দ্বৈপায়ন দেব:
●‌ সমান্তরাল। পরিচালনা:‌ পার্থ চক্রবর্তী। অভিনয়ে:‌ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, ঋদ্ধি সেন, সুরঙ্গনা, কুশল চক্রবর্তী, অপরাজিতা আঢ্য, তনুশ্রী, অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়।
দুটি সত্তা। সমান্তরালে বহমান। একই অস্তিত্বে। আর তারই টানাপোড়েনে বিধ্বস্ত এক জীবন কেন্দ্রবিন্দু পার্থ চক্রবর্তীর ছবি ‘‌সমান্তরাল’‌–‌এর।
সুজন, এক আপাত শান্ত নির্বিরোধী, ‘লিরিকাল’‌ মনের মানুষ। যে যৌথ পরিবারের মধ্যে থেকেও আলাদা, বিচ্ছিন্ন, অবরুদ্ধ। বাড়ি থেকে বেরোতে দেওয়া হয় না তাকে। কারণ সে নাকি স্বাভাবিক নয়!‌ মনের জটিলতার কারণে।
ব্যাপারটা নিয়ে প্রথম খটকায় পড়ে অর্ক। সুজনের মৃত বোন রুনার ছেলে, যে হোস্টেলে বড় হয়েছে আর এখন কলেজে পড়ার জন্য থাকতে এসেছে মামাবাড়িতে। সুজন (‌পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়)‌–‌এর ভেতর এক সংবেদনশীল মানুষকে খুঁজে পায় অর্ক (‌ঋদ্ধি সেন)‌। যে জগৎ সংসারের সবার জন্য মায়ায় ভোগে, বিদেশি ভাষায় সুরেলা গান গায়, বেহালা বাজায়, পাতার পর পাতা জীবনানন্দ দাশ আবৃত্তি করে যায়। প্রকৃতি, কাব্য আর সুরের অদ্ভুত সব প্রবাহ যেন ঘিরে থাকে তাকে।
আবার এই সুজনের ভেতর অপ্রত্যাশিত কিছু দিকও আছে। যেগুলো সামনে এসে আঘাতের মতো বারবার ছিন্ন করে দিয়ে যায় অর্কের মনোভাবকে। পরিবারের সবাই অপ্রকৃতিস্থ ভাবে সুজনকে। তাকে আটকে রাখে বাড়ির ভেতর। আর নিমেষমাত্র সুযোগ পেলেই সুজন পালিয়ে যায় বাড়ি থেকে, চলে যায় বেশ্যাপাড়ায়!‌ অংশ নেয় তাদের অদ্ভুত সব আচারে। অর্ক দেখে সুজনের ঘরে দুপুরে নির্জনে এক নারী আসে। বাড়ির লোকেদের বহুবার জিজ্ঞেস করেও অর্ক জানতে পারে না কেন সুজনকে এমন অপ্রকৃতিস্থের মতো অবরূদ্ধ করে রাখা হয় অন্দরমহলে!‌ এক অদ্ভুত রহস্যের বাতাবরণ গড়ে ওঠে। এই রহস্যকে ঘিরে চিত্রনাট্যে অন্যরকম এক পারিবারিক থ্রিলারের আমেজ তৈরি করেছেন পরিচালক পার্থ চক্রবর্তী এবং চিত্রনাট্যকার পদ্মনাভ দাশগুপ্ত, যা ছবিটি শেষ পর্যন্ত দেখতে বাধ্য করে।
অবস্থা চরমে ওঠে যখন সুজন অর্কের প্রেমিকা তিতলিকে ছাদে একা পেয়ে শারীরিকভাবে ঘনিষ্ট হবার চেষ্টা করে। তার শরীরের গোপন অংশ ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করে। অর্ক–‌ও এর ফলে ক্ষিপ্ত হয়ে মামাকে বাড়িছাড়া করতে চায়। যে কাজে এর আগেই সক্রিয় ছিল সুজনের ছোটভাই (‌অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়)‌ ও ভাই–‌বউ (‌তনুশ্রী চক্রবর্তী)‌। সুজনের দাদা (‌কুশল চক্রবর্তী)‌ ও বউদির (‌অপরাজিতা আঢ্য)‌ প্রতিরোধে তা এতদিন পেরে ওঠেনি। অবশেষে নাটকীয় এক ঘটনার অন্তে মুখ খোলেন, রহস্যের যবনিকা ছিন্ন করেন সুজনের বাবা (‌সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়)‌।
এই অংশে সৌমিত্রবাবুর একটি দীর্ঘ একক সংলাপ আছে। অনুতাপ আর বিষণ্ণতাজনিত সে মুহূর্তে তাঁর অভিব্যক্তি আর স্বরক্ষেপন আজও কত অমোঘ, তারই স্বাক্ষ্য ধরা রইল এই ছবিতে। জটিল অবদমিত মনস্তত্বের এক চরিত্রে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় তাঁর আগের সব কাজকে যেন ছাপিয়ে গেছে। বিশেষতঃ শেষ দৃশ্যে তাঁর বেদনাময় ‘‌এক্সপ্রেশান’‌!‌ অনবদ্য!‌ ঋদ্ধি সেনও এ’‌ছবিতে দারুণ পরিণত। সুরঙ্গনাও যথাযথ। স্নেহময় বড় দাদার চরিত্রে কুশল চক্রবর্তী একেবারে ঠিকঠাক। বরং তনুশ্রী বা অপরাজিতা আঢ্যকে যেভাবে চিত্রনাট্যে আনা হয়েছে তাতে অনেকটা ‘‌ক্লিশে’‌ মিশে আছে যেন।
সব মিলিয়ে, ফর্মুলা না মেনে জীবনের এক অন্য গল্প বলার চেষ্টা করেছেন পার্থ চক্রবর্তী। এই গল্প মানবিক, যা স্পর্শ করে দর্শককে। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top