অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়:  মাছের বড় টুকরোটা ছেলেকে দিয়ে যখন নতুন বউয়ের পাতে ছোট টুকরোটা তুলে দেন শাশুড়ি, তখন সদ্য বিবাহিতা ওই নারীর গলায় একটা মাছের কাঁটা বিঁধে যায় যেন। এই মাছের কাঁটাটা কেউ কেউ আজীবন বয়ে বেড়ায়। ফলে, শাশুড়ির সঙ্গে একটা অলিখিত ‘‌শত্রুতা’‌ চলতেই থাকে সারাজীবন। কিন্তু, সেই খাওয়ার টেবিলেই ঘটে যাওয়া একটা দৃশ্য অনেক সময়েই চোখ এড়িয়ে যায় নব-‌বিবাহিতার। সে দেখতে ভুলে যায়, তার চেয়েও অনেক ছোট একটা মাছের টুকরো নিয়েছেন তাঁর শাশুড়ি নিজে। এই দৃশ্যটা যদি একবার চোখে পড়ত, তাহলে, ওই গলায়-‌বিঁধে-‌থাকা মাছের কাঁটাটা বেরিয়ে যেত। আজীবনের অস্বস্তির হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যেত তখন-‌ই। কিন্তু, আমরা তো অনেক সময়েই ঘটনার খণ্ডচিত্র দেখি—কী সমাজে, কী সংসারে। ‘‌মুখার্জিদার বউ’‌ এই সংসারটাকেই তুলে ধরতে চেয়েছে। এবং সন্দেহ নেই, প্রথম ছবিতেই পরিচালক পৃথা চক্রবর্তী চেষ্টা করেছেন সংসারের ছোট-‌খাটো ঘটনাকে শেষপর্যন্ত সামগ্রিক দৃষ্টিতে দেখানোর এবং চেয়েছেন, গলায় আটকে থাকা মাছের কাঁটা-‌টাকে বের করে দিতে। এই চেষ্টায় সফল পৃথা। তাকে যথার্থ সাহায্য করেছেন তাঁর গল্পকার ও সহযোগী চিত্রনাট্যকার সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়। এবং পৃথা-‌সম্রাজ্ঞী এই ছবিটাকে শিবপ্রসাদ-‌নন্দিতার ঘরানার মধ্যেই রেখেছেন, যে দুই পরিচালকের ‘‌উইনডোজ’‌-‌ই এই ছবির প্রযোজক।
কী সেই শিবপ্রসাদ-‌নন্দিতা ঘরানা?‌ সেটা ছিল সংসারের মধ্যেই ঘটে যাওয়া ছোট-‌খাটো দ্বন্দ্ব-‌বিরোধের দিকে তাকানো এবং সেটাকেই আবেগ, ভালবাসা এবং যত্ন নিয়ে সহজ করে পর্দায় প্রকাশ করা।
‘‌সহজ’‌টা কী?‌ সহজটা হল তথাকথিত আঁতলামোর দিকে না গিয়ে, জীবনের তথা সংসারের ছোট ছোট সুখ-‌দুঃখকে অন্য একটা দৃষ্টিকোণে দেখা এবং একটা সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া। দেখলে মনে হয় এ-‌সব তো নিয়তই ঘটছে। কিন্তু, সেই সব ঘটনাই তো সংসারকে নিয়ন্ত্রণ করছে। সেই সহজ কথাটা সহজে বলা বেশ কঠিন। শিবপ্রসাদ-‌নন্দিতা রায় সেটা পারেন। সেই পথেই নিজের দক্ষতা প্রমাণ করলেন পৃথা। তাঁকে স্বাগত।
এই ছবিতে ‘‌মুখার্জিদার বউ’ দুজন। একজন অদিতি (‌কনিনীকা)‌। অন্যজন তার শাশুড়ি শোভারানী (‌অনসূয়া মজুমদার)‌। কিন্তু কে তাদের নামে চেনে?‌ তারা আসলে ‘‌মুখার্জিদার বউ’। বড়জোর ‘‌মিসেস মুখার্জি’‌।
আত্মপরিচয়ের সঙ্কট তো ঘরে ঘরে, সমাজে, সংসারে। সেদিকে অনেকে তাকিয়েও দেখে না। পুরুষ-‌শাসিত ঘর-‌সংসার সমাজে এটা যেন অতি স্বাভাবিক ব্যাপার, এটাই ধরে নেয় পুরুষেরা। আর, বহু মহিলাই নিজেদের এই ‘‌মিসেস মুখার্জি’‌ বা ‘‌মুখার্জিদার বউ’‌ পরিচয়টা মেনে নিতে বাধ্য হন। তার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ আর্থিকভাবে স্বাধীন না হওয়া। এই স্বাধীনতাটা একজন মহিলাকে পুরুষও যেমন দিতে চায়না অনেক সময়, অন্য মহিলাও চায়না বহু সময়। সেই দৃষ্টান্ত এই ছবিতেও আছে। শাশুড়ি শোভারানী কি চেয়েছিলেন এম এ পাস বৌমা অদিতি চাকরি করুক?‌
অনেক গভীর সমস্যাই সহজভাবে তুলে ধরেছে ‘‌মুখার্জিদার বউ’‌। শাশুড়ি‌-‌বউয়ের দ্বন্দ্ব তো আছেই। এবং শুধু সমস্যা তুলে ধরাই নয়, একটা পথও দেখাতে চেয়েছে পৃথার প্রথম ছবি। সেজন্যে অদিতি, শোভারানীর কাউন্সিলর হিসেবে এসেছে আরত্রিকা ভট্টাচার্য (‌‌ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত)‌। এমনকি ঘরে অত্যাচারিতা পুতুলকে (‌অপরাজিতা আঢ্য)‌ সোজা-‌হয়ে-‌দাঁড়ানোর ‘‌মন্ত্র’‌ দিয়ে নিজের অজান্তেই ‘‌কাউন্সিলর’‌ হয়ে যায় অদিতি তথা কনিনীকা, যে কিনা নিজেই কাউন্সিলরের শরণাগত।
এই ছবিতে শাশুড়ি শোভারানীর চরিত্রে অনসূয়া মজুমদার এবং বৌমা অদিতির চরিত্রে কনিনীকা বন্দ্যোপাধ্যায় অনবদ্য অভিনয় করেছেন। সিনিয়র এবং জুনিয়র মুখার্জিদার বউ-‌এর রাগ, ঝগড়া, ভালবাসার নানান মুহূর্তে অনসূয়া-‌কনিনীকার যুগলবন্দী মুগ্ধ করে। আরত্রিকার চরিত্রে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত একই সঙ্গে ব্যক্তিত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। খুবই ভাল অভিনয় করেছেন জুনিয়র মিস্টার মুখার্জি তথা শাশ্বতর চরিত্রে বিশ্বনাথ বসু। শুধু কমেডি নয়, সিরিয়াস চরিত্রেও কতটা দক্ষ বিশ্বনাথ, এই ছবি তার প্রমাণ। পুতুলের চরিত্রে অল্প অবকাশেই গভীর অভিনয় করেছেন অপরাজিতা আঢ্য। ভাল লাগে অজিতেশের চরিত্রে বাদশা মৈত্রকে। আর, ছোট্ট ইচ্ছাপূরণের চরিত্রে অ্যাডোলিনা চক্রবর্তী খুব মিষ্টি আর সাবলীল। ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তর সঙ্গীত এবং সুপ্রিয় দত্তর সিনেমাটোগ্রাফি যোগ্য সঙ্গত করেছে ছবিকে। ভাল গেয়েছেন ঈশান, শোভন, নিবেদিতা আর ইমন।
সব মিলিয়ে, ‘‌মুখার্জিদার বউ’‌ খুব সহজভাবে দর্শকদের বলে, সংসারের দিকে একবার ঠিকভাবে তাকাতে। বলে, শুধু হেঁসেলটাই জীবন নয়। বলে, গলায় আটকে থাকা মাছের কাঁটা-‌টা তুলে ফেললেই স্বস্তি। কারণ, কাঁটা বইতে নেই—সংসারে এবং জীবনে।‌‌ ‌

জনপ্রিয়

Back To Top