সম্রাট মুখোপাধ্যায়: রং বেরঙের কড়ি, পরিচালনা:‌ রঞ্জন ঘোষ। অভিনয়ে:‌ চিরঞ্জিত, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, ঋত্বিক চক্রবর্তী, সোহম, অরুণিমা ঘোষ, অর্জুন চক্রবর্তী, ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়, ধী মজুমদার, খরাজ মুখোপাধ্যায়, ডোনা সাহা
মৃত্যু। বিচ্ছেদ। বিষণ্ণতা, বিসর্জন
এই চার মন খারাপ–‌করা উপাদান নিয়ে পরিচালক রঞ্জন ঘোষের ‘‌রং বেরঙের কড়ি’‌। ছোট ছোট চার গল্প। চার স্বাদের। সিনেমার পরিভাষায় যাকে বলে ‘‌বক্স–‌ফিল্ম’‌।
আর চারটে গল্পের মধ্যেই একটা মূল দ্বন্দ্বকে ঘুরিয়ে–‌ফিরিয়ে এনেছেন পরিচালক তথা কাহিনীকার রঞ্জন। তা হল, মানুষের সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করে কে?‌ অর্থ, নাকি মানবিক আবেগ?‌ প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর উত্তরটাই চিত্রনাট্যের মূল অবলম্বন। সন্দেহ নেই, গল্পগুলোতে ছোট–‌গল্পের নিপুণ স্বাদ পাওয়া গেছে।
সবটাই যে সাহিত্য–‌নির্ভর তাও নয় অবশ্য। এই সব গল্পকে দৃশ্যে বদলাতে গিয়ে চারটে গল্পের জন্য চারটে আলাদা রঙও ভেবেছেন পরিচালক। অনেকটাই ক্রিস্তফ কিওসলেস্কির ‘‌থ্রি কালার্স’‌–‌এর ছাঁচে। তবে বাংলা ছোট গল্পের কৃৎকৌশলের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতেই সম্ভবত কিওসলেস্কির ধাঁচে গল্পগুলোকে একে–‌অপরের সঙ্গে জোড়ার রাস্তায় যাননি রঞ্জন। বিচ্ছিন্নই রেখেছেন। আর জোর দিয়েছেন প্রতিটি ক্ষেত্রেই জোরালে ‘‌ক্লাইম্যাক্স’‌–‌এর ওপরে। তবে ছবির দৈর্ঘ্য আরও মিনিট কুড়ি কম হলে ভাল হত। 
প্রথম কাহিনীতে দুই আদিবাসী যুবক–‌যুবতী। তারা বিবাহিত দম্পতি। রামচন্দ্র মুর্মু (‌সোহম)‌ আর সীতারানি মুর্মু (‌অরুণিমা ঘোষ)‌। চরিত্রদের নামে এই পৌরাণিক বিভার আয়োজন ঋত্বিক ঘটকের ‘‌সুবর্ণরেখা’‌র কথা মনে করিয়ে দেবে। ভুলে গেলে চলবে না, এ ছবির সৃজন–‌উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন অপর্ণা সেন। রামচন্দ্র আর সীতারানি চায় বিবাহ বিচ্ছেদ। তারা দ্বারস্থ হয় পঞ্চায়েত অফিসে বসা মুহুরি খগেনবাবুর (‌খরাজ মুখোপাধ্যায়)‌। বিচ্ছেদ হয়েও যায় তাদের। কিন্তু তার পরই গল্পে আসে বাঁকবদল।
দ্বিতীয় কাহিনীতে এক ত্রিকোণ সম্পর্ক। এক মেয়ে (‌অরুণিমার এই ছবিতে অভিনীত দ্বিতীয় চরিত্র)‌ ভালবাসে এক যুবককে (‌অর্জুন চক্রবর্তী)‌। দু‌জনের ভালবাসার পথে অন্তরায় অভাব। মেয়েটি বিয়ে করে বয়সে বড় এক ধনী লোককে (‌চিরঞ্জিত)‌। তারপর সেই লোকটি ব্যবসা দেখার জন্যই ডেকে আনে তার প্রেমিককে। আচমকাই এক রাতে খবর আসে, নৌকাডুবিতে মারা গেছে স্বামী। এবার তাহলে কাঙ্ক্ষিত মিলন দুই প্রেমিক–‌প্রেমিকার। কিন্তু সেখানেই আসে পরপর দুটি মারাত্মক মোচড়। এ গল্পটি যেভাবে ধীরে ধীরে এগিয়েছে, আর সম্পর্কের অজানা পরতগুলো খুলে গেছে, তা দেখতে ভারি অনুভবী লাগে। সেক্ষেত্রে চিরঞ্জিতের মেজাজি অভিনয়, ছদ্ম রসিকতার ব্যবহার, আবার আলগা একটা বয়স্ক বিষণ্ণতা ধরে রাখা— ‌অসাধারণ মাত্রা যুক্ত করেছে এই অংশে। যোগ্য সঙ্গত করেছেন অরুণিমা ঘোষও।
বিরতির পরে তৃতীয় ছবিটি ধাক্কা দেয়। এটি এই প্যাকেজে সার্থক ‘‌কালো’‌ ছবি। আগের ছবি দুটির নরম ভাবকে কাটিয়ে দেয় সংলাপের কড়া ভাষায়, ক্যামেরার ঝাঁকুনি আর অন্ধকার ‘‌টোন’‌–‌এ। গোটা ছবি জুড়েই এই ‘‌মরবিডিটি’‌র হানাটাকে বজায় রাখতে পেরেছেন রঞ্জন। তার গল্পের নায়ক (‌ঋত্বিক চক্রবর্তী)‌ ছবির প্রথম ফ্রেমেই চাকরি হারায়। এরপর তার লক্ষ্যহীন ঘুরে বেড়ানোর মধ্যে ঘটতে থাকে একের পর এক দেহোপজীবিনীর আক্রমণ। প্রথমে এক কিশোরী (‌ডোনা সাহা)‌ বন্ধুত্বের ছদ্মবেশে। এর পর এক কিশোর দালাল (‌ধী মজুমদার)‌। এরই মাঝে চাকরি–হারা যুবকের পকেটে একটা দু ‌হাজার টাকার নোট, যা তাকে ভাঙাতে হবে। যা ভাঙাতে পারেনি বলে একটু আগে সিগারেটওয়ালা তার ঠোঁট থেকে কেড়ে নিয়েছে ধরাতে–‌চলা সিগারেট। কিশোর দালালের প্রস্তাবে রাজি হয়ে সে যায় কালীঘাটের এক বাসাবাড়িতে, যেখানে অপেক্ষা করে আছে এক পূর্ববঙ্গীয় দেহোপজীবিনী (‌ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত)‌‌‌। এই জার্নিটুকুর ভেতর বেশ সাহসী কিছু মুহূর্ত আছে। তবে তা ম্লান হয়ে যায় দেহোপজীবিনীর কাছ থেকে পাওয়া একটি তথ্যে।
শেষ গল্পে মা ও ছেলের কথা। ছেলে (‌ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়)‌ বড় ঢাকি হতে চায়। অসুস্থ মাও (‌ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত এই চরিত্রটিও করেছেন)‌ সেই স্বপ্ন দেখে। ছেলের স্বপ্ন সফল হয় মার মৃত্যুমুহূর্তে। ছেলে অভিনব পথে মাকে বিদায় জানায়। এই চারটি গল্পকে গেঁথেছে এক নেপথ্য কথক। পৃথিবী (‌নেপথ্যকণ্ঠ অনসূয়া মজুমদারের)‌। এই গ্রন্থনার অংশটির ছবি ও ভাষ্য অবশ্য একটু ছেলেমানুষি লেগেছে। চারটি ছবিতেই শীর্ষ রায়ের ক্যামেরায় শহর ও গ্রামের নানা ভিন্ন চেহারা মৌলিক দৃশ্যকল্পে উঠে এসেছে। দুটি ভিন্নমাত্রিক চরিত্রে ঋতুপর্ণা নিজের অভিনয়ক্ষমতার স্বাক্ষর রেখেছেন আরেকবার। বিশেষত, দ্বিতীয় ছবিটির মতো চরিত্র তিনি কখনও করেননি। সোহম–‌অরুণিমার জুটি ভাল লেগেছে। খরাজ মুখোপাধ্যায় বা অর্জুন চক্রবর্তী যথারীতি এক্কেবারে চরিত্র হয়ে উঠেছেন। এরকম দ্বিধাগ্রস্ত নাগরিক চরিত্রে বরাবরই দুর্দান্ত ঋত্বিক চক্রবর্তী। এবারও। তবে এ ছবির সেরা আবিষ্কার দুই কিশোর অভিনেতা। ঋতব্রত মুখোপাধ্যায় আর ধী মজুমদার। নিজের নিজের জায়গায় দুজনেই চমকে দিয়েছেন কঠোরে–‌কোমলে।   ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top