‘‌ফিল্মফেয়ার’‌ পুরস্কারে সেরা পরিচালক হন বাসু চট্টোপাধ্যায়, সেরা অভিনেত্রী শাবানা আজমি। এবং সেরা কাহিনীকারের মরণোত্তর পুরস্কার পান শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ৪১ বছর আগে বলিউড স্বীকৃতি দিয়েছিল বাঙালি ঔপন্যাসিককে।
মজার কথা, অনুরাগের এই ছবিও ঘুরিয়ে বিদেশের মাটিতে কিন্তু স্বীকৃতি দিয়ে ফেলেছে ‘‌স্বামী’‌ নামটাকে। টরেন্টো চলচ্চিত্র উৎসবে গত দু’‌সপ্তাহ আগে দেখানো হয়েছে এই ছবি। আর সেখানে ঐ ছবির ইংরেজি নাম ছিল ‘‌হাজবেন্ড মেটিরিয়াল’‌। বোঝা যায় যতই পাঞ্জাবি জীবন, সংস্কৃতি, দর্শককূল অনুরাগের ‘‌টার্গেট’‌ হোক না কেন, তাঁর হাতের আসল তীরটি সেই শরৎচন্দ্রেরই দেওয়া। সেই অমোঘ ‘‌স্বামী’‌র নির্ভরতা।
এতকিছু বলার পরে ছবির গল্পটা দু’‌লাইনে বলাই যথেষ্ট। প্রেমিক ভিকির প্রতি দুর্বলতা কিছুতেই মুছতে পারে না রুমি। স্বামীকে লুকিয়ে দেখা করে। ধরাও পড়ে যায়। ভিকি যথারীতি অপদার্থতাই দেখায় এই প্রেমকে সম্মান দেখাতে। রুমি ঘর ছেড়ে এসেও শেষ আশ্রয় পায় সেই স্বামী রবির কাছেই। অভিষেক বচ্চন এমন দায়িত্বপূর্ণ চরিত্রের দায়িত্ব বেশ দায়িত্ব সম্পন্ন ভাবেই পালন করেছেন। ভিকি কৌশল গতানুগতিক। তাপসী পান্নু প্রত্যেক ছবিতেই উন্নতি করছেন।
তবে এহ বাহ্য। সত্যি বলতে কী, শরৎচন্দ্রকে অস্বীকার করার এই দৃষ্টান্তই লজ্জাজনক। 

জনপ্রিয়

Back To Top