সৌগত চক্রবর্তী: জীবন ও মৃত্যুর সীমারেখা ছুঁয়ে মৃত্যুর দিকেই ঢলে পড়েছে পরিবারের একজন প্রিয় মানুষ। সেই মানুষটির আর কোনও অনুভূতি নেই। অথচ সেই কাঙ্খিত মৃত্যুও আর আসছে না। অথচ, মানুষটির এইভাবে শুধুমাত্র হৃদস্পন্দন চালু থাকার জন্য কতকিছুই না আটকে গেছে সেই পরিবারে। মানবিকতা এই প্রসঙ্গে কী বলে?‌ আর বাস্তবটাই বা কী?‌ তারই এক সাহসী ও বাস্তব সম্মত ছবি এঁকেছেন পরিচালক ইন্দ্রাশিস আচার্য তাঁর নতুন ছবি ‘‌পিউপা’‌য়।
ছবির প্রথমেই বিধিবদ্ধ বার্তায় বলা হয়েছে, এই ছবি মার্সি কিলিং-‌এর পক্ষে নয়। হয়ত সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্রের কারণেই এই বার্তা দিতে হয়েছে পরিচালককে। কিন্তু এরকম পরিস্থিতিতে কী করতে পারে সেই মানুষটির পরিবার?‌ এ বিষয়ে পক্ষে বা বিপক্ষে নানা মত থাকতেই পারে। ছবিতে শুধু এই সত্যটুকু পরিষ্কার করেছেন পরিচালক।
গুটিপোকা থেকে প্রজাপতি হয়ে ডানা মেলার অপেক্ষায় একজন যুবক। আর অনিবার্য পরিস্থিতিতে যখন সেই ডানা মেলার সুযোগ প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়ার মুখে তখনই সেই যুবককে ফের ডানামেলার সুযোগ তৈরি করে দিল তার কাকা। মার্সি কিলিং-‌এর মাধ্যমেই।
ছবির গল্পের কেন্দ্রে শুভ্র (‌রাহুল)‌। আমেরিকা থেকে মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে যে কলকাতায় এসেছে। কিন্তু কলকাতায় যখন সে এসে পৌঁছয়, দেখে তার মা মারা গেছেন। আবার যখন সে আমেরিকায় ফেরার তোড়জোড় করছে তখনই তার বাবার (‌প্রদীপ মুখার্জি)‌ সেরিব্রাল অ্যাটাক এবং কোমায় চলে যাওয়া। ডাক্তারের মত, সুস্থ হওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। ১০-‌১২ দিনের মধ্যেই মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। এদিকে শুভ্রর বিবাহিতা দিদি (‌সুদীপ্তা চক্রবর্তী)‌ শেষ অবস্থায় বাবার কাছে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও তার স্বামীর অসম্মতিতে থাকতে পারে না। শুভ্রর কাকা রজতও কয়েকদিনের মধ্যেই ব্যস্ত হয়ে পড়বে বিদেশে নানান কনফারেন্সে। কাজেই বাবাকে দেখবে কে?‌ শুধুমাত্র দিন-‌রাতের সেবিকা নিয়োগ করে দিলেই কি দায়িত্ব শেষ?‌ এই নিয়ে দোলাচল শুভ্রর মনে। কাকা রজত বারবার বলে এই ইমোশন ছেড়ে শুভ্রর উচিত আমেরিকায় গিয়ে কাজে যোগ দেওয়া। এদিকে কোমায় বাবার কেটে গেছে এক মাসের ওপর। শুভ্রর চাকরিও প্রায় যায় যায়। এবার কী করবে শুভ্র? তার মানবিক আদর্শর দ্বারা চালিত হয়ে সে তো চাকরি ছেড়েই বাবার পাশে থাকতে চায়। কিন্তু বাস্তববাদী কাকার পরামর্শ, এভাবে আর কতদিন?‌ কাজেই শুভ্র যেন এই সংসারে গুটিপোকা হয়ে না থেকে উন্মুক্ত পৃথিবীতে ডানা মেলার সুযোগটা পায়ে না ঠেলে। ‌‌
আপাত দৃষ্টিতে কাকা রজতকে মনে হতেই পারে ভিলেন। কিন্তু দারুণ দক্ষতায় এই চরিত্রের মধ্যে পরিমিত আবেগ, পারিপার্শিক মানুষগুলোর ভাল চাওয়া, উদারতা এবং সর্বোপরি বাস্তব যুক্তির প্রতি নিষ্ঠা এনেছেন চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক ইন্দ্রাশিস আচার্য। আর অভিনীত চরিত্রের এই দিকগুলো সুন্দর অভিনয়ে  বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন অভিনেতা কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়। শুভ্রর ভূমিকায় রাহুলও সুন্দর। শুভ্রর দিদি মৌ-‌এর ভূমিকায় অত্যন্ত স্বাভাবিক অভিনয় করেছেন সুদীপ্তা চক্রবর্তী। অল্প সুযোগে দেবপ্রসাদ হালদার ও বাবার চরিত্রে প্রদীপ মুখোপাধ্যায়কে ভাল লাগে। রাহুলের প্রেমিকা বর্ষার ভূমিকায় পিয়ালী মুন্সি যথাযথ। কিন্তু পুরো ছবিটাই দাঁড়িয়ে আছে রজত ও রাহুলের যুক্তি ও প্রতিযুক্তির মধ্যে। এই ক্রমাগত সংলাপ ও প্রতিসংলাপে ছবি কিছুটা শ্লথ হয়েছে ঠিকই। তবে সুন্দর অভিনয়ের সুবাদে তা ঢাকা পড়ে যায়। সব মিলিয়ে যে ছবি তৈরি করেছেন পরিচালক ইন্দ্রাশিস তা হয়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী ও সাহসী গল্প। ছবির বিষয় নিয়ে বিতর্ক তো থাকবেই। সেই বিতর্কে না ঢুকেও বলা যায়, এরকম একটা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়কে নিজের ছবির বিষয় হিসেবে নির্বাচন করার জন্যে ধন্যবাদ প্রাপ্য ইন্দ্রাশিস আচার্যের। ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top