অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: প্রচলিত পথে হাঁটেননি কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, তাঁর নতুন ছবি ‘‌মুখোমুখি’‌তে। বিষয় এবং আঙ্গিক, দুটো নিয়েই পরীক্ষা করেছেন তিনি। এবং এই পরীক্ষা করার সাহসটাকে অবশ্যই স্বাগত জানাতে হয়। সবাইকে একসুরে বাজানোর চেষ্টাকে এই ছবির একটা চরিত্র তীব্রভাবে আক্রমণ করে। কমলেশ্বর নিজেও চেষ্টা করেছেন এক সুরে বেজে ওঠার চলতি পথকে অগ্রাহ্য করতে। এই চেষ্টাটার জন্যে সাহস লাগে। সেই সাহসটা দেখিয়েছেন কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়। এবং সন্দেহ নেই, সাহস দেখিয়েছেন ফ্রেন্ডস কমিউনিকেশনের দুই প্রযোজক ফিরদৌসল হাসান ও প্রবীর হালদার।
এছবির চালচিত্র যেন নাটকের। সেভাবেই দুর্দান্ত একটা সেট তৈরি করেছেন শিল্প নির্দেশক তন্ময় চক্রবর্তী। পরিচালকের ভাবনাকে যেভাবে রূপ দিয়েছেন শিল্প নির্দেশক, তাতে নাটকের সেটের প্রেক্ষাপটও মাঝে মাঝেই অনেকটা ‘‌স্পেস’‌ তৈরি করেছে। যেটা খুব জরুরি ছিল এই ছবির ক্ষেত্রে। ফলে বিভিন্ন অবস্থান থেকে ধরা পড়ে ছবির চরিত্ররা। আর, বিছানায়, টেবিলে বা বসার টুল-‌এ কখনও ‘‌গুপী গাইন’‌-‌এর ক্যলিগ্রাফি বা শম্ভু মিত্রর ‘‌কাকে বলে নাট্যকলা’‌-‌র অক্ষরগুলো স্পষ্ট হয়ে অন্য একটা মাত্রাও তৈরি করে। ক্যামেরায় শুভঙ্কর ভড়ও প্রশংসাযোগ্য।
এই ছবির চরিত্ররা আসলে প্রথমত এক বিখ্যাত লেখিকা ইশার (‌গার্গী রায়চৌধুরি)‌ ভাবনা প্রসূত। ইশা যখন কোনও চরিত্রকে জটিলতার মধ্যে ফেলে, তার সঙ্গী অগ্নি (‌রজতাভ দত্ত)‌ বারবার প্রশ্ন তোলে, আপত্তি জানায়। কিন্তু প্রথাগত প্রেমের গপ্পোতে আপত্তি আছে ইশার। একটা সময় দেখা যায়, অগ্নিও নিজের মতো করে তৈরি করতে থাকে চরিত্র। ফলে ইশা, অগ্নির মতবিরোধ থেকে অন্য একটা অ্যাঙ্গেল তৈরি হতে থাকে।
সোজাসাপ্টা কোনও গল্প বলার ছবি নয় ‘‌মুখোমুখি’‌। মূলত ইশার তৈরি দুটো চরিত্র শৌনক (‌যিশু সেনগুপ্ত)‌ আর অনসূয়ার (‌পায়েল)‌ জীবনযাপনকে ঘিরে এই ছবি এগোতে থাকে। তাদের স্বপ্ন, স্বপ্নের ভাঙচুর, তাদের কাছে আসা, দূরে চলে যাওয়াকে ধরতে গিয়ে কমলেশ্বর জীবনের নানান ভাবনাকে, জীবনকে নানান দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখার চেষ্টাকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। জীবন তো একইরকম নয়। একজনের জীবনও নানান ভাবনার, নানান অভিঘাতের চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, চলতে থাকে। তা কখনও একমাত্রিক নয়। এই বহুমাত্রিকতাকেই তুলে ধরতে চেয়েছে ‘‌মুখোমুখি’‌।
কিন্তু, সমস্যা হল, সেই বহুমাত্রিকতাকে ধরতে গিয়ে বহু কিছু দেখাতে এবং বলতে চেয়েছেন কমলেশ্বর। ফলে, অনেক অনেক কথা বলে এই ছবির চরিত্ররা। কখনও বর্তমানে, কখনো ফ্ল্যাশব্যাকে। এবং তার সমর্থনে অনেক সাদা-‌কালো দৃশ্যও নির্মাণ করেন পরিচালক। যা, সবসময় খুব জরুরি বলে মনে হয় না।
ফ্ল্যাশব্যাকে শৌনক (‌সাহেব ভটআচার্য)‌ ও অনসূয়া (‌দর্শনা বনিক)‌ তাদের মাখো-‌মাখো প্রেম পর্বকে স্পষ্ট করে এবং তখনই ভাঙনের বীজ ঢুকে যায় সম্পর্কের মাঝখানে।
এছবিতে গার্গী রায়চৌধুরি ও রজতাভ দত্ত খুব ‘‌ম্যাচিওরড’‌ অভিনয় করেছেন। রজতাভ নিজস্ব ব্যক্তিত্বে উজ্জ্বল। কিন্তু লেখিকা ইশার চরিত্রটা যথেষ্ট জটিল, যা দক্ষতার সঙ্গে স্পষ্ট করে তুলেছেন গার্গী। অন্য একটা তাৎক্ষণিক সম্পর্ককে স্বীকার করার পর ইশা অগ্নিকে বলে ওঠে—‘‌তুমি আমাকে আর ভালবাসবে না?‌’‌ এই মূহূর্তটা গার্গীর অভিনয়ে গভীর অভিঘাত তৈরি করে। এই দৃশ্যটি গার্গী ও রজতাভর অভিনয় দক্ষতার একটা সেরা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।
যিশু আর পায়েলও ভাল অভিনয় করেছেন। ঝগড়ার দৃশ্যে যিশু এবং পায়েল, কেউ-‌ই কম যাননি।
ছবির শুরুতেই পদ্মনাভ আর ঊষসী বেশ স্বাভাবিক। সাহেব ভাল অভিনয় করেছেন। দর্শনা ছেলেমানুষীকেই ফুটিয়ে তুলেছেন।
ছবির শেষ দিকে ইশা নয়, অগ্নি তার ভাবনা থেকে এক চরিত্রকে সৃষ্টি করে। যার নাম ‘‌পরিতোষ’‌ও হতে পারে। তিনি অঞ্জন দত্ত। এই চরিত্রে সত্যজিৎ রায়ের ‘‌আগন্তুক’‌-‌এর উৎপল দত্তর ছায়া স্পষ্ট। আগন্তুক-‌এ আলতামিরার গুহাচিত্রের কথা ছিল, এখানে আছে থিবসের ফ্রেসকোর কথা। হয়ত ইচ্ছে করেই কমলেশ্বর এই চরিত্রকে রেফারেন্স সমেত এনেছেন, যে চরিত্র নস্যাৎ করে দেয় তথাকথিত ‘‌সভ্যতা’‌র, ‘আধুনিক ‌শিল্পে‌র’‌ হামবড়াইকে।
অঞ্জন দত্ত নিজের মতোই স্বাভাবিক এই চরিত্রে। দেবজ্যোতি মিশ্রর সঙ্গীত এই ছবির মূল সুরকে স্পষ্ট করেছে। সব মিলিয়ে, এক নতুন আঙ্গিকে, ‘‌মুখোমুখি’‌কে পরিচালক  দর্শকদের ‘‌মুখোমুখি’ এনে দিলেন। নতুন আঙ্গিকের ছবি। তথাকথিত স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ছবি। ফর্মুলা অগ্রাহ্য করে দর্শকদের মুখোমুখি দাঁড়ানোর ছবি। এই নতুনকে অভিনন্দন।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top