সম্রাট মুখোপাধ্যায়: • সঞ্জু। পরিচালনা:‌ রাজকুমার হিরানি। অভিনয়ে:‌ রণবীর কাপুর, অনুষ্কা শর্মা, দিয়া মির্জা, পরেশ রাওয়াল, মনীষা কৈরালা, জিমি সর্ব, ভিকি কৌশল, সোনম কাপুর, বোমান ইরানি, সায়াজি সিন্ধে, করিশ্মা তান্না, প্রকাশ বেলাওয়াড়ি, পীযূষ মিশ্র।
‘‌গান্ধিগিরি’‌ যেমন বিশুদ্ধ গান্ধীবাদ নয়। ‘‌সঞ্জুগিরি’‌ও তেমনই সঞ্জয় দত্তের নিখাদ বায়োপিক নয়।
এবং রাজকুমার হিরানির এই ‘‌সঞ্জু’‌ ছবিটি আসলে একটি বিশুদ্ধ ‘‌সঞ্জুগিরি’‌। মানে প্রায় মোহনবাগান–‌ইস্টবেঙ্গলের হয়ে গ্যালারিতে গলা ফাটানোর মতো ক’‌রে অন্ধভাবে সঞ্জয় দত্তের হয়ে চেঁচিয়ে যাওয়া। যাঁরা রাজু হিরানির ‘‌মুন্নাভাই’‌ সিরিজ দেখেছেন, কিংবা ‘‌থ্রি ইডিয়েটস্‌’‌, ফলতঃ তাঁর সুক্ষ্ম, পরিমিত রসবোধে আস্থা রাখেন, তাঁরা এ’‌ছবি দেখে কিছুটা ধাক্কা খাবেন!‌
তার কারণ কি এটা, যে সঞ্জয় দত্তের জীবনী–‌চিত্র বানাতে গিয়ে পরিচালক আদতে অনুগত থাকতে চেয়েছেন আটের দশকে বা নয়ের দশকে করা সঞ্জুবাবার সেই সব ‘‌ননসেন্স’‌ কমেডি বা চড়া দাগের নাটক, অ্যাকশান, আর সেক্স সম্বলিত মশালা ছবির ঘরানার প্রতি?‌ তা হলে হয়ত এ ছবি এভাবে বানানোর একটা যুক্তি খুঁজে পাওয়া যেতে পারে যে, সঞ্জয়ের চিত্রনাট্য আর সঞ্জয়ের জীবন এক!‌ ফিল্ম (‌‘‌শিল্প’‌ কথাটা লিখছি না)‌ আস্তে আস্তে খেয়ে নিচ্ছে এক অভিনেতার জীবন!‌
কিন্তু সে ক্ষেত্রেও সমস্যাটা হচ্ছে সিনেমায় সেই ‘‌ফিল্ম’‌ ব্যাপারটা থাকতে হবে তো!‌ সঞ্জয়ের প্রথম ছবি ‘‌রকি’‌র শুটিং পর্ব এসেছে। ভীষণ মজা করেই এসেছে। রাজকুমার হিরানির প্রসিদ্ধ রসবোধের একটু ছোঁয়াও মিলেছে এখানে। শুটিং নিয়ে মজা। কেমনভাবে নায়িকাকে ছাড়াই রোমান্টিক গানের শট্‌ দিতে হয় নায়ককে। এসেছে এই ছবির প্রিমিয়ারের সন্ধ্যায় অভিজাত হলের লবিতে নেশাগ্রস্ত সঞ্জয়ের ‘‌হ্যালুশিনেসন্‌’‌ দেখার বিড়ম্বনাময় পর্বও। ফলে কেরিয়ারের সূচনা পর্বটুকুতে ফিল্মি ‘‌অ্যাম্বিয়েন্স’‌ দশে দশ। কিন্তু তারপর?‌
‘‌নাম’‌ (‌যে ছবি সঞ্জুকে তারকা বানিয়েছে)‌, ‘‌সাজন’‌ (‌যে ছবি সঞ্জুকে অভিনেতার খ্যাতি এনে দিয়েছে)‌, ‘‌খলনায়ক’‌ (‌যে ছবি তারকার ঔজ্জ্বল্যে বিতর্কের দ্যুতি জুড়েছে)‌, ‘‌ইয়ালগার’‌ (‌যে ছবি করতে গিয়ে পরিচালক ফিরোজ খান সূত্রে আলাপ দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে)‌, বা নিদেনপক্ষে অন্যসব হিট্‌, ‘‌কব্জা’‌, ‘‌সড়ক’‌— কোথায় এ সব ছবির কথা?‌ সঞ্জয়ের মতো ব্যস্ত অভিনেতার কেরিয়ার আর জীবনের রান্নাঘরে উঁকি মারতে গেলে তো এই সব ছবির শুটিং, স্টুডিও ফ্লোর, সেখানে রাগারাগি থেকে রোমান্স— সবটাই বড্ড জরুরি ছিল। দরকার ছিল ‘‌ফিল্ম উইদিন ফিল্ম’‌–‌এর খেলাটা। সিনেমার ভেতর সিনেমা। তা না হলে যে দেবমূর্তি চালচিত্রহীন হয়ে পড়ে, এটা কি হিরানী বোঝেননি?‌
নাকি, এ ছবির আসল উদ্দেশ্য সঞ্জয়কে কলঙ্কমুক্ত করা। দর্শকের দরবারে কেবলমাত্র সঞ্জুর তরফের যুক্তিগুলোকেই তুলে ধরা। আর তার জন্য যে আংশগুলো, ঘটনাগুলো, সিনেমাগুলো কোনও-‌না-‌ কোনও ভাবে বিতর্ক–‌সংশ্লিষ্ট, সেগুলোকে এ’‌ছবির চিত্রনাট্য থেকে ঝেড়ে ফেলা হয়েছে!‌ তাই হয়ত ‘‌ইয়ালগার’‌ নেই, যাতে দাউদ প্রসঙ্গ না থাকে। তাই হয়ত ‘‌সাজন’‌ নেই, যাতে মাধুরী প্রসঙ্গ না আসে। তাই হয়ত ‘‌নাম’‌ নেই, যাতে কুমার গৌরবকেও প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া যায়।
না, সত্যিই কুমার গৌরব নেই!‌ এটাই ঘটনা!‌ সঞ্জয়ের ভগ্নিপতি হিসাবে শুধু নয়, এ’ চিত্রনাট্যে তো হেঁটে হেঁটে আসার কথা রাজেন্দ্রকুমারের ছেলের, সঞ্জয়ের কেরিয়ারে ও নেশাগ্রস্ত জীবনে, পরবর্তীকালের আদালত পর্বেও তাঁর যা ভূমিকা। তার বদলে আছে কমলেশ কানাইয়ালাল (‌ভিকি কৌশল)‌ নামের এক বন্ধুর কথা। গোটা ছবি জুড়ে। এ’‌চরিত্র কাল্পনিক না বাস্তবিক জানা নেই, তবে এ’‌চরিত্রের অভিনেতাকে খানিকটা কুমার গৌরবের মতো দেখতে, এটা ঘটনা। কিন্তু বাস্তবের কুমার গৌরবের ছিটে ফোঁটা উল্লেখও ছবিতে নেই। বোনেরা দৃশ্যতঃ আছে। কিন্তু নামমাত্র। মা নার্গিস আছেন। ক্যান্সার আক্রান্ত। এই চরিত্রে মনীষা কৈরালার উপস্থিতি অন্যরকম একটা আবেগের ছোঁড়াও এনে দিয়েছে। কিন্তু চরিত্রটিতে কখনোই নার্গিসের পড়ন্ত সৌন্দর্য আর ব্যক্তিত্বের ছোঁয়া আসেনি। কখনও ব্রেকফাস্ট টেবিলে অসুখ লুকোনো চাপল্যে বাড়াবাড়ির ছোঁয়া, কখনও গুরুত্বহীন কাল্পনিক গানের দৃশ্য, যেখানে মা ও ছেলে নাচছে সিনেমার শুটিং–‌এর মতো— গোটা নার্গিস পর্বটায় জল ঢেলে দিয়েছে।
তবে এই ‘‌নেই’‌–‌এর তালিকার শেষটা জানতে, ‘‌সিটবেল্ট’‌ বেঁধে বসুন। সব চেয়ে বড় ধাক্কাটা হল, সঞ্জয়ের প্রথম স্ত্রী রিচা শর্মা নেই!‌‌ না, সে সঞ্জয়ের প্রথম ‘‌নোটেবল’‌ প্রেমিকা টিনা মুনিমও নেই। বদলে আছে এক গুজরাটি মেয়ে (‌টিনাও গুজরাটি ছিলেন, কিন্তু এ মেয়ের সঙ্গে টিনার পার্থক্য আল্পস্‌ পর্বতমালার সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের)‌ রুবি (‌সোনম কাপুর)‌ আর তার এ’‌গল্পের পক্ষে অপ্রয়োজনীয় বাবা (‌বোমান ইরানি)‌। এদের নিয়েই প্রথমার্ধের অর্ধেক জুড়ে অনেক ভাড়ামো থেকে চোখের জল আছে— কিন্তু সঞ্জয়ের মূল জীবনের সঙ্গে তা সম্পর্কহীন। যেমন মাধুরীর অভাব ঢাকতে আনা হয়েছে জনৈকা পিঙ্কিকে (‌করিশ্মা তান্না)‌। আসলে সে কমলেশের প্রেমিকা, তবু বন্ধুর উপস্থিতিতেই কীভাবে তার সঙ্গে এক রাতে প্রথম আলাপে যৌন সম্পর্ক হয়ে গেল, তার রসালো বর্ণনা দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে যেভাবে দৃশ্যতঃ আর সংলাপে এসেছে, তা ডেভিড ধাওয়ানের একদা–‌কুখ্যাত সেই সব কমেডি ছবিকেও লজ্জা দেবে। একটি দৃশ্যে জাঁক করে এ’‌ছবির সঞ্জু জানিয়েছে তাঁর শয্যাসঙ্গিনীর সংখ্যা সার্ধ–‌তিনশত!‌ সবই আছে। শুধু ক্যান্সার–‌আক্রান্তা স্ত্রী রিচা শর্মা বা প্রথম কন্যার অংশটাই নেই!‌
আসলে এই থাকবে না’‌র শর্তগুলো মেনেছেন বলেই কি রাজুসাহেব অনুমতি পেয়েছেন ‘‌বায়োপিক’‌টি বানানোর?‌ ছবির মূল শিরদাড়া সঞ্জয়ের একটি অথরাইজড্‌ বায়োগ্রাফি’‌ লেখা। যেটি লিখছেন এক বিদেশিনী (‌অনুষ্কা শর্মা)‌। আগামী দিনে এমন কিছু ঘটলে তা কেমন হবে, তারই নমুনা এ’‌ছবিতে। সেই বায়োগ্রাফি–‌লিখন–‌সূত্রেই ফ্ল্যাশব্যাকে পছন্দসই সব ঘটনার অবতারণা। যেমন কেমনভাবে কুচক্রী এক ড্রাগ ডিলারের (‌জিমি সর্ব)‌ পাল্লায় পড়ছেন সরলমতি সঞ্জয়। কেমনভাবে বাবার সুরক্ষার জন্য বে–‌আইনি বন্দুক কিনছেন সুপুত্র সঞ্জয়। সর্বোপরি কেমনভাবে খবরের কাগজগুলোই এরকম ‘‌চক্রান্ত’‌ করে পেছনে লাগছে তার পুলিস সূত্রের কবর ছেপে। আসলে তিনি নিষ্পাপ, যত পাপ সংবাদ মাধ্যমের!‌ ছবিতে তাঁর বর্তমান স্ত্রী মান্যতা (‌দিয়া মির্জা)‌ আছে। একেবারে সর্বস্ব–‌পণ করে উদ্ধার কারিনীর মতো।
ছবির একমাত্র পোক্ত জায়গা বাবা সুনীল দত্তের অংশটুকু। স্নেহে ও কঠোরতায়। দারুণ ফুটিয়েছেন পরেশ রাওয়াল। আর সঞ্জু?‌ রণবীর কাপুরকে ওই মেক–‌আপে স্থিরচিত্রে যত ভালো লেগেছিল, পর্দায় সচল অবস্থায় তা লাগল না। হাঁটা চলায় কাঁধের ভঙ্গী যথাযথ। কিন্তু কথা–‌বলায় বড় দ্রুত। যেন ‘‌মিমিক্রি’‌। আর চোখেও সে বিষন্নতা নেই। সেটার অবশ্য গোটা ছবি জুড়েই বড় অভাব!‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top