সম্রাট মুখোপাধ্যায়: স্মৃতি। কলেজ জীবনের। স্মৃতি রাজনীতির। স্মৃতি। প্রেমের।
এই স্মৃতিটাই মূল কথা ‘‌রিইউনিয়ান’‌–‌এর চিত্রনাট্যে। যেখানে সময় চলে গিয়েছে দু’‌দশক আগে মানে গত শতাব্দীর নয়ের দশকে। কলেজ জীবনে। হোস্টেল, ইউনিয়ান রুম আর ক্যাম্পাস ছুঁড়ে।
‘‌রিইউনিয়ান’‌ ছবির সবচেয়ে বড় জোর এর গল্পের ‘‌ফ্রেশনেস’‌। যেখানে দু’‌টো ব্যাপার আছে। এক, তারুণ্যের তরতাজা উপস্থিতি। কলেজ–‌কাহিনীর সূত্রে। দুই, গল্পের ভেতর থাকা অচেনা স্বাদ। পরিচালক মুরারী এম রক্ষিত জানতেন তাঁর ছবির জোরের জায়গা এই গল্পটাই। আর তাই খুব বেশি সিনেমার ফর্ম নিয়ে কাটাকুটি না করে বরং মনোযোগী হয়েছেন সোজাসাপটাভাবে গল্পটাকে বলাতেই। তার ভেতর ফ্ল্যাশব্যাকের আসা যাওয়া আছে ঠিকই কাহিনীর প্রয়োজনে, কিন্তু তা যথাসম্ভব জটিলতাহীন। সিনেমা এখানে যেন অনেকটাই ‘‌বই’‌। গল্প শোনাতে শোনাতে।
কলেজ জীবনের চার বন্ধু অভি (‌‌সমদর্শী দত্ত)‌‌, শুভ (‌‌সৌরভ দাশ)‌‌, অর্ক (‌‌ইন্দ্রাশিস রায়)‌‌ আর জয়িতা (‌‌সায়নী ঘোষ)‌‌ বহুদিন পরে মিলিত হয় কয়েকদিনের জন্য। অর্ক আর জয়িতা এখন স্বামী স্ত্রী। অন্যদিকে আমেরিকা প্রবাসী শুভর সঙ্গে আসে তার স্ত্রীও (‌‌অনিন্দিতা বোস)‌‌ । চার বন্ধুর টুকরো টাকরা স্মৃতিচারণা দিয়ে শুরু হয় ছবির কাহিনীর গড়িয়ে চলা। র‌্যাগিং, ভুল বোঝাবুঝি, বন্ধুত্ব ছুঁয়ে কাহিনী স্থিতি পায় ছাত্র রাজনীতির অলিন্দে এসে।
আর তার সূত্র ধরে ঢুকে পড়ে কাহিনীর মূল জুটি রুদ্র (‌‌পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়)‌‌ আর মণিদীপা (‌‌রাইমা সেন)‌‌। রুদ্র কলেজের ছাত্র ইউনিয়ানের সাধারণ সম্পাদক আদর্শবাদী রাজনৈতিক কর্মী। আর মণিদীপা তারই সহপাঠী। মণিদীপার বাবা মানস–‌বাবু (‌‌সব্যসাচী চক্রবর্তী)‌‌ এলাকার এম এল এ। তথা প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। সেই দলের, যে দলের কর্মী রুদ্র। তার সঙ্গে ক্রমশই দলের কর্মসূচিগত ক্ষেত্রে লড়াই বাঁধতে থাকে। মতাদর্শগতভাবে ক্রমশ দলের ভেতর একা হয়ে পড়ে রুদ্র। মানসবাবুর বিরুদ্ধাচারণ করতে সে ভেঙে ফেলে মণিদীপার সঙ্গে সম্পর্ক। মণিদীপার সঙ্গে বিয়ে হয় আরেক সহপাঠী অজয়ের (‌‌অনিন্দ্য‌‌ পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়)‌। যে মানসবাবু সঙ্গে মিলে রুদ্রকে এলাকাছাড়া করে।
পাঁচ বন্ধুর রি–‌ইউনিয়ান টিম রুদ্রকে খুঁজে পায় কালিম্পঙের এক গ্রামে ২০ বছর পরে। অসুস্থ অবস্থায়। তাকে নিয়ে আসে তারা সঙ্গে করে। আর যোগাযোগ করে আবার মণিদীপার সঙ্গে। দু’‌জনের দেখা হয় আবার। এরপর ছোট একটা মোচড় আছে। সেটা এই লেখায় উহ্যই থাক।
পরিচালকের প্রধানতম কৃতিত্ব ২০ বছর আগের সময়টা, তার বৈশিষ্ট্য, তার রাজনৈতিক উত্তাপ–‌সেটা বিশ্বস্তভাবে ধরতে পারা। ওই ব্যাপারে কলেজ ফেস্টের একটি দৃশ্যে গায়ক নচিকেতার উপস্থিতিও চমৎকার কাজে লেগেছে। পোশাক আশাক, আসবাবপত্র, কথাবার্তার ধরণ ধারণ –‌ সর্বত্রই সময়ের পিছিয়ে যাওয়াটা বিশ্বস্ত লেগেছে। তবে কলেজে শিক্ষক–‌শিক্ষিকাদের অনুপস্থিতি বড্ড চোখে লেগেছে। যেমন অভাব অনুভূত হয়েছে ক্লাসরুম দৃশ্যেরও।
রিউউনিয়ানে আসা পাঁচ জনের অভিনয়ের কেমিস্ট্রিতে বোঝাপড়া ভালোই অনুভূত হয়ছে। পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় ছাত্র নেতার চরিত্রে প্রয়োজনীয় দাপটের সঙ্গে তারুণ্যের চমৎকার মিলমিশ করেছেন। রাইমা সেনকে ভাল লাগে। সব্যসাচী চক্রবর্তী মানসবাবুর একরৈখিক চরিত্রকেও আকর্ষনীয় করেছেন। পারিবারিক গল্প বলতে রাজনৈতিক ‘‌অ্যাঙ্গেল’‌কে ব্যবহার করার দক্ষতা দেখিয়েছেন পরিচালক।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top